তোমার এত বিরক্তির কারণ কী
মনে করো, তুমি ইউটিউবে খুব জরুরি কিছু দেখছ, অমনি একটা পপআপ বিজ্ঞাপন চলে এল। সেটা স্কিপ করতে না করতেই আরেকটা বিজ্ঞাপন। অথবা ধরো, পরীক্ষার ঠিক আগের রাতে পড়ার টেবিলে বসেছ, আর তখনই তোমার ছোট ভাই পাশে বসে শব্দ করে চিপস খাচ্ছে। কিংবা ধরো রাস্তায় জ্যামে বসে আছ, আর পেছনের গাড়িটা অকারণেই হর্ন বাজিয়েই যাচ্ছে। যদি তুমি খুব ঠান্ডা মাথার মানুষ না হও, তবে এসব অবস্থায় তোমার মেজাজ বিগড়ে যাওয়াই স্বাভাবিক। বিরক্তি জিনিসটা কী, তা আমরা সবাই জানি। কিন্তু বিজ্ঞানের কাছে এ বিরক্তিই বেশ জটিল এক ব্যাপার।
কেন একটা সাধারণ ঘটনা হঠাৎ আমাদের কাছে অসহ্য হয়ে ওঠে? নেইল কাটারের শব্দ বা কারও মিনমিন করে পাশে গান গাওয়া কেন বিরক্তিকর লাগে? সবার কাছে কি বিরক্তির কারণ একই রকম, নাকি একেকজনের কাছে একেকটা বিরক্তিকর? আর এই হুটহাট মাথা গরম হওয়া থামানোর কি কোনো সমাধান আছে? তবে মজার ব্যাপার বিজ্ঞানীরা এখনো এর কোনো সহজ উত্তর খুঁজে পাননি। অর্থাৎ আমরা কেন বিরক্ত হই বা কীভাবে এটা থামানো যায়, তা নিয়ে এখনো গবেষণা চলছে।
ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক ২০২০ সালের দিকে বিরক্তি নিয়ে একটি মজার জরিপ চালায়। সেই জরিপ পড়লে মনে হবে, দেশকালভেদে বিরক্তির কারণগুলো পুরো পৃথিবীর মানুষের কাছে প্রায় একই রকম। প্রযুক্তিগত বিরক্তির শীর্ষে আছে ইন্টারনেটের ধীরগতি কিংবা ইউটিউবের সেই অসহ্য সব বিজ্ঞাপন। আবার শব্দের কথা বললে, রাস্তার জ্যামে আটকে থাকা বাসের বিকট হর্ন, বাসার পাশে সারা দিন নির্মাণকাজের শব্দ কিংবা কেউ মুখ হাঁ করে শব্দ করে খাবার খেলে কার না মাথা গরম হয়।
আর মানুষের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি মেজাজ খারাপ করে সেই সব পণ্ডিত, যারা না বুঝেই সব বিষয়ে জ্ঞান দিতে আসে। কিংবা কষ্ট করে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার সময় যারা হুট করে মাঝখানে ঢুকে পড়ে। ঢং করে ইংরেজি মিশিয়ে কথা বলা অনেকের কাছেই বেশ বিরক্তিকর। আসলে দেশভেদে সংস্কৃতির পার্থক্য থাকলেও অকারণ শব্দ, অযাচিত উপদেশ কিংবা খাবারের অদ্ভুত সব সংমিশ্রণ সব মানুষের কাছেই বিরক্তির।
বিরক্তি কি সবার জন্য একই? উত্তর হলো ‘না’। কোনো বিষয় তোমার কাছে চরম বিরক্তিকর মনে হলেও অন্য কারও কাছে, তা একদম স্বাভাবিক হতে পারে।
কিন্তু কেন এই সব বিষয় বিরক্তিকর মনে হয়? বিজ্ঞানীরা কেন কোনো বিষয়কে আমাদের কাছে বিরক্তিকর মনে হয়, এর পেছনে প্রধানত তিনটি কারণ খুঁজে পেয়েছেন। বিরক্তি হতে হলে বিষয়টি এমন হতে হবে, যা বিরক্তির কারণ ঠিকই, কিন্তু বড় কোনো শারীরিক ক্ষতি করবে না। যেমন কানের কাছে একটি মশার ভনভন শব্দ মেজাজ ভীষণ খারাপ করে দিতে পারে। কিন্তু এটি তোমাকে মেরে ফেলবে না। এই অল্প ক্ষতি কিন্তু অনেক অস্বস্তি—এটাই হলো বিরক্তির প্রথম ধাপ, যা তোমাকে বিপদে ফেলবে না, কিন্তু স্বস্তিতেও থাকতে দেবে না।
বিরক্তিকর বিষয়টি হতে হয় অপ্রত্যাশিত ও অনিয়মিত। যদি কোনো শব্দ বা গন্ধ সারাক্ষণ চলতেই থাকে, তবে আমাদের মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে তাতে অভ্যস্ত হয়ে যায়। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় হ্যাবিচুয়েশন বা অভ্যস্ততা। ঘরে থাকা পুরোনো ঘড়ির টিকটিক শব্দ প্রথমে কানে লাগলেও কিছুক্ষণ পর আমরা তা আর খেয়ালই করি না। কিন্তু যদি কোনো বাজে শব্দ বা দুর্গন্ধ হঠাৎ আসে আবার চলে যায়, তবে প্রতিবারই তা নতুন করে বিরক্তির জন্ম দেয়। কারণ, আমাদের মস্তিষ্ক সেটির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সুযোগ পায় না।
কোনো আপদ বা সমস্যা যদি হুট করে আসে ও আগে থেকে অনুমান করা না যায়, তবে সেটি সবচেয়ে বেশি বিরক্তিকর হয়ে ওঠে। কোনো কিছুর বিরুদ্ধে মানসিক প্রস্তুতি না থাকলে তা সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে। ধরো, তুমি আগে থেকেই জানো যে রাস্তায় জ্যামে আটকে যাবে, তখন তুমি হয়তো গান শুনে বা বই পড়ে নিজেকে শান্ত রাখার প্রস্তুতি নিতে পারবে। কিন্তু জ্যাম যদি হঠাৎ সামনে চলে আসে, তবে নিজেকে সামলানোর আগেই মেজাজ বিগড়ে যাবে। অর্থাৎ যে সমস্যার পূর্বাভাস পাওয়া যায় না, তাই আমাদের মাথায় দ্রুত রক্ত তুলে দেয়।
একসময় অন্যের ফোনে জোরে কথা বলা ছিল সবচেয়ে বিরক্তিকর বিষয়। কারণ, আমাদের মস্তিষ্ক সব সময় পুরো ঘটনা শুনতে চায়
বিরক্তি কি সবার জন্য একই? উত্তর হলো ‘না’। কোনো বিষয় তোমার কাছে চরম বিরক্তিকর মনে হলেও অন্য কারও কাছে, তা একদম স্বাভাবিক হতে পারে। আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের মতে, বিরক্তি আসলে প্রেক্ষাপটনির্ভর। অর্থাৎ ব্যক্তি, সমাজ আর সংস্কৃতিভেদে বিরক্তির কারণ বদলে যায়। ধরো, বাসে বা রেস্তোরাঁয় অপরিচিত কেউ যদি তোমার একদম গা ঘেঁষে বসে বা তোমার কাঁধে হাত দিয়ে কথা বলে, তবে তুমি হয়তো বিরক্ত হবে। কারণ, তুমি প্রাইভেসি পছন্দ করো। কিন্তু অনেক মানুষের কাছে এটিই আবার আন্তরিকতা বা বন্ধুত্বের বহিঃপ্রকাশ।
আমাদের ব্যক্তিত্ব আর চারপাশের পরিবেশই ঠিক করে দেয় আমরা কোন বিষয়ে কতটা বিরক্ত হব। নিজের গোপন কথা বলতে অনেকে লজ্জা পেলেও কেন কার ওপর মেজাজ খারাপ, তা নিয়ে আমরা অনর্গল কথা বলতে পারি। আসলে মানুষের বিরক্তিগুলো বিশ্লেষণ করলেই তার মনের কথা জানা যায়।
একসময় অন্যের ফোনে জোরে কথা বলা ছিল সবচেয়ে বিরক্তিকর বিষয়। কারণ, আমাদের মস্তিষ্ক সব সময় পুরো ঘটনা শুনতে চায়; কিন্তু ফোনে কেবল একজনের কথা শোনা গেলে মস্তিষ্ক খেই হারিয়ে ফেলে। আবার এখনকার জেনারেশনের কাছে হুট করে ফোনকল আসাটাই বিরক্তিকর। তাদের মতে, টেক্সট করলেই তো হয়, ফোন করার কী দরকার? অর্থাৎ প্রযুক্তির সঙ্গে সঙ্গে আমাদের বিরক্তির ধরনও পাল্টে যাচ্ছে।
বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে মিসোফোনিয়া। বিজ্ঞানীরা এই বিশেষ সমস্যা নিয়ে গবেষণা করছেন, যা ভবিষ্যতে আমাদের সবার বিরক্তি কমানোর পথ দেখাবে আশা বিজ্ঞানীদের।
সব বিরক্তি কিন্তু খারাপ নয়। পচা গন্ধে বমি ভাব হওয়া বা ধুলাবালু চোখে গেলে পলক ফেলা এগুলো আসলে আমাদের শরীরের নিজস্ব সুরক্ষাব্যবস্থা। ঠিক তেমনি, কড়া পারফিউম বা বিকট শব্দে আমাদের যে বিরক্তি লাগে, তা মূলত শরীরকে ক্ষতির হাত থেকে বাঁচানোর একটি প্রাকৃতিক সংকেত।
কিন্তু কিছু মানুষের কাছে সাধারণ শ্বাস নেওয়ার শব্দ বা চিপস খাওয়ার শব্দও অসহ্য মনে হয়। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে মিসোফোনিয়া। বিজ্ঞানীরা এই বিশেষ সমস্যা নিয়ে গবেষণা করছেন, যা ভবিষ্যতে আমাদের সবার বিরক্তি কমানোর পথ দেখাবে আশা বিজ্ঞানীদের।
বিরক্তি থেকে বাঁচার উপায় আসলে খুব সহজ। নিজের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে ফেলা। কোনো পরিস্থিতি যখন নিয়ন্ত্রণে থাকে না, তখন সেটি নিয়ে মন খারাপ না করে বরং অন্য কিছুতে মন দাও। সঙ্গে একটি ভালো বই রাখা কিংবা প্রিয় কোনো কথা চিন্তা করা কিংবা পছন্দের গান শোনা তোমাকে এই মানসিক চাপ থেকে নিমেষেই মুক্তি দিতে পারে।