সাদাব আর ফিরবে না

অলংকরণ: সব্যসাচী চাকমা

২১ জুলাই ২০২৫। বেলা ১টা। মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে ক্লাস চলছে। সাদাবের দিকে তাকিয়ে আবিদ বলল, ‘তোকে আর আমি জীবনেও খাতা দেখাব না। তুই আমারটা দেখে দেখে লিখে আমার চেয়ে বেশি নম্বর পেয়ে গেছিস।’ সাদাব হাসতে হাসতে বলল, ‘আরে, ৫ নম্বরই তো বেশি পেয়েছি। এত রাগছিস কেন? গত বছর, ক্লাস ফোরে বার্ষিক পরীক্ষায় তুই তো আমার খাতা দেখে লিখেই পাস করেছিলি, এবার নাহয় আমি লিখলাম!’

সাদাবের কথার উত্তর না দিয়ে স্কুলের ব্যাগ নিয়ে হাঁটা শুরু করল আবিদ। সাদাব বলল, ‘কী রে, আজ কোচিং করবি না?’ আবিদ বলল, ‘নাহ্‌, ইচ্ছা করছে না।’ সাদাব বলল, ‘যা, বাড়িতে যা। বাড়িতে গেলেই তো আন্টির কাছে ঝাড়ি খাবি।’ আবিদ কিছু না বলেই ওর স্কুলের ব্যাগ নিয়ে বাড়ির দিকে হাঁটা শুরু করল। সাদাব বলল, ‘কী রে, একটা বাইও বলে যাচ্ছিস না?’ আবিদ গোমড়া মুখে বলল, ‘তোর সঙ্গে কথা বলতেই আর ইচ্ছা করছে না।’

আরও পড়ুন

আবিদের বাড়ি মাইলস্টোন স্কুল থেকে খুব বেশি দূরে নয়। হঠাৎ ‘বুম’ করে একটা শব্দ শুনতে পেল। তারপর দেখল, ওর স্কুলের দিক থেকে মানুষজন ছুটতে ছুটতে এদিকে আসছে। মানুষজনের মুখে আবিদ শুনল, মাইলস্টোন স্কুলে নাকি প্লেন ক্র্যাশ হয়েছে। কিছু না ভেবেই তাড়াতাড়ি স্কুলে গেল ও। তারপর দেখতে পেল, স্কুলে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। আবিদ দেখল, ওদের ক্লাসেরই বেশ কিছু বাচ্চা দৌড়ে পালাচ্ছে। অনেকের মরদেহ স্বেচ্ছাসেবকেরা নিয়ে যাচ্ছে। ও তাড়াতাড়ি সাদাবকে খুঁজতে লাগল। হঠাৎ মাঠে পড়ে থাকা সাদাবের নিথর দেহের দিকে আটকে গেল ওর চোখ। সাদাবের অর্ধেক শরীর পুরো ঝলসে গেছে। মুখের চামড়াও কেমন যেন সাদা হয়ে গেছে। ও তাড়াতাড়ি সাদাবের কাছে গিয়ে সাদাবকে ঝাঁকাতে লাগল। ‘এই সাদাব, ওঠ, চোখ খোল। ভয় পাস না, ডাক্তারের কাছে গেলেই তুই ঠিক হয়ে যাবি।’ আবিদ তাড়াতাড়ি একজন স্বেচ্ছাসেবককে ডেকে বলল, ‘আঙ্কেল, আমার বন্ধু অজ্ঞান হয়ে গেছে। প্লিজ, ওকে একটু তাড়াতাড়ি হাসপাতালে নিয়ে যান।’ স্বেচ্ছাসেবকটি কয়েক সেকেন্ড সাদাবকে দেখলেন। তারপর আবিদের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, ‘বাবু, শোনো, তোমার বন্ধু আর বেঁচে নেই। তুমি কি ওর মা–বাবা কাউকে চেনো?’

আরও পড়ুন

এ কথা শুনে আবিদের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। ও বলল, ‘এসব কী বলছেন! সাদাবের সঙ্গে একটু আগেই আমার কথা হয়েছিল।’ তারপর সাদাবকে ধরে জোরে জোরে ঝাঁকাতে লাগল। বলল, ‘এই সাদাব, ওঠ। দেখ এই আঙ্কেল বলছে, তুই নাকি মরে গেছিস! আর কতক্ষণ এভাবে মটকা মেরে পড়ে থাকবি? আমি প্রমিজ করছি, এবার থেকে তোকে প্রতিটা পরীক্ষার খাতা দেখাব। তুই বেশি নম্বর পেলেও তোর সঙ্গে ঝগড়া করব না। প্লিজ, উঠে পড়, একবার চোখটা অন্তত খোল।’

সাদাব যদি আর একবার চোখ খুলত, তাহলে দেখতে পেত, যে ছেলে ওর সঙ্গে কথা বলবে না বলে বাড়ির দিকে হাঁটা দিয়েছিল, সে–ই এখন শুধু ওর চোখ খোলার অপেক্ষায় উন্মাদের মতো চিৎকার করছে!

লেখক: শিক্ষার্থী, দশম শ্রেণি, শহীদ নজমুল হক বালিকা উচ্চবিদ্যালয়, রাজশাহী

আরও পড়ুন