ফোবিয়া কী, এটি থেকে মুক্তি পাব কীভাবে
বিখ্যাত হলিউড পরিচালক আলফ্রেড হিচককের ক্ল্যাসিক থ্রিলার মুভি ভার্টিগোর কথা শুনেছ কখনো? এই মুভির প্রধান চরিত্র স্কটি ফার্গুসনের এক অদ্ভুত সমস্যা ছিল। তার ছিল উচ্চতাভীতি। উঁচু কোনো জায়গায় গেলেই তার মাথা ঘুরত, হাত-পা কাঁপত, ভয়ংকর প্যানিক হতো। এই অতিরিক্ত ভয়ের কারণে একপর্যায়ে তাকে তার সাধের পুলিশের চাকরিটাই ছেড়ে দিতে হয়! মুভির গল্প তো বটেই, বাস্তব জীবনেও এই ফোবিয়া অনেক মানুষের জীবনকেই দুর্বিষহ করে তুলেছে।
মাকড়সা দেখলে ভয়ে সিঁটিয়ে যাওয়াও একধরনের ফোবিয়া। একে বলে অ্যারাকনোফোবিয়া। আবার বদ্ধ জায়গায় আটকে পড়ার ভয়কে বলে ক্লস্ট্রোফোবিয়া। অনেকে ইঁদুর দেখে লাফিয়ে ওঠে। এই ভয়কে বলে মুসোফোবিয়া। এমন নানা ধরনের ফোবিয়ায় ভোগেন বিশ্বের অসংখ্য মানুষ। শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই প্রায় ১৩ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনো ফোবিয়ায় আক্রান্ত! কিন্তু এই ফোবিয়া আসলে কী? সাধারণ ভয়ের সঙ্গে এর পার্থক্যই–বা কোথায়? একে ভয় না বলে কেন আলাদাভাবে ফোবিয়া বলে?
ফোবিয়া আসলে কী
ফোবিয়া হলো কোনো বস্তু বা পরিস্থিতির প্রতি অতিরিক্ত ও অযৌক্তিক ভয়। ধরো, একটা ছোট তেলাপোকা তোমার তেমন কোনো ক্ষতি করতে পারবে না, কিন্তু সেটা দেখে যদি তুমি প্রচণ্ড আতঙ্কিত হয়ে পড়ো, ঘামতে থাকো এবং সেখান থেকে পালানোর জন্য মরিয়া হয়ে ওঠো; তবে সেটি ফোবিয়া। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে ফাইট অর ফ্লাইট রেসপন্স। মানে শরীরকে লড়াই করা কিংবা পালানোর জন্য প্রস্তুত করা। কোনো ভয় তখনই ফোবিয়ায় রূপ নেয়, যখন ওই ভয়ের কারণে তুমি সেই জিনিসগুলো এড়িয়ে চলতে শুরু করো এবং তা তোমার স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করে।
ফোবিয়া কেন হয়
প্রথমে জানতে হবে ফোবিয়া আসে কোথা থেকে? এর পেছনে কি কোনো ভয়ংকর দুর্ঘটনা বা ট্রমা দায়ী? অনেক সময় তা-ই হয়! ধরো, কেউ হয়তো কোনো মারাত্মক গাড়ি দুর্ঘটনার শিকার হলো, অথবা দীর্ঘক্ষণ লিফটে আটকে গেল। ওই সময় তার মনে হয়েছিল, সে হয়তো মারাই যাবে! এই চরম আতঙ্ক থেকে তার মনে লিফট বা গাড়ির প্রতি এক গভীর ফোবিয়া তৈরি হতে পারে।
তবে সব ফোবিয়াই যে কোনো দুর্ঘটনার কারণে হবে, তা কিন্তু নয়। যেসব জিনিস বা পরিস্থিতির সঙ্গে আমরা সচরাচর মুখোমুখি হই না, সেগুলোর প্রতিও আমাদের মনে অজানা কারণে ফোবিয়া জন্ম নিতে পারে।
ফোবিয়া কি বংশগত
অনেকেই ভাবেন, ফোবিয়া হয়তো বংশগত! মা–বাবার থাকলে সন্তানেরও হয়। সরাসরি জিনের মাধ্যমে ফোবিয়া ছড়ানোর আশঙ্কা খুব কম। তবে মা–বাবার আচরণ থেকে সন্তান এই ভয় শিখতে পারে। ধরো, তোমার মা বা বাবা কুকুর খুব ভয় পান এবং কুকুর দেখলেই রাস্তা এড়িয়ে চলেন। তুমি ছোটবেলা থেকে এটা দেখতে দেখতে বড় হলে তোমার মনেও কুকুরের প্রতি একটা ফোবিয়া তৈরি হতে পারে। আবার মা-বাবার অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা করার স্বভাব সন্তানের মধ্যে এলে, সে-ও সাধারণ বিষয়গুলোকে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বিপজ্জনক ভাবতে শুরু করে।
ছোটবেলার ভয় বনাম ফোবিয়া
ছোটবেলায় আমরা সবাই অনেক কিছু ভয় পাই। ক্লাউন, পোকা, অন্ধকার বা ভূত—বাচ্চাদের ভয়ের কোনো শেষ নেই! কিন্তু বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা যখন পৃথিবীটাকে বুঝতে শিখি, তখন এই ভয়গুলো এমনিতেই কেটে যায়। আমরা বুঝতে পারি, ক্লাউনরা আসলে আমাদের ক্ষতি করতে আসেনি, বরং হাসাতে এসেছে। তাই ছোটবেলার সব ভয়ই যে বড় হয়ে ফোবিয়ায় রূপ নেবে, এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই।
ফোবিয়া থেকে মুক্তির উপায় কী
এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, ফোবিয়া থেকে মুক্তির উপায় কী? সঠিক চিকিৎসায় ফোবিয়া পুরোপুরি দূর করা সম্ভব! এর সবচেয়ে কার্যকর চিকিৎসা হলো কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি ও এক্সপোজার থেরাপি।
এই থেরাপিতে রোগীকে তার ভয়ের কারণগুলোর মুখোমুখি হতে শেখানো হয়। তবে সেটা একবারে নয়, খুব ধীরে ধীরে এবং সম্পূর্ণ নিরাপদ পরিবেশে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো, ভয়ের মুখোমুখি হওয়ার পর শরীরে যে অস্বস্তি তৈরি হয়, সেটাকে সহ্য করতে শেখা। তুমি যখন ধীরে ধীরে বুঝতে পারবে যে জিনিসটাকে তুমি ভয় পাচ্ছ, সেটা আসলে তোমার কোনো ক্ষতি করছে না, তখন তোমার মস্তিষ্ক নিরাপদ বোধ করবে।
সবচেয়ে বড় কথা হলো, তোমার ভয়ের অনুভূতিটাকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা তোমার নিজের হাতেই আছে। ভয় পেলেও তুমি যদি সেই পরিস্থিতি থেকে পালিয়ে না গিয়ে শক্ত হয়ে দাঁড়াতে পারো, তবে ফোবিয়া একসময় নিজেই হার মানতে বাধ্য হবে!