কেউ মিথ্যা বলছে কি না কীভাবে বুঝব

মিথ্যা বলা ঠিক নয়, এ আমরা সবাই জানি। তা সত্ত্বেও জীবনের কোনো না কোনো সময়ে ছোটখাটো মিথ্যা বলতে বা শুনতে হয়েছে। বিষয়টি এত সাধারণ যে মিথ্যা নিয়ে তৈরি হয়েছে সিনেমা, নাটক ও গান। ২০২২ সালের এক জরিপে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ দিনে গড়ে চারবার পর্যন্ত মিথ্যা বলেন।

অবশ্য এই হিসাব সবার জন্য এক নয়। হয়তো তুমি নিজে খুব একটা মিথ্যা বলো না, কিন্তু তোমার পরিচিত কেউ এখন তোমার সঙ্গে মিথ্যা বলছেন বলে সন্দেহ হতে পারে। সব সময় ধরা সহজ না হলেও, কেউ মিথ্যা বলছে কি না, তা বোঝার কিছু উপায় আছে।

সন্দেহজনক আচরণ ও মানুষের ভিন্নতা

মিথ্যা নানা ধরনের হতে পারে। ছোটখাটো বাড়িয়ে বলা থেকে শুরু করে বড় ধরনের। কেউ সন্দেহজনক আচরণ করলে তার কথা বলার ধরন ও শারীরিক অঙ্গভঙ্গির দিকে নজর দেওয়া যেতে পারে।

তবে মনে রাখা দরকার, একেক মানুষের স্বভাব একেক রকম। তাই মিথ্যা বলার লক্ষণ সবার ক্ষেত্রে একইভাবে প্রকাশ পায় না। মনোবিজ্ঞানী ডাক্তার লরেন কারউইনের মতে, কেউ কেউ এমনিতেই চিন্তিত বা বিচলিত থাকলে এমন আচরণ করতে পারেন। তাই তাড়াহুড়া করে কোনো সিদ্ধান্তে না পৌঁছে পুরো পরিস্থিতি ভালো করে ভেবে দেখা উচিত। এরপরও কখনো কখনো মনের ভেতর এমন জোরালো অনুভূতি হতে পারে সামনের মানুষটি সত্যি লুকিয়ে যাচ্ছে।

আরও পড়ুন
কিশোর সন্তানকে শুধু ‘মিথ্যা বলা যাবে না’ বলে ধমকালেই হবে না, বুঝতে হবে কেন মিথ্যা বলছে সন্তান, পেছনের কারণটাই কী।
প্রতীকী ছবিতে মডেল হয়েছেন গোলাম মোর্শেদ ও লুবাবা

মানুষ কেন মিথ্যা বলে

মানুষ নানা কারণে মিথ্যা বলে থাকে। কেউ হয়তো শাস্তি, সমালোচনা বা কোনো খারাপ পরিণতি এড়ানোর জন্য মিথ্যা বলেন। আবার কেউ অন্যকে কষ্ট পাওয়া থেকে বাঁচাতেও অসত্য কথা বলে ফেলেন।

যোগাযোগ ও আত্মবিশ্বাস বিষয়ক প্রশিক্ষক ক্যারেন ডোনাল্ডসন এবং ডাক্তার কারউইনের মতে, অনেকে আবার অন্যদের পছন্দ পাওয়ার জন্য, কোনো দলের সঙ্গে মানিয়ে চলার জন্য, কাউকে প্রভাবিত করার জন্য কিংবা নিজের সুবিধা আদায় করতেও মিথ্যা বলে থাকেন।

কেউ মিথ্যা বলছে কি না, তা বোঝার প্রথম উপায় হলো তার স্বাভাবিক আচরণের ধরন বা ‘বেসলাইন’ খেয়াল করা। ‘হাউ টু ডিটেক্ট লাইজ, ফ্রড অ্যান্ড আইডেন্টিটি থেফট: ফিল্ড গাইড’ বইয়ের লেখিকা ও বডি ল্যাঙ্গুয়েজ বিশেষজ্ঞ ট্রেসি ব্রাউন এ কথা জানিয়েছেন। ‘বেসলাইন’ বলতে বোঝায় কোনো মানুষের স্বাভাবিক আচরণ। অর্থাৎ সে যখন সম্পূর্ণ সত্যি কথা বলে, তখন সাধারণত যেভাবে কথা বলে বা চলাফেরা করে।

ট্রেসি ব্রাউনের মতে, মানুষের এই স্বাভাবিক আচরণে যখন হঠাৎ কোনো পরিবর্তন দেখা যায়, তখনই মিথ্যা বলার আশঙ্কা থাকে। তবে মনে রাখতে হবে, একেক জনের মিথ্যা বলার লক্ষণ একেক রকম হয়। তাই সামনের মানুষটির স্বাভাবিক আচরণ জানা থাকলে সে সত্যি বলছে কি না, তা বোঝা সহজ হয়।

যদি তুমি কাউকে খুব ভালো করে না চেনো, তবে তাকে সাধারণ কিছু প্রশ্ন করতে পারো। যেমন তুমি কোথায় বড় হয়েছো? কিংবা তোমার নামের বানান কী? এবং সে যখন উত্তর দেবে, তখন তার আচরণের দিকে খেয়াল রাখতে পারো।

আরও পড়ুন

শারীরিক ভাষার দিকে নজর দেওয়া

মানুষের অঙ্গভঙ্গি অনেক সত্য প্রকাশ করে দিতে পারে। মিথ্যা বলার সময় মানুষের স্বাভাবিক ও শান্ত ভাবটা আর থাকে না। ভেতরের অস্থিরতার কারণে তারা ছটফট করতে পারেন, অকারণে পা নাড়াতে পারেন, আঙুল ফোটাতে পারেন, কিংবা ঘেমে যেতে পারেন। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ হলো কথার সঙ্গে শরীরের নড়াচড়ার অমিল। সাধারণত আমরা হ্যাঁ বোঝাতে মাথা ওপর-নিচে নাড়ি এবং না বোঝাতে ডানে-বাঁয়ে নাড়ি। এখন কেউ যদি মাথা ওপর-নিচে নেড়ে হ্যাঁ বোঝায়, কিন্তু মুখে বলে আমি এমনটা করিনি, তবে বুঝে নিতে হবে তার শরীরই সত্য বলছে এবং মুখ দিয়ে সে মিথ্যা বলছে।

মুখের এক্সপ্রেশন বা ভাবভঙ্গি খেয়াল করা

কারো মুখ দেখেই বোঝা যেতে পারে যে সে সত্যি বলছে নাকি মিথ্যা। অনেক সময় কথার সঙ্গে মুখের এক্সপ্রেশনের মিল থাকে না। কোনো গম্ভীর বিষয়ে আলোচনার সময় সে হয়তো হঠাৎ হেসে ফেলতে পারে, কিংবা তার মুখের ভাব কথাটির বিষয়ের সঙ্গে মিলবে না। মিথ্যা বলার সময় অনেকে চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে অস্বস্তি বোধ করে। আবার অনেকে নিজেকে সত্যি প্রমাণ করার জন্য অস্বাভাবিক দীর্ঘ সময় ধরে অপলক তাকিয়ে থাকতে পারে। কেউ কথা বলার ঠিক আগে যদি নিজের ঠোঁট দুটি ভেতরের দিকে গুটিয়ে নেয়, তবে বুঝতে হবে সে কোনো তথ্য লুকাচ্ছে বা পুরোপুরি সত্য বলছে না। অর্থাৎ সে যা বলতে চায়, তা বলছে না। এ ছাড়া মিথ্যা বলার সময় অনেকে হাত দিয়ে মুখ ঢেকে ফেলে অথবা বারবার মুখ স্পর্শ করে বা চুলকায়। এটিও মিথ্যা বলার একটি সাধারণ লক্ষণ।

কথা বলার ধরন খেয়াল করা

কথার সুর ও গতি খেয়াল করলে অনেক কিছু বোঝা যায়। মিথ্যা বলার সময় মানুষের গলার স্বর তীক্ষ্ণ বা উঁচু হয়ে যেতে পারে। তারা আটকে আটকে কথা বলতে পারে। অথবা কথা বলার গতি হঠাৎ খুব দ্রুত বা ধীর হয়ে যেতে পারে। অনেক সময় মিথ্যা বলার আগে মানুষ অস্বাভাবিক বিরতি নেয়। এতে বোঝা যায় সে মনে মনে উত্তর সাজাচ্ছে বা কতটা বলবে, তা ভেবে নিচ্ছে। অনেকে আবার উত্তর দেওয়ার আগে মূল প্রশ্নটিই আবার বলে। মূলত একটি বানোনো উত্তর ভাবার সময় পাওয়ার জন্যই তারা এটি করে। এ ছাড়া কথা বলার সময় অনেকে সত্যি বলতে বা আসল কথা হলো এই জাতীয় শব্দ বারবার ব্যবহার করে। এভাবে তারা নিজেদের কথাকে সত্যি প্রমাণ করার চেষ্টা করে।

আরও পড়ুন

কথার অমিল বা অসংগতি ধরা

কেউ যদি আগের কথার সঙ্গে পরের কথার মিল রাখতে না পারে, তবে বুঝতে হবে ঝামেলা আছে। আগের কথার সঙ্গে পরের কথা না মিললে সত্য-মিথ্যা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়। এই ধরা পড়ে যাওয়ার ভয় থেকে বাঁচতে অনেকে প্রশ্ন এড়িয়ে যায়। আলোচনার বিষয় বদলে ফেলে অথবা অস্পষ্ট উত্তর দেয়।

খোলামেলা বা ডিটেইল প্রশ্ন করা

কেউ মিথ্যা বলছে মনে হলে তাকে এমন প্রশ্ন করা উচিত, যার উত্তর শুধু হ্যাঁ বা না দিয়ে দেওয়া যায় না। সামনের মানুষটি যত বেশি কথা বলবে, তাকে তত বেশি তথ্য বানিয়ে মনে রাখতে হবে। ফলে মিথ্যা ধরে রাখা তার জন্য কঠিন হয়ে পড়বে। তাই তার কাছে ঘটনার ভেতরের ছোট ছোট বিস্তারিত তথ্য জানতে চাওয়া যেতে পারে। এতে কথার অসংগতি ও ভুলগুলো ধরা সহজ হয়।

কেউ মিথ্যা বললে কী করবে

কাউকে মিথ্যা বললে ধরা বেশ অস্বস্তিকর। বন্ধু, পরিবারের সদস্য বা সহকর্মীর মিথ্যা ধরে ফেলা সব সময় সহজ হয় না। তবে বিষয়টি যদি তোমাকে কষ্ট দেয় বা সম্পর্কের ওপর খারাপ প্রভাব ফেলে, তবে শান্তভাবে তা নিয়ে কথা বলা ভালো। ডাক্তার কারউইন পরামর্শ দেন, সরাসরি শান্তভাবে তাকে বলা যেতে পারে, তোমার কথায় কিছু অমিল মনে হচ্ছে, বিষয়টায় আমাকে একটু বুঝিয়ে বলবে?

এভাবে খোলামেলা কথা বললে হয়তো বোঝা যাবে সে কেন মিথ্যা বলছিল। তবে পরিস্থিতি যদি না বদলায়, তবে সেই মানুষের সঙ্গে কতটুকু মিশবে বা কতটুকু সম্পর্ক রাখবে, তা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।

আরও পড়ুন