ফুটবল খেলতে গিয়ে উশুতে এলেন কীভাবে?
জিন্নাত আক্তার: আমার খেলাধুলার শুরু ফুটবল দিয়ে। বঙ্গমাতা ফুটবল টুর্নামেন্টে খেলেছি। পরে বাফুফের জাতীয় দলের ক্যাম্পেও ছিলাম। কিন্তু পাসপোর্টের সমস্যার কারণে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় খেলা হয়নি। এরপর আনসারের একটি প্রতিভা অন্বেষণ ক্যাম্পে যাই। সেখানে কোচেরা আমার উচ্চতা দেখে উশু খেলার পরামর্শ দেন। উশু কী, সেটাই তো জানতাম না! পরে দিলু স্যার (উশু ফেডরেশনের সাধারন সম্পাদক দিলদার হোসেন) আমাকে উশু খেলা দেখান। দেখে ভয় পেয়ে যাই। মনে হয়েছিল, এ তো মারামারির খেলা! নাক-টাক ফেটে যাবে। আমি বলেছিলাম, ‘এই খেলা খেলব না।’ পরে কোচেরা সাহস দেন। বলেন, চেষ্টা করলে পারব। তাঁদের কথায় ভরসা করে অনুশীলন শুরু করি। মাত্র ১৫ দিন অনুশীলন করে জাতীয় প্রতিযোগিতায় অংশ নিই, সোনার পদক জিতি। সেখান থেকেই উশুতে পথচলা শুরু।
১৫ দিনের অনুশীলনে পদক, নিজের ওপর বিশ্বাস কি তখনই বেড়ে গিয়েছিল?
জিন্নাত আক্তার: হ্যাঁ, সোনা জেতার পর মনে হয়েছিল, আমিও পারি। কোচেরা আমাকে অনেক উৎসাহ দিয়েছেন। প্রথমে ভয় লাগলেও পরে খেলাটা ভালো লাগতে শুরু করে। এরপর থেকে উশু নিয়েই স্বপ্ন দেখতে শুরু করি।
আপনার ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন ছিল। এখন কি সেটা নিয়ে আক্ষেপ হয়?
জিন্নাত আক্তার: প্রথমে খারাপই লেগেছিল। জাতীয় উশু প্রতিযোগিতায় সোনা জেতার পর বাংলাদেশ আনসারে যোগ দিই। সেখান থেকে ভাতাও পাই। সেই টাকা দিয়ে পরিবারকে সাহায্য করতাম, নিজের পড়াশোনার খরচও চালাতে পারতাম। তখন আর আগের মতো আক্ষেপ কাজ করেনি। এখন মনে হয়, যা হয়েছে ভালোই হয়েছে।
খেলাধুলায় আসার পথে কোনো প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়েছিলেন?
জিন্নাত আক্তার: পরিবার থেকেই প্রথমে বাধাটা আসে। আমি মাদ্রাসায় পড়তাম। আমার মামাতো ভাই রানা আমাকে স্কুলে গিয়ে ফুটবল খেলতে উৎসাহ দিতেন। কিন্তু পরিবার চাইত না আমি খেলাধুলা করি। গ্রামের মানুষও অনেক কথা বলত। তাঁদের ভয় ছিল, মেয়ে খেলাধুলা করলে পরিবারের মানসম্মান থাকবে না।
গ্রামের মানুষ ঠিক কী বলতেন?
জিন্নাত আক্তার: অনেকে বলতেন, ‘মেয়ে মানুষের আবার কিসের খেলা!’ গ্রামের মানুষ ভাবত, মেয়েরা খেলাধুলা করলে কী হবে, কেন খেলবে? পরিবারও প্রথমে আমাকে খেলতে দিতে চাইত না। আমি খেলতে চাইতাম, কিন্তু তাঁরা রাজি হতেন না। এ জন্য অনেক সময় রাগ করে না খেয়েও থেকেছি। তারপর যখন স্কুলে খেলতে শুরু করি এবং কিছু মানুষ আমার খেলার প্রশংসা করতে থাকে, তখন পরিবারের মনোভাব বদলাতে শুরু করে।
এরপর পরিবারের সমর্থন কতটা পেয়েছেন?
জিন্নাত আক্তার: শুরুতে আমি গোলকিপার হিসেবে খেলতাম। কিন্তু গোলকিপার হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে ভালো লাগত না। কোচকে বলেছিলাম, আমাকে মাঝমাঠে খেলতে দিতে হবে। এরপর মাঝমাঠে খেলতে শুরু করি। আমার মামাতো ভাইও খেলতেন। আমাদের খেলা দেখে যখন অন্যরা বাবা–মাকে বলতে শুরু করল, ‘তোর মেয়ে ভালো খেলতেছে’, তখন বাবা-মাও উৎসাহ দিতে শুরু করেন। এরপর থেকে বাবা বলতেন, খেললে ভালোভাবে খেলতে হবে। সবার মুখ উজ্জ্বল করতে হবে।
ভালো খেলার জন্য কখনো কি মনে কোনো জেদ কাজ করেছে?
জিন্নাত আক্তার: তেমন জেদ বা ইচ্ছা ছিল না। তবে এসব কথা আমকে বাড়তি প্রেরণা যুগিয়েছে। এগিয়ে যাওয়ার শক্তি দিয়েছে। আমি মনে করি, চেষ্টা করলে মেয়েরাও অনেকদূর যেতে পারে। আমি সেটাই দেখাতে চেয়েছি। আগে যাঁরা খেলাধুলা নিয়ে আপত্তি করতেন, তাঁরা এখন আমার সাফল্য দেখে অনেক খুশি। এটা দেখতে আমারও ভালো লাগে। আমি চাই, আমার মতো আরও মেয়েরা খেলাধুলায় আসুক, নিজেদের আলাদা একটা পরিচয় তৈরি করুক।
এশিয়ান গেমসে একটু অপ্রত্যাশিতভাবেই পদকটা পেয়ে গেলেন। এটাকে কিভাবে দেখছেন?
জিন্নাত আক্তার: আমার ভাগ্য খুবই ভালো ছিল। প্রথম ম্যাচটিতে বাই পেয়ে যাই। দ্বিতীয় ম্যাচে প্রতিপক্ষ ডিসকোয়ালিফায়েড হয়। আমিও সেমিফাইনালে উঠে পদক নিশ্চিত করে ফেলি। আসলে, সবকিছু আমার কাছে স্বপ্নের মতো লেগেছিল। অবশ্য আমি খেলার জন্য প্রস্তুত ছিলাম। যেভাবে হোক পদকটা পেয়ে খুবই ভালো লাগছে। এই অনুভুতি আসলে ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।
পদক জেতার পর প্রথম কার কথা মনে পড়েছিল?
জিন্নাত আক্তার: আমার বাবার কথা। বাবা বেঁচে থাকলে সবচেয়ে বেশি খুশি হতেন। আমার এই অর্জন বাবাকে উৎসর্গ করেছি। তাঁর খুব ইচ্ছা ছিল, আমি দেশের বাইরে গিয়ে খেলব, টেলিভিশনে আমার খেলা দেখা যাবে। সেই স্বপ্ন পূরণ হয়েছে, কিন্তু বাবা দেখে যেতে পারেননি।
বাবার সঙ্গে এমন কোনো স্মৃতি আছে, যেটা মনে পড়লে এখনো খারাপ লাগে?
জিন্নাত আক্তার: শুরুতে বাধা দিলেও পরে বাবাকেই আমি সবচেয়ে পাশে পেয়েছি। আমি কোথাও খেলতে গেলে বাবাকে সঙ্গে নিয়ে যেতাম। বাবা খুব খুশি হতেন। বলতেন, ‘কবে তুমি দেশের বাইরে যাবে, কবে বিমানে উঠবে?’ তিনি খুব করে চাইতেন, আমি বিদেশে গিয়ে খেলি। আমার সেই স্বপ্ন পূরণ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু বাবাকে দেখাতে পারলাম না! পদক হাতে নেওয়ার পর বাবার কথা খুব মনে পড়েছিল।
এখন তো পরিবারের দায়িত্বও আপনার কাঁধে। খেলা, চাকুরি, পরিবার—সবকিছু কিভাবে সামলান?
জিন্নাত আক্তার: ২০২৫ সালের ২৩ নভেম্বর বাবা ক্যান্সারে মারা যান। তিনি কাঠমিস্ত্রি ছিলেন। এরপর থেকেই পরিবারের দায়িত্ব আমার ওপর। সেনাবাহিনীতে চাকরি করে যে বেতন পাই ওটা দিয়েই সংসার চলে। ছোট বোনকে পড়াশোনা করাচ্ছি। আমি চাই, ও ভালোভাবে পড়াশোনা করুক। পরিবারের সবাই ভালো থাকুক—এখন এটাই আমার সবচেয়ে বড় চাওয়া।
অবসর বা ছুটির দিনগুলো কিভাবে কাটান?
জিন্নাত আক্তার: আমি সেনাবাহিনীতে চাকরি করি। খুব একটা সময় পাই না। ছুটি পেলে বেশিরভাগ সময় বাড়িতে চলে যাই। মা আর ছোট বোন আছে। তাদের সময় দিই। মাঝে মধ্যে একটু ঘুরতে বের হই। রান্না করতেও ভালো লাগে।
ভবিষ্যত নিয়ে কী স্বপ্ন দেখেন?
জিন্নাত আক্তার: আগামী বছর পাকিস্তানে দক্ষিণ এশিয়ান গেমস। সেখানে বাংলাদেশের জন্য সোনার পদক জিততে চাই। সে জন্য নিজেকে আরও ভালোভাবে তৈরি করতে হবে। এশিয়ান গেমসে পদক পেয়েছি, এবার আরও ভালো করতে চাই। নিয়মিত অনুশীলন করে দেশের জন্য সাফল্য আনতে চাই।
আপনার মতো অনেক মেয়েই খেলাধুলায় আসতে চায়, কিন্তু পরিবার বাধা দেয়। তাদের উদ্দেশ্যে কী বলবেন?
জিন্নাত আক্তার: স্বপ্ন দেখতে হবে, চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। শুরুতে বাধা আসতে পারে, মানুষ অনেক কথা বলতে পারে। কিন্তু নিজের লক্ষ্যে স্থির থাকতে হবে। আত্নরক্ষার জন্য হলেও মেয়েদের উশু শেখা দরকার। অভিভাবকদের বলব, মেয়েদের খেলাধুলার সুযোগ করে দিন, আমি পারলে আপনার মেয়েও পারবে। শুধু সুযোগটা করে দিতে হবে।
আপনার প্রিয় খেলোয়াড় কে?
জিন্নাত আক্তার: যেহেতু ফুটবল দিয়েই আমি খেলাধুলায় এসেছি, ছোটবেলা থেকেই লিওনেল মেসির খেলা ভালো লাগত। তিনিই আমার প্রিয় খেলোয়াড়। পছন্দের দল আর্জেন্টিনা।