মেনি মাছ কি সত্যিই কাদা খায়
কাদার ভেতরে হাতড়ে মাছ ধরার গল্প নিশ্চয়ই শুনেছ। বিলে এখনো কেউ কেউ এভাবেই মাছ হাতড়ে বেড়ান। হঠাৎ মুঠোর মধ্যে মাছ নড়ে ওঠে। এমন কাদার মধ্যে মাঝেমধ্যে একটা মাছ ধরা পড়ে, নাম মেনি। একে অনেকে ‘ভেদা’ নামে চেনে। গায়ে কালচে সবুজ ছোপ, মুখটা লম্বাটে। কই মাছ ভেবে অনেকে ভুল করেন, এটা আসলে কই নয়। উত্তরাঞ্চলে এর নাম ভেদা।
তুমি যদি কখনো গ্রামের কোনো বুড়ো মাছ-শিকারির সঙ্গে কথা বলো, তিনি একে মেনি বলবেন, বা নন্দই, বা রয়না। নাম যা-ই হোক, একটা কথায় সবাই একমত, এ মাছ মেলে কাদার মধ্যে। সেখান থেকেই একটা ধারণা চলে আসছে বহুদিন। ভেদা মাছ কাদা খায়। কথাটা পুরো ঠিক নয়, পুরো ভুলও নয়।
কাদার মধ্যেই কেন থাকে
মেনি মাছের বৈজ্ঞানিক নাম ন্যান্দাস ন্যান্দাস, ইংরেজিতে গ্যাঙ্গেটিক লিফফিশ নামে পরিচিত। বাংলাদেশ থেকে ভারত, মায়ানমার, থাইল্যান্ড, পাকিস্তান পর্যন্ত এর বিস্তার। খাল-বিল, হাওর-বাঁওড় ছাড়িয়ে বর্ষার সময় ঢুকে পড়ত প্লাবিত ধানখেতেও। একসময় সংখ্যাটা ছিল চোখে পড়ার মতো।
জলাশয়ের তলায় কাদা যেখানে জমে থাকে, সেখানেই গা গুটিয়ে রাখে এ মাছ। শীত নামলে সরে যায় আগাছাভরা পানির তলদেশে। গাছের শিকড় আর পাঁকের ফাঁকে খুঁজে নেয় আড়াল। রুই বা পুঁটি জলের মাঝখানে সাঁতরে বেড়ায়, মেনি মাছের জগৎটা একদম নিচে। আর এই নিচে নামার অভ্যাসেই যাবতীয় গন্ডগোলের শুরু।
আসলে মুখে যায় কী
মাংসাশী এই মাছ মূলত খায় জলজ পোকামাকড় আর পোকার লার্ভা, কখনো ছোট মাছও। শেওলা খাওয়ার নজিরও মিলেছে কোথাও কোথাও। কাদা এ খাদ্যতালিকায় নেই।
তবু কাদা মুখে যায় একটা সহজ কারণে। লার্ভা থাকে কাদার ভেতরেই। মাটির নিচে, পচা পাতার আনাচকানাচে ডিম পাড়ে অনেক পোকা। সেই লার্ভা খুঁজতে গিয়ে মুখটা ডুবিয়ে দিতে হয় কাদায় আর শিকার মুখে আসার সঙ্গে সঙ্গে কিছুটা কাদাও ঢুকে পড়ে।
মুখের গঠনটাও এই কাজের জন্যই যেন বানানো। লম্বাটে, নিচের দিকে সামান্য বাঁকা। তল্লাট ঘাঁটতে ঘাঁটতে কাদা মুখে আসে, ফুলকার ফাঁক দিয়ে কিছুটা বেরিয়েও যায় পরে। দূর থেকে দেখলে তোমার মনে হবে, মাছটা কাদাই গিলছে, যদিও আসল লক্ষ্য থাকে, কাদার আড়ালে বসে থাকা পোকা।
শরীরের গড়নেও সুরক্ষার ব্যবস্থা আছে। পিঠে ১০ থেকে ১৫টা শক্ত কাঁটা পাতলা পর্দায় জোড়া লাগানো একে অপরের সঙ্গে আর পায়ুর কাছে আরও তিনো, যার দ্বিতীয়টা সবচেয়ে লম্বা। বিপদ টের পেলে এসব কাঁটা খাড়া হয়ে যায়। কাদার ভেতর নিরাপত্তাহীন থাকতে হয় না তাই।
কাদাটা আসলে আড়াল
গায়ের রং কাদার সঙ্গে মিলে যায় অদ্ভুতভাবে, কালচে সবুজের ওপর অনিয়মিত ছোপ। শিকারির চোখ এড়াতে এ রং কাজে লাগে, শিকার ধরার সময়ও পোকামাকড় টের পায় না যে কেউ লুকিয়ে আছে আশপাশে। একই কাদা একসঙ্গে দুটো কাজ করে যাচ্ছে। আড়াল আর ফাঁদ, দুটোই।
স্বাদ আর পুষ্টিতেও এ মাছের নাম আছে অনেক দিনের। প্রতি ১০০ গ্রামে ১১ গ্রাম আমিষ আর ৩৯০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম পাওয়া যায় আর গ্রামের হাটে এর কদরও তাই কমেনি সহজে।
যে মাছ হাত দিয়েই ধরা হতো
জাল বা বড়শির দরকারই পড়ত না এ মাছ ধরতে, জলাশয়ে নেমে কর্দমাক্ত তল হাতড়ালে আঙুলে নড়াচড়া টের পাওয়া যেত, আর সেটাই হতো মেনি মাছ পাওয়ার ইঙ্গিত। তুমি যদি আজ কোনো গ্রামীণ জলাশয়ে গিয়ে এ দৃশ্য খোঁজো, হতাশ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। এ ছবি প্রায় মুছে গেছে এখন।
অবৈধ ফাঁদ আর জালের অবাধ ব্যবহার, আবাসস্থল নষ্ট হয়ে যাওয়া, জলাশয় শুকিয়ে আসা—সব মিলিয়ে মেনি মাছ এখন বাংলাদেশের বিপন্ন প্রজাতির তালিকায়। আইইউসিএন বাংলাদেশের লাল তালিকায় এর অবস্থান আশঙ্কাজনক হিসেবে চিহ্নিত। চলন বিলের দক্ষিণাংশের কিছু এলাকা ছাড়া আর কোথাও এদের তেমন দেখা মেলে না। কৃষিজমিতে কীটনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহার তলদেশের পরিবেশ বদলে দিচ্ছে ধীরে ধীরে আর অতিরিক্ত মাছ ধরাও এ সংকটে যুক্ত হয়েছে আলাদাভাবে।
সান্তাহারের পরীক্ষাগার
বগুড়ার সান্তাহারে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের একটা প্লাবনভূমি উপকেন্দ্র আছে। সেখানে বিজ্ঞানীরা গবেষণাগারে মেনি মাছের কৃত্রিম প্রজনন সফল করে দেখিয়েছেন। দাবি করা হচ্ছে যে দেশে এমনকি বিশ্বেও এমন প্রজনন এখনো পর্যন্ত শুধু এই কেন্দ্রেই হয়েছে।
বাণিজ্যিক চাষ এখনো শুরু হয়নি অবশ্য। তবে এ সাফল্যের পর বড় পরিকল্পনা চলছে আর সফল হলে একদিন আবার বাজারে দেখা যেতে পারে এ হারিয়ে যাওয়া স্বাদ। এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে ডিম ছাড়ে এ মাছ, বর্ষার পানি বাড়লে পোনাগুলো বেড়ে ওঠে তাড়াতাড়ি।
শুরুর প্রশ্নে তাহলে ফেরা যাক। ভেদা মাছ কাদা খায় না। কাদার আড়ালে বসে থাকা পোকা আর লার্ভা খায় আর সেই খোঁজাখুঁজির পথে কাদাটা মুখে চলে আসে একরকম বিনা দাওয়াতে।