যে ঝরনায় পানি ওপরের দিকে ওঠে

এশারের ওয়াটারফল

চোখ আর মস্তিষ্কের বোঝাপড়াটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। মানবজীবনে এ বোঝাপড়াটা বেশির ভাগ সময়ই ঠিকঠাক কাজ করে। তাই পৃথিবীকে, প্রকৃতিকে, মহাবিশ্বকে এত ভালোভাবে বুঝতে পারি আমরা। কিন্তু এ দুয়ের মেলবন্ধন যদি ঠিকঠাকমতো না হয়, চোখ আমাদের প্রতারিত করে। অনেক অসম্ভবকেও ‘চোখ’ সম্ভব বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। মস্তিষ্ক তখন বাধা হয়ে দাঁড়ায়। চোখের দৃষ্টি আর অন্তর্দৃষ্টির দ্বন্দ্বে জন্ম হয় অপটিক্যাল প্যারডক্সের।

আর এই দ্বন্দ্ব তৈরিতে বিজ্ঞানীদের মধ্যে অগ্রগণ্য হলেন নোবেলজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী রজার পেনরোজ ও তাঁর বাবা লনিয়েল পেনরোজ। ১৯৫৪ সালে তাঁরা একটা ছবি এঁকে পাঠান ব্রিটিশ জার্নাল অব সাইকোলজিতে। একটা অসম্ভব ত্রিভুজের ছবি।

ত্রিমাত্রিক এই ত্রিভুজটা সহজে আঁকা যায়; কিন্তু বাস্তবে এ জিনিস তৈরি করা অসম্ভব। নিচের ছবিটা দেখলেই বুঝতে পারবে।

আরও পড়ুন
পেনরোজের ট্রায়াঙ্গল

এই ত্রিভুজ এখন পেনরোজের ট্রায়াঙ্গল নামে পরিচিত। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, পেনরোজদের দ্বারা জনপ্রিয় হলেও এর জনক তাঁরা নন। ১৯৩৪ সালে সুইডিশ শিল্পী অস্কার রিউটারসভ্যার্ড ওই অদ্ভুত ত্রিভুজটি প্রথম আঁকেন। কিন্তু সে সময় এটা অত জনপ্রিয়তা অর্জন করতে পারেনি, যতটা পেরেছিল পেনরোজদের কারণে।

পেনরোজদের এই ইমপসিবল ট্রায়াঙ্গল আরেক ডাচ শিল্পী এম সি এশারকে প্রভাবিত করে। চোখ-মগজের ধন্দ তৈরির জন্য আগে থেকেই বিখ্যাত ছিলেন এশার। পেনরোজদের ট্রায়াঙ্গল আবার নতুন করে ভাবনার খোরাক জোগায় তাঁকে। নতুন মাত্রা যোগ করেন তাঁর ছবিতে। এশারের এ ধরনের অনেক কাজ রয়েছে। এর মধ্যে বিখ্যাত ছবি হলো ওয়াটারফল। যেটা এশারের ওয়াটারফল নামে পরিচিত। চোখ আর মগজের দ্বন্দ্বের এক অসাধারণ উদাহরণ এই ছবি।

আরও পড়ুন
এম সি এশার

নাম তাঁর মরিস করনেলিস এশার। জন্ম ১৭ জুন ১৮৯৮ সালে। নেদারল্যান্ডসের লিউয়ারডেন শহরে। ছেলেবেলা থেকেই আঁকাআঁকিতে ঝোঁক ছিল তাঁর। তাতেই বেশি মগ্ন থাকতেন। ফল হয় নেতিবাচক, স্কুলে গণিত ও ভাষা শিক্ষায় পিছিয়ে পড়েন। ফলে ‘ভালো ছাত্র’র তকমা তাঁর কপালে জোটেনি। লেখাপড়ার সেই দুর্বলতা তিনি কাটিয়ে উঠতে পারেননি উচ্চশিক্ষা জীবনেও। উচ্চশিক্ষার বিষয় হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন আর্কিটেকচার। কিন্তু আর্কিটেক্ট ইঞ্জিনিয়ার আর হয়ে উঠতে পারেননি। সুতরাং একাডেমিক শিক্ষার পাঠ তাঁর অসমাপ্তই রয়ে যায়। পরে তিনি সম্পূর্ণ মনোযোগ ঢেলে দেন ড্রয়িং আর প্রিন্টমেকিংয়ে।

১৯২০-এর দশকে তিনি ইতালি আর স্পেন ভ্রমণ করেন। স্পেনের আলহামব্রা প্রাসাদের জ্যামিতিক নকশা তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করে। গভীরভাবে প্রভাবিত হন ওই নকশার প্রতি। যে নকশার ছত্রে ছত্রে রয়েছে জ্যামিতি আর গণিতের ছোঁয়া। ফলে একসময়ের ভীতিকর বিষয় গণিত ও জ্যামিতিই পরে তাঁর ক্যানভাসে জায়গা করে নেয়। গণিত আর জ্যামিতির নিখুঁত হিসাব তাঁর চিত্রকলায় যোগ করে অন্য মাত্রা। আর দশটা শিল্পীর চেয়ে তিনি সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে ওঠেন। তাঁর ছবিতে যোগ হয় অসম্ভব সব প্যারাডক্সিক্যাল অবজেক্ট। এই ধারায় অগ্রগণ্য হলো তাঁর বিখ্যাত ‘ওয়াটারফল’।

আরও পড়ুন

২.

১৯৬১ সালে এশার এই ছবি আঁকেন। প্রথম দেখায় এটাকে তোমার খুব সাধারণ ছবি বলেই মনে হবে। কিন্তু একটু ভালো করে তাকিয়ে থাকো, দু-দশ সেকেন্ড। নিজের অজান্তেই বলে উঠবে, অসম্ভব! কী আছে এই ছবিতে, সে ব্যাখ্যায় যাওয়ার আগে আরেকবার ভালো করে দেখে নাও ছবিটা।

এশারের ওয়াটারফলের আধুনিক রূপ

একটা ওয়াটারফল বা ঝরনা। সেটা ওপর থেকে আছড়ে পড়ছে একটা টারবাইনের ওপর। টারবাইনের ফ্যান বা খাঁজগুলো সেই পানিকে টেনে একটা ওয়াটার চ্যানেলে পাঠিয়ে দিচ্ছে। ওয়াটার চ্যানেলটা ইংরেজি M আকৃতির। কিন্তু এর সঙ্গে যদি ঝরনার ধারাটা যোগ করো, পাশাপাশি দুটো ত্রিভুজ পাবে। সেই ত্রিভুজসদৃশ চ্যানেল বেয়ে পানি ওপরে উঠে যাচ্ছে। আবার ঝরনার ধারা হয়ে গড়িয়ে পড়ছে নিচে।

সমস্যা হলো পানি কীভাবে ওপরে উঠছে?

এক কাজ করো, ছবির ঝরনার ধারাটা আঙুল চাপা দিয়ে ঢেকে রাখো। তাহলে মনে হবে পুরো চ্যানেলটা একই সমতলে রয়েছে। তাই চ্যানেলের এক মাথা থেকে গড়িয়ে আরেক মাথায় যেতে পানির কোনো সমস্যাই হওয়ার কথা নয়। এবার আঙুল সরিয়ে ঝরনার ধারাটা আবার আলগা করো। পুরো ছবিটা দেখো। কীভাবে পানির ধারা ওপরে উঠছে বোঝার চেষ্টা করো। তোমার চোখ বলছে খুব সহজেই সম্ভব। কিন্তু মস্তিষ্ক বলছে অসম্ভব। এ ক্ষেত্রে আসলে বিভ্রান্তিতে পড়েছে চোখ। তোমার মস্তিষ্কের ভাবনা ঠিক আছে।

আঁকাআঁকি আর জ্যামিতিতে বিশেষ মুনশিয়ানা থাকলে ছবিতেই কেবল এই দৃশ্য ফুটিয়ে তোলা সম্ভব। বাস্তবে এমন ঝরনা তৈরি একেবারে অসম্ভব।

কিন্তু এই অসম্ভবকে কীভাবে ছবিতে সম্ভব করলেন এশার। আসলে M আকৃতির ওয়াটার চ্যানেলটা ভালো করে আরেকবার দেখো। দুটো পেনরোজ ট্রায়াঙ্গল বা ইমপসিবল ত্রিভুজ পাবে। এই ত্রিভুজ দুটোই এশারের আঁকার কাজটা সহজ করে দিয়েছে। তৈরি হয়েছে একটা ক্ল্যাসিক ইমপসিবল অবজেক্ট!

আরও পড়ুন