আহসান হাবীবের ‘মিশন গাজীপুর’ (দ্বিতীয় পর্ব)

অলংকরণ: মামুন হোসাইন

এই ঘটনার পর মন্টুদের পাড়া গরম হয়ে যায়। মন্টুর মা প্রচণ্ড খেপে গিয়ে মন্টুকে নির্বাসনে পাঠায় গাজীপুরে তার এক ‘কাইষ্টা’ টাইপ মামার কাছে। আর এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে মিটিং করে বিটুলকেও পাড়াছাড়া করে এই অপরাধে। এতে অবশ্য বিটুলের সুবিধাই হয়, তার ছয় মাসের মেস ভাড়া বাকি ছিল। এলাকার গুরুজনেরা তাকে মেসছাড়া করতে গিয়ে বাধ্য হয়ে মেসের ভাড়া ক্লিয়ার করে তাকে পাড়া থেকে বিদায় করতে হয়। এসব যখন ঘটছে তখন মন্টুর বন্ধুরা আমতলায় মিটিংয়ে বসেছে। (আমতলাটা তাদের খেলার জায়গা, একই সঙ্গে মিটিংও চলে মাঝেমধ্যে)।

এখন কী হবে? মন্টুর প্রাণের বন্ধু নাফিস জানতে চায়।

মন্টুকে গাজীপুরে পাঠিয়ে দিয়েছেন আন্টি।

শুধু পাঠিয়েছেন? ওখানে শুনেছি ওকে গৃহবন্দী করে রেখেছে ওর চেয়ারম্যান মামা।

মামাটা শুনেছি ভয়ংকর। আরেকজন মন্তব্য করে।

এখন আমাদের কী করা উচিত?

বিটুল ভাইয়ের খোঁজ কিছু জানিস?

বিটুল ভাইকেও তো পাড়ার গার্জেনরা এলাকা থেকে বের করে দিয়েছে।

উফ্ এখন কী হবে?

এ রকম নানা মতামত চলতে থাকল। সবাই নানা কথা বলছে। কিন্তু দলের একমাত্র মহিলা সদস্য মিতু কিছু বলছে না। তবে মুখ চলছে!

এই তোর মুখে কী?

বরই।

আশ্চর্য আমরা একটা জটিল বিষয় নিয়ে কথা বলছি, আর তুই বরই খাচ্ছিস?

তোরাও খা। বলে সে তার ফ্রকের পকেট থেকে এক গাদা কাঁচা-পাকা বরই বের করে দিল (সঙ্গে বিট লবণ ফ্রি)। সবাই মোটামুটি ঝাঁপিয়ে পড়ল বরইয়ের ওপর। দেশি বরই, সাইজে ছোট কিন্তু বেশ মিষ্টি।

তাহলে আমাদের আলোচনার ফলাফল কী দাঁড়াল? গম্ভীর হয়ে বলল নাফিস।

ফলাফল ফলপ্রসূ। বলে সজল।

মানে?

মানে এই যে সবাই মিলে ফল খেলাম। সবাই হেসে উঠল। তবে শেষ পর্যন্ত মিটিংয়ে একটা জিনিসই ফাইনাল হলো, সেটা হচ্ছে আবার কবে মিটিং হবে তার ডেটটা।

পরের মিটিং বুধবার যথরীতি সেই আমতলায়। স্কুল বন্ধ বলে মিটিং করতে কোনো সমস্যা নেই, যখন-তখন মিটিং চলতেই পারে।

বিটুল ভাইয়ের খোঁজ করেছিলি? নাফিস প্রশ্ন করে সজলকে। সজলের কাছেই বিটুল ভাইয়ের নম্বর আছে।

করেছিলাম।

বিটুল ভাই কী বলল?

বিটুল ভাই ধরেনি।

কে ধরেছে?

একটা মেয়ে।

মেয়ে? মেয়েটা কী বলল?

বলল, ‘এই ফোনটির সংযোগ দেওয়া যাচ্ছে না...’ সবাই হেসে উঠল। রেগে গেল নাফিস।

দেখ নাফিস, এটা ফাজলামোর সময় না।

তোরা কিন্তু একটা গুরুত্বপূর্ণ জিনিস ভুলে যাচ্ছিস। চুইংগাম চিবুতে চিবুতে মানিক গম্ভীর হয়ে বলে,

কী?

পরশু আমাদের স্কুল খুলবে। এবং পরশুই স্কুলে বার্ষিক নাটক...

হ্যাঁ, জানি তো। সবাই একসঙ্গে বলে।

কিন্তু মন্টু নেই।

তো? আর তখনই সবার মাথায় একসঙ্গে আকাশ থেকে যেন মহাকাশের মির স্টেশন ভেঙে পড়ে। আরে তাই তো সবচেয়ে ইম্পরটেন্ট বিষয়টাই তাদের মাথায় নেই। ওই নাটকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পার্টটা মন্টুর, আর মন্টুই নেই।

হায় হায় এখন কী হবে?

আরে তাই তো...মিটিংয়ে পিনপতন নিস্তব্ধতা নেমে আসে। সেই নিস্তব্ধতা ভেঙে একটা বাজখাঁই গলা শোনা যায়।

ওই পোলাপাইন হট পেটিস খাও গরম গরম...

 সবাই বিরক্ত হয়ে তাকায় হটপেটিসওয়ালা লোকটার দিকে। এটা কি হটপেটিস খাওয়ার সময়? তারা মরছে নিজেদের সমস্যা নিয়ে। আর তখনই মিতু চেঁচিয়ে ওঠে, ‘আরে এ তো বিটুল ভাই!’ সবাই আশ্চর্য হয়ে দেখে সত্যিই হটপেটিসওলা আর কেউ না, বিটুল ভাই, দেখে চেনার উপায় নেই। দারুণ ছদ্মবেশ...মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। মাথায় গামছা বাঁধা। ময়লা একটা শার্ট আর ছেঁড়া লুঙ্গি।u

বিটুল ভাই তুমি?

তোমার একি ছদ্মবেশ?

ছদ্মবেশ না নিয়ে উপায় আছে? তোরা আমায় বের করে দিলি পাড়া থেকে।

উফ্... আমরা বের করেছি?

ওই হলো, তোদের গার্জেনরা। ...আচ্ছা বাদ দে, আসল আলোচনায় আসি। শোন, পরশু দিন মন্টুর স্কুলে নাটক, তোরা জানিস?

তুমি জানলে কী করে? সবাই অবাক।

আমি জানব না মানে, আমি নাটক করি না? আমিই তো ওকে রিহার্সেল দেয়ালাম। তোদের গজেন্দ্র স্যার আমাকে দায়িত্ব দিল রিহার্সেলের। ওর রাজপুত্রের ড্রেসটাও আমার কাছে।

ও হো তাই তো...

তো?... এখন কথা হচ্ছে ওকে উদ্ধার করতে হবে। উদ্ধার করে এনে ওকে নাটকে হাজির করতে হবে।

ঠিক ঠিক।

এখন তোদের কিছু কাজ করতে হবে। মন্টু গাজীপুরে কোন ঠিকানায় আছে, সেটা বের করতে হবে। কে বের করতে পারবে?

আমি। হাত তুলে মিতু।

তুই পারবি? গুড, কাল আমাকে ফোন করে ঠিকানাটা জানাবি। আমি সকালে ওকে উদ্ধার করতে মাইক্রোবাস নিয়ে যাব।

ঠিকানা আমি এখনই দিতে পারি। বলে মিতু।

সত্যি?

হ্যাঁ, কাল আমি ওদের বাসায় গিয়েছিলাম। তখনই জোগাড় করেছি। এই যে। বলে একটা কাগজে লেখা ঠিকানা এগিয়ে দেয়।

কীভাবে করলি? নাফিস জানতে চায়।

সেটা বলব কেন?

ঠিক আছে সেটা জানা জরুরি নয়, ঠিকানাটাই জরুরি। নে এখন তোরা পেটিস খা। ১০ টাকা করে, কিন্তু তোদের জন্য ছয় টাকা।

সবাই ঝাঁপিয়ে পড়ে গরম পেটিস খেতে লাগল। কিন্তু আমাদের কারও কাছে এখন টাকা নেই।

ঠিক আছে পরে দিবি, কিন্তু দিবি। আমি এখন এই পেটিসওলার বাড়িতে থাকি। ওর পেটিস বিক্রি করে কমিশন দিয়ে দিই ওকে। ভালো ব্যবসা, ভাবছি এই লাইনেই থেকে যাব। একটা হটপেটিস স্টোর খুলব।

ওহ্‌ দারুণ পেটিস।

আরও পড়ুন