শরিফা আর আতা কি একই ফল
বাজারের এক কোণে ঝুড়িভর্তি সবুজ খাঁজকাটা ফল। পাশের দোকানি বলছেন ‘আতা’, তার ঠিক উল্টো দিকের দোকানি একই দেখতে ফল ধরিয়ে দিয়ে বলছেন ‘শরিফা’। দাম প্রায় সমান, স্বাদও কাছাকাছি। প্রশ্ন জাগে, দুটো কি আসলেই এক ফল, নাকি নাম দুটো আলাদা দুই জিনিসের?
এই তর্ক নতুন কিছু নয়, বহু বছর ধরে চলছে। কারও মতে একই গাছের দুই নাম মাত্র, কারও আবার জোর দাবি, এরা দুই রকম ফল। উত্তরটা খুঁজতে গেলে দেখা যায় ব্যাপারটা একরকম মাঝামাঝি।
একই পরিবারের সদস্য
আতা আর শরিফা দুটোই অ্যানোনেসি নামের একটা উদ্ভিদ পরিবারের সদস্য। ইংরেজিতে এদের বলে কাস্টার্ড অ্যাপল বা সুগার অ্যাপল। বাংলাদেশের প্রায় সব জেলাতেই গাছটা দেখা যায়, উঠানে কিংবা রাস্তার ধারে, তেমন কোনো যত্ন ছাড়াই বেড়ে ওঠে। উচ্চতা খুব বেশি হয় না, তিন থেকে পাঁচ মিটারের মধ্যে থেমে যায়। শীতে পাতা ঝরে, বসন্তে আবার নতুন পাতার সঙ্গে ফুল আসে, কাঁঠালচাঁপার মতো দেখতে সেই ফুলের রং হালকা সবুজাভ হলুদ।
কৃষিবিজ্ঞানীদের অনেকেই বলেন, আতা আর শরিফা মূলত একই প্রজাতি, নাম Annona squamosa। পার্থক্য শুধু অঞ্চলভেদে নামে। মাগুরার এক কৃষি প্রতিবেদনে পাওয়া যায়, একই ফলকে কোথাও শরিফা বলা হচ্ছে, কোথাও আতা, আবার কোনো কোনো গ্রামে সেটাই নোনা নামে পরিচিত।
তাহলে ফারাকটা কোথায়
তবে ব্যাপারটা পুরোপুরি এত সরলও নয়। বাংলাদেশে একই প্রজাতির ভেতরেই দুই রকম জাত পাওয়া যায়, আর মানুষ সেই জাত দুটোকে আলাদা নামেই চিনে নিয়েছে। একটা জাত প্রায় গোলাকার, স্বাদে একটু নোনতাঘেঁষা, একে সাধারণত ডাকা হয় আতা বলে। অন্যটার আকৃতি হৃদয়ের মতো, খেতে বেশি মিষ্টি, নাম শরিফা।
এখানে একটু গোলমাল লাগতে পারে, কারণ একই সঙ্গে বলা হচ্ছে একই প্রজাতি আবার দুই জাত। আমের কথা ভাবলে ব্যাপারটা সহজ হয়ে যায়। ল্যাংড়া আর হিমসাগর দুটোই আম, কিন্তু স্বাদ-গন্ধ-আকারে নিজস্ব চরিত্র আছে দুজনেরই। আতা-শরিফার সম্পর্কটাও অনেকটা সে রকম।
সবাই অবশ্য এই ব্যাখ্যা মানতে রাজি না। অনেকের যুক্তি, আকৃতির এই তফাত আসে গাছের বয়স আর মাটির ধরনের কারণে, আলাদা জাত বলে সত্যিই কিছু নেই। এই তর্কের মীমাংসা এখনো হয়নি পুরোপুরি।
শ্রী ঊর্ণচন্দ্র সাহার সংকলিত ‘আয়ূর্ব্বেদোক্ত উদ্ভিদ সংগ্রহ’ বইতে ১৬ নম্বর উদ্ভিদ হচ্ছে আতা। বইটির ১৬ নম্বর পৃষ্ঠায় আতা সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।
নামের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, ফলটির বাংলা নাম আতা, সংস্কৃত নাম আতৃপ্য, হিন্দি নাম শরিফা।
যে ফলটাকে প্রায়ই গুলিয়ে ফেলা হয়
গল্পটা এখানেই থেমে গেলে ভালো হতো। কিন্তু আরেকটা ফল আছে, নাম নোনা বা রামফল, দেখতে প্রায় আতার মতোই। খোসার গায়ে জালের মতো নকশা, পাকলে রং হয় হালকা লালচে হলুদ।
নলিনীকান্ত চক্রবর্তী প্রণীত ‘ত্রিপুরার গাছপালা’ বইতে ৪ নম্বর উদ্ভিদ হচ্ছে নোনা। বইটির ১২ নম্বর পৃষ্ঠায় নোনা সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।
নামের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, ফলটির বাংলা নাম নোনা। অন্য নাম রাম ফল, নোনা আতা। বৈজ্ঞানিক নাম Annona reticulata L।
reticulata অর্থ জালিকাকার। এটা ফলের ওপরের অস্পষ্ট জালিকার আকার বোঝায়। আতাগাছের সঙ্গে এর পার্থক্য, এর পাতা অনেক লম্বাটে, ফলের গা সমান, অবশ্য তাতে অস্পষ্ট জালিকাকার খাঁজ রয়েছে। ফলের ভেতরটা অনেকটা আতার মতো, তবে শাঁস অনেকটা বালুর মতো দানাদার এবং এর গন্ধ ততটা ভালো নয়। ফলের আকার প্রাণীর হৃৎপিণ্ডের মতো।
সমস্যা হলো, অঞ্চলভেদে এই তিন ফলের নাম একে অপরের সঙ্গে গুলিয়ে গেছে বহু আগেই। কোথাও নোনাকেই বলা হয় আতা, আবার কোথাও শরিফাকে ডাকা হয় নোনা নামে। নাম শুনে তাই বোঝার উপায় থাকে না, ঠিক কোন ফলটা হাতে উঠছে। বরং খোসার নকশা দেখে আর কেটে ভেতরের রং যাচাই করে বোঝাটাই বেশি নির্ভরযোগ্য।
চেনার একটা সহজ উপায়
বাজারে গিয়ে ফলটা হাতে নিয়ে খোসাটা প্রথমে দেখো। বড় বড় গোল খাঁজ থাকলে আর ফলটা প্রায় গোলাকার হলে সেটা আতা গোত্রের হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। খোসা একটু মসৃণ, আকৃতি মানব হৃদয়ের কাছাকাছি, কামড়ে মিষ্টতা বেশি মনে হলে সেটা শরিফা। খোসায় সূক্ষ্ম জালের নকশা আর স্বাদ কিছুটা পানসে লাগলে বুঝে নাও ওটা নোনা, যেটা তুমি হয়তো খুঁজছিলে না।
নামের পেছনের গল্প
নামের এই খুঁটিনাটি নিয়ে এত ভাবার কী দরকার, এমন প্রশ্ন উঠতেই পারে। কিন্তু ভাষা যেভাবে প্রকৃতিকে নিজের মতো সাজিয়ে নেয়, সেটাই এখানে চোখে পড়ে। গ্রামের মানুষ প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে একই জিনিসকে নানা নামে ডেকেছে, কোথাও সেই নাম মিশে গেছে, কোথাও আলাদা হয়ে গেছে। বিজ্ঞানের শ্রেণিবিভাগ সব সময় এই মুখে মুখে চলা নামকরণের সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি।
পুষ্টির দিক থেকে অবশ্য আতা আর নোনা প্রায় সমান উপকারী। ফাইবার আছে যথেষ্ট, ভিটামিন ‘সি’ আছে, আর প্রাকৃতিক চিনি ক্লান্তি কাটাতে সাহায্য করে। কাঁচা অবস্থায় খাওয়া যায় না অবশ্য, পাকতে দিতে হয় গাছে বা ঘরে রেখে। বীজগুলো কখনো চিবিয়ে ফেলা ঠিক নয়।
পরেরবার বাজারে দুই দোকানির মধ্যে এই তর্ক কানে এলে, একবার নিজেই ফলটা হাতে নিয়ে দেখতে পারো। খোসা, আকৃতি, ভেতরের রং—সব মিলিয়ে হয়তো নিজের একটা উত্তর পেয়েও যাবে। গবেষকেরা যখন এখনো একমত হতে পারেননি, তখন তোমার নিজের চোখ-জিবও কম যাবে কিসে!