‘জলদি!’ চেঁচিয়ে আদেশ দিল টোরা। ‘জলদি ঠেকা দেওয়ার জন্য একটা পিলার নিয়ে এসো!’

একজন টেকনিশিয়ান ছুটে চলে গেল করিডর থেকে। ৩০ সেকেন্ড পরেই একটা হালকা, কিন্তু মজবুত পিলারের মতো জিনিস নিয়ে এল। ভূগর্ভকক্ষে এ ধরনের দুর্ঘটনা যেকোনো সময় ঘটতে পারে, তাই এই বিশেষ জিনিসগুলো আগে থেকেই তৈরি করে রাখা হয়েছে।

টেকনিশিয়ানের সহায়তায় এগিয়ে এল টোরা। দুজনে মিলে পাথরের ঠিক মাঝামাঝি জায়গা থেকে মেঝের সঙ্গে ঠেক দিয়ে বসিয়ে দিল পিলারটা। হাতের চাপ হালকা করল ইউসুফ। তারপর পাথরটা আর পড়বে না বুঝতে পেরে হাত নামিয়ে আনল।

ইউসুফের হাত চেপে ধরল টোরা। ‘আপনার...আপনার কোনো ক্ষতি হয়নি তো?’

‘না।’

‘কী ভূমিকম্পটাই না হলো!’

‘সামান্য একটু কম্পনমাত্র,’ ঠেস দিয়ে আটকে রাখা পাথরটার দিকে তাকিয়ে আছে ইউসুফ। ‘এতে ভয়ের কিছু নেই। কিন্তু আমি ভাবছি, পাথরটা থাকবে তো!’

হিমপাহাড় বেস। একটু আগের ভূমিকম্প নিয়ে আলোচনা করছেন আবু তাহের আর আশফাক খান।

‘ভুল?’ ভুরু কোঁচকালেন আশফাক খান, ‘কম্পিউটার ভুল করেছে?’

‘একটা ফিগারে একটু গন্ডগোল ছিল, ঠিক করে দিয়েছি,’ বললেন আবু তাহের। ‘আর এই ভুলের জন্যই আসল সময়ের কয়েক সেকেন্ড আগে সময় নির্দেশ করেছে যন্ত্রটা।’

‘তাহলে? মেজর আর্থকোয়েক ঠিক কখন বঙ্গোপসাগরের উপকূলে আঘাত হানবে?’

ঘড়ি দেখলেন আবু তাহের, ‘এখন থেকে ঠিক ৭ ঘণ্টা ৩৬ মিনিট পর।’

‘হুঁ!’ হতাশ দৃষ্টি আশফাক খানের চোখে, ‘কোনো উপায় নেই আর, তাই না? নিউক্লিয়ার বিস্ফোরণ ঘটাতেই হচ্ছে? ঠিক আছে, কাজ শুরু করে দিতে বলো, তাহের।’

‘ঠিক আছে’, চেয়ার থেকে উঠে ঘুরে দাঁড়ালেন আবু তাহের। তারপর কী মনে হতে ফিরে তাকালেন, ‘ইউসুফের আর কোনো খবর পাওয়া যায়নি, না?’

আবু তাহেরের দিকে তাকালেন আশফাক খান। মুখে কিছু বললেন না। এদিক-ওদিক মাথা নাড়ালেন শুধু।

ঘুরে দাঁড়িয়ে হাঁটতে শুরু করলেন আবু তাহের।

পরীক্ষাগারে ভিটুকে শুইয়ে রাখা টেবিলটার পাশে দাঁড়িয়ে আছে ইউসুফ আর টোরা।

‘কী চেহারা!’ ঠোঁট ওলটাল ইউসুফ। ‘অমাবস্যা রাতে দেখলে ভিরমি খাবে লোকে। নিশ্চয় খেয়েছেও অনেকে।’

‘ভারি মিষ্টি ছেলে ও,’ বলল টোরা। ‘ভারি মিশুক!’

‘তা তো বটেই,’ ব্যঙ্গ করল ইউসুফ। ‘বনের ভেতরে তো আমার সঙ্গে ঠাট্টা করেছিল কেবল, তাই না?’

‘আপনাকে ধরে আনার নির্দেশ দিয়েছিলাম, হুকুম পালন করেছেমাত্র সে,’ গম্ভীর হয়ে বলল টোরা। ‘যাকগে ওসব কথা। এখন আসুন, ওকে জাগিয়ে তোলার আগে কয়েকটা কাজ সেরে ফেলি।’

একটা টেবিলে রাখা কন্ট্রোল সুইচবোর্ডের একাধিক বোতাম টিপল টোরা। ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতির বিচিত্র আওয়াজ উঠল। একমনে কাজ করে গেল টোরা। এটা-ওটার নির্দেশ দিতে লাগল ইউসুফকে। চিফ নার্সের কাজ করাচ্ছে যেন ইউসুফকে দিয়ে।

‘আরও বেশি শক্তিশালী করতে হবে ওর হাতটা,’ আনমনে বিড়বিড় করে যেন নিজেকে বোঝাল টোরা। ‘যখন বানিয়েছিলাম, আপনার মতো বায়োনিকম্যানের পাল্লায় পড়বে ভাবিনি।’

‘ওর মতো আরও রোবট আছে নাকি তোমাদের?’

‘না। ও-ই আমার প্রথম সৃষ্টি। প্রথম খোকা।’

‘কাঁচি,’ ইউসুফের দিকে না তাকিয়েই হাত বাড়াল টোরা।

হাতে তুলে দিল ইউসুফ। ‘অপারেশনের পোশাক পরছি না কেন আমরা? আমাদের হাসপাতালে ছোট্ট যেকোনো কাটাছেঁড়ার সময়েও বিশেষ পোশাক পরেন সার্জনরা।’

‘আমাদের এই পরীক্ষাগারের বাতাস হাইপার স্টেরিলাইজড। জীবাণু পরিবাহী কোনো কিছু কিংবা একবিন্দু ময়লা নেই এ ঘরে। কোনোভাবে জীবাণু যদি ঢুকে পড়েও নিউট্রাক্সিন থ্রি ওদিকটা সামলাবে।’

‘নিউট্রা...কী বললে?’ জিজ্ঞেস করল ইউসুফ।

‘নিউট্রাক্সিন থ্রি,’ অহংকার টোরার গলায়। ‘আপনাকে এর একটা শিশি দেখাব। এটা একধরনের ইলেকট্রোলাইটিক নিউরোপ্রোবেসিস, আমাদের দেহের ডিএনএ কণার সঙ্গে মিশে কাজ করে। রোগ ছড়াতে বাধা দেয়।’

‘কোন রোগ?’

‘সমস্ত রোগ। এ এক আশ্চর্য মহৌষধ!’

ঝুঁকে ভিটুর বুকে মৃদু চাপড় দিল টোরা। নির্জীব রোবটটার উদ্দেশে বলল, ‘আর বেশি দেরি নেই খোকা। এই কয়েক মিনিট। তারপরই ঘুম ভাঙাব।’

‘তুমি আসলে ওর মা।’

‘তা ঠিকই। এই নিরানন্দ ল্যাবরেটরিতে ও না থাকলে সময়ই কাটত না আমার।’

ইউসুফের দিকে তাকাল টোরা। মৃদু হাসল। তারপর আবার কাজে মন দিল।

যন্ত্রপাতির ট্রেটা খুঁজছে টোরা। কিন্তু প্রয়োজনীয় জিনিসটা কিছুতেই পাচ্ছে না। শেষ পর্যন্ত একটা নিডল-নোজড প্লায়ার্স তুলে নিল। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ জিনিসটার দিকে, ঠিক পছন্দ হচ্ছে না। বলল, ‘এই প্লায়ার্সেরই নাক দুটি যদি ভেতরের দিকে সামান্য বাঁকানো থাকত, চমৎকার হতো।’

‘দাও তো দেখি,’ টোরার হাত থেকে প্লায়ার্সটা নিল ইউসুফ। বায়োনিক আঙুলে চেপে ভেতর দিকে সামান্য বাঁকিয়ে দিল নাক দুটি। প্লায়ার্সটা আবার টোরাকে ফিরিয়ে দিতে দিতে বলল, ‘দেখো, এতে কাজ চলে কি না!’

প্লায়ার্সটার দিকে একবার তাকাল টোরা। তারপর ইউসুফের দিকে তাকাল। হাসল। ‘ধন্যবাদ,’ বলে আবার ঝুঁকে কাজে মন দিল।

কাজ শেষ করে প্লায়ার্সটা ট্রেতে রাখল টোরা। তারপর ট্রেটা নিয়ে টেবিলের নিচে যন্ত্রপাতি রাখার বাক্সে রেখে দিল।

‘হয়েছে,’ বলল টোরা, ‘ওর হাতটা জোড়া লেগেছে। শক্তিও অনেক বাড়ানো হয়েছে আগের চেয়ে। আপনিও আর এখন টেনে ছিঁড়তে পারবেন না।’

‘হয়তো,’ হাসল ইউসুফ। ‘তবে জোর দিয়ে কিছুই বলা যায় না।’

‘পারবেন না,’ জোর দিয়েই বলল টোরা। ‘আর একটু বাকি। এই যে এখানে,’ ভিটুর পিঠের একটা জায়গা দেখিয়ে বলল সে, ‘মারজানন পাওয়ার সেলটা বসিয়ে দিলেই কাজ শেষ।’

টেবিলের এক পাশে রাখা একটা প্লাস্টিকের বাক্স খুলল টোরা। ভেতর থেকে ছোট ব্যাটারি আকৃতির চৌকোনা কালো একটা বাক্সমতো জিনিস বের করল।

‘এটা!’ কালো বাক্সটার দিকে নির্দেশ করে বলল ইউসুফ, ‘এটাই অত বড় দানবটার চলার শক্তি জোগাবে? এত ছোট জিনিস! এই মারজানন আসলে কী?’

‘একধরনের অ্যান্টিহের‌্যাটার পাওয়ার সোর্স,’ জানাল টোরা। ‘আগামী এক শ বছরের মধ্যে আপনাদের বিজ্ঞানীরাও এই জিনিস আবিষ্কার করে ফেলবেন হয়তো।’

‘হয়তো,’ অনিশ্চিত ভঙ্গিতে মাথা দোলাল ইউসুফ।

আবার ভিটুর দিকে মন দিল টোরা।

‘এই মারজাননের চেয়ে তোমাদের নিউট্রাক্সিন সিরাম অনেক বেশি কাজের জিনিস মনে হচ্ছে।’ বলি বলি করে বলেই ফেলল ইউসুফ কথাটা, ‘এই ওষুধ পেলে পৃথিবীবাসীর খুব উপকার হতো। এক-আধ শিশি উপহার পাওয়ার আশা করতে পারি কি?’

ভিটুর পিঠে একটা মিটার-জাতীয় যন্ত্র বসিয়ে রিডিং দেখছে টোরা। ইউসুফের কথায় ফিরে তাকাল। ‘দেখুন, আপনাকে এক শিশি ওষুধ উপহার দেওয়াটা বড় কথা নয়। দিলে আমরা যে এখানে রিসার্চ করছি, সেটা ফাঁস হয়ে যাবে। এটাই জানতে দিতে চাই না পৃথিবীবাসীকে।’

হাসল ইউসুফ। ‘টোরা, কথা দিচ্ছি, শিশিটা কোথায় পেয়েছি, জানাব না কাউকে। তোমাদের কথাও বলব না। যত খুশি মানুষ ধরে এনে পরীক্ষা চালাও তোমরা। বিন্দুমাত্র বাধা দিতে আসব না। এক শিশি নিউট্রাক্সিন পৃথিবীবাসীর যে উপকার করবে, তার বিনিময়ে কয়েকজন মানুষকে গিনিপিগ বানাতে চাওয়া, তখন অন্যায় হবে না তোমাদের জন্য। যদি চাও,’ আবার হাসল সে, ‘তোমাদের ছুরি-কাঁচির তলায় আমিও নির্দ্বিধায় নিজেকে বলি দিতে রাজি আছি।’

‘দুঃখিত, ইউসুফ। আপনার কথা রাখা সম্ভব নয়। সত্যিই দুঃখিত আমি।’

‘ও’, গম্ভীর হয়ে গেল ইউসুফ। কী যেন ভাবল। তারপর বলল, ‘হ্যাঁ, ভালো কথা, আমি যে এখানে নিরাপদে আছি, আমার লোকদের জানাতে পারলে ভালো হয়। তোমাদের কথা জানাব না অবশ্যই।’ ইউসুফ জানে তার কথায় রাজি হবে না টোরা। তা-ও বলল, অন্য একটা মতলব মাথায় ঢুকেছে বলে।

‘সম্ভব না,’ সরাসরি মানা করে দিল টোরা। ‘হিগ রাজি হবে না।’

‘মোর্স কোড পাঠাতে মাত্র ১০ সেকেন্ড লাগবে।’

‘মোর্স তো দূরের কথা, স্মোক সিগন্যালও না।’

‘কিন্তু...’

‘বললাম তো, সরি! সম্ভব না!’

‘ঠিক আছে। আশা করছি শুধু বিজ্ঞানের উন্নতির জন্যই এত সব করছ তোমরা?’ হাল ছেড়ে দেওয়ার ভান করল ইউসুফ।

‘বিজ্ঞানের উন্নতির জন্যই শুধু।’

পরিস্থিতি সহজ করার জন্যই শব্দ করে হাসল ইউসুফ। টোরাও হাসল তার দিকে তাকিয়ে। তারপর আবার ভিটুর দিকে ফিরল। ঠিক এই সময় সিলিংয়ে বসানো মাইক্রোফোনে একটা শব্দ হলো। মেসেজ পাঠানোর পূর্বসংকেত।

সুইচবোর্ডের একটা সুইচ টিপল টোরা। সঙ্গে সঙ্গে দেয়ালের গায়ে টেলিভিশনের পর্দা বেরিয়ে এল। তাতে হিগের ছবি।

‘টোরা,’ ছবিটা তার দিকে তাকিয়ে ডাকল, ‘জলদি চলে এসো।’

কেন ডাকছে, কিছুই জানতে চাইল না টোরা। শুধু বলল, ‘আসছি।’

মিলিয়ে গেল হিগের ছবি।

ইউসুফের দিকে তাকাল টোরা, ‘এখানেই থাকুন। আমি আসছি।’ ঘর থেকে বেরোতে গিয়েও ইতস্তত করল টোরা। ‘আচ্ছা ইউসুফ, আবারও করছি প্রশ্নটা, আপনি এখানে থেকে যেতে পারেন না?’

‘থাকতে পারলে খুশিই হতাম,’ হাসল ইউসুফ। ‘তার চেয়ে তুমিই বরং চলো না আমার সঙ্গে।’

‘সেটা কি সম্ভব?’

মাথা ঝাঁকাল ইউসুফ। ‘না, অসম্ভব। তবু?’

পরস্পরের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল ওরা কয়েকটা মুহূর্ত। তারপর চোখ নামাল টোরা। ‘তোমাকে কোনো দিন ভুলব না আমি, ইউসুফ।’

‘তোমাকেও ভুলব না।’

‘আরেকটা কথা না বলে পারছি না,’ টোরা বলল, ‘আবেগপ্রবণ পৃথিবীর মানুষের কাছে শিখলাম জ্ঞান সাধনাই সব নয়; সহানুভূতি, সাহায্য, এসবেরও প্রয়োজন আছে। অনেক ধন্যবাদ তোমাকে।’

বারো

টোরা চলে যেতেই দ্রুত কমিউনিকেটরের কাছে গিয়ে দাঁড়াল ইউসুফ। বোতাম টিপতেই ছবি ফুটল টেলিভিশনের পর্দায়। করিডরের একটা অংশ পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। কী ভেবে আরও দুটি টেলিভিশনের বোতামও টিপল সে। কাউন্সিলের চেম্বার দেখা গেল একটায়। তৃতীয় টেলিভিশনটা ভূগর্ভের বাইরের দৃশ্য দেখার জন্য। বুঝল, এর সাহায্যেই হিমপাহাড় বেসের ওপর নজর রেখেছে টোরা আর হিগ।

হিমপাহাড় বেসের ওপরই এখন সেট করা আছে টেলিভিশন। ওয়ার্কিং টেবিলের সামনে আশফাক খান আর আবু তাহেরকে বসে থাকতে দেখল ইউসুফ। টেলিভিশনের প্রেরক যন্ত্রটা খুঁজতে লাগল সে। বেশিক্ষণ লাগল না, দেয়ালের গায়ের একটা গুপ্তকুঠুরি থেকে যন্ত্রটা বের করে নিল। ওটা টিভি সেটে লাগিয়ে অ্যাডজাস্ট করতেই দেখল, ক্যাপ্টেন এগিয়ে যাচ্ছে আশফাক খান আর আবু তাহেরের দিকে।

ডায়াল সেট করতেই কথা ভেসে এল টিভির স্পিকারে।

‘বোমা বসানো কদ্দুর?’ আশফাক খানের কথা শোনা গেল।

বোমা! অবাক হলো ইউসুফ।

‘মাত্র তো গ্রিভগুলো নিয়ে গেছে,’ আশফাক খানের কথার জবাব দিলেন আবু তাহের।

ছবি আর কথা প্রেরণ-গ্রহণ দুটোই করতে পারে কি না, টিভি গেজেটটা পরীক্ষা করতে লাগল ইউসুফ।

‘মিস্টার আশফাক খান!’ গেজেটের মাইক্রোফোনে মুখ লাগিয়ে বলল ইউসুফ, ‘মিস্টার আবু তাহের! আমার কথা শুনতে পাচ্ছেন?’

শুনল না ওরা।

‘কখন, কোন পজিশনে বিস্ফোরণ ঘটবে?’ জানতে চাইলেন আর্মি ক্যাপ্টেন।

আশফাক খানের দিকে তাকালেন আবু তাহের। তিনিও সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন।

‘ওয়ান সিক্স জিরো এইট আওয়ারে উনিশ নম্বর স্টেশনে ডেটোনেশন ঘটবে,’ জবাব দিলেন আবু তাহের। ‘বিস্ফোরণের দুই কি তিন সেকেন্ড পরেই ভূমিকম্প হবে হিমপাহাড়ের চূড়ার আশপাশে। রিখটার স্কেলে কম্পনের মাপ উঠবে সেভেন পয়েন্ট নাইন।’

‘সেভেন পয়েন্ট নাইন!’ ভুরু কুঁচকে গেছে ইউসুফের।

যেন তার কথার জবাবেই বলতে লাগলেন আবু তাহের, ‘প্রথমে যা ভেবেছিলাম, কম্পিউটারকে জিজ্ঞেস করে জেনেছি, ও জায়গায় বিস্ফোরণ ঘটানো উচিত হবে না এখন কিছুতেই। একটু আগের ভূকম্পনে মারাত্মকভাবে নড়তে শুরু করেছে রকপ্লেট। কাজেই পাহাড়ের একটু ধার ঘেঁষে কৃত্রিম পদ্ধতিতে বিস্ফোরণ ঘটাতে হবে এখন। এতে জোর ভূমিকম্প হবে বটে, কিন্তু জনবসতি পর্যন্ত পৌঁছাতে পৌঁছাতে কম্পনের শক্তি একেবারেই কমে যাবে। কারও কোনো ক্ষতি হবে না এতে। আর পাঁচ ঘণ্টা পরেই বিস্ফোরণ ঘটানো হবে।’

‘কী!’ চিৎকার করে উঠল ইউসুফ।

ইউসুফের চিৎকারেই যেন ভিটুর ঘুম ভেঙে গেল। টোরা যাওয়ার আগেই ওর যান্ত্রিক প্রসেসের কানেকশন কেটে দিয়ে গেছে। অস্বাভাবিক চিৎকার রোবটটার কানে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সচেতন হয়ে উঠেছে তার ইলেকট্রনিক ব্রেন। হুকুম দিতে শুরু করেছে যান্ত্রিক দেহকে। চোখ মেলেই কাত হয়ে ইউসুফের দিকে তাকাল ভিটু। তার দিকে পেছন ফিরে আছে ইউসুফ।

‘বুঝেছি,’ ক্যাপ্টেনের কথা শোনা গেল স্পিকারে। আবু তাহেরের কথার জবাব দিচ্ছেন। ‘এ জন্যই হিমপাহাড়ের পশ্চিম ধারে যাতে কেউ না যায়, দেখতে বলেছেন। কিন্তু ওখানে আর কে যাবে। কয়েকজন রাখাল গরু-ছাগল চরাচ্ছিল, সরিয়ে দিয়েছি। মাঝেমধ্যে শিকারিরা যায় ওদিকে, আজ যায়নি একজনও,’ আশফাক খানের দিকে তাকালেন তিনি। ‘কিন্তু মিস্টার খান, মিস্টার ইউসুফ তো ওদিকেই গেছেন। তার কী হবে?’

চট করে পরস্পরের দিকে তাকালেন আশফাক খান আর আবু তাহের।

আধসেকেন্ড চেয়ে থেকেই চোখ নামালেন আবু তাহের। টেবিলে রাখা একটা ডিজিটাল কাউন্টারের দিকে। রিডিং দেখলেন। তারপর রেডিও মাইক্রোফোনে কাকে আদেশ দিলেন, ‘নিউক্লিয়ার ডেটোনেশন বারো মিনিট মার্ক করে রাখো।’

দ্রুত পরিষ্কার হয়ে এল বিগফুটের ইলেকট্রনিক ব্রেন। পুরোপুরি কাজ করতে শুরু করেছে। কনুইয়ে ভর দিয়ে উঠে বসল ভিটু। ইউসুফ কী করছে, ভালোমতো দেখতে চায়।

তাকে লক্ষ করা হচ্ছে, টের পেল না ইউসুফ। গভীর মনোযোগে টিভির প্রেরক যন্ত্রটা পরীক্ষা করছে সে। মিনিটখানেক পরেই বুঝল, কয়েকটা বিশেষ যন্ত্রাংশ খুলে নেওয়া হয়েছে, লাগিয়ে নিলেই আবার কাজ করবে। আপাতত অকেজো। অগত্যা নিজের পায়ের চেম্বারে রাখা ভিএইচএফ ট্র্যানসিভারটা বের করে নিল। অ্যানটেনা তুলে সুইচ টিপল। কিন্তু কোনো সাড়া নেই। আরও বার দুই সুইচ টেপাটেপি করেই বুঝে গেল, কাজ করবে না। তার দেহের ভেতরের পাওয়ার সোর্স থেকে রেডিওটার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে। আবার জোড়া লাগাতে পারে সে, কিন্তু অত সময় হাতে নেই এখন। যন্ত্রটা আবার আগের জায়গায় রেখে দিয়ে দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে এল। ভিটুর দিকে তাকানোর কথা মাথায় এল না একবারও।

মিনিট তিনেকের চেষ্টায় কাউন্সিল চেম্বারটা খুঁজে পেল সে। সোজা ঢুকে পড়ল ভেতরে। টেবিল ঘিরে বসে কথা বলছে হিগ, রাটিনসহ কয়েকজন। টোরা অনুপস্থিত।

‘হিগ,’ ইউসুফ বলল, ‘বঙ্গোপসাগরের উপকূল বরাবর একটা মেজর আর্থকোয়েক ঘটতে যাচ্ছে আগামী কয়েক ঘণ্টার মধ্যে। এটাকে রোধ করতে চাইছে আমার সঙ্গীরা। একটা কৃত্রিম ভূমিকম্প ঘটাবে ওরা আগামী কয়েক ঘণ্টার মধ্যে। আর ঘটাবে পাহাড়ের এদিকটাতেই।’

‘জানি আমরা,’ বলল হিগ।

‘জানেন!’

‘হ্যাঁ।’

‘কিন্তু তাহলে যে ভয়ংকর বিপদ ঘটবে! আপনাদের এই আন্ডারগ্রাউন্ড কমপ্লেক্স পুরো ধ্বংস হয়ে যাবে।’

‘না,’ শান্ত কণ্ঠে বলল হিগ, ‘যাবে না। কৃত্রিম ভূমিকম্পটা ঘটতেই দেওয়া হবে না।’

‘মানে?’ ভুরু কোঁচকাল ইউসুফ।

‘ডেটোনেশন সাইটে চলে গেছে টোরা। ডেটোনেটরের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেবে সে।’

‘কিন্তু আপনি বুঝতে পারছেন না,’ প্রতিবাদ করল ইউসুফ। ‘কৃত্রিম ভূকম্পনের সাহায্যে প্রেশার না কমালে বঙ্গোপসাগরের উপকূল ধরে আসল ভয়ংকর ভূমিকম্প হয়ে যাবে।’

‘বললাম তো, জানি আমরা।’

‘এর ফলে বহু শহর, বহু জনপদ ধ্বংস হয়ে যাবে আমাদের! লাখ লাখ লোক মারা যাবে! কোটিও ছাড়িয়ে যেতে পারে।’

‘কিন্তু আমাদের কিছু করার নেই।’

‘নিশ্চয়ই আছে,’ চেঁচিয়ে উঠল ইউসুফ। ‘টোরাকে থামান।’

‘দুঃখিত,’ বলল হিগ, ‘সম্ভব নয়।’

‘সম্ভব নয়! কী বলছেন আপনি?’ কঠোর হয়ে উঠল ইউসুফের দৃষ্টি। ‘বুঝেছি। লাখ লাখ নিরপরাধ পৃথিবীবাসীর জীবনের কোনো দাম নেই আপনাদের কাছে। ওদেরকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে বিন্দুমাত্র প্রাণ কাঁপবে না আপনাদের। কোন ধরনের সভ্য জাতি আপনারা?’

‘স্যাক্রিফাইস শব্দটা আপনাদের অভিধানেই দেখেছি। বিজ্ঞানের উন্নতির জন্য, বিশেষ করে কোটি কোটি মানুষের উপকারের জন্য সাধারণ কয়েক লাখ অসভ্য মানুষের জীবন কিছুই না।’

রাগে জ্বলে উঠল ইউসুফ। চিৎকার না করে আর থাকতে পারল না। ‘দেখুন, এই পৃথিবীটা আমাদের। আপনারা এখানে অনধিকার প্রবেশ করেছেন। অনুপ্রবেশকারীদের কী করে ঘাড় ধরে বের করে দিতে হয়, ভালোমতোই জানা আছে আমাদের। আপনারা পৃথিবীতে বসে পৃথিবীর লোকদেরই চিড়িয়াখানার জীব বানাবেন, তা আর হতে দিচ্ছি না কিছুতেই।’

চরকির মতো ঘুরে দাঁড়াল ইউসুফ। দরজার দিকে ছুটল।

‘সাবধান,’ পেছন থেকে ডেকে বলল হিগ, ‘পালানোর চেষ্টা করলে ফল ভালো হবে না।’

‘বাধা দিয়েই দেখুন,’ বেরিয়ে গেল ইউসুফ। ছুটল করিডর ধরে। এঁকেবেঁকে, পাক খেয়ে এগিয়ে গেছে করিডর। অসংখ্য সাবকরিডর বেরিয়ে গেছে আবার এটা থেকে। ঠিক কোন দিকে এগোলে আইস টানেলটা পাওয়া যাবে, জানে না সে। অনুমানেই এগিয়ে চলেছে। প্রধান করিডর থেকে সরছে না। এখানে এসে অবধি কোনো ধরনের অস্ত্র চোখে পড়েনি তার। অস্ত্রের ব্যবহার প্রয়োজন মনে করে না নাকি এরা? হয়তো নিজেদের এতটাই ক্ষমতাশালী ভাবে, পৃথিবীবাসীর বিরুদ্ধে লাগার জন্য অস্ত্র রাখার প্রয়োজনই বোধ করে না। ভাবে, একটা গরিলার যান্ত্রিক সংস্করণ বানিয়ে ছেড়ে দিলেই মানুষকে কবজা করা যাবে অনায়াসে। নিজেদের সব অকাজ-কুকাজ করে যেতে পারবে নির্বিঘ্নে। যতই ভাবছে, রাগে পাগল হয়ে উঠছে ইউসুফ। হাঁটার গতি বেড়ে যাচ্ছে নিজের অজান্তেই।

শ খানেক ফুট কিংবা তারও বেশি এগিয়ে, পাথর খুঁড়ে বের করা সরু লম্বা অন্ধকারাচ্ছন্ন সুড়ঙ্গে এসে মিশেছে প্রধান করিডর। সুড়ঙ্গের শেষ মাথায় উজ্জ্বল আলো। ক্রিস্টালে তৈরি। ওখান থেকেই শুরু হয়েছে আইস টানেল। সুড়ঙ্গে নেমে এল ইউসুফ। বড়জোর তিন কদম এগিয়েছে, হঠাৎ প্রচণ্ড দমকা হাওয়া ছুঁয়ে গেল যেন তার শরীর। ভারী কিছু ছুটে গেল তার গা ঘেঁষে, অকল্পনীয় গতিতে। তারপরই তার সামনে যেন বাতাস ফুঁড়ে উদয় হলো হিগ, রাটিনসহ কয়েকজন। টিএলসির সাহায্যে এসেছে ওরা। ইউসুফের পথ রোধ করে দাঁড়াল।

‘প্লিজ, মিস্টার ইউসুফ,’ থামানোর জন্য হাত তুলল হিগ। ‘বেরোনোর চেষ্টা করবেন না। তাতে আপনার নিজের তো বটেই, আমাদের লোকেরাও ভালো থাকবে।’

‘শোনো,’ ভদ্রতা খসে পড়ল ইউসুফের কণ্ঠ থেকে। ‘তোমাদের সঙ্গে নোবল স্যাভেজ খেলায় বিরক্ত হয়ে গেছি আমি। পথ ছাড়ো, নইলে জোর করে বেরোব।’

‘মিস্টার ইউসুফ...’

‘বুঝেছি,’ দাঁতে দাঁত চাপল ইউসুফ, ‘ভায়োলেন্স স্টাডি করতে এসেছ। বেশ, তা-ই সই।’

ভয়ংকর বায়োনিক গতিতে সামনে ছুটে গেল ইউসুফ। সরে যাওয়ারও সময় পেল না হিগ আর রাটিন। ইউসুফের দুই কনুইয়ের ধাক্কায় উড়ে গিয়ে পড়ল পাথুরে দেয়ালের গায়ে। ব্যথায় চিৎকার করে উঠল দুজনেই। ময়দার বস্তার মতো ধপাস করে মাটিতে গড়িয়ে পড়ল। জ্ঞান হারাল সঙ্গে সঙ্গেই।

ফিরে দাঁড়াল ইউসুফ। অন্য লোকগুলো আক্রমণ করতে আসছে কি না, দেখল। তেমন কোনো ইচ্ছেই দেখা যাচ্ছে না ওদের মাঝে। চোখ বড় বড় করে হিগ-রাটিন, তারপর ইউসুফের দিকে তাকাচ্ছে।

‘কী বুঝলে?’ ভয়ংকর হাসি হাসল ইউসুফ। ভুরু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করল লোকগুলোকে, ‘কী, বাধা দেওয়ার শখ মিটেছে?’

কথা বলল না লোকগুলো। দ্বিধা করছে। আচমকা সুড়ঙ্গে এসে ঢুকল আরও দুজন, ইউসুফের সামনে এসে দাঁড়াল।

হিগ আর রাটিনের পড়ে থাকা দেহ দুটি দেখিয়ে জিজ্ঞেস করল, ইউসুফ, ‘ওদের মতো অবস্থা হোক, চাও না নিশ্চয়?’

‘কিন্তু আমাদের কর্তব্য তো আমাদের করতেই হবে,’ দুজনের একজন বলল। জোর নেই গলায়।

‘ভেরি গুড। এসো তাহলে,’ শার্টের হাতা গুটাচ্ছে ইউসুফ। ‘ঠ্যাঙানিটা কে আগে খেতে চাও?’

পিছিয়ে এল দুজনেই। দ্বিতীয়জন বলল, ‘ঠিক আছে, ঠিক আছে, মারপিটের দরকার কী। আমরা শুধু বোঝাতে এসেছি...’

ঘুষি মারতে গেল ইউসুফ। বিদ্যুৎ গতিতে ঘুরে ছুট দিল দুজনে। নিরাপদ দূরত্বে নিজের সঙ্গীদের কাছে গিয়ে থামল। ফিরে তাকাল ভয়ে ভয়ে।

হাসল ইউসুফ। ‘এই সাহস নিয়ে পৃথিবীর মানুষকে গিনিপিগ বানাতে আসো?’

দ্রুত ছুটে গিয়ে আইস টানেলে ঢুকল ইউসুফ। ৫০ ফুটমতো এগিয়ে থামল। বায়োনিক চোখ ব্যবহার করে পরীক্ষা করতে শুরু করল দেয়াল, সিলিং, মেঝে। তার ইনফ্রা-রেড পদ্ধতি সিগন্যাল দিচ্ছে, এখানে দুর্বল জায়গা আছে কোথাও। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই খুঁজে বের করল জায়গাটা। সিলিংয়ে। বায়োনিক হাতটা তুলে সিলিংয়ের ওই জায়গায় ঘুষি মারল সে। ঝনঝন শব্দে ক্রিস্টাল ভেঙে পড়ল। ঝুরঝুর করে ঝরল ক্রিস্টাল স্তরের ওপাশের আলগা ধুলা। এবারে আর ঘুষি নয়, সিলিংয়ে হাত ঠেকিয়ে ওপরের দিকে ঠেলা দিল সে। পাথরে পাথরে ঘষা খেয়ে চাপা, অদ্ভুত গোঙানি বেরোল যেন পাথরের বুক চিরে। আরও জোরে ঠেলা দিল ইউসুফ। গোঙানিও জোরালো হলো। কিন্তু পুরো সরছে না আলগা পাথরটা। হাত নামিয়ে নিল ইউসুফ। ইনফ্রা-রেডের সাহায্যে পরীক্ষা করে বুঝল, সিলিংয়ের এই অংশ নিরেট নয়। বেশ কয়েকটা আলগা পাথর গায়ে গা ঠেকিয়ে আটকে আছে শুধু। যেকোনো একটা পাথর সরে গেলেই হুড়মুড় করে নিচে পড়বে সব কটা। আবার হাত তুলে ঠেলতে শুরু করল ইউসুফ। তার বায়োনিক শক্তিকেও হার মানিয়ে দিচ্ছে ভারী পাথর। দাঁতে দাঁত চেপে, জোরে, আরও জোরে ঠেলতে লাগল সে। হঠাৎ ঘটল ঘটনাটা। আচমকা ওপর দিকে আধ হাত উঠে গেল পাথরটা। গায়ের ওপর থেকে চাপ সরে যেতেই ওটার পাশের অপেক্ষাকৃত ছোট পাথরটা ছুটে গিয়ে নিচে পড়ে গেল। মহাপ্রলয় শুরু হয়ে গেল যেন সঙ্গে সঙ্গে। প্রচণ্ড কানফাটা শব্দ করে আইস টানেলের মেঝেতে গড়িয়ে পড়তে লাগল আলগা পাথরগুলো। একেকটা দুই-তিন মণের কম হবে না। প্রথম পাথরটা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডাইভ দিয়েছে ইউসুফ। পাথরটা ডিঙিয়ে চলে এসেছে। তারপর এক বিরাট লাফে এগিয়ে গেছে আরও ফুট দশেক সামনে।

ঘুরে দাঁড়িয়ে পাথর পড়া দেখছে ইউসুফ। দ্রুত বুজে যাচ্ছে আইস টানেলের এক মাথা। ইউসুফ আর আন্ডারগ্রাউন্ড কমপ্লেক্সের মাঝে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই পাথরের দেয়াল সরিয়ে টানেল পরিষ্কার করতে প্রচুর সময় লাগবে হিগের টেকনিশিয়ানদের।

হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে কপালের ঘাম মুছল ইউসুফ, তারপর হাতটা প্যান্টের পেছনে মুছে ঘুরে দাঁড়াল। স্বাভাবিকভাবে হেঁটে চলল টানেলের শেষ প্রান্তের দিকে।

অপরূপ আলো ক্রিস্টালের। কিন্তু ইউসুফের এখন এসব দেখার সময় নেই। এগিয়ে চলেছে সে। হঠাৎ কমে আসতে লাগল আলো। আবার বাড়ল। বিচিত্র শব্দ শুরু হলো সেই সঙ্গে। থমকে দাঁড়াল ইউসুফ। ইলেকট্রোপিপের কথা ভুলেই গিয়েছিল সে।

মাথার ভেতরে ইতিমধ্যেই ঝিমঝিম শুরু হয়ে গেছে তার। চেতনা আচ্ছন্ন হওয়ার পূর্বলক্ষণ দেখা দিয়েছে। যা করার এক্ষুনি করতে হবে। এর আগের বার টানেলের ভেতরে ঠিক কতটা প্রবেশ করার পর ঘুমিয়ে পড়েছিল সে, মনে করার চেষ্টা করল। হ্যাঁ, মনে পড়েছে। টানেলের ঠিক মাঝামাঝি আসার পর পুরোটা কাজ করেছিল ইলেকট্রোপিপ।

টানেলের মাঝামাঝি পৌঁছাতে আর কতখানি বাকি, দেখে নিল ইউসুফ। খুব বেশি না, বড়জোর ফুট দশেক হবে। যদি বায়োনিক গতিবেগে ছুটে যায়, বিপদ ঘটার আগেই হয়তো বিপদসীমা পেরোনো সম্ভব। রওনা হতে যাবে, হঠাৎ খুলে গেল টানেলের ও–মাথার ধাতব দরজা। মেরামত করে ফেলা হয়েছে ওটা আগেই। ভেতরে এসে ঢুকল ভিটু। পেছনে দরজাটা আবার বন্ধ হয়ে যেতেই পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়াল রোবট-দানব। ইউসুফের দিকে চেয়ে ভয়ানক যান্ত্রিক গর্জন করল।

থমকে দাঁড়াল ইউসুফ। ‘ব্যাটা বেরোল কখন!’ বিড়বিড় করল সে।

ইউসুফ পরীক্ষাগার থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে টেবিল থেকে নেমে বেরিয়ে পড়েছে ভিটু। তার ইলেকট্রনিক ব্রেনে প্রথম চিন্তাটা আসে, ইউসুফ পালাচ্ছে। অতএব তাকে ধরো। সোজা আইস টানেল ধরে বাইরে বেরিয়ে যায় রোবটটা। আশপাশে কোথাও ইউসুফকে না পেয়ে আবার এসে ঢুকেছে এখানে।

পেছনে শব্দ হতেই ফিরে তাকাল ইউসুফ। পাথরের দেয়ালের ওপাশ থেকে আসছে আওয়াজ। পাথর সরানোর কাজ শুরু করে দিয়েছে টেকনিশিয়ানরা। ভিটু ও টানেলের ইলেকট্রোপিপ, দুটিকে একসঙ্গে সামলানো সম্ভব নয় ইউসুফের পক্ষে। কী করে ভিটুকে ফাঁকি দেওয়া যায়, ভাবছে সে। সেই সঙ্গে পিছিয়ে এল কয়েক পা। আশ্চর্য! কমে যাচ্ছে ইলেকট্রোপিপের ক্রিয়া। তার মানে টানেলের দুই প্রান্ত যান্ত্রিক ঘুম থেকে নিরাপদ।

‘এই যে খোকা,’ চেঁচিয়ে বলল ইউসুফ, ‘এবারে কোন অঙ্গটা খসাতে চাও বলো তো? পা? ভালোই হবে। খুঁড়িয়ে হাঁটা প্র্যাকটিস করতে পারবে তাহলে।’

গর্জন করে উঠল আবার ভিটু। কয়েকটা হর্ন ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে ওর ভেতরে। ইচ্ছেমতো যেটা খুশি ব্যবহার করে সে। সাধারণ মানুষকে ভয় দেখানোর জন্য যথেষ্ট।

ইউসুফের ইচ্ছা, রোবটটা আগে আক্রমণ করুক তাকে। সে জন্য তাকে খেপিয়ে তুলতে হবে। মাথার ওপর দুই হাত তুলে বিচিত্র ভঙ্গিতে নাচল একবার ইউসুফ। তারপর বুক চাপড়াল। বনের ভেতরে তাকে আক্রমণ করার আগে এভাবেই নেচেছে ভিটু। বার দুই গরিলার মতো বুক চাপড়ে ভিটুর অনুকরণে চাপা গর্জন করে উঠল ইউসুফ।

গোঁ গোঁ করে উঠল ভিটু। রেগে কাঁই হয়ে গেছে। কিন্তু দরজার কাছ থেকে নড়ল না।

আসছে না কেন? বিড়বিড় করে নিজেকেই প্রশ্ন করল ইউসুফ। অন্যভাবে চেষ্টা করা দরকার।

আরেক পা পিছিয়ে এসে মাটিতে বসে পড়ল ইউসুফ। অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল ভিটু। রোবটটা আক্রমণ কিংবা ভয় পাওয়ার আশা করেছিল। কিন্তু এ রকম অদ্ভুত ব্যবহার দেখে ঠিক কী করতে হবে, বুঝতে পারল না। রোবটটার ব্রেন তেমন উন্নত নয়। কাজেই বুদ্ধির জোরেই পরাস্ত করতে হবে ওটাকে এখন, বুঝতে পারছে ইউসুফ।

পুরো এক মিনিট দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে রইল। বসেই আছে ইউসুফ। বসে বসেই বিচিত্র অঙ্গভঙ্গি করছে। শেষ পর্যন্ত এই আজব ব্যবহার আর সহ্য হলো না রোবট-গরিলার। পায়ে-পায়ে এগিয়ে আসতে শুরু করল সে। রোবটটার ২০ ফুট দূরে থাকতেই হঠাৎ লাফিয়ে উঠল ইউসুফ। চোখেমুখে প্রচণ্ড ভয়ের চিহ্ন ফুটিয়ে তুলে পেছাতে থাকল দ্রুত। সঙ্গে সঙ্গে ভয়ংকর গর্জন করে উঠল ভিটু। ছুটে এল তীব্র গতিতে।

ভিটু একেবারে গায়ের ওপর এসে পড়তেই থমকে দাঁড়াল ইউসুফ। থাবা মেরে রোবটের দুই কবজি চেপে ধরল। বিদ্যুৎ গতিতে চিত হয়ে শুয়ে পড়ল মেঝেতে। প্রচণ্ড ঝটকা খেয়ে ইউসুফের ওপরই পড়ে গেল ভিটু। দুই পা গুটিয়ে ওটার পেটের তলায় নিয়ে এল ইউসুফ। বিন্দুমাত্র দেরি না করে পা দিয়ে প্রচণ্ড জোরে ঠেলে দিল ওপর দিকে। সেই সঙ্গে দুই কবজি ধরা হাতে টান মারল সামনে। মাথার ওপর দিয়ে উড়ে গেল রোবটটা। গিয়ে পড়ল পাথরের দেয়ালের ওপর।

পাথরে ভয়ানকভাবে মাথা ঠুকে গেছে ওটার। যান্ত্রিক গোঙানি বেরিয়ে এল ওর মুখ থেকে, তারপরই স্থির হয়ে গেল। ইলেকট্রনিক ব্রেনে চোট পেয়েছে।

উঠে দাঁড়াল ইউসুফ। ভিটুর দিকে একবার তাকাল। রোবটটাকে সামলানো গেছে। এবারে ইলেকট্রোপিপকে ফাঁকি দিতে পারলেই বেরিয়ে যেতে পারবে সে এই যান্ত্রিক মায়াপুরী থেকে।

ধীরে ধীরে সামনের দিকে এগিয়ে চলল ইউসুফ। ঘুম ঘুম ভাবটা অনুভব করে থমকে দাঁড়াল। তৈরি হয়ে নিয়েই ছুটল। ঘণ্টায় ৪০ মাইল গতিবেগ। টানেলের মাঝামাঝি আসতেই প্রচণ্ডভাবে আঘাত হানল ইলেকট্রোপিপে। সঙ্গে সঙ্গে লাফ দিল ইউসুফ। প্রায় উড়াল দিয়ে এসে নামল ধাতব দরজার সামনে। ঘুম এবার পরাস্ত হলো তার কাছে। দুই সেকেন্ড স্থির দাঁড়িয়ে একটু জিরিয়ে নিয়ে দরজা লক্ষ্য করে লাফ দিল আবার। আগের বারের মতোই গোটা দুই ফ্লাইং কিক ঝেড়ে দরজাটা ভেঙে ফেলল সে। বাইরে এসে পড়ল।

মাটিতে পড়ে গিয়েছিল, লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে গুহামুখের দিকে ছুটল সে। এক ছুটে বেরিয়ে এল বাইরে। সঙ্গে সঙ্গে গায়ে আঘাত হানল যেন তীব্র সূর্যালোক। কিন্তু ভালোই লাগল ইউসুফের। তাজা পাহাড়ি বাতাস টানল বুক ভরে। জুড়িয়ে গেল শরীর-মন।

দেরি করল না ইউসুফ। টোরাকে খুঁজে বের করতে হবে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। ছুটল সে।

(চলবে...)