‘কোকোমাংক! কোকোমাংক!’ হেসে বাক্যটা শেষ করে দিল সারা।

‘শিম্পাঞ্জি আর এ ছাড়া কী বলবে!’ নাক কুঁচকে বলল লরা। ‘তারপর রোমশ আঙুল দিয়ে চোখ টিপে ধরবে, কানের কাছে পচা কলার গন্ধ ফেলবে ফোঁস ফোঁস! এ কি ভালো লাগে?’

এই সময় মিসেস অ্যানসন এগিয়ে এলেন মেয়েদের দিকে। তাঁর হাতে চারটে কাগজ। টিকিট। ফ্রি পাস। ‘এই যে, নিয়ে এলাম।’

‘ওহ্, মা, তুমি যে কি ভালো না!’ মাকে জড়িয়ে ধরল ক্যারি।

‘থ্যাংক ইউ, আন্টি!’ প্রায় সমস্বরে বলে উঠল জারা, সারা আর লরা।

এমন আলতো করে পাসটা ধরল জারা, যেন বেশি জোরে আঙুলের চাপ লাগলে নষ্ট হয়ে যাবে। ভালো করে দেখল। গোলাপি রঙের আয়তাকার এক টুকরো কাগজ, চারপাশে কমলা বর্ডার। রংটা ওর পরনের লাল জ্যাকেটের বর্ডারের মতো। পাসে প্রিন্ট করে লেখা ‘শনিবার থেকে শনিবার’।

গর্বিত ভঙ্গিতে পাসগুলো নিয়ে মিসেস অ্যানসনের পেছন পেছন চলল ওরা। প্রধান গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকল।

‘কী সাংঘাতিক!’ চারপাশে তাকিয়ে জারা বলল। ‘গত বছরের চেয়ে ভালো লাগছে। অনেক কিছু বদলে ফেলেছে।’

জারা আর তার বন্ধুরা দেখল, অসংখ্য রাইড বসানো হয়েছে। রঙিন বাটারফ্লাই চেয়ার লাগানো ফেরিস হুইলটা যেন আকাশ ছুঁতে চাইছে। আরেকটা রাইড আছে ‘পাইরেটস শিপ’, অর্থাৎ জলদস্যুদের জাহাজ। দুলছে, যেন ঢেউয়ের তালে তালে। যান্ত্রিকভাবে করা হয়েছে এটা।

‘মনে রেখো, মেয়েরা,’ মিসেস অ্যানসন বললেন, ‘তোমাদের পাসগুলো একবারই দেওয়া হয়েছে। হারালে আর বদলি পাবে না। কাজেই খুব সাবধানে রাখবে।’

‘রাখব, মা,’ ক্যারি বলল।

‘গুড।’ ঘড়ি দেখলেন মিসেস অ্যানসন। ‘দুই ঘণ্টা পর ঠিক এইখানে দেখা হবে আবার আমাদের। সবাইকে গাড়িতে করে বাড়ি পৌঁছে দেব।’ তাড়াহুড়া করে চলে গেলেন তিনি, ফ্যান্টমল্যান্ডের অফিসে, চাকরির কাজে।

‘পাসগুলো একটা নিরাপদ জায়গায় রাখা দরকার,’ জারা বলল।

‘ঠিক,’ ক্যারি বলল। নিজের পাসটা ওর ওয়েস্ট-প্যাকের ভেতরে রেখে দিল।

সারা আর লরার পোশাকে পকেট নেই, পাস রাখার জায়গাও নেই।

‘আমার জ্যাকেটের পকেট বড়,’ জারা বলল। ‘তোমাদেরগুলোও রাখতে পারব।’

‘ঠিক আছে,’ হাতের পাসটা জারার দিকে বাড়িয়ে দিল লরা।

সারাও তারটা দিল।

তিনটে পাস জ্যাকেটের ডান পকেটে রেখে দিল জারা।

‘পকেটের ফ্ল্যাপের বোতামটা লাগিয়ে দাও,’ সারা বলল।

‘এটা আসলে ফ্ল্যাপ নয়,’ জারা বলল। ‘ডেকোরেশন, ফ্ল্যাপের মতো।’ পকেটের ওপর চাপড় দিল সে। ‘ভেবো না, পাসগুলো এখানে নিরাপদেই থাকবে।’

‘দেখো, না হারায়,’ সাবধান করে দিল লরা।

‘না, ওর কাছে হারাবে না,’ হাসল সারা। ‘গোয়েন্দারা কখনো হারায় না। ওরা বরং খুঁজে বের করে।’

জারাও হাসল। রিচমন্ড এলিমেন্টারি স্কুলের সবাই জানে সে খুব দক্ষ গোয়েন্দা। সঙ্গে একটা নীল রঙের ডিটেকটিভ নোটবুকও রাখে। তদন্ত করতে গেলে যে সব তথ্য-প্রমাণ আর সূত্র পাওয়া যায়, সবকিছুর নোট লিখে রাখে এই নোটবুকে।

‘বেশ, চলো এখন,’ ক্যারি বলল। ‘আগে কোন রাইডটাতে চড়তে চাও?’

‘ডুডল ডাকে চড়লে কেমন হয়?’ লরা বলল। একটা রাবারের ভেলা পানিতে ভাসতে দেখল সবাই।

মুখ বাঁকিয়ে সারা বলল। ‘ওটা দেখতে মোটেও হাঁসের মতো লাগছে না। বরং রাবারের বাথটাব বললে ভালো মানাত। নাহ্, পানিতে ভেসে বেড়াতে আমার ভালো লাগবে না।’

‘তাহলে নাগরদোলা?’ জারা জিজ্ঞেস করল।

কেউ জবাব দেওয়ার আগেই জোরালো গুমগুম শব্দ কানে এল।

এহ্-হে, সর্বনাশ! জারা ভাবল। এই শব্দের একটাই মানে।

‘র‌্যাম্বলিং রোজি!’ চেঁচিয়ে উঠল ক্যারি।

র‌্যাম্বলিং রোজি হলো ফ্যান্টমল্যান্ডের সবচেয়ে দ্রুততম রাইড। অনেক লম্বা মস্ত একটা রোলার কোস্টার, আর এই রাইডটা জারার সবচেয়ে অপছন্দ। গুমগুম শব্দটা ওটার ভারী ইঞ্জিনের শব্দ।

জারার পছন্দ না হলেও রাইডটা ওর বন্ধুদের পছন্দ। তাই বাধ্য হয়ে ওদের সঙ্গে যেতে হলো তার। ওরা রাইডের প্রবেশমুখে পৌঁছাতে পৌঁছাতে লম্বা লাইন পড়ে গেল। বহু ছেলেমেয়ে এতে চড়তে আগ্রহী।

‘আরে, কী বলে!’ আঙুল তুলে একটা কাঠের সাইনবোর্ড দেখাল লরা। তাতে লেখা:

এই রাইডে চড়তে হলে এই সাইনবোর্ডের সমান উঁচু হতে হবে তোমাকে।

কাঁধ ঝাঁকাল সারা। ‘এখনো তুমি খাটো রয়ে গেছো, লরা।’

‘কিন্তু গত এক বছরে তো এক ইঞ্চি লম্বা হয়েছি,’ লরা জবাব দিল।

‘থাকগে, লরা, আমি তোমার সঙ্গে থাকব,’ জারা বলল। ‘ওটাতে চড়তে ভালো লাগে না আমার।’

‘কেন লাগে না?’ সারা জিজ্ঞেস করল। ‘গতবার তো চড়েছিল। ভালোও লেগেছে বলেছ।’

‘তাই তো,’ মাথা ঝাঁকাল ক্যারি। ‘চলতে চলতে কেমন উল্টে যায়।’

মুখ বাঁকাল জারা। ‘সেই সঙ্গে পেটটাকেও উল্টে ফেলে!’

হাসল সারা। ‘রাইডে চড়ার আগে যে কটন ক্যান্ডি খেয়েছিলে, তো গতবার তাই মুখ দিয়ে বেরিয়ে এসেছিল, মনে আছে?’

‘আগামী বছর চড়ব,’ প্রসঙ্গটা বাদ দিয়ে দিল জারা।

‘বেশ,’ ক্যারি বলল। ‘আধঘণ্টা পর নাগরদোলাটার কাছে দেখা হবে।’

রাইডে চড়তে আগ্রহী, লাইন দিয়ে দাঁড়ানো ছেলেমেয়েদের দিকে দৌড়ে গেল ক্যারি আর সারা।

সেদিকে তাকিয়ে রইল জারা ও লরা।

‘কে চড়ে ওই পচা র‌্যাম্বলিংয়ে !’ দীর্ঘশ্বাস ফেলে লরা বলল। ওর মাথার গোলাপি ব্যান্ডটা টান দিয়ে ঠিক করল। ‘ওতে চড়লে চুলের বারোটা বাজে।’

ওকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য জারা বলল, ‘রনি’স ট্যাফিস্ট্যান্ড থেকে ট্যাফি খাইগে, চলো।’

প্রতিবছর ফ্যান্টমল্যান্ডের বিরাট আকর্ষণ রনির ট্যাফি। টফির মতোই জিনিস, তবে আরও সুস্বাদু করে বানায়। নানা রকম সুগন্ধি মেশায়।

খাবারের কথায় উজ্জ্বল হলো লরার মুখ। ‘ভাবছি, এ বছর কী সুগন্ধি দিল রনি?’

হাসতে শুরু করল জারা। ‘আচ্ছা বিফ পেপারনি পিৎজা হলে কেমন হয়?’

‘পেপারনি! পিৎজা!’ চেঁচিয়ে উঠল লরা। ‘ওয়াক! ভাবলেই বমি আসে!’

ববস্লেড রাইডের পাশে রনির ট্যাফিস্ট্যান্ড। স্ট্রবেরি ফ্লেভার দেওয়া এক ব্যাগ ট্যাফি কিনল লরা। জারার পছন্দ কলার সুগন্ধি।

একটা ট্যাফি খেল জারা। তারপর ব্যাগটা রেখে দিল জ্যাকেটের ডান পকেটে।

‘অল্প অল্প করেই খাই,’ বলল সে। ‘বেশি খেয়ে পেটে সয় না, গতবারের মতো আবার অসুস্থ হতে চাই না।’

মেলার মধ্য দিয়ে হেঁটে চলল জারা আর লরা। ওরা দেখল একটা স্টেজের সামনে আগ্রহী ছেলেমেয়েদের ভিড়।

‘ওখানে কী হচ্ছে?’ লরা বলল।

হাতাকাটা রুপালি আলখাল্লা পরা একজন লোক মখমলের লাল পর্দার ওপাশ থেকে বেরিয়ে এল এই সময়।

‘মেইজ দ্য গ্রেট ম্যাজিশিয়ান,’ জারা বলল। ‘তার মানে এ বছরও এসেছে।’

‘উম!’ এখনো ট্যাফি চিবোচ্ছে লরা। মুখে আঠালো খাবার নিয়ে আরও কী বলল, কিছু বোঝা গেল না।

‘আমার পরের খেলার জন্য তোমাদের মাঝখান থেকে একজনকে দরকার,’ মেইজ বলল।

সঙ্গে সঙ্গে হাত তুলল জারা। তারপর কার চিৎকার যেন কানে এল, ‘এই, রাস্তা দাও! সরো!’

তাকিয়ে দেখল কালো চুলওয়ালা একটা ছেলে ঠেলাঠেলি করে জারার সামনে এসে দাঁড়াল।

‘টনি হোয়াং!’ বিড়বিড় করল জারা। ওদের ক্লাসেই পড়ে ছেলেটা।

‘এই যে! এই যে! আমাকে নিন! আমাকে নিন!’ টনি বলল।

এত জোরে চিৎকার করছে সে, দুই হাত কানে চাপা দিল জারা। জোরে একটা নিশ্বাস ফেলল জারা। ‘মনে হয় টনিকেই নেবে। বড় হয়ে ম্যাজিশিয়ান হতে চায়।’

default-image

‘যদি কোনোকালে বড় হয়,’ নাক কুঁচকে বলল লরা।

টনির দিকে আঙুল তুলল ম্যাজিশিয়ান। ‘এই ছেলেটা মনে হচ্ছে ম্যাজিক ভালোবাসে। এই, উঠে এসো, ইয়াং ম্যান!’

‘আসছি!’ চিৎকার করে বলল টনি। ভিড় ঠেলে সামনে এগোল। স্টেজের কাছাকাছি গেলে হাত ধরে টেনে তাকে স্টেজে উঠতে সাহায্য করল ম্যাজিশিয়ান।

‘টনিকে নিয়ে ম্যাজিক দেখানো দেখবে?’ লরাকে জিজ্ঞেস করল জারা। ‘নাকি নাগরদোলায় চড়বে?’

কেমন বোকা বোকা চোখে দর্শকদের দিকে তাকিয়ে রইল টনি।

পরস্পরের দিকে তাকাল জারা আর লরা।

লরা বলল, ‘হাঁদাটার খেলা কে দেখে!’

জারা বলল, ‘তার মানে নাগরদোলা!’

ভিড় ঠেলে নাগরদোলার দিকে যেতে যেতে জারার হাত চেপে ধরল লরা।

‘জারা, দেখো!’ ফিসফিস করে বলল লরা। ‘ওই যে ক্রিপি হাউস অব স্ক্রিমস!’

কেঁপে উঠল জারা। ‘ভুতুড়ে বাড়ির ভাঙা জানালা আর মাকড়সার জালগুলোর ব্যাপারে সাবধান!’

‘আমার এক বছরের হোমওয়ার্ক করে দিতে যদি রাজি হও, তাহলেও আর ওখানে ঢুকব না,’ লরা বলল।

‘জায়গাটা সত্যিই ভুতুড়ে,’ জারা বলল। ‘তাই না?’

ফিসফিস করতে লাগল লরা, ‘ওখানে নাকি একটা ভুতুড়ে নেকড়ে বাস করে, উইয়ারউলফ। সারা বছরই থাকে ওটা।’

‘উইয়ারউলফ?’ জারা জিজ্ঞেস করল।

মাথা ঝাঁকাল লরা। ‘লম্বা লম্বা দাঁত...রক্ত লেগে থাকা...রোমশ থাবা আর ধারালো নখ!’

হঠাৎ দুটো হাত জারার চোখ টিপে ধরল। কে ধরেছে হাত দিয়ে বোঝার চেষ্টা করল সে। শক্ত লোমে ঢাকা অতি রোমশ একটা হাত।

‘উইয়ারউলফ!’ ঢোঁক গিলল জারা। তারপর চিৎকার করে উঠল। ‘বাঁচাও! বাঁচাও! কে আছো!’

দুই.

‘বুহ্! বুহ্! বুহ্!’ জারার কানের কাছে জোরে চিৎকার করে উঠল একটা অদ্ভুত কণ্ঠ।

রোমশ হাতটা সরে গেল। পাঁই করে ঘুরে দাঁড়াল জারা। দেখল, উইয়ারউলফ নয়। একটা শিম্পাঞ্জি। আর মজার ব্যাপার হলো, জন্তুটাকে মানুষের মতো ওভারঅল পরিয়ে রাখা হয়েছে।

‘ও, তুই!’ জারা বলল। ‘তুই-ই নিশ্চয় কোকোমাংক!’

শিম্পাঞ্জিটা লম্বায় জারার সমান। ওর দিকে তাকিয়ে শিম্পাঞ্জির হাসি হাসল। বড় বড় হলুদ দাঁত বের করে।

পকেটে হাত দিল কোকোমাংক। যে পকেটে ট্যাফির ব্যাগটা রেখেছে জারা। কিন্তু একজন মহিলাকে এদিকে আসতে দেখে তাড়াতাড়ি হাতটা বের করে নিল। মহিলার পরনে একটা তামাটে রঙের স্যুট। মাথায় খড়ের টুপি।

জারার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তুমি ঠিকই বলেছ, ইয়াং লেডি। ও কোকোমাংক। আমি মিসেস জেনিফার কেনসিংটন। এত লম্বা নাম মনে না থাকলে শুধু জেনি বলো। আমি কোকোমাংকের ট্রেইনার। আর তুমি হয়ে গেলে আজকের দিনের কোকোমাংক পাল। মানে, কোকোমাংকের বন্ধু।’

শিম্পাঞ্জিটার দিকে হাত নাড়ল লরা। ‘যাহ্! যাহ্! এই সর!’

‘থাক, লরা,’ বাধা দিল জারা। শিম্পাঞ্জির হাতটা ধরে ঝাঁকিয়ে দিল। ‘কোকোমাংক তো যথেষ্ট অন্তরঙ্গ।’

একটা পিকোমাংক পাল বোতাম জারার জ্যাকেটে পরিয়ে দিলেন মিসেস জেনিফার। পিন লাগানো বড় বোতামটার গায়ে কোকোমাংকের ছবি আঁকা। তারপর নিজের কাঁধে ঝোলানো ব্যাকপ্যাক থেকে একটা কলা বের করে শিম্পাঞ্জিটার হাতে দিলেন। খুশিতে তীক্ষ্ণ চিৎকার করে উঠল কোকোমাংক।

‘একটা কলার জন্য যা খুশি করতে পারে কোকোমাংক,’ মিসেস জেনিফার বললেন। ‘আর ভালোবাসে ট্যাফি। ওটাও তার প্রিয় খাবার।’

হাতের স্ট্রবেরি ট্যাফির ব্যাগটা শক্ত করে চেপে ধরল লরা। ঢোঁক গিলল, ‘ট্যাফি?’

‘কোকোমাংক খুব ভদ্র,’ জারা বলল। শিম্পাঞ্জিটা কলা ছিলছে, সেদিকে তাকিয়ে আছে সে।

‘আগে এত ভদ্র ছিল না,’ মিসেস জেনিফার বললেন। ‘দুই বছর আগেও খালি শয়তানি করে বেড়াত।’ হাসলেন তিনি। ‘তখন আাামি ওকে কর্নেল লায়নের অ্যানিমেল লার্নিং স্কুলে পাঠালাম। ওখান থেকে ভদ্রতা শিখে এসেছে।’

তাকিয়ে দেখছে জারা। কলাটা শেষ করল কোকোমাংক। তারপর অন্য হাতে রাখা কলার খোসাটা তার পরনের লম্বা ওভারঅলের পকেটে রেখে দিল।

‘দেখলে?’ মিসেস জেনিফার বললেন। ‘বেশির ভাগ বানরই কলা খেয়ে খোসাটা মাটিতে ছুড়ে ফেলে। কোকোমাংক তা করে না।’ শিম্পাঞ্জিটার মাথা চাপড়ে আদর করে দিলেন তিনি। ‘গুড বয়।’

খুশিতে হাততালি দিতে লাগল বানরটা।

‘আমাদের রাইডে চড়তে হবে,’ যারা বলল। ‘পিনটার জন্য ধন্যবাদ, মিসেস কেনসিংটন।’ জ্যাকেটে লাগানো বোতামটার গায়ে হাত রাখল সে। শিম্পাঞ্জিটাকে বলল, ‘বাই, কোকো!’

লরাকে নিয়ে নাগরদোলার দিকে এগোল জারা। নাগরদোলায় অনেক রঙের ঘোড়া। সাদা ঘোড়াটা জারার প্রিয়। ওটার দিকেই এগোল সে। নাগরদোলায় ঘোড়াসহ আরও অনেক জন্তু-জানোয়ার ঝোলানো। যারা চড়বে তাদের বসার জন্য। হঠাৎই একটা উজ্জ্বল কমলা রঙের নকল মোরগের ওপাশ থেকে উঁকি দিল একটা মেয়ের মুখ।

‘মনিকা জোয়ান!’ চেঁচিয়ে উঠল জারা। তার কাছে দৌড়ে গেল লরা।

‘হাই, জারা, হাই লরা,’ মনিকা বলল। ‘সারাও এসেছে নাকি?’

মাথা ঝাঁকাল লরা। ‘র‌্যাম্বলিং রোজিতে চড়তে গেছে ওরা। সারার সঙ্গে ক্যারিও আছে।’

‘আজ এখানে আসবে, কই, ক্যারি তো আমাকে একবারও বলেনি,’ মনিকা বলল।

জারার মনে হলো অস্বস্তি বোধ করছে মনিকা।

‘সারা শুধু আসেইনি,’ লরা বলল, ‘সে আমাদের সারা সপ্তাহের জন্য ফ্রি পাসেরও ব্যবস্থা করে দিয়েছে। দারুণ না?’

মনিকার প্রতিক্রিয়া দেখার জন্য তীক্ষ দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রইল জারা।

‘ফ্রি পাস?’ ভ্রু কোঁচকাল মনিকা। ‘তার মানে তোমরা এখন বিনে পয়সায় এখানে মজা করছ?’

‘জারা, ওকে পাসগুলো দেখিয়ে দাও না,’ লরা বলল।

জোরে নিশ্বাস ফেলল জারা। পকেটে হাত দিয়ে পাসগুলো অর্ধেক টেনে বের করে দেখাল।

পাসগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল মনিকা। ‘প্রথম কথা, সারা আমার সঙ্গে পুরো এক সপ্তাহ ধরে কথা বলেনি। আর তারপর এই কাণ্ড!’

মনিকার মন খারাপ হয়ে গেছে, ভাবল জারা। অন্য প্রসঙ্গে চলে যেতে চাইল। মনিকার পোশাকের বুকে ঝোলানো একটা চমৎকার পার্সের দিকে আঙুল তুলল। প্লাস্টিক দিয়ে গুবরেপোকার মতো করে বানানো।

‘তোমার পার্সটা তো খুব সুন্দর, মনিকা,’ জারা বলল। অর্ধেক বের করে রাখা পার্সগুলো আবার ঠেলে ঢুকিয়ে দিল পকেটে। ‘গুবরেপোকা কি তোমার পছন্দ?’

মাথা ঝাঁকাল মনিকা। ‘হ্যাঁ, গুবরেপোকা আমার পছন্দ। এত সুন্দর। আর খুব লাকি। সৌভাগ্য নিয়ে আসে।’

একটা ঘণ্টা বাজল তিনবার।

‘রাইড চালু হতে যাচ্ছে,’ জারা বলল।

‘ওই গোলাপি-সাদা খরগোশটায় চড়ব আমি,’ লরা  বলল। কিন্তু নাগাল পেল না বলে উঠতে পারল না।

সাদা ঘোড়াটায় চড়ার চেষ্টা করল জারা। ঘোড়াটা এত উঁচুতে, উঠতে পারল না।

‘ঠিক আছে, আমি তোমাকে সাহায্য করছি,’ মনিকা বলল। জারার পেছনে এসে দাঁড়াল সে। জারার কোমর জড়িয়ে ধরে জোরে এক ঠেলা দিল ওপর দিকে।

default-image

‘থ্যাংকস,’ ঘোড়ায় বসে নিচে তাকিয়ে জারা বলল। কিন্তু মনিকা নাগরদোলায় উঠল না। দৌড়ে চলে যাচ্ছে।

‘এই, মনিকা!’ চেঁচিয়ে ডাকল জারা। ‘তুমি নাগরদোলায় চড়বে না?’

থামল না মনিকা। ফিরে তাকাল না। দৌড়াতে দৌড়াতে জনতার ভিড়ে মিশে গেল।

অদ্ভুত তো! ভাবল জারা। নাগরদোলাটা ততক্ষণে চলতে আরম্ভ করেছে।

নাগরদোলার ঘোরা শেষ হলো।

রেলিংয়ের কাছে দাঁড়িয়ে আছে লরা আর সারা।

‘কাকে দেখেছি জানো?’ লরা জিজ্ঞেস করল। ‘মনিকা জোয়ান।’

‘মনিকা এখানে এসেছিল?’ ভ্রু কোঁচকাল সারা।

‘আরও কাকে দেখেছি কল্পনাই করতে পারবে না,’ জারা বলল। ‘কোকোমাংক!’

‘বলো কি?’ চেঁচিয়ে উঠল লরা।

‘দেখতে কেমন?’ সারা জানতে চাইল।

বুকে লাগানো বোতামটায় টোকা দিল জারা। ‘শিম্পাঞ্জি আবার কেমন হয়, শিম্পাঞ্জির মতোই। তবে মুখটা বড়, হাসিটাও বড়।’

‘অদ্ভুত দেখতে!’ লরা বলল।

‘অদ্ভুত যখন বললেই,’ ফিসফিস করে সারা বলল, ‘ওই দেখো কে আসছে।’

‘টনি হোয়াং!’ গুঙিয়ে উঠল লরা।

রুপালি রঙের একটা হাতাকাটা আলখাল্লা পরেছে টনি। হাতে একটা লম্বা লাঠি, রংচঙে কাগজে মোড়ানো ম্যাজিশিয়ানের লাঠি। উঁচু করে সুর করে বলল, ‘অ্যাবরাকা ডেবরা! ডেবরাকা কেবরা!’

‘হাহ্ হাহ্!’ হেসে ফেলল জারা। মনে মনে বলল, ‘ভাঁড়টা করে কী?’ জোরে বলল, ‘হাই টনি।’

‘এখন আমার নাম শুধু টনি নয়,’ টনি বলল। ‘আমি এখন বিস্ময়বালক টনি হোয়াং।’ ম্যাজিশিয়ানদের ভঙ্গিতে বাউ করল। ‘আমি এখন মেইজের অ্যাসিস্ট্যান্ট।’

‘আমরা জানি,’ জারা বলল। ‘মেইজ যখন তোমাকে একটা ম্যাজিক দেখানোর জন্য মঞ্চে তোলে, আমি আর লরা তখন ওখানে ছিলাম।’

‘মেইজ তো শুধু একটা খেলা দেখানোর জন্য মঞ্চে তোলেনি আমাকে,’ টনি বলল। ‘সারা দিনের জন্য আমাকে তার সহকারী বানাতে চেয়েছিল। এখন বলো, আমাকে কি ভাগ্যবান বলা যায়?’

‘ভালো,’ সারা বলল। ‘আর ক্যারি আমাদের পুরো এক সপ্তাহের জন্য ফ্যান্টমল্যান্ডে ঢোকার ফ্রি পাস জোগাড় করে দিয়েছে।’

সারার কথায় লরা যোগ করল, ‘এটাকে কতটা ভাগ্যবান বলবে?’

বড় বড় হয়ে গেল টনির চোখ। ‘ফ্রি পাস? যাহ্, বিশ্বাস করলাম না!’

আঙুল তুলে জারার পকেট দেখাল লরা। ‘পাসগুলো ওর পকেটে।’

জারা দেখল, তার জ্যাকেটের পকেটের দিকে তাকাচ্ছে টনি। বোঝা গেল, ঈর্ষা করছে সে। কিছুটা রাগান্বিতও।

‘চলো যাই,’ বন্ধুদের বলল জারা। ‘উইযি ওয়ার্লে চড়ব।’

‘দাঁড়াও,’ টনি বলল। ‘আমার ম্যাজিক না দেখেই চলে যাবে?’

‘না না, দেখেই যাব,’ লরা বলল।

হঠাৎ লরার কানের কাছে হাত নিয়ে গিয়ে একটা উজ্জ্বল লাল রঙের ফুল টেনে বের করল টনি।

ফুলটার দিকে তাকিয়ে রইল লরা। ‘বাহ্, ভালো তো!’

জারার দিকে ঘুরল টনি। হাতের জাদুর লাঠিটা জারার মাথার ওপর ঘোরাতে লাগল। টেনে টেনে বলল, ‘অ্যাবরাকা-জারা!’

লাঠিটার দিকে তাকিয়ে রইল জারা। কিছু ঘটার অপেক্ষা করছে।

‘কী হলো? কিছু হচ্ছে না কেন?’ মিনিটখানেক অপেক্ষা করে জারা জিজ্ঞেস করল।

‘তোমার পকেট দেখো,’ হাসল টনি।

কাঁধ ঝাঁকাল জারা। পকেট থেকে একটা রাবারের টারান্টুলা মাকড়সা টেনে বের করল।

‘ওয়াক!’ করে উঠল জারা। সারার দিকে ছুড়ে ফেলল মাকড়সাটা। সারাও চিৎকার করে লরার দিকে ছুড়ল। তীক্ষ চিৎকার করতে লাগল তিনজনে।

‘কী?’ ভ্রু নাচাল টনি। হেসে উঠল। ‘আমাকে কি খারাপ ম্যাজিশিয়ান বলা যায়?’

‘যত সব নোংরামি!’ রাবারের মাকড়সাটাকে একটা ময়লার ঝুড়িতে ছুড়ে ফেলল সে। ‘এই পকেটেই আমার ট্যাফির ব্যাগটা রয়েছে।’

‘দেখো আবার, ট্যাফির মধ্যে পোকাটোকা ভরে দিল কি না হাঁদাটা,’ লরা বলল।

সাবধানে পকেটে হাত দিল আবার জারা। আর কোনো কুিসত জিনিস বেরোল না। তবে হঠাৎ ভয় পেয়ে গেল সে। চিৎকার করে উঠল। ‘সর্বনাশ!’

চলবে...

গল্প থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন