জাদু দেখানো শুরু হয়েছিল কবে

মিডজার্নি

জাদু মানে কি শুধু টুপি থেকে খরগোশ বের করা বা শূন্যে মানুষ ভাসিয়ে রাখার ভেলকি? হয়তো না। জাদুর ইতিহাস অনেক পুরোনো। হ্যারি পটার বা আধুনিক জাদুকরদের বহু হাজার বছর আগে যখন পিরামিড তৈরি হচ্ছিল, তখন মানুষ জাদু দেখাত। সেই জাদুর কথা শুনলে আজও গায়ের লোম দাঁড়িয়ে যায়। জাদুকর নাকি শিরশ্ছেদ করা প্রাণীকে পুনরায় জীবিত করতে পারতেন! সেসব গল্প শুনতে হলে যেতে হবে ফারাও খুফুর দরবারে। চলো, একটু ঘুরে আসা যাক।

ওয়েস্টকার প্যাপিরাস: জাদুর গোপন দলিল

প্রাচীন মিসরের এক অজ্ঞাত লিপিকরের হাতে লেখা একটি জরাজীর্ণ পাণ্ডুলিপি পাওয়া গেছে। নাম ওয়েস্টকার প্যাপিরাস। ধারণা করা হয়, এই প্যাপিরাসটি লেখা হয়েছিল খ্রিষ্টপূর্ব ১৭৮২ থেকে ১৫৫০ অব্দের মাঝামাঝি সময়ে। কিন্তু এই দলিলে যে ঘটনাগুলোর বর্ণনা আছে, তা আরও প্রায় এক হাজার বছর আগের। অর্থাৎ, ফারাও খুফু যখন মিসর শাসন করতেন। তোমরা যে গিজার গ্রেট পিরামিডের নাম শুনেছ বা ছবিতে দেখেছ, এটা তাঁর আমলেই তৈরি। এই প্যাপিরাসে মোট পাঁচটি গল্পের উল্লেখ আছে। এর মধ্যে চতুর্থ গল্পটিতেই পাওয়া যায় সেই রোমহর্ষক জাদুর বর্ণনা।

আরও পড়ুন
জাদুর গোপন দলিল ওয়েস্টকার প্যাপিরাস
উইকিমিডিয়া কমন্স

ফারাও খুফুর ছেলে রাজপুত্র হারদেদেফ বাবাকে বললেন এক অদ্ভুত জাদুকরের কথা। তাঁর নাম জ্যেডি (Djedi)। রাজপুত্রের দাবি, এই জাদুকরের বয়স ১১০ বছর! শুধু তাই নয়, এই বুড়ো বয়সেও তিনি নাকি প্রতিদিন ১০০ কলস মিসরীয় পানীয় সাবাড় করেন। সঙ্গে ৫০০টি রুটি ও গরুর মাংসের একটি আস্ত পা অনায়াসেই খেয়ে ফেলেন। তবে জ্যেডির আসল খ্যাতি তাঁর খাওয়ার বহরে নয়, বরং তাঁর জাদুকরি ক্ষমতায়। তিনি নাকি কাটা মুণ্ডু জোড়া লাগাতে পারেন! ফারাও খুফু কৌতূহলী হয়ে জ্যেডিকে দরবারে তলব করলেন।

দরবারে জ্যেডি হাজির হলে ফারাও খুফু তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘শুনলাম তুমি নাকি কাটা মাথা জোড়া লাগাতে পারো?’ জ্যেডি বিনয়ের সঙ্গে সম্মতি জানালেন। ফারাও তখন আদেশ দিলেন কারাগার থেকে এক বন্দীকে নিয়ে আসতে। সেই বন্দীর ওপরই জাদুর পরীক্ষা চালানো হবে। কিন্তু এখানেই জ্যেডি দেখালেন তাঁর নৈতিকতা। তিনি ফারাওয়ের মুখের ওপর বলে দিলেন, ‘না মহারাজ! কোনো মানুষের ওপর এই পরীক্ষা চালানো যাবে না। জাদুর জন্য কোনো মানুষের প্রাণ নিয়ে খেলা অনুচিত।’

অগত্যা একটি রাজহাঁস আনা হলো। সবার চোখের সামনে হাঁসটির মাথা কেটে শরীর থেকে আলাদা করা হলো। দরবারের একপাশে রইল রক্তাক্ত শরীর, অন্যপাশে মাথা। শুরু হলো জ্যেডির মন্ত্রপড়া। প্যাপিরাসের বর্ণনা অনুযায়ী, জ্যেডি তাঁর জাদুকরি মন্ত্র উচ্চারণ করতেই হাঁসটির দেহ থরথর করে নড়ে উঠল। শরীরটা টলতে টলতে এগিয়ে গেল কাটা মাথার দিকে। মুহূর্তের মধ্যে মাথা আর শরীর জোড়া লেগে গেল। হাঁসটি প্যাঁকপ্যাঁক করতে করতে ছুটে গেল! ফারাওয়ের অনুরোধে এরপর একটি জলজ পাখি ও শেষে একটি ষাঁড়ের ওপর একই জাদুর পুনরাবৃত্তি করা হয়। প্রতিবারই কাটা মুণ্ডু জোড়া লেগে প্রাণীগুলো জীবিত হয়ে ওঠে।

আরও পড়ুন

এখন তোমাদের মনে নিশ্চয়ই প্রশ্ন জাগছে, এই ঘটনা কি সত্যি? পড়তে যতই রোমাঞ্চকর লাগুক, ইতিহাসবিদেরা বলছেন, এই পুরো ঘটনাটিই আসলে কাল্পনিক। জ্যেডি নামে কোনো জাদুকরের অস্তিত্বের কোনো শক্ত ঐতিহাসিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ওয়েস্টকার প্যাপিরাস মূলত ফারাওদের বিনোদনের জন্য লেখা লোককথা বা রূপকথার সংকলন মাত্র। প্রাচীন মিসরে জাদুকর বা পুরোহিতেরা নানা ইলিউশন ব্যবহার করতেন বটে, কিন্তু জ্যেডির এই অলৌকিক ক্ষমতা শুধুই গল্পের পাতায় সীমাবদ্ধ। তবে মজার ব্যাপার হলো, এটি কাল্পনিক হলেও লিখিত ইতিহাসে এটাই পৃথিবীর প্রাচীনতম জাদুর ঘটনা। অর্থাৎ, এর আগে কেউ জাদু দেখিয়েছে বলে উল্লেখ পাওয়া যায় না।

আসল জাদুর শুরু কোথায়

মিসরের এই জাদু যদি শুধুই রূপকথা হয়, তাহলে সত্যি সত্যি জাদুর খেলা কোথায় প্রথম শুরু হয়েছিল? অনেকে দাবি করেন, মিসরের বেনি হাসান এলাকায় একটি সমাধিতে আঁকা ছবিতে দুজন মানুষকে বাটি বা কাপ নিয়ে কিছু করতে দেখা যায়। কেউ কেউ বলেন, এটিই বিখ্যাত কাপ অ্যান্ড বল ম্যাজিকের আদি রূপ। কিন্তু বেশির ভাগ প্রত্নতাত্ত্বিক এই দাবি নাকচ করে দিয়েছেন। তাঁদের মতে, ওটা হয়তো রুটি বানানোর দৃশ্য কিংবা কোনো ঘরোয়া খেলা, জাদু নয়।

হাতের কারসাজি বা জাদুর প্রথম বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায় রোমান যুগে। বিখ্যাত রোমান দার্শনিক সেনেকা দ্য ইয়াঙ্গার ৬৫ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর এক চিঠিতে জাদুকরদের কাপ ও ছক্কা দিয়ে ভেলকি দেখানোর কথা উল্লেখ করেছেন। জাদুকরেরা কীভাবে দর্শকদের চোখের সামনে জিনিস গায়েব করে দেন, সে ব্যাপারে তিনি লিখেছিলেন। তাই বলা যায়, গল্পের জাদুকর হিসেবে মিসরের জ্যেডি হয়তো প্রথম, কিন্তু বাস্তবের জাদুকরেরা ছিলেন রোমান সাম্রাজ্যে। তবু ফারাওয়ের দরবারে সেই কাটা হাঁস জোড়া লাগানোর গল্প জাদুর ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় মিথ হয়েই বেঁচে আছে।

সূত্র: আইএফএল সায়েন্স

আরও পড়ুন