পৃথিবীর মাত্র ২ শতাংশ মানুষের চোখের রং কেন সবুজ

বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়ার সময় কখনো কি ওদের চোখের রং খেয়াল করে দেখেছ? আমাদের দেশে বেশির ভাগ মানুষের চোখের মণি বা আইরিশের রং গাঢ় বাদামি বা কালো। কিন্তু আজ থেকে প্রায় ১০ হাজার বছর আগে পৃথিবীর সব মানুষের চোখের রং ছিল বাদামি! হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছ! এরপর হঠাৎ করেই জিনগত পরিবর্তনের কারণে মানুষের চোখে তৈরি হতে শুরু করে নানা রঙের মায়া।

পৃথিবীতে যত ধরনের চোখের রং আছে, তার মধ্যে সবচেয়ে দুর্লভ হলো সবুজ রং! আমেরিকান একাডেমি অব অফথালমোলজির মতে, পুরো বিশ্বের মাত্র ২ শতাংশ মানুষের চোখের রং সবুজ। তবে যুক্তরাষ্ট্রে এই হার একটু বেশি, প্রায় ৯ শতাংশ।

কিন্তু কেন সবুজ চোখ এত দুর্লভ? এর উত্তর লুকিয়ে আছে আমাদের জিনে। একসময় বিজ্ঞানীরা ভাবতেন, চোখের রং হয়তো মাত্র একটি জিনের ওপর নির্ভর করে। স্কুলে হয়তো তোমরাও পড়েছ, বাদামি চোখ মানে প্রকট, নীল চোখ মানে প্রচ্ছন্ন। কিন্তু জিনতত্ত্বের জগৎটা এত সহজ নয়! যেমন, নীল চোখের দুজন মা-বাবার ঘরেও অনায়াসেই বাদামি চোখের সন্তান জন্ম নিতে পারে।

চোখের রং মূলত নির্ভর করে আমাদের আইরিশে কী পরিমাণ মেলানিন আছে, তার ওপর। মেলানিন হলো সেই রঞ্জক পদার্থ, যা আমাদের ত্বক বা চুলের রং নির্ধারণ করে। আমাদের চোখের প্রায় ৭৫ শতাংশ রং ঠিক করে দেয় OCA2 নামে একটি জিন। এটি মূলত গাঢ় বাদামি রঙের মেলানিন তৈরি করে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় HERC2 নামে আরেকটি জিন, যা প্রথম জিনটিকে কম মেলানিন তৈরিতে বাধ্য করতে পারে। এই জিনগুলোর হাজারো জটিল হিসাব-নিকাশের ওপরই নির্ভর করে চোখের রং।

আরও পড়ুন

সবচেয়ে মজার ও অবাক করা বিষয় হলো, সবুজ চোখে আসলে সবুজ রঙের কোনো রঞ্জক বা পিগমেন্টই থাকে না! তাহলে চোখ সবুজ দেখায় কেন?

সবুজ চোখের আইরিশে থাকে খুব সামান্য পরিমাণ হালকা বাদামি রঙের মেলানিন। এর সঙ্গে মিশে থাকে লিপোক্রোম নামে একধরনের হলদেটে চর্বিজাতীয় পিগমেন্ট। জেনে অবাক হতে পারো যে এই লিপোক্রোমের কারণেই কিন্তু ডিমের কুসুম বা মাখনের রং হলুদ হয়! যখন বাইরে থেকে আলো এসে আমাদের চোখে পড়ে, তখন এই হালকা বাদামি ও হলদেটে পিগমেন্টের সঙ্গে আলোর এক অদ্ভুত বিচ্ছুরণ ঘটে। এই আলোর বিচ্ছুরণের কারণেই চোখ ওই মণিটিকে সবুজ রঙের বলে ভুল করে!

নীল চোখের ক্ষেত্রেও প্রায় একই রকম ঘটনা ঘটে। তবে সেখানে কোনো লিপোক্রোম বা হলুদ পিগমেন্ট থাকে না। নীল চোখে মেলানিন এতই কম থাকে যে আলো বিচ্ছুরিত হয়ে কেবল নীল রঙের ছোট তরঙ্গদৈর্ঘ্যগুলোই আমাদের চোখে ফিরে আসে। ঠিক যে কারণে আমরা আকাশের রং নীল দেখি!

আরও পড়ুন

তাহলে সবুজ চোখ এত দুর্লভ কেন? সবুজ চোখ এত দুর্লভ হওয়ার কারণ হলো, এই নির্দিষ্ট রংটি তৈরি হওয়ার জন্য জিনের খুব নিখুঁত একটা ভারসাম্য লাগে। একটুখানি বাদামি মেলানিন, তার সঙ্গে ঠিক পরিমাণমতো হলদেটে লিপোক্রোম মিলে তৈরি হয় এই রং। এই নিখুঁত রেসিপিটি খুব কম মানুষের জিনেই একসঙ্গে কাজ করে।

তবে চোখের রং যেটাই হোক না কেন, প্রতিটি মানুষের চোখ কিন্তু সম্পূর্ণ আলাদা। তুমি যদি খুব কাছ থেকে কারও চোখের মণির দিকে তাকাও, দেখবে সেখানে রঙের হাজারো শেড, ছোট ছোট বিন্দু এবং অদ্ভুত সব নকশা লুকিয়ে আছে। জিন ও পরিবেশের এই জটিল খেলার কারণে পৃথিবীর কোনো দুজন মানুষের চোখের মণি হুবহু এক রকম হয় না। এমনকি চেহারায় হুবহু মিল থাকা যমজ ভাইবোনের চোখের মণিও আলাদা হয়! আর ঠিক এ কারণেই জেমস বন্ড বা মিশন ইমপসিবলের মতো মুভিতে পাসওয়ার্ড হিসেবে চোখ স্ক্যান করতে দেখা যায়। কারণ, হাতের ফিঙ্গারপ্রিন্টের মতো সবার চোখের মনিও আলাদা হয়!

সূত্র: আইএফএল সায়েন্স
আরও পড়ুন