প্রকৃতিবিদ ডেভিড অ্যাটেনবরো কেন লন্ডন ছাড়া অন্য কোথাও থাকেন না

স্যার ডেভিড অ্যাটেনবরোছবি: রয়টার্স

অন্ধকার গ্রীষ্মের রাত। ঘাসের ওপর কাত হয়ে শুয়ে আছেন ৯৯ বছর বয়সী এক বৃদ্ধ। একমনে দেখছেন একটা ছোট্ট কাঁটাওয়ালা প্রাণী। বাগানে খুঁটে খুঁটে খাবার খুঁজছে ওটা। বৃদ্ধ ফিসফিস করে হেসে বললেন, ‘আমার এদের খুব ভালো লাগে।’

কণ্ঠস্বরে সেই চিরচেনা বালকসুলভ বিস্ময়, অথচ তার সঙ্গেই মিশে আছে শতবর্ষ ছোঁয়ার অভিজ্ঞতা। তিনি আমাদের সময়ের সবচেয়ে বিখ্যাত প্রকৃতিবিদ ও ব্রডকাস্টার স্যার ডেভিড অ্যাটেনবরো। গত ৭০ বছর ধরে তিনি আমাদের পুরো পৃথিবী ঘুরিয়ে দেখিয়েছেন। রুয়ান্ডার পাহাড় থেকে সমুদ্রের তলদেশ পর্যন্ত কোথায় যাননি তিনি!

কিন্তু জীবনের এই শেষ প্রান্তে এসে নতুন এক ডকুমেন্টারিতে অ্যাটেনবরো ফিরেছেন তাঁর নিজের ঘরে। নাম ওয়াইল্ড লন্ডন। কেন লন্ডন?

প্যাশন প্ল্যানেটের এক্সিকিউটিভ প্রডিউসার গ্যাবি বাসটিরা খুব সুন্দর একটা কথা বলেছেন। তিনি বলেন, ‘স্যার ডেভিড চাইলে পৃথিবীর যেকোনো জায়গায় রাজার হালে থাকতে পারতেন। কিন্তু দিন শেষে তিনি সব সময় লন্ডনেই ফিরে এসেছেন। এই শহর তাঁর ভালোবাসার জায়গা।’

সারা জীবন রোমাঞ্চকর সব জায়গায় ঘুরলেও লন্ডনের প্রতি ডেভিডের এই টানের আসল কারণটা বেশ সাদামাটা। তিনি বলেন, ট্রপিক্যাল বা গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বনাঞ্চলগুলো দেখতে অবিশ্বাস্য সুন্দর হলেও সেখানে বসবাস করাটা কিন্তু মোটেও আরামদায়ক নয়। সেখানকার ভ্যাপসা গরম আর পোকামাকড় নিত্যদিনের সঙ্গী। সে তুলনায় লন্ডনের নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়া তাঁর কাছে স্বর্গের মতো। নিজের বাড়ির পেছনের বাগানে ঋতু পরিবর্তনের খেলা দেখাটাকেই তিনি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আনন্দ মনে করেন। তাই তো আমাজন বা আফ্রিকার জঙ্গল তাঁকে ডাকলেও, দিন শেষে শান্তির খোঁজে তিনি লন্ডনের ওই পুরোনো বাড়িতেই ফিরে আসেন।

আরও পড়ুন

এখন প্রশ্ন হলো, যিনি রুয়ান্ডার পাহাড়ি গরিলা দেখেছেন, অস্ট্রেলিয়ার লায়ারবার্ডের মিমিক্রি শুনেছেন কিংবা নীল তিমির পাশে ছোট নৌকা নিয়ে ভেসেছেন, তিনি লন্ডনের ভিড়ভাট্টায় কী এমন বন্য প্রাণী পাবেন?

বিশ্বাস করুন আর না করুন, লন্ডনেও আছে এক অদ্ভুত বন্য জগৎ। হ্যামারস্মিথ স্টেশনের ট্রেনের ছাদে লাফানো কবুতর থেকে শুরু করে খালের পাড়ে সাপের কলোনি আছে! প্রায় ৯০ লাখ মানুষের এই শহরেই আমাদের চোখের আড়ালে ঘটে যাচ্ছে প্রকৃতির নানা নাটক।

ডকুমেন্টারির একটা দৃশ্যে দেখা যায়, রোমফোর্ডের ড্যাগনাম পার্কে একটা ডালমেশিয়ান কুকুর আপনমনে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সে জানেই না, তার খুব কাছেই গরমের দিনের ঝোপঝাড়ের আড়ালে লুকিয়ে আছে মাত্র কয়েক দিন বয়সী এক হরিণশাবক! ইন্ডিয়ান জঙ্গলে বাঘের শিকার ধরার দৃশ্য নয়, বরং শহরের পার্কে পোষা প্রাণী আর বন্য প্রাণীর এই অদ্ভুত সহাবস্থানই স্যার ডেভিড আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন। লন্ডন ওয়াইল্ডলাইফ ট্রাস্টের প্রধান ডেভিড মুনি এই দৃশ্য দেখে মুগ্ধ হয়ে বলেছেন, ‘বন্য প্রাণীরা সব সময় আমাদের সঙ্গেই আছে, আমরা শুধু খেয়াল করি না।’

আর মাত্র কয়েক মাস পরেই ডেভিড ১০০ বছরে পা দেবেন। এই বয়সে এসে প্রাণীদের প্রতি তাঁর মমতা যেন আরও গভীর হয়েছে। ডকুমেন্টারিতে দেখা যায়, পার্লামেন্ট ভবনের কাছে তিনি হাতে তুলে নেন পেরিগ্রিন ফ্যালকনের এক ছানাকে। পাখির পায়ে শনাক্তকরণের জন্য রিং পরানোর সময় তিনি বাচ্চাটার দিকে তাকিয়ে পরম মমতায় বলেন, ‘এখন আমরা তোমাকে যেকোনো জায়গায় চিনতে পারব—হ্যাঁ, হ্যাঁ, তোমাকেই।’

আরও পড়ুন

আবার পশ্চিম লন্ডনের গ্রিনফোর্ডে এক ছোট্ট হারভেস্ট মাউস হাতে নিয়ে তিনি ঘাসের ওপর ছেড়ে দেন। আলতো করে বলেন, ‘স্বাগতম তোমার নতুন বাড়িতে—যাও এবার।’ ইঁদুরটি যেন তাঁর হাতের ওই ওম ছেড়ে যেতেই চাইছিল না! পরিচালক জো লনক্রেইন বলেন, বহু দিন পর তিনি স্যার ডেভিডের মধ্যে প্রাণীদের প্রতি এমন উষ্ণতা আর ভালোবাসা দেখলেন।

পশ্চিম লন্ডনের ইলিং বিভার প্রজেক্ট দেখে ডেভিড দারুণ মুগ্ধ। তিনি বলেন, ‘আমি যখন প্রথম লন্ডনে এসেছিলাম, কেউ যদি বলত একদিন আমি এই শহরে বন্য বিভার দেখব, আমি তাকে পাগল ভাবতাম। কিন্তু দেখুন, ওরা ঠিক আমার পেছনেই!’

লন্ডন বিশ্বের অন্যতম সবুজ মহানগরী। আর এই বিভারগুলো প্রমাণ করে যে মানুষ আর বন্য প্রাণী চাইলে একসঙ্গে সুন্দরভাবে বাঁচতে পারে।

আমরা হয়তো প্রতিদিন অফিসের তাড়ায় ছুটছি, বাচ্চার স্কুল বা বাজারে যাওয়ার পথে আশপাশে তাকানোর সময় পাই না। কিন্তু জো লনক্রেইনের ভাষায়, ‘একটু থামুন। আপনার চোখের সামনেই হয়তো অপরূপ কোনো প্রাণী বসে আছে।’

ডেভিড মুনি পুরো ডকুমেন্টারির সারমর্ম টেনেছেন এভাবে, ‘মানুষকে প্রকৃতির দিকে তাকাতে হবে। তাকালে মায়া জন্মাবে, মায়া জন্মালে তারা সেটা রক্ষা করতে চাইবে। আর রক্ষা করলেই প্রকৃতি আবার প্রাণ ফিরে পাবে।’

৯৯ বছর বয়সী স্যার ডেভিড অ্যাটেনবরো তাঁর এই শেষ বয়সের কাজে আমাদের সেই থামার কথাই মনে করিয়ে দিলেন। প্রকৃতি কেবল আমাজনের জঙ্গলে নেই, আছে আপনার বাড়ির পেছনের বাগানটাতেও!

সূত্র: বিবিসি

আরও পড়ুন