কিছু শিশু কেন এত চিকেন ফ্রাই পছন্দ করে
বাসায় দারুণ সব আইটেম রান্না হয়েছে। তোমার হয়তো সব ধরনের খাবারেই আগ্রহ। তুমি হয়তো নতুন কোনো মাছ, সবজি বা স্যুপ দেখলেই চেখে দেখতে চাও। কিন্তু তোমার ছোট ভাই বা বোনটার দিকে তাকিয়ে দেখো! সে হয়তো মুখ গোমড়া করে বসে আছে। তার চাই শুধু চিকেন! প্লেটে এক টুকরা সবজি দেখলেই তার যেন কান্না পায়। প্রতিদিন একই খাবার ছাড়া সে আর কিছুই খেতে চায় না!
যারা এ রকম বেছে বেছে খাবার খায়, ইংরেজিতে তাদের বলা হয় পিকি ইটার। এখন তোমার মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে, একই পরিবারের দুজন মানুষের খাবারের পছন্দ এত আলাদা হয় কীভাবে? কেন কেউ সবজি দেখলে পালায়, আর কেউ আনন্দের সঙ্গে সব খেয়ে ফেলে?
খাবারের এই পছন্দের পেছনে আমাদের শরীরের ভেতরের জিন বা বংশগতির একটা বড় হাত আছে। তুমি কি জানো, আমরা সবাই জন্ম থেকেই মিষ্টি খাবার পছন্দ করি এবং তেতো খাবারকে অপছন্দ করি? এর পেছনে একটা দারুণ বৈজ্ঞানিক কারণ আছে!
প্রাচীনকালে যখন মানুষ জঙ্গলে বাস করত, তখন তাদের বেঁচে থাকার জন্য প্রচুর শক্তি বা ক্যালরি দরকার হতো। ফলমূল বা মায়ের দুধের মতো মিষ্টি খাবারে প্রচুর ক্যালরি থাকে। অন্যদিকে জঙ্গলের বেশির ভাগ বিষাক্ত গাছের পাতা বা ফলের স্বাদ হয় প্রচণ্ড তেতো। তাই আমাদের শরীর এমনভাবেই তৈরি হয়েছে যে মিষ্টি কিছু মুখে দিলেই আমাদের ব্রেন ভাবে, ‘বাহ! দারুণ শক্তির খাবার!’ আর তেতো কিছু মুখে দিলেই ব্রেন অ্যালার্ম বাজিয়ে বলে, ‘সাবধান! এটা বিষ হতে পারে!’
এ ব্যাপারটা প্রমাণ করার জন্য বিজ্ঞানীরা একটা দারুণ মজার পরীক্ষা করেছিলেন। তাঁরা কিছু গর্ভবতী মাকে মিষ্টি গাজরের জুস খাইয়েছিলেন, আর কিছু মাকে খাইয়েছিলেন তেতো স্বাদের কেল নামে একধরনের পাতার জুস। এরপর যখন আলট্রাসাউন্ড মেশিনের সাহায্যে মায়ের পেটের ভেতরের শিশুদের ছবি তোলা হলো, তখন দেখা গেল এক অদ্ভুত দৃশ্য! যেসব মা গাজরের জুস খেয়েছিলেন, তাঁদের পেটের শিশুরা হাসিমুখে আছে! আর যাঁরা তেতো পাতার জুস খেয়েছিলেন, তাঁদের পেটের শিশুরা রীতিমতো বিরক্ত হয়ে মুখ বাঁকিয়ে আছে! অর্থাৎ জন্মের আগে থেকেই শিশুরা তেতো খাবারকে অপছন্দ করতে শুরু করে।
অনেক সময় আমাদের জিনের কারণে কিছু স্বাস্থ্যকর খাবারকেও আমাদের কাছে খুব বাজে মনে হয়। যেমন ধরো, ব্রকলি বা করলার মতো সবজিগুলো। পৃথিবীতে প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষের জিনে এমন একটা সংকেত দেওয়া থাকে, যার কারণে এই সবজিগুলোর ভেতরের থায়োইউরিয়া নামের একটি উপাদান তাদের কাছে প্রচণ্ড তেতো ও বিস্বাদ লাগে।
আরেকটি মজার উদাহরণ হলো ধনেপাতা! আমাদের দেশের অনেক তরকারিতেই ধনেপাতা দেওয়া হয়। কিন্তু তুমি জানলে অবাক হবে, পৃথিবীর প্রায় ২০ শতাংশ মানুষের কাছে ধনেপাতার স্বাদ একদম কাপড় কাচা সাবানের মতো লাগে! কারণ, তাদের অলফ্যাক্টরি বা ঘ্রাণ নেওয়ার জিনের একটা বিশেষ গঠন। এই জিনের কারণে ধনেপাতার ভেতরে থাকা অ্যালডিহাইড নামে রাসায়নিক পদার্থটি তাদের নাকে সাবানের মতো গন্ধ তৈরি করে। তাই তারা ধনেপাতা দেখলেই দূরে পালায়!
তবে শুধু জিন দিয়ে সবকিছু বিচার করা যায় না। আমরা বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের চারপাশের পরিবেশ কীভাবে আমাদের সঙ্গে আচরণ করছে, তার ওপরও আমাদের খাবারের পছন্দ অনেকখানি নির্ভর করে।
ঊনবিংশ শতাব্দীতে রাশিয়া ইভান প্যাভলভ একজন বিখ্যাত বিজ্ঞানী ছিলেন। তিনি একটা কুকুর নিয়ে দারুণ একটা পরীক্ষা করেছিলেন। তিনি প্রতিদিন কুকুরটিকে খাবার দেওয়ার ঠিক আগে একটা ঘণ্টা বাজাতেন। কিছুদিন পর দেখা গেল, খাবার না দিয়ে শুধু ঘণ্টা বাজালেই তার মুখ দিয়ে লালা পড়তে শুরু করেছে! কারণ, কুকুরটির মস্তিষ্ক বুঝে গিয়েছিল, ঘণ্টা বাজানো মানেই সুস্বাদু খাবার আসা। একে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ক্ল্যাসিক্যাল কন্ডিশনিং।
আমাদের খাবারের পছন্দের ক্ষেত্রেও ঠিক এই ব্যাপারটিই ঘটে! যখন কোনো খাবার খাওয়ার সময় আমরা খুব আনন্দ পাই, মায়ের হাসিমুখ দেখি বা প্রশংসা শুনি, তখন ওই খাবারটা আমাদের প্রিয় হয়ে যায়। উল্টো দিকে, কোনো খাবার খাওয়ার সময় যদি তোমার পেটব্যথা করে, অথবা মা যদি ধমক দিয়ে বলেন, ‘সবজি না খেলে আজ তোমার টিভি দেখা বন্ধ!’, তখন তোমার মস্তিষ্ক সবজি জিনিসটাকে শাস্তি বা কষ্টের সঙ্গে মিলিয়ে ফেলে। ফলে ওই খাবারের প্রতি তোমার চরম ঘৃণা তৈরি হয়ে যায়!
আরেকটা অবাক করা তথ্য দিই। শিশুরা কিন্তু পৃথিবীতে আসার অনেক আগে, মায়ের পেটে থাকা অবস্থাতেই খাবারের স্বাদ বুঝতে শেখে! মায়ের পেটের ভেতর বাচ্চারা যে বিশেষ তরল পানির ভেতর ভেসে থাকে, সেখানে মায়ের খাওয়া খাবারের স্বাদ মিশে যায়।
এক পরীক্ষায় দেখা গেছে, যেসব মা সন্তান পেটে থাকা অবস্থায় প্রচুর গাজরের জুস খান, তাঁদের বাচ্চারা বড় হয়ে অন্য বাচ্চাদের তুলনায় অনেক বেশি আনন্দের সঙ্গে গাজরের স্বাদের খাবার খেয়েছে! অর্থাৎ মায়ের পেটে থাকতেই তারা পরিবারের খাবারের সঙ্গে পরিচিত হয়ে যায়।
তাহলে যারা কোনো নির্দিষ্ট খাবার খেতে চায় না, তাদের কি কোনো দিনই ওই খাবার খাওয়ানো যাবে না? বিজ্ঞানীরা বলছেন, ভয়ের কিছুই নেই! বেশির ভাগ বাচ্চার ক্ষেত্রেই এই পিকি ইটিং বা বেছে খাওয়ার স্বভাবটা স্কুলে যাওয়ার বয়স হলে এমনিতেই ঠিক হয়ে যায়।
আর যারা একদমই নতুন কিছু মুখে তুলতে চায় না, তাদের জন্য বিজ্ঞানীদের একটা ম্যাজিক রুল আছে। কোনো বাচ্চাকে জোর করে বা ধমক দিয়ে খাবার খাওয়ানো যাবে না। এর বদলে তাকে বারবার কোনো চাপ ছাড়াই খাবারটি চেখে দেখার সুযোগ দিতে হবে। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, একটি নতুন খাবার পছন্দ করতে একজন শিশুর গড়ে ১২ বার বা তার চেয়ে বেশিবার সেই খাবারটি চেখে দেখার প্রয়োজন হতে পারে! অর্থাৎ আজ যদি তোমার ব্রকলি বা নতুন কোনো মাছ ভালো না লাগে, তবে হাল ছেড়ো না। হয়তো ১০ বা ১২ বার একটু একটু করে খাওয়ার পর একসময় সেটিই তোমার প্রিয় খাবার হয়ে উঠবে!
তাই তোমার ছোট ভাই বা বোনটি যদি শুধু চিকেন নাগেট খেতে চায়, তাকে বকা দিয়ো না। তার পাশে বসে মজার মজার গল্প করতে করতে তাকে নতুন খাবার একটুখানি চেখে দেখতে উৎসাহ দাও। কে জানে, হয়তো কালই সে তোমার মতো সবজি খেতে শুরু করবে!
সূত্র: সায়েন্স অ্যালার্ট