নিজের মিশনের কথা ভাবলেন আশফাক খান। বেশ কিছুদিন ধরে রহস্যজনকভাবে স্থানীয় লোক গায়েব হয়ে যাচ্ছিল হিমপাহাড়ের আশপাশের অঞ্চল থেকে। গায়েব হচ্ছিল ভ্রমণকারী, শিকারি। মাঝেমধ্যে দু–একজন বদ্ধ উন্মাদ অবস্থায় ফিরে এসেছে। অধিকাংশই আসেনি। শেষ পর্যন্ত যখন কয়েকজন নামকরা বিজ্ঞানী এই অঞ্চলে ভৌগোলিক কারণ অনুসন্ধান করতে এসে হারিয়ে গেলেন, তখন আর চুপ করে থাকতে পারল না সরকার। আশফাক খানের ওপর নির্দেশ এল, জলদি অনুসন্ধান করে এর কারণ বের করা হোক। প্রথমেই ইউসুফের কথা মনে পড়ল তার। ইনভেস্টিগেটর হিসেবে তাকে সঙ্গে দেওয়ার অনুরোধ জানালেন প্রতিষ্ঠানের কাছে।

প্রথমে রাজি হতে চাননি আসজাদুল কিবরিয়া। এত সাংঘাতিক দামি একজন অপারেটরের জন্য মিশনটা ততখানি গুরুত্বপূর্ণ মনে হলো না তার কাছে। কিন্তু আশফাক খান বুঝিয়েছেন, শুধু লোক গায়েব হওয়াই নয়, একটা আজব কিংবদন্তিও আছে এই এলাকায়। মাঝেমধ্যেই নাকি দানবীয় এক গরিলাকে দেখা যায় এখানে। বিজ্ঞানীরা তার পায়ের ছাপও আবিষ্কার করেছেন। প্রথমত, গরিলা বাংলাদেশের প্রাণী নয়। ভারত কিংবা মিয়ানমারেও নেই এই প্রাণী। তার ওপর যেটার ছাপ পাওয়া গেছে, সেটা এতই বড় যে আফ্রিকাতেও এত বড় গরিলার কথা শোনা যায়নি। রহস্য আরও আছে। হিমপাহাড়ের ওপরের আকাশে নাকি রহস্যময় একটা উড়ুক্কু যান ঘোরাফেরা করতে দেখে মাঝেমধ্যে এলাকার মানুষ। উজ্জ্বল আলো বিচ্ছুরিত হয় ওটা থেকে। এতগুলো অদ্ভুত রহস্য ভেদ করতে হলে ইউসুফের মতো অতিমানবই দরকার। অনেক বুঝিয়ে শুনিয়ে ডক্টর কিবরিয়ার কাছ থেকে ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ের অতিমানবকে চেয়ে নিয়েছেন আশফাক খান। বুঝতে পারছেন, ইউসুফকে হারিয়ে ফিরে গেলে জবাব দেওয়ার কিছুই থাকবে না তার। কিবরিয়া সাহেবের সামনে গিয়েও দাঁড়াতে পারবেন না।

আবু তাহেরের কথায় চমক ভাঙল আশফাক খানের। কিন্তু তাকে কিছু বলছেন না আবু তাহের, রেডিও মাইক্রোফোনে আদেশ দিচ্ছেন, ‘মার্ক ঠিক রাখো। আর ২ মিনিট ৩০ সেকেন্ড।’

সুইচ অফ করে আশফাক খানের দিকে তাকালেন আবু তাহের। কী বলবেন বুঝতে পারলেন না। তবু আস্তে করে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কফি খাবেন?’

মাথা নাড়লেন আশফাক খান। আবু তাহেরের দিকে তাকাবারও প্রয়োজন বোধ করলেন না।

‘খুব ভালো কফি আছে,’ আবার বললেন আবু তাহের। আসলে আশফাক খানের এই নীরবতা পীড়া দিচ্ছে তাকে।

‘না, খাব না!’ কণ্ঠস্বর স্বাভাবিক রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন আশফাক খান।

‘আমার খারাপ লাগছে, মিস্টার খান।’

‘তা তো লাগবেই। কিন্তু কী আর করা।’

‘আমার কী মনে হয়, ওই এলাকায় নেই ইউসুফ,’ আবু তাহের বললেন। ‘থাকলে তাকে পাওয়া যেতই, যেভাবে গরুখোঁজা হয়েছে। মাত্র তিন-চার মাইলের মধ্যে শতাধিক লোক গিয়ে খুঁজেছে। কোনো চিহ্নই পায়নি তারা। তার মানে, ওই এলাকায় নেই সে। দৈত্য গরিলার পিছু নিয়ে অন্য কোথাও চলে গেছে হয়তো।’

‘আমাদের জানিয়ে যেতে পারত,’ বললেন আশফাক খান। ‘তার কাছে রেডিও তো আছেই।’

‘কই, না তো!’

আশফাক খানের মনে পড়ল, ইউসুফের ঊরুর গুপ্তকুঠুরিতে রেডিও আছে। আবু তাহের সেটা জানেন না। জানানোর প্রয়োজনও মনে করলেন না তিনি। জানালেই আরও হাজারটা প্রশ্নের জবাব দিতে হবে। কথা বলতে একটুও ভালো লাগছে না এখন তার।

টাইমওয়াচের দিকে তাকালেন আবু তাহের। আবার রেডিওর সুইচ অন করে মাইক্রোফোন তুলে নিলেন। একবার কাশি দিয়ে গলা পরিষ্কার করে নিয়ে বলল, ‘আর দুই মিনিট।’

কোথায় ডেটোনেশন ঘটানো হবে, আবু তাহেরের মুখে শুনেছে ইউসুফ। জাফররা যেখানে শেষ সেন্সর বসিয়েছিল, জায়গাটা তার কাছাকাছিই হবে। অবিশ্বাস্য গতিতে ছুটছে সে। গতিবেগ ষাটের কাছাকাছি।

পেছন থেকে আক্রান্ত হওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই। নিজেদের আস্তানাতেই সাহস করেনি ভিনগ্রহবাসীরা, বাইরে বেরিয়ে ইউসুফের সঙ্গে লাগার দুঃসাহস ওদের হবে না। ভিটুকেও আহত করে ফেলে এসেছে। অতএব তারও আসার সম্ভাবনা নেই।

বিস্ফোরণ এলাকার কাছাকাছি একটা ছোট পাহাড়ের চূড়ায় এসে দাঁড়াল ইউসুফ। সামনে খোলা উপত্যকার দিকে তাকাল। কয়েকটা আজব যন্ত্রপাতি চোখে পড়ছে। দেখে মনে হচ্ছে বোমা ফাটানো নয়, তেল উত্তোলনের কাজ চলছে ওখানে। মোটাসোটা পাইপের একটি মাথা মাটির তিন ফুট ওপরে বেরিয়ে আছে। মাথায় বসানো একটি বাক্স। তাতে রয়েছে কন্ট্রোল ইকুইপমেন্ট। হিমপাহাড় বেস থেকে রেডিও সিগন্যাল পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কাজ শুরু করবে বাক্সের ভেতরে বসানো কম্পিউটার। বিস্ফোরণ ঘটাবে।

টোরার খোঁজে এদিক–ওদিক তাকাল ইউসুফ। উপত্যকার কোথাও নেই। ইনফ্রা-রেড চালু করল সে। সামনের দিকে অর্ধবৃত্তাকারে একবার দৃষ্টি ঘুরিয়ে আনল। দেখে ফেলেছে সে টোরাকে। অর্ধবৃত্তের এক মাথায় একটি পাহাড়ের চূড়ায় ছোট কয়েকটা গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে আছে টোরা। বিস্ফোরণ এলাকার দিকে দৃষ্টি । বিন্দুমাত্র দেরি না করে রওনা দিল ইউসুফ। যত দ্রুত সম্ভব পাইপটার কাছে পৌঁছাতে হবে।

পাইপটা টোরাও দেখেছে। কিন্তু তার বায়োনিক চোখ নেই, তাই ইউসুফকে দেখতে পেল না। রিস্টওয়াচ দেখল। বিস্ফোরণ ঘটতে মাত্র আর ১ মিনিট ১৫ সেকেন্ড বাকি। আর দেরি করা যায় না। এমনিতেই বিস্ফোরণ এলাকা খুঁজে বের করতে অনেক সময় গেছে। টিএলসি ব্যবহার করে চোখের পলকে পাইপটার কাছে এসে দাঁড়াল সে। এগিয়ে গিয়ে এক পাশের অ্যাকসেস প্যানেল টান মেরে খুলল। ধাতব বাক্সের ভেতর অসংখ্য জট পাকানো তার। দুটি বিশেষ তার দৃষ্টি আকর্ষণ করল। ও দুটির ওপর আলতো করে হাত ছোঁয়াল সে। অত্যন্ত সতর্ক। একটু এদিক–ওদিক হলে রক্ষা নেই। দরদর করে ঘামছে। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম রোদের আলোয় মুক্তাবিন্দুর মতো চকচক করছে। ঝুঁকে বাক্সের ভেতরে আরও ভালোমতো তাকাল সে। কিন্তু আসল জিনিসটা খুঁজে পাচ্ছে না। সময়ও দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। বাক্সের অন্য পাশে চলে এল। আরেকটা একসেস প্যানেলের ডালা খুলল। ঠিক এই সময় পেছনে শুকনা ডাল ভাঙার আওয়াজ শুনল টোরা। সঙ্গে সঙ্গে স্থির হয়ে গেল সে। আস্তে করে ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল। স্তব্ধ হয়ে গেল তাকিয়েই।

প্রচণ্ড বায়োনিক গতিতে সোজা তার দিকে ধেয়ে আসছে ইউসুফ। ভয়ংকর হয়ে উঠেছে চেহারা। আতঙ্কে শিউরে উঠল টোরা। যত শক্তিশালীই হোক, পরীক্ষাগারে টেবিলে শুইয়ে বায়োনিক ম্যানকে পরীক্ষা করা এক কথা আর খোলা জায়গায় ওই দানবীয় ক্ষমতার মুখোমুখি দাঁড়ানো সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যাপার। এক লাফে কন্ট্রোল বক্সের কাছ থেকে সরে এল টোরা।

টোরার ছয় ফুট দূরে এসে দাঁড়াল ইউসুফ।

‘প্লিজ, প্লিজ ইউসুফ, আমাকে ছুঁয়ো না!’ অনুরোধের ভঙ্গিতে একটা হাত তুলল টোরা।

‘কিন্তু তোমাকে ডেটোনেশন বন্ধ করতে দেব না আমি কিছুতেই।’

‘বন্ধ আমাকে করতেই হবে,’ হিস্টিরিয়াগ্রস্তের মতো দেখাচ্ছে টোরাকে।

‘না,’ কঠিন হয়ে উঠেছে ইউসুফের গলা। আচমকা ডাইভ দিল সে। চকিতে ডান হাতটা ঊরুর কাছে চলে এল টোরার। ঊরুতে আটকানো টিএলসির সুইচ টিপে দিল। চোখের পলকে ‘নেই’ হয়ে গেল সে। একেবারে গায়েব। মুহূর্ত পরে কন্ট্রোল বক্সের আরও কাছাকাছি আবার দেখা গেল তাকে।

লক্ষ্যবস্তু হারিয়ে দড়াম করে মাটিতে আছড়ে পড়ল ইউসুফ। এমনিতেই একজন নারীকে আক্রমণ করতে ভীষণ খারাপ লাগছে তার। তবু উঠে দাঁড়িয়ে পাইপের কাছে দাঁড়ানো টোরার দিকে তাকাল সে। দুচোখ জ্বলছে রাগে।

‘প্লিজ, ইউসুফ।’

‘না!’ ধমকে উঠল ইউসুফ।

‘দোহাই তোমার, ইউসুফ, আমার মানুষদের রক্ষা করতেই হবে।’

‘আমার মানুষদের কী হবে?’

‘দুঃখিত, ইউসুফ,’ মাথা নিচু করল টোরা।

‘চমৎকার!’ খসখসে ইউসুফের গলা। ‘চমৎকার কথা বলেছ। তোমাদের মুষ্টিমেয় কয়েকজন হারামি লোককে বাঁচানোর জন্য আমাদের লাখ লাখ নিরপরাধ লোক মারা যাবে! সত্যিই চমৎকার বিচার তোমাদের!’

‘আমি সত্যিই দুঃখিত,’ বলল টোরা। মাথা নিচু করে আছে। ইউসুফের চোখের দিকে তাকানোর সাহস হচ্ছে না তার।

‘হাসি পাচ্ছে আমার শুনে,’ আচমকা লাফ দিল ইউসুফ। উড়াল দিয়ে এসে পড়ল টোরার ওপর। মাথা নিচু করে থাকায় সময়মতো হুঁশিয়ার হতে পারল না টোরা। ওর হাত টিএলসির সুইচ স্পর্শ করার আগেই কবজিতে প্রচণ্ড চাপ অনুভব করল।

টোরার হাতটা বাঁকিয়ে পিঠের ওপর নিয়ে গেল ইউসুফ। ধাক্কা মেরে কয়েক পা পেছনে সরিয়ে আনল তাকে। বাঁ হাতে ঊরুতে বাঁধা টিএলসির সুইচের নাগাল পাবে না টোরা। তাড়া খেয়ে আটকা পড়া বিড়ালের মতো ফোঁস করে উঠল সে। ‘ছাড়ো, ছেড়ে দাও আমাকে,’ চেঁচিয়ে উঠল সে।

কানও দিল না ইউসুফ। ডান হাতে থাবা মেরে টোরার ঊরুর টিএলসির বাঁধন ছিঁড়ে নিয়ে এল। মুখে পুরে দিল ছোট্ট যন্ত্রটা। এটাই সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা মনে হলো তার।

টোরাকে তুলে নিজের কাঁধের ওপর ময়দার বস্তার মতো ঝুলিয়ে নিল ইউসুফ। ছুটতে শুরু করল। বিপৎসীমা থেকে যত দ্রুত সম্ভব সরে যেতে হবে। সমানে চেঁচিয়ে চলেছে টোরা, অনুরোধ-উপরোধ করছে। কিন্তু কানই দিল না ইউসুফ।

বিপৎসীমা ছাড়িয়ে একটু উঁচু জায়গায় এসে পৌঁছাতেই গুরুগম্ভীর শব্দটা কানে এল ইউসুফের। চাপা মেঘগর্জন শোনা যাচ্ছে টানা। কয়েক সেকেন্ড পরেই ইউসুফের পায়ের নিচে মাটি আচমকা ফুলে উঠল। টাল সামলাতে না পেরে চিত হয়ে পড়ে গেল ইউসুফ। তার ওপর পড়ল টোরা।

‘না না!’ পাগলের মতো মাথা ঝাঁকাচ্ছে টোরা। চিৎকার করছে। ‘সব শেষ। সবাই শেষ হয়ে গেছে ওরা!’

মাটি কাঁপছে। পাউরুটির পিঠের মতো ফুলে উঠছে ওপর দিকে। ইউসুফ আর টোরার মাথার ওপরে পাতার ঝড় উঠেছে। প্রচণ্ড কাঁপুনিতে শুকনা, আধ শুকনা সব পাতা খসে গেছে গাছ থেকে। তীব্র হাওয়ায় উড়ছে। আরও ওপরে দিগ্‌বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে উড়ছে পাখির ঝাঁক। আতঙ্কিত গলায় সমানে চেঁচিয়ে চলেছে ওরা।

উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে ইউসুফ, কিন্তু পারছে না। মাটির প্রচণ্ড কাঁপুনিতে পড়ে যাচ্ছে বারবার। মুখের ভেতর খোঁচা দিচ্ছে টিএলসির তীক্ষ্ণ কোনাগুলো। অগত্যা ওটা মুখ থেকে বের করে প্যান্টের পকেটে ভরল সে। তারপর উবু হয়ে বসে কাঁধে তুলে নিল আবার টোরাকে। ছুটতে শুরু করল। দাঁড়াবার চেষ্টা করছে না। তাহলেই আবার মাটিতে আছড়ে পড়বে।

সমানে কাঁদছে টোরা। ধরেই নিয়েছে, ওর সঙ্গী-সাথিরা কেউ বেঁচে নেই।

আরও কয়েক সেকেন্ড পরে হঠাৎ থেমে গেল মাটির কাঁপুনি। থামল ইউসুফ। কাঁধ থেকে টোরাকে নামাল। ‘ভূমিকম্প শেষ,’ বলল সে।

কিন্তু তার মুখের কথা শেষ হবার আগেই বুঝল ভুল বলেছে। আসলে ভূমিকম্প নয়, বিস্ফোরণ শেষ হয়েছে। এখন আসবে ভূমিকম্প।

আস্তে আস্তে এল কাঁপুনিটা, দ্বিতীয়বার। দ্রুত এগিয়ে আসছে তীব্র, চাপা মেঘগর্জন। এক ধাক্কায় টোরাকে মাটিতে ফেলে দিল ইউসুফ, নিজেও উবু হয়ে শুয়ে পড়ল তার পাশেই। পড়ে থাকা পাতার পুরু গালিচায় মুখ ঢাকল।

আশফাক খান ছাড়া হিমপাহাড় বেসের অন্য সবাই মাটিতে শুয়ে পড়েছে। তিনি মেটাল ফোল্ডিং চেয়ারটা থেকে নেমে মাটিতে বসেছেন। দুই হাতে চেপে ধরে রেখেছেন দুই কান। মাটির সঙ্গে সঙ্গে থরথর করে কাঁপছেন তিনিও।

‘আল্লাহ্ তোমার সহায় হোন, ইউসুফ!’ বিড়বিড় করে প্রার্থনা করলেন আশফাক খান। দুচোখ বেয়ে পানি গড়াচ্ছে। ছেলেবেলার পর কত দিন আর এভাবে শিশুর মতো কাঁদেননি, ভুলেই গিয়েছিলেন তিনি।

চৌদ্দ

বনসীমার দিকে এগিয়ে চলেছে ইউসুফ। কাঁধে টোরা। পায়ের নিচে এখনো মাটি কাঁপছে, কিন্তু কম। বনের কাছে পৌঁছে ঘুরে দাঁড়াল সে। ইনফ্রা-রেড স্ক্যানার ব্যবহার করে দেখল, বিস্ফোরিত এলাকার কেন্দ্রে শ খানেক গজ বৃত্তাকার জায়গায় মাটি লালচে দেখাচ্ছে। কালো ধোঁয়া উড়ছে আকাশে। ওই অংশে যত গাছপালা-ঘাস ছিল, পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। জায়গাটার আশপাশে গাছপালা তেমন নেই, নইলে দাবানল শুরু হয়ে যেত এতক্ষণে।

কাঁধ থেকে টোরাকে নামিয়ে দিল ইউসুফ। তাকে জড়িয়ে ধরে রেখে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে মেয়েটা। পুরো নির্ভরশীল এখন তার ওপর। বিস্ফোরণের পরের বিপদ এখনো শেষ হয়নি, জানে ইউসুফ। ইনফ্রা-রেড চালু করে ঘুরে ঘুরে দিগন্তের দিকে তাকাতে লাগল সে। হিমপাহাড়ের পশ্চিম ধারের ঢালের দিকে তাকাতেই ব্যাপারটা চোখে পড়ল তার।

ছোট একটা চূড়া ফেটে চৌচির হয়ে গেছে। বড় বড় পাথর গড়িয়ে নামছে, এগিয়ে আসছে এদিকেই। আচমকা খসে পড়ল চূড়াটা। হিমবাহের মতো যেন পাথরবাহ ছুটে আসছে পাথরের স্তূপ নিয়ে। হ্যাঁচকা টানে টোরাকে আবার কাঁধে তুলে নিল ইউসুফ। দ্রুত ঢুকে গেল বনের ভেতরে। কিছুক্ষণের মধ্যেই তার পেছনে ভয়ংকর গতিতে গাছপালার ওপর এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল পাথরের স্তূপ। বিরাট বিরাট গাছগুলোকে পাটখড়ির মতো ভাঙতে ভাঙতে এগিয়ে আসছে ক্রমশ।

বনের ভেতরে গাছপালার জন্য খুব একটা দ্রুত ছুটতে পারছে না ইউসুফ। তার ওপর কাঁধে বোঝা। পেছনে ক্রমেই এগিয়ে আসছে পাথর। প্রায় তিন মণ ওজনের একটা পাথর হঠাৎ এসে বাড়ি খেল তার পায়ে। হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল ইউসুফ। তার আশপাশ দিয়ে ছিটকে বেরিয়ে যাচ্ছে বড় বড় পাথর।

প্রাণপণে ছুটল ইউসুফ। যে করেই হোক, এই পাথরবাহের কবল থেকে বেরোতেই হবে।

ভূমিকম্পের প্রচণ্ডতা সবচেয়ে বেশি অনুভব করল ভূগর্ভ আস্তানার ভিনগ্রহবাসীরা। চারদিকে বিশৃঙ্খলা। জায়গায় জায়গায় ক্রিস্টালের দেয়াল-সিলিং ভেঙে পড়েছে। মেঝেতে গড়াগড়ি খাচ্ছে যন্ত্রপাতি। কোনো কোনো ঘরের সিলিং ভেঙে নিচে পড়েছে বিশাল পাথর। যন্ত্রপাতি, আসবাব আর অন্য জিনিসপত্র ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে।

মেইন করিডরে দাঁড়িয়ে আছে ভিটু। প্রচণ্ড ঝাঁকুনিতে তার ইলেকট্রনিক ব্রেন কয়েক সেকেন্ডের জন্য অকর্মণ্য হয়ে পড়েছিল, তারপর আবার ঠিক হয়ে গেছে আপনা–আপনি। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পাথর পড়া দেখছে সে। পায়ের ওপরও এসে পড়ছে এক–আধটা। কিন্তু কোনো ক্ষতি করতে পারছে না ওর কৃত্রিম দেহের।

ভিটুর কাছাকাছি দাঁড়িয়ে আছে একজন পুরুষ আর একজন নারী। আতঙ্কে, বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে গেছে দুজনেই।

কাউন্সিল চেম্বারে ভয়ংকর কম্পনের মধ্যে নিজেদের সামলানোর চেষ্টা করছে হিগ আর রাটিন। ওদিকে মিটমিট শুরু করেছে ক্রিস্টাল আলো। ওগুলোর শক্তির উৎস নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ দপ করে নিভে গেল সব কৃত্রিম ক্রিস্টাল। আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল রাটিন।

হামাগুড়ি দিয়ে একপাশের দেয়ালের কাছে চলে এল হিগ। সমানে কাঁপছে মাটি। দেয়ালের সঙ্গে কাঁধ ঠেকিয়ে বসল সে। অন্ধকারে দেখতে পেল না তার মাথার ওপরে পাথরের দেয়ালে ফাটল ধরেছে। আধসেকেন্ডের মধ্যেই বড় হলো ফাটলটা, ধসে পড়ল বিকট শব্দে। নিজেকে বাঁচাতে কিছুই করতে পারল না হিগ। শেষ মুহূর্তে পাথরটা ঠেকাতে একটা হাত তুলেছিল, কিন্তু দেশলাইয়ের কাঠির মতো ভেঙে গেল হাতটা। ব্যথায় আর্তনাদ করে উঠল সে। পরমুহূর্তে চাপা পড়ল পাথরের তলায়।

পাথুরে গুহাটার ভেতরে গুটিয়ে বসে আছে ইউসুফ আর টোরা। মাথার ওপরে বাইরের দিকে বেরিয়ে আছে একটা বিরাট চ্যাপ্টা পাথর। এটার জন্য পাথরবাহের আঘাত থেকে বেঁচে গেছে ওরা।

ধীরে ধীরে কমে এল আওয়াজ। পাথরে পাথরে ঠোকাঠুকির শব্দ কমতে কমতে একেবারে থেমে গেল। টোরাকে বসে থাকতে বলে বেরিয়ে এল ইউসুফ। পায়ের তলায় শুধু পাথরের কুচি। ধুলার মেঘে ছেয়ে আছে এখনো চারদিক। টোরাকে গুহা থেকে বেরিয়ে আসতে ডাকল সে।

কিন্তু টোরা বেরোল না। উঁকি দিল ইউসুফ। গোঁজ হয়ে একটা পাথরের ওপর বসে আছে মেয়েটা। ভেতরে নেমে তার হাত ধরতে গেল ইউসুফ। ঝটকা মেরে হাতটা সরিয়ে নিল টোরা, ‘খবরদার, ছোঁবে না আমাকে!’

‘টোরা! তোমাকে সাহায্য করতে চাই আমি।’

‘কী সাহায্য করবে?’ কঠোর দৃষ্টিতে ইউসুফের দিকে তাকাল টোরা, ‘যা হওয়ার তো হয়েই গেছে। কেউ কি আর বেঁচে আছে ওরা!’

‘সবাই মারা না-ও যেতে পারে,’ বলল ইউসুফ।

টোরার চোখে দ্বিধা।

‘হ্যাঁ, টোরা,’ বলল আবার ইউসুফ, ‘কেউ কেউ হয়তো বেঁচে আছে এখনো। তাহলে ওদের সাহায্য দরকার নিশ্চয়,’ হাত বাড়াল সে। ‘চলো। যাই।’

‘ওদের থেঁতলানো লাশগুলো দেখতে পারব না আমি,’ দুহাতে মুখ ঢাকল টোরা।

‘তাহলে ওদের সাহায্য করতে চাও না তুমি?’

ইউসুফের চোখে চোখে তাকাল টোরা। সিদ্ধান্ত নিল। তারপর বাড়ানো হাতটা ধরে উঠে দাঁড়াল। মেয়েটাকে সোজা হয়ে দাঁড়াতে সাহায্য করল ইউসুফ। হাত দিয়ে ধুলা ঝাড়ল টোরার জামাকাপড় থেকে। প্যান্টের পকেট থেকে টিএলসিটা বের করে বাড়িয়ে ধরল, ‘এটা ব্যবহার করবে তুমি।’

হাত বাড়িয়ে যন্ত্রটা নিল টোরা।

‘চলো,’ ইউসুফ বলল।

ছুটতে শুরু করল ইউসুফ। টিএলসি পো মুভমেন্টে অ্যাডজাস্ট করে তার সঙ্গে একই গতিবেগে ছুটল টোরা। তারপরও গুহামুখের কাছে ইউসুফের আগে এসে পৌঁছাল সে। অপেক্ষা করতে লাগল। এখন আর ওই গুহায় একা প্রবেশ করতে সাহস পাচ্ছে না সে।

ইউসুফের হাত ধরে গুহায় ঢুকল টোরা। পুরু ধুলা জমে আছে গুহার মেঝেতে। আইস টানেলের প্রবেশমুখে এসে দাঁড়াল দুজনে। অবাক হয়ে ভাঙা ধাতব দরজাটার দিকে তাকাল টোরা। ইউসুফের দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘নিশ্চয়ই তোমার কাজ?’

‘দরজা ভাঙাটা আমার স্পেশালিটি,’ হালকা গলায় বলল ইউসুফ। ‘বিশেষ করে বায়োনিক হবার পর থেকে।’

লাথি মেরে সামনে থেকে কয়েকটা পাথর সরিয়ে টোরার হাত ধরে ভেতরে ঢুকল ইউসুফ। অন্ধকার টানেল। ঝিরঝিরে মৃদু আওয়াজ করে কী যেন ঝরে পড়ছে। পানিই হবে হয়তো।

‘অন্ধকার কেন?’ জিজ্ঞেস করল ইউসুফ।

‘নিশ্চয়ই পাওয়ার চেম্বারের ক্ষতি হয়েছে,’ বলল টোরা। ‘অন্ধকারে দেখতে পাও তো? এক কাজ করো, কয়েক গজ এগোলেই টানেলের গায়ে বসানো একটা গুপ্তকুঠুরি পাবে। ওতে লন্ঠন আছে।’

ইনফ্রা-রেড চালু করল ইউসুফ। চোখে বসানো বিশেষ নাইট গ্লাসটাও। অন্ধকার দূর হয়ে গেল তার চোখের সামনে থেকে। টোরার হাত ধরে এগিয়ে চলল সে। দুপাশে সুড়ঙ্গের দেয়াল তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দেখতে দেখতে চলেছে। ১০ গজের মতো গিয়ে কুঠুরির ডালাটা দেখতে পেল সে। বাঁ হাতে ঘুষি মেরে লক ভেঙে খুলে ফেলল ডালা। সত্যিই, ভেতরে লন্ঠন আছে। আরও কয়েকটা টুকিটাকি প্রয়োজনীয় জিনিসও আছে।

চৌকোনা লন্ঠনটা বের করে আনল ইউসুফ। ব্যাটারিতে জ্বলে। সুইচ টিপতেই আলো জ্বলে উঠল। এতে টোরার সুবিধা হলো। ইউসুফের আলো ছাড়াও চলে।

আইস টানেলের দুই–তৃতীয়াংশ এসে থমকে দাঁড়াল ইউসুফ। এখানেই পাথর ফেলে দেয়াল তুলেছিল সে। এখন আর নেই। তবে পাথরগুলো ছড়িয়ে–ছিটিয়ে পড়ে আছে। একটা বিশাল পাথরের নিচে চাপা পড়ে আছে একজন মানুষ। ঝুঁকে লোকটার মুখের কাছে লন্ঠন ধরল ইউসুফ। লোকটা জীবিত না মৃত, বোঝা যাচ্ছে না। লন্ঠনটা টোরার হাতে তুলে দিয়ে হাঁটু গেড়ে বসল ইউসুফ। লোকটার একটা হাত হাতে তুলে নিল। দুই সেকেন্ড দেখেই ঘাড় ফিরিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘টোরা, তোমাদের বডি কনস্ট্রাকশনে পালস আছে নিশ্চয়, না?’

মাথা ঝাঁকাল টোরা, ‘হ্যাঁ।’

লোকটার হাত আবার আস্তে করে নামিয়ে রেখে উঠে দাঁড়াল ইউসুফ, ‘মারা গেছে।’

কয়েক ফুট দূরে একজন টেকনিশিয়ানকে পাথরের নিচে চাপা পড়ে থাকতে দেখা গেল। এগিয়ে গিয়ে পাথরটা ঠেলে সরিয়ে লোকটাকে বের করে আনল ইউসুফ। মরেনি।

লোকটার কাছে গিয়ে উবু হয়ে বসল টোরা। পরীক্ষা করল। ডান পায়ে হাত দিতেই ব্যথায় চেঁচিয়ে উঠল লোকটা।

‘একটা পা ভেঙেছে,’ ঘোষণা করল টোরা। লোকটাকে বলল, ‘আপাতত এখানেই থাকো। ভেতরে গিয়ে দেখি, মেডিকেল টিম পাঠাতে পারি কি না।’

আইস টানেল পেরিয়ে এল টোরা আর ইউসুফ। এরপরের পাথুরে সুড়ঙ্গটায় কোনো মানুষ দেখা গেল না। সারা পথে পাথরের ছড়াছড়ি। পুরু ধুলার আস্তরণ।

প্রধান করিডরও পাথরে ছেয়ে আছে। সেই সঙ্গে ধুলা। ধুলায় ভারী হয়ে আছে বাতাস। শ্বাস নিতে কষ্ট হয়।

কাউন্সিল চেম্বারে এসে ঢুকল ওরা। ইউসুফের হাতের লন্ঠনটার মতো আরেকটা লন্ঠন জ্বালিয়ে পাথরের ওপর রাখা হয়েছে। ঘরে হলদেটে মৃদু আলো। দুটো লন্ঠনের আলোয় অন্ধকার আরেকটু দূর হলো। ঘরের একটা জিনিসও আস্ত নেই। ভেঙেচুরে একাকার। পাথর আর ধুলা তো আছেই।

একটা বিশাল চ্যাপ্টা পাথর টেনে তুলে সরাবার প্রাণপণ চেষ্টা করছে ভিটু। পারছে না। তার পাশেই দাঁড়িয়ে চোখ বড় বড় করে দেখছে রাটিন।

দ্রুত রাটিনের পাশে গিয়ে দাঁড়াল ইউসুফ আর টোরা।

‘হিগ,’ আঙুল তুলে দেখিয়ে ফিসফিস করে বলল রাটিন। ‘পাথরের নিচে চাপা পড়ে আছে।’

‘জীবিত আছে?’ জিজ্ঞেস করল টোরা।

‘হ্যাঁ,’ বলল রাটিন, ‘কিন্তু পাথরটা সরাতে না পারলে...।’

‘সরানো যাবে,’ বলল ইউসুফ। লন্ঠনটা টোরার হাতে তুলে দিয়ে ভিটুর পাশে গিয়ে দাঁড়াল সে। সন্দিহান চোখে ইউসুফের দিকে তাকাল রোবটটা।

এগিয়ে গিয়ে উবু হয়ে পাথরটার কার্নিশ ধরে ওপরে টানতে শুরু করল ইউসুফ। কিন্তু পাষাণ অনড়। আরও বার দুই ঠেলে এক ইঞ্চিও সরাতে না পেরে ঘাড় ফিরিয়ে ভিটুর দিকে তাকাল সে। একভাবে তারই দিকে তাকিয়ে আছে রোবট।

‘হাঁ করে দেখছ কী?’ বলল সে, ‘এসো, হাত লাগাও।’

ঘোঁৎ ঘোঁৎ করে এগিয়ে এল ভিটু। ইউসুফের পাশাপাশি উবু হয়ে দাঁড়িয়ে পাথরে হাত লাগাল। একই সঙ্গে টানতে শুরু করল দুজনে। এবার আর গ্যাঁট হয়ে থাকতে পারল না পাথর, নড়ে উঠল। উঠছে ইঞ্চি ইঞ্চি করে। আরও জোরে টান লাগাল ইউসুফ আর ভিটু। পাথরটা ফাঁক হতেই এগিয়ে গেল টোরা আর রাটিন। টেনেহিঁচড়ে নিচ থেকে হিগকে বের করে নিয়ে এল। আস্তে করে আবার পাথরটা নামিয়ে রাখল ভিটু আর ইউসুফ।

হিগের বুকে কান ঠেকিয়ে হৃৎপিণ্ডের শব্দ শুনল টোরা। মাথা তুলে রাটিনের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এখনো বেঁচে আছে। জলদি টিএলসিটা খোলো।’

হিগের কোমরের বেল্ট থেকে যন্ত্রটা নিয়ে টোরার হাতে দিল রাটিন।

‘কী করবে?’ জানতে চাইল ইউসুফ।

‘ওর দেহের মেটাবলিজমের সঙ্গে টিএলসি অ্যাডজাস্ট করে দেব। অপারেশন করা পর্যন্ত ওকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে।’ কথা বলতে বলতেই যন্ত্রটা হিগের দেহে সেট করে দিল টোরা।

হঠাৎ জ্বলে উঠল ক্রিস্টাল। কিন্তু আগের উজ্জ্বলতা নেই। করিডরে বেরিয়ে এল ইউসুফ। দ্রুত ছুটে আসছে একজন টেকনিশিয়ান। ইউসুফকে দেখেও দেখল না। তাকে পাশ কাটিয়ে ঘরে ঢুকেই চেঁচিয়ে বলল, ‘টোরা, আরও অনেকে আহত হয়েছে।’

‘আচ্ছা টোরা, এসব আহতকে বাঁচানো কি সম্ভব?’ দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে ইউসুফ।

‘জানি না,’ অনিশ্চিত টোরার গলা, ‘তবে ইলেকট্রমেডিকেল টেকনিকে কাজ করতে পারলে হয়তো সম্ভব। নিউট্রাক্সিন কম্পাউন্ড তো আছেই। কিন্তু তার জন্য পাওয়ার দরকার।’

‘পাওয়ার চেম্বারটা কোথায়?’ টেকনিশিয়ানকে জিজ্ঞেস করল ইউসুফ।

‘কমপ্লেক্সের তলায়,’ জবাব দিল টোরা। ‘থার্মাল কনভার্টারের সাহায্যে ভূগর্ভের উত্তাপকে কাজে লাগিয়ে ইলেকট্রিক্যাল এনার্জি তৈরি করি আমরা।’

‘কিন্তু পাথর পড়ে অ্যাকসেস টানেল বুজে গেছে,’ বলল টেকনিশিয়ান। ‘যাওয়ার উপায় নেই।’

‘টানেলটা কোথায়?’ জিজ্ঞেস করল ইউসুফ।

‘ওর ভেতর দিয়ে যাওয়া অসম্ভব,’ বলল টেকনিশিয়ান।

‘যা বলছি উত্তর দাও!’ ভিটুকে দেখিয়ে বলল ইউসুফ, ‘ও আর আমি দুজনে মিলেও পাথর সরাতে পারব না?’

‘কী জানি!’ নিশ্চিত হতে পারছে না টেকনিশিয়ান।

‘চলো, আমিও যাচ্ছি,’ উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল টোরা। ভিটুর দিকে ফিরে ডাকল, ‘ভিটু, এসো।’

ইউসুফকে পথ দেখিয়ে নিয়ে চলল টোরা। পাশে হাঁটছে ভিটু। কী ভেবে ওদের পিছু নিয়েছে রাটিন। ইউসুফের হাতে হাত রাখল টোরা। হঠাৎ মৃদুকণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, ‘আচ্ছা ইউসুফ, এসব কেন করছ, বলো তো?’

থমকে দাঁড়াল ইউসুফ। অবাক হয়ে তাকাল টোরার মুখের দিকে। ‘কেন করছি মানে? নইলে মারা যাবে তো ওরা।’

‘তাতে তোমার কী? আমরা তো তোমাদের লক্ষ লক্ষ লোক মেরে ফেলার জন্য তৈরি হয়ে গিয়েছিলাম।’

হেসে উঠল ইউসুফ। আবার সামনে এগোল। ‘পৃথিবীর মানুষের আবেগ–অনুভূতি খুব বেশি।’

স্প্রিংয়ের মতো পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে মাটির ১০০ ফুট গভীরে নেমে গেছে মেইন করিডরের এক মাথা। দুপাশে সারি সারি সাবকরিডর। মেইন করিডরের এদিকের শেষ প্রান্ত থেকে শুরু হয়েছে অ্যাকসেস টানেল। সরু। তবে তিনজন লোক পাশাপাশি হাঁটতে পারবে। মেঝে থেকে সিলিংয়ের উচ্চতা আট ফুট।

ঢোকার মুখেই বড় বড় পাথর পড়ে পথ একেবারে বন্ধ হয়ে আছে।

‘এটাই অ্যাকসেস টানেল,’ আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলল টোরা। দুই হাতের তালু একবার ডলল ইউসুফ। এগিয়ে গেল। ভিটুও সঙ্গে এগোল।

‘পেছনে সরে যাও তোমরা,’ টোরা আর রাটিনের উদ্দেশে বলল ইউসুফ।

পিছিয়ে গিয়ে এক পাশের দেয়ালের সঙ্গে সেঁটে দাঁড়াল দুজনে। ওদিকে কাজ শুরু করে দিয়েছে ভিটু আর ইউসুফ। অবলীলায় দু–তিন মণ ওজনের পাথরগুলো তুলে নিয়ে সুড়ঙ্গের বাইরে ছুড়ে ফেলছে। মিনিটখানেকের মধ্যেই একটা অতি বিশাল পাথরের চাঙড় ছাড়া সবই সরিয়ে ফেলল দুজনে। খাড়াভাবে দেয়ালের মতো দাঁড়িয়ে আছে চৌকোনা পাথরটা।

‘এটা সরাতে হলে খাটতে হবে,’ সবাইকে শুনিয়ে বলল ইউসুফ।

কাঁধ লাগিয়ে ঠেলা দিল ইউসুফ। তার দেখাদেখি পাথরটায় কাঁধ লাগাল ভিটুও। নড়তে শুরু করল ২০ মণ ওজনের পাথর, কিন্তু অতি ধীরে। আধমিনিটের চেষ্টায় মাত্র কয়েক ইঞ্চি সরানো গেল। থামল ইউসুফ। ভিটুর দিকে তাকাল। ‘দেখো খোকা, পাথরটা সরাতেই হবে আমাদের। নইলে মান থাকবে না,’ বলেই আবার পাথরে কাঁধ লাগাল।

কী বুঝল ভিটু, কে জানে। আরও জোরে ঠেলতে লাগল সে। আরও কয়েক ইঞ্চি সরল পাথরটা...আরও কয়েক ইঞ্চি। একজন মানুষ কোনো রকমে গলে ওপাশে বেরোনোর মতো ফাঁক করে থামল ইউসুফ। ফাঁকে দাঁড়িয়ে উঁকি দিল ভেতরে।

পাওয়ার রুম দেখা যাচ্ছে। বিশাল জেনারেটরের আশপাশে শুধু নীল আগুনের ফুলকি। নীল আলোতে ভরে গেছে টানেলের অন্য মাথা। ছেঁড়া তারের মাথাগুলো একনাগাড়ে বিদ্যুৎ-স্ফুলিঙ্গ ছিটাচ্ছে। ওগুলোর তীক্ষ্ণ ছটছট শব্দ ছাপিয়ে আরেকটা টানা হিসহিস শব্দ কানে আসছে। যেন বিশাল এক চায়ের কেটলিতে পানি ফুটছে।

একটা মোটা স্টিলের পাইপ ঢোকানো হয়েছে পাথরের ভেতরে। সেটিকে অবলম্বন করে চারপাশ থেকে আটকে দেওয়া হয়েছে বিচিত্র সব যন্ত্রপাতি। কয়েকটা যন্ত্রের গায়ে বসানো লাল আলো জ্বলছে নিভছে। অজগরের মতো মোটা একটা বিদ্যুতের তারের এক মাথা ছিঁড়ে সিলিং থেকে ঝুলছে, দুলছে, বাড়ি খাচ্ছে পাইপের গায়ে। স্টিলের পাইপের গায়ে তারের বেরিয়ে থাকা মাথাগুলোর ছোঁয়া লাগামাত্র ছড়ছড় শব্দে স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে যাচ্ছে। পাইপের একটা জয়েন্ট ছুটে গেছে। জোরে বাষ্প বেরোচ্ছে ও-পথে। হিসহিস শব্দ আসছে ওখান থেকেই।

এগিয়ে এসে ইউসুফকে সরিয়ে ফাঁক দিয়ে টানেলের ভেতরে উঁকি দিল টোরা। হতাশ হয়ে বলল, ‘ওখানে যেতে পারবে না। ওই পাইপ দিয়েই মাটির নিচ থেকে গরম বাষ্প উঠে আসছে। সুপার হিটেড স্টিম।’

‘তার মানে সতর্ক হয়ে এগোতে হবে আমাকে,’ টোরার দিকে তাকাল ইউসুফ। হাসল, ‘যাতে আঙুল না পুড়ে যায়,’ বলেই ফাঁক গলে ওপাশে চলে গেল সে।

‘ইউসুফ!’ ভয়ার্ত গলায় আর্তনাদ করে উঠল টোরা। ভেতরে ঢোকার ফাঁকটার কাছে এসে দাঁড়িয়েছে সে। দেখছে।

পাওয়ার হাউসের দরজায় এসে দাঁড়াল ইউসুফ। ঢুকতে যাবে, কানে এল টোরার ডাক। ‘ইউসুফ, আগে ওই মোটা তারটা রিপ্লেস করো। ওই যে কমলা রঙের জাংশন বাক্স, ওর ভেতরেই ফিউজ।’

ভেতরে ঢুকেই এক পাশের দেয়ালে বসানো কমলা বাক্সটার দিকে এগিয়ে গেল ইউসুফ। বাক্সের তলায় একটা প্লাগ। বুঝল সে, ওতেই তারটা লাগবে। বায়োনিক হাতের কড়ে আঙুলের নখ দিয়ে প্লাগের ভেতরের ছেঁড়া তারের মাথা খুঁচিয়ে বের করে আনল সে। পরিষ্কার করল। এগিয়ে গিয়ে ঝুলন্ত তারটা ধরল। বায়োনিক আঙুলের নিচে বিদ্যুতের স্ফুলিঙ্গের ছড়াছড়ি শুরু হয়ে গেল। তারের মাথাটা প্লাগের ভেতরে ঠেলে ঢুকিয়ে দিল সে। স্ফুলিঙ্গ ছিটানো বন্ধ হয়ে গেল। সেট হয়ে গেছে তারটা।

স্টিম পাইপের দিকে নজর দিল ইউসুফ। জয়েন্টের কাছে এগিয়ে গেল। তীক্ষ্ণ চোখে একবার পরীক্ষা করে দেখল। পাথর পড়ে নয়, ভূকম্পনের প্রচণ্ড চাপ সইতে পারেনি স্ক্রুগুলো। ছুটে গেছে।

টুলস বাক্সটা খুঁজে বের করল ইউসুফ। একটি রেঞ্চ বের করে নিয়ে আবার গেল জয়েন্টের কাছে। মোট ১০টার মধ্যে মাত্র ৪টি স্ক্রু জয়েন্টের ছিদ্রগুলোতে আটকানো গেল, কিন্তু ঢিলা হয়ে আছে প্যাঁচ। বাকি স্ক্রুগুলো নেই। বাষ্পের ধাক্কায় কোথায় গিয়ে পড়েছে কে জানে। আপাতত চারটি স্ক্রু দিয়েই জয়েন্টটা জোড়া লাগাল ইউসুফ। ছোট ছোট ফাঁক রয়েই গেল। স্টিম লিক করছে, কিন্তু খুবই সামান্য। জেনারেটর চালাতে অসুবিধা হবে না।

রেঞ্চটা আবার টুলস বক্সে রেখে দিয়ে পাইপের গায়ে বসানো যন্ত্রগুলোর দিকে ফিরে তাকাল ইউসুফ। নিভে গেছে লাল আলোগুলো। জ্বলছে না আর। ‘বিপৎসংকেত’ শেষ।

পাওয়ারহাউস থেকে বেরিয়ে এল ইউসুফ।

পনেরো

পুরোদমে কাজ শুরু হয়েছে মেডিকেল রুমে। টোরা অপারেশন করছে। তাকে সাহায্য করতে টেবিল ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে কয়েকজন মেডিকেল ওয়ার্কার। টোরার কাছাকাছি দাঁড়িয়ে দেখছে ইউসুফ। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে ভিটু।

একটা ছোট্ট শিশির ভেতরে ইনজেকশনের সুচ ঢুকিয়ে দিল টোরা। নীল ওষুধ দিয়ে সিরিঞ্জ ভরে নিয়ে শিশিটা একজন সহকারীর হাতে তুলে দিল।

অপারেশন টেবিলে হিগকে চিৎ করে শুইয়ে রাখা হয়েছে। সেদিকে নির্দেশ করে আস্তে জিজ্ঞেস করল ইউসুফ, ‘কেমন মনে হচ্ছে?’

‘বেঁচে যাবে,’ জবাব দিল টোরা। ‘কয়েক মিনিটের মধ্যেই হাড়গুলো জোড়া লেগে যাবে,’ সুচ ওপরের দিকে তুলে সিরিঞ্জের পেছনটা ঠেলল টোরা। তিরতির করে কয়েক বিন্দু নীল ওষুধ ছিটকে বেরোল। ‘যেকোনো ধরনের ইনফেকশন সারাতে আমাদের নিউট্রাক্সিন অতুলনীয়। সারায়ও খুব দ্রুত।’

‘অথচ যেভাবে জখম হয়েছে হিগ,’ বলল ইউসুফ, ‘মরে যাওয়াটাই স্বাভাবিক ছিল।’

‘তোমারও তো মরে যাওয়াটা স্বাভাবিক ছিল,’ সুচটা হিগের মাংসে ঢোকাতে ঢোকাতে বলল টোরা। ‘অথচ বেঁচে আছ। সব বিজ্ঞানের দান।’

হাসল ইউসুফ। হিগের দেহে নিউট্রাক্সিন পুশ করছে টোরা।

‘ম্যাজিক মেডিসিন, তা–ই না!’ বলল ইউসুফ।

মাথা ঝাঁকাল টোরা। সুচটা হিগের মাংসের ভেতর থেকে টান মেরে বের করে এনে একজন সহকারীর হাতে তুলে দিল। বলল, ‘ভেনট্রিকুলারের ওপর চোখ রাখবে।’

ঘাড় কাত করে সম্মতি জানাল সহকারী।

ইউসুফের দিকে ফিরল টোরা। ‘এক্ষুনি ফিরবে?’

‘হ্যাঁ, ফিরতে তো হবেই।’

কিন্তু যাওয়ার আগে তোমার স্মৃতি থেকে আমাদের কথা তো মুছে দিতে হবে,’ বলল রাটিন।

‘ওহ্ হো, ভুলেই গিয়েছিলাম। কী করে মুছবে?’

‘রেডিয়েশনের সাহায্যে। এক্স-রের মতোই একধরনের রশ্মি ব্রেনে ঢুকিয়ে। কোনো ক্ষতি হবে না শরীরের। ভিটুর সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎ থেকে শুরু করে, এখান থেকে বেরোনো পর্যন্ত কোনো কথা মনে থাকবে না তোমার।’

‘ভারি মজার ব্যাপার তো,’ হাসল ইউসুফ।

একজন সহকারীকে ইঙ্গিত করল রাটিন।

এগিয়ে এসে ইউসুফের হাত ধরল লোকটা। টান দিল। বলল, ‘কিছু মনে করবেন না, মিস্টার ইউসুফ।’

‘আমার তরফ থেকেও তোমাকে ধন্যবাদ দেওয়া উচিত, ইউসুফ,’ বলল রাটিন।

‘বাড়ি যাবে না?’ রহস্যময় হাসি হাসল ইউসুফ।

‘তা তো যাবই। এখানে চিরদিন থাকব নাকি?’

‘কবে যাবে?’

‘আমি আগেই চলে যাব। তিন বছর অনেক লম্বা সময়। এত দিন থাকতে পারব না।’

একটু থামল রাটিন। তারপর বলল, ‘দু–তিন দিনের মধ্যেই একটি শিপ আসছে।’

‘তোমরা সবাই যাবে তো?’

‘না,’ উত্তরটা দিল রাটিন। ‘আমি অধৈর্য হয়ে পড়েছি। আর থাকতে ইচ্ছা করছে না। আমি যাব। ওরা মিশন শেষ করে যাবে। এখনো তিন বছর।’

‘তোমাদের দুই বছর যেতেই আমাদের আড়াই শ বছর পার হয়ে গেল। তার মানে আরও কয়েক শ বছর পৃথিবীতে আছ তোমরা?’

‘থাকতে হচ্ছে।’

‘ভিটুকে দিয়ে মানুষ ধরে এনে টেস্ট টেবিলে শোয়াবে তো আরও?’

‘উপায় নেই। পরীক্ষা শেষ হয়নি এখনো আমাদের।’

শ্রাগ করল ইউসুফ। আর কিছু না বলে টেকনিশিয়ানের সঙ্গে এগিয়ে গিয়ে ওর নির্দেশিত একটা রি–ক্লিনিং চেয়ারে বসল। একটা চ্যাপ্টা ইলেকট্রড ইউসুফের মাথায় বসিয়ে দিল টেকনিশিয়ান। যন্ত্রটা থেকে এক গোছা তার বেরিয়ে গিয়ে ঢুকেছে একটা কম্পিউটারে। নিঃশব্দে হেঁটে ইউসুফের কাছে এসে দাঁড়াল টোরা। গা ঘেঁষে দাঁড়াল। সবার অলক্ষে তার একটা হাত ইউসুফের হাতের তালুতে নেমে এল। একটা ছোট্ট নীল শিশি গুঁজে দিল। পকেটে ঢুকিয়ে রাখল ইউসুফ শিশিটা।

‘গুডবাই, ইউসুফ,’ টোরা বলল। পিছিয়ে সরে গেল এক পাশে। সুইচ অন করল টেকনিশিয়ান। মৃদু গুঞ্জন উঠল ইলেকট্রডের ভেতরে। চোখ মুদল ইউসুফ। মিনিটখানেক পরেই থেমে গেল শব্দ। যন্ত্রটা ইউসুফের চাঁদি থেকে সরিয়ে নিল টেকনিশিয়ান। কাজ শেষ।

চোখ খুলল না ইউসুফ। যেন ঘুমিয়ে পড়েছে সে।

‘ভিটু,’ ডাকল টোরা। এর বেশি কিছু বলতে হলো না। ইঙ্গিতটা বুঝতে পারল রোবট। এগিয়ে এসে পাঁজাকোলা করে ইউসুফকে চেয়ার থেকে তুলে নিয়ে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।

বনসীমার কাছে এসে ইউসুফকে আস্তে করে মাটিতে শুইয়ে দিল ভিটু। এক মুহূর্ত দেখল তাকে। তারপর ঘুরে দাঁড়িয়ে আস্তানায় রওনা দিল।

ভিটুকে আন্ডারগ্রাউন্ড কমপ্লেক্সে ফিরে যাওয়ার সময় দিল ইউসুফ। পরক্ষণে তড়াক করে লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল। হাসিতে উদ্ভাসিত মুখ।

টেলিভিশনের সামনে দাঁড়িয়ে দৃশ্যটা দেখছে টোরা আর রাটিন। ইউসুফকে এভাবে লাফিয়ে উঠতে দেখে বিস্ময়ে বোবা হয়ে গেল যেন দুজনেই।

‘এমন তো হওয়ার কথা নয়,’ ভুরু কুঁচকে টিভির পর্দার দিকে তাকিয়ে বলল রাটিন, ‘আগামী পনেরো মিনিটের মধ্যে জ্ঞানই ফেরার কথা না ওর।’

আন্ডারগ্রাউন্ড কমপ্লেক্সটা যেদিকে, সেদিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল ইউসুফ, ‘আমি জানি, আমাকে দেখছ তোমরা। নিশ্চয় আমার কথাও শুনছ।’

‘আমাদেরই বলছে ও,’ বলল রাটিন।

‘হ্যাঁ,’ শুকনো টোরার কণ্ঠ।

‘কিন্তু কী করে এটা সম্ভব! আমাদের যন্ত্র কাজ করেনি?’

এত দূর থেকে রাটিনের কথা শুনতে পাচ্ছে না ইউসুফ। কিন্তু তবু যেন তার কথারই জবাব দিল সে, ‘খুব অবাক হয়েছ, তা–ই না, রাটিন? আসল কথাটা কী জানো? আমার খুলিটা এক ধরনের মেটাল অ্যালয়ে তৈরি। এক্স-রে কিংবা অন্য কোনো রশ্মিই এটি ভেদ করতে পারে না।’

হাঁ করে টেলিভিশনের পর্দার দিকে তাকিয়ে আছে রাটিন।

‘সুতরাং বুঝতেই পারছ,’ বলে চলেছে ইউসুফ, ‘তোমাদের মেমোরি ইরেজার আমার ওপর কাজ করেনি। ইচ্ছা করেই তখন চুপ ছিলাম। ভিটুর সঙ্গে মারামারি আর কত করব।’ পকেট থেকে ধীরে ধীরে বের করে আনল হাতটা। নীল শিশিটা ছুড়ে দিল ওপরের দিকে। লুফে নিল আবার। হাসল সে।

‘নিউট্রাক্সিনের একটি শিশিও চুরি করেছে ও,’ ফিসফিস করে বলল রাটিন। জোরে কথা বলতে ভয় পাচ্ছে যেন। চুপ করে রইল টোরা।

‘শোনো রাটিন, পৃথিবীর মানুষকে গিনিপিগ বানানোর জন্য কঠোর শাস্তি পাওনা হয়ে আছে তোমাদের। তবে এই শিশি পেয়ে যাওয়াতে ওষুধটুকুতে মানুষের যে উপকার হবে, তার বিনিময়ে তোমাদের অপরাধ ক্ষমা করা যায়। আশা করছি এই অতুলনীয় ওষুধ আমাদের চিকিৎসাজগতের প্রচুর উন্নতি সাধন করবে,’ শিশিটা পকেটে রেখে দিল আবার ইউসুফ। ‘এবার আসল কথা শোনো। আমি এখন যাচ্ছি। কিন্তু ঠিক চার দিন পরে ফিরে আসব এখানে। একা নয়, পুরো এক ব্রিগেড সৈন্য সঙ্গে নিয়ে। আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র থাকবে ওদের কাছে। যদি দেখি তখনো আছ, গত কয়েক বছরে তোমাদের বর্বরতার কথা আবার মনে পড়ে যাবে আমার। আর তোমাদের ক্ষমা করা হবে না।’

টোরার দিকে তাকাল রাটিন। চোখে হতাশা। জিজ্ঞেস করল, ‘আমাদের মাদার শিপটা তিন দিনের মধ্যে আসবে তো?’

নীরবে মাথা ঝাঁকাল টোরা।

মিষ্টি হাসিতে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল ইউসুফের মুখ। ‘টোরা, চিরকাল মনে রাখব আমি তোমাকে। বিদায়।’

হাত বাড়িয়ে টিভির সুইচটা অফ করে দিল রাটিন। লম্বা লম্বা পা ফেলে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। লাল হয়ে উঠেছে তার মুখ। এত দিন যাদের অসভ্য–আদিম জেনে এসেছে, সে রকম একজন পৃথিবীবাসীর কাছে পরাজিত হওয়ার অপমান হজম করতে কষ্ট হচ্ছে ওর।

আর কিছু বলার নেই। ঘুরে দাঁড়াল ইউসুফ। ছুটতে শুরু করল।

বায়োনিক গতিবেগ।

লক্ষ্য, হিমপাহাড়ের বেস ক্যাম্প।

(শেষ)