এই শতাব্দীতে মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ১৭টি বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি

পৃথিবীতে মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকা বেশ চ্যালেঞ্জিং। তবে এটাই মানব ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন সময় নয়। এই তর্ক নাহয় ইতিহাসবিদদের ওপরই ছেড়ে দেওয়া যাক।

প্রতিদিনই আমাদের স্বাস্থ্য ও সুস্থতার সামনে এসে দাঁড়াচ্ছে নতুন নতুন সংকট। ইন্টারনেট আর সোশ্যাল মিডিয়ায় এসব সমস্যার খবরে ভরা। তথ্যের এই ভিড়ে কোনটা আসলেই বড় হুমকি, তা বুঝে ওঠা মাঝে মাঝে কঠিন হয়ে পড়ে।

তবে ভালো খবর হলো, আমাদের হয়ে এই কঠিন কাজ করছেন একদল বিজ্ঞানী ও গবেষক। সম্প্রতি ৩৭ জন বিশেষজ্ঞের একটি আন্তর্জাতিক দল পৃথিবীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বড় বড় হুমকি নিয়ে একটি নতুন রিপোর্ট তৈরি করেছেন। এই গবেষণাটি চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী দ্য ল্যানসেট-এ প্রকাশিত হয়েছে।

সেখানে তাঁরা মানবস্বাস্থ্যের জন্য ১৭টি বিপর্যয়কর ঝুঁকির কথা তুলে ধরেছেন। এসব বিপদ কতটা ভয়ংকর হতে পারে এবং চলতি শতাব্দীতে এগুলো কীভাবে সামাল দেওয়া সম্ভব, তা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে এই গবেষণাপত্রে।

আরও পড়ুন

দুটি বিপর্যয়

শত শত সম্ভাব্য বিপদ পরীক্ষা করে দেখার পর গবেষকেরা এমন ১৭টি হুমকি চিহ্নিত করেছেন, যা পৃথিবীর জন্য বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

ইউনিভার্সিটি অব ওয়াশিংটনের ‘ইনস্টিটিউট ফর হেলথ মেট্রিক্স অ্যান্ড ইভল্যুশন’-এর পরিচালক এবং এই গবেষণার অন্যতম সদস্য অধ্যাপক ক্রিস্টোফার জে এল মারে। তিনি বলেন, ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই ১৭টি সংকট কিন্তু একটার সঙ্গে আরেকটা জড়িত। তাই এগুলোকে আলাদা করে না দেখে একসঙ্গে সমাধান করার চেষ্টা করতে হবে।’

এই ১৭টি বড় হুমকির মধ্যে দুটি বিষয়কে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পারমাণবিক যুদ্ধ ও এআইয়ের ক্ষতিকর ব্যবহার। গবেষকেরা যদিও মনে করেন এই দুই ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা বেশ কম, তবু তাঁদের মতে, এদের যেকোনো একটির কারণে পুরো মানবজাতি বড় বিপদে পড়তে পারে।

পারমাণবিক অস্ত্রবিশেষজ্ঞরা আগেই সতর্ক করেছেন, সাধারণ মানুষ এখন আর পারমাণবিক বোমার ভয়াবহতা নিয়ে তেমন একটা চিন্তাই করে না। অথচ মাত্র কয়েক প্রজন্ম আগে স্নায়ুযুদ্ধের সময়ে মানুষ এই আতঙ্কের মধ্যেই দিন পার করত।

অন্যদিকে এআইয়ের হুমকিটি একেবারেই আধুনিক একটি সংকট। এআই নিয়ে যাঁরা রাতদিন কাজ করছেন, মানবজাতির জন্য এটি কতটা বিপজ্জনক, তা নিয়ে তাঁদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। তবে সামগ্রিকভাবে সমাজ ও মানুষের চিন্তাভাবনার ওপর এই নতুন প্রযুক্তির কেমন প্রভাব পড়বে তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে নানা বিতর্ক চলছে।

আরও পড়ুন

১৭টি বড় সংকটের তালিকা

গবেষকদের চিহ্নিত করা এই প্রধান ১৭টি সংকটকে দুটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। বিপর্যয়কর হুমকি এবং অস্তিত্বের সংকট।

‘দ্য ল্যানসেট’ মেডিক্যাল জার্নালের প্রধান সম্পাদক রিচার্ড হর্টন। তিনি বলেন, ‘কমিশন আমাদের মানবজাতির মুখোমুখি হওয়া এসব সংকটকে একটি বড় ও জটিল ক্যানভাসে দেখতে বলেছে। বিপদের এই বৈচিত্র্যময় রূপ মোকাবিলায় আমাদের সমাধানগুলোকেও বিস্তৃত হতে হবে।’

গবেষকদের চিহ্নিত করা এই প্রধান ১৭টি সংকটকে দুটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে

উদাহরণ হিসেবে জলবায়ু পরিবর্তনের কথা বলা যায়। এটি ইতিমধ্যে মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর বড় প্রভাব ফেলছে। শুধু অতিরিক্ত গরম বা তাপপ্রবাহেই মানুষ মারা যাচ্ছে না। বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ রক্ত সরবরাহ ব্যাহত করছে, ঝড়ের পর বন্যা মারাত্মক ব্যাকটেরিয়া ছড়িয়ে দিচ্ছে এবং তাপমাত্রা বাড়ার কারণে রোগবাহী পোকামাকড় নতুন নতুন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ছে।

একটি পূর্বাভাস অনুযায়ী, অতি শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাবে হওয়া চরম আবহাওয়ার কারণে ২০২৭ সালের মধ্যেই প্রায় ৪ লাখ ৫১ হাজার মানুষের মৃত্যু হতে পারে।

অধ্যাপক মারে যেমনটি বলেছেন, এসব বিপদ কিন্তু একা আসে না। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে বায়ুদূষণ সরাসরি জড়িত, যার কারণে প্রতিবছর বহু মানুষের অকালমৃত্যু হচ্ছে। এই বাস্তবতার মাঝেও সম্প্রতি ট্রাম্প প্রশাসন কয়লা ও গ্যাস বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্ষতিকর ধোঁয়া বা নির্গমন সীমিত করার নিয়ম বাতিল করেছে, যা পরিস্থিতিকে আরও চিন্তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

আবার বনাঞ্চল ধ্বংসের মতো কাজের কারণে বন্য প্রাণীরা মানুষের কাছাকাছি চলে আসছে। ফলে প্রাণীদের শরীর থেকে নতুন নতুন রোগবালাই মানুষের শরীরে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ছে, যা ডেকে আনতে পারে নতুন কোনো মহামারি।

একই সঙ্গে মারাত্মক আকার ধারণ করছে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স বা ওষুধের কার্যকারিতা কমে যাওয়ার সমস্যা। অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাক মোকাবিলায় নতুন ওষুধ তৈরি না করা গেলে আগামী ২৫ বছরে লাখ লাখ মানুষের জীবন হুমকির মুখে পড়বে।

একটি সুতো ধরে টান দিলে বোঝা যায়, কীভাবে এই প্রতিটি সমস্যা একে ওপরের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে।

গবেষকেরা এই হুমকিগুলো একটি পিরামিডের আকারে সাজিয়েছেন। পিরামিডের শীর্ষে রাখা হয়েছে মানবজাতির অস্তিত্ব সংকটের প্রধান দুটি বড় চ্যালেঞ্জকে। তার নিচে রয়েছে বাকি ১৫টি বড় হুমকি। আর এসবের ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে আরও ৩১৪টি ছোট-বড় ঝুঁকি ও কারণ।

হিসাব অনুযায়ী, আমরা যদি এখনই কোনো ব্যবস্থা না নিই, তবে এই ১৭টি হুমকি মিলে ২১০০ সালের মধ্যে মানবজাতির সার্বিক সুস্থ জীবন থেকে প্রায় ১০০ কোটি বছর কেড়ে নিতে পারে।

তবে এই ভয়াবহ ভবিষ্যৎ কেবল তখনই ঘটবে, যদি আমরা হাত গুটিয়ে বসে থাকি এবং কোনো পদক্ষেপ না নিই।

আরও পড়ুন
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বরফ গলে যাচ্ছে
রয়টার্স

সমাধানের তিন ধাপের কর্মপরিকল্পনা

এই ১৭টি বড় সংকট মোকাবিলায় বিজ্ঞানীরা তিন ধাপের একটি সহজ সমাধান দিয়েছেন। প্রথমত, বিশ্বনেতাদের এক হয়ে আগে থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে। দরিদ্র দেশগুলোকে আর্থিক সহায়তা দিতে হবে।

দ্বিতীয়ত, বিজ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে নতুন নতুন টিকা, ওষুধ ও জলবায়ু প্রযুক্তি আবিষ্কার করে তা সবার কাছে পৌঁছে দিতে হবে।

আর তৃতীয়ত, ঝুঁকিগুলোর ওপর সব সময় কড়া নজর রাখতে হবে। ‘দ্য ল্যানসেট’-এর এই প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, এখনই ক্ষতিকর ধোঁয়া বা নির্গমন না কমালে জলবায়ু পরিবর্তন কিন্তু আগামী শতাব্দীতে মানবজাতির জন্য চরম স্বাস্থ্যঝুঁকি কারণ হতে পারে।

নাটালিয়া কানেমের মতে, এসব সংকট সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে গরিব ও প্রান্তিক মানুষের। তবে বিশ্বনেতারা যদি আজ থেকেই দূরদর্শিতার সঙ্গে সঠিক পদক্ষেপ নেন, তবে আগামী প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ ও সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়া নিশ্চয়ই সম্ভব।

সূত্র: আইএফএল সায়েন্স
আরও পড়ুন