পেলে হয়ে ওঠার বিশ্বকাপ

সুইডেন বিশ্বকাপের আগপর্যন্ত ফুটবল-বিশ্বে ব্রাজিলের পরিচিতি ছিল ‘অপ্রতিরোধ্য’ হিসেবে। ফর্মের দিক দিয়ে নয় বরং অংশগ্রহণের দিক দিয়ে। বিশ্বকাপের প্রথম পাঁচ আসরে ব্রাজিলই একমাত্র দেশ, যাদের অংশগ্রহণে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি কোনো কিছু। বিশ্বযুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, গণবর্জন—সবকিছু পাশ কাটিয়ে বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ ঠিক রেখেছিল তারা। কিন্তু বিশ্বকাপ ছুঁয়ে দেখা হয়নি কখনো। বিশ্বকাপে পা দেওয়ার আগে থেকেই তাদের লক্ষ্য থাকে একটাই— যেভাবেই হোক, বিশ্বকাপ তাদের পেতে হবেই।

১৯৫৮ সালে ১৬টি দল নিয়ে বিশ্বকাপের ষষ্ঠ আসর বসে সুইডেনে। কোনো প্রতিযোগিতা ছাড়াই সেবার বিশ্বকাপের আয়োজক দেশ হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিল সুইডেন। তবে সেবার বিশ্বকাপের সব আলো কেড়ে নিয়েছিল ব্রাজিল।

১৯৫৮ বিশ্বকাপের পোস্টার

আনকোরা তরুণ এক দল নিয়ে বিশ্বকাপে হাজির হয়েছিল ব্রাজিল। সেই বিশ্বকাপের সেরা ১০ দলেও তাদের জায়গা হতো কি না সন্দেহ। কিন্তু ব্রাজিল একটি জায়গায় নিজেদের লক্ষ্য ঠিক করে রেখেছিল, যত যা-ই হোক ইউরোপ থেকে খালি হাতে ফেরা যাবে না। দলের সঙ্গে ছিল ফিজিও, চিকিৎসক, মনোবিজ্ঞানী। এমনও শোনা যায়, খেলোয়াড়দের মনোযোগে ঘাটতি হতে পারে ভেবে হোটেলের সব নারী কর্মীর বদলে পুরুষ কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়।

আরও পড়ুন

ব্রাজিল তার প্রমাণও দেয় বিশ্বকাপে। সোভিয়েত ইউনিয়ন, ইংল্যান্ড আর অস্ট্রিয়ার গ্রুপ থেকে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয় ব্রাজিল। আর গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে দেখা মেলে ১৭ বছর বয়সী এক খেলোয়াড়ের। ফুটবল-বিশ্বে রাজত্ব করার আহ্বান দিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপক্ষে বিশ্বকাপ অভিষেক হয় তাঁর। নাম—এডসন অরান্তেস দো নাসিমেন্তো। সংক্ষেপে পেলে। ফুটবল-বিশ্বকে নিজের জাদুতে মুগ্ধ করার শুরু ছিল সেখান থেকে।

১৭ বছর বয়সেই পেলে হয়ে উঠেছিলেন বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় তারকা।
ছবি: এক্স

পেলের ম্যাজিক শুরু হয় কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে। কোয়ার্টার ফাইনালে ওয়েলসের বিপক্ষে গোলের খাতা খোলেন পেলে। যদিও তাঁর উদ্‌যাপনের কারণে ইউরোপিয়ানদের কাছে হাসির পাত্রে পরিণত হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু তা নিয়ে থোড়াই কেয়ার করতেন পেলে। সেমিফাইনালে ব্রাজিলের প্রতিপক্ষ ফ্রান্স। এক বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলদাতা জুস ফন্তেনের ফ্রান্স। আর সেই ফ্রান্সের বিপক্ষেই হ্যাটট্রিক করে বসেন পেলে। হয়ে যান বিশ্বকাপের ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ হ্যাটট্রিক করা ফুটবলার। ব্রাজিল আবারও ফাইনালে।

স্টকহোমের ফাইনালে ব্রাজিলের মুখোমুখি স্বাগতিক সুইডেন। কিন্তু ঝামেলা বাধে জার্সি নিয়ে। দুই দলেরই জার্সির রং হলুদ। টসে হেরে হলুদ জার্সির মায়া ছাড়তে হয় ব্রাজিলকে। শেষ মুহূর্তে এসে একজন পরামর্শ দেন তাদের কুখ্যাত সাদা জার্সি পরে মাঠে নামার। কিন্তু মুখের কথা মুখেই থেকে যায়, সাদা জার্সির পরিকল্পনা বাদ পড়ে যায় তালিকা থেকে। ব্রাজিল বেছে নেয় তাদের পুরোনো অ্যাওয়ে জার্সি—নীল।

আরও পড়ুন

স্বাগতিক হওয়ার ফায়দা নিতে প্রস্তুত সুইডেন মাঠের পাশে রেখেছিল চিয়ারলিডার, যাতে ব্রাজিল দলের খেলায় বিঘ্ন সৃষ্টি করা যায়। কিন্তু ব্রাজিল দলের অভিযোগে তা প্রত্যাহার করা হয়।

বিশ্বকাপ জয়ের আনন্দে মাতোয়ারা ব্রাজিল।
ছবি: এক্স

ম্যাচ শুরুর চার মিনিটের মাথায় সুইডেনকে এগিয়ে নেন অধিনায়ক নিলস লাইদহোম। সুইডিশদের আনন্দ স্থায়ী হয়েছিল মাত্র ৫ মিনিট। ৯ মিনিটে ব্রাজিলকে সমতায় ফেরান ভাভা। ৩২ মিনিটে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন রিনি। ২-১ গোলে শেষ হয় প্রথমার্ধ। আর এরপর শুরু হয় ‘দ্য পেলে শো’, তর্কাতীতভাবে বিশ্বকাপ ফাইনালের অন্যতম সেরা পারফরম্যান্স।

ম্যাচের ৫৫ মিনিটে প্রথম ম্যাজিক দেখান পেলে। এরপর তাঁর বানিয়ে দেওয়া বল থেকে ৬৮ মিনিটে গোল করেন মারিও জাগালো। আর সুইডেনের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেন পেলে নিজেই। ৯০ মিনিটে তাঁর করা গোলে ফাইনালের বাঁশি বাজে ৫-২ গোলে। প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ শিরোপা স্পর্শ করে ব্রাজিল। স্টকহোমের রাসুন্দা স্টেডিয়ামে সেদিন ছিল পিনপতন নীরবতা। একদিন যে স্বপ্নভঙ্গ হয়েছিল ব্রাজিলের, তারা সেই স্বপ্ন জয় করল আরেক স্বাগতিককে পরাস্ত করে।

আরও পড়ুন