পরীক্ষার হলে এমন কখনো হয়েছে, যখন প্রশ্নটা জানো, উত্তরটাও জানো; কিন্তু লিখতে পারছ না? সবাই নিশ্চয় একসঙ্গে বলে উঠবে অবশ্যই, এমনটা তো সবারই হয়। পরীক্ষার হলে গিয়ে জানা প্রশ্নের উত্তর ভুলে যাওয়া তো স্বাভাবিক একটা ব্যাপার। কিন্তু একই ঘটনা যদি ঘটে বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে, যেখানে সামান্যতম ভুল করা সাজে না। ২০০৬ বিশ্বকাপে এমনই এক ঘটনা ঘটিয়েছিলেন ব্রিটিশ রেফারি গ্রাহাম পোল। এক ভুল করে রীতিমতো ইতিহাসের পাতায় নাম লিখিয়েছেন তিনি।
জার্মানি বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের খেলা, মুখোমুখি ক্রোয়েশিয়া আর অস্ট্রেলিয়া। ম্যাচের ৬২ মিনিটে ক্রোয়েশিয়ার ডিফেন্ডার জোসিপ সিমুনিচকে প্রথম হলুদ কার্ড দেখান রেফারি পোল। ৯০ মিনিটের মাথায় আরেকটি ফাউল করে হলুদ কার্ড দেখেন সিমুনিচ। ফুটবলের নিয়ম কী বলে? হলুদ কার্ডের পাশাপাশি তাঁকে লাল কার্ড দেখিয়ে এখনই মাঠ থেকে বের করে দেওয়া উচিত। কিন্তু রেফারি যেন বেমালুম ভুলেই গিয়েছিলেন সেই কথা। সিমুনিচও নিজ থেকে কিছুই বলেননি। ফলে দুই হলুদ কার্ড দেখেও ঠিকই ম্যাচ খেলে গিয়েছিলেন তিনি।
কিন্তু সেই ভাগ্য আর বেশিক্ষণ থাকল না, ম্যাচ শেষ হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে রেফারির সঙ্গে বাগ্বিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন সিমুনিচ। সঙ্গে সঙ্গেই পকেট থেকে হলুদ কার্ড বের করে সিমুনিচকে দেখিয়ে দেন রেফারি। এবার আর গ্রাহাম পোল কোনো ভুল করেননি, তাঁর ‘হিসাব’ অনুযায়ী পরপর দুই হলুদ কার্ড দেখার কারণে লাল কার্ড দেখান সিমুনিচকে। ফলে এবার সত্যি সত্যিই মাঠ ছাড়তে হয়েছিল তাঁকে। অন্যদিকে ম্যাচ ২-২ গোলে ড্র হওয়াতে বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় বলতে হয় ক্রোয়েশিয়াকে।
মজার ব্যাপার হলো গ্রাহাম পোলের এই ভুল পুরো বিশ্ব দেখলেও দেখার সুযোগ ছিল না রেফারির। কারণ, সে সময় তো ভিএআর ছিল না, আবার চতুর্থ রেফারি মূল রেফারিকে সংকেতও দিতে পারেননি, কারণ ম্যাচের একদম শেষ সময় চলছিল। তবে ভুলটা ধরা পড়ে ম্যাচ রিপোর্ট করার সময়। রেফারিরা সাধারণত সবগুলো কার্ডের নম্বর লিখে রাখেন কার্ডের পেছনে, তবু কীভাবে এই ভুল হলো?
রেফারি গ্রাহাম পোল সিমুনিচের প্রথম হলুদ কার্ড লিখতে ভুল করেছিলেন। ক্রোয়েশিয়ার নম্বর ৩ এর বদলে তিনি অস্ট্রেলিয়ার নম্বর ৩ খেলোয়াড়ের নাম লিখেছিলেন। মজার ব্যাপার হলো, সিমুনিচের জন্ম ও বেড়ে ওঠা সবই অস্ট্রেলিয়ায়। ফলে তাঁর কথায় একটু অজি টান রয়েছে। সেই ভুল থেকেই হয়তো রেফারি অজি খেলোয়াড়কে হলুদ কার্ড দেখিয়েছেন। রেফারিকে সম্পূর্ণ দোষ দেওয়াও যায় না, ২-২ গোলে ড্র হওয়া ম্যাচে মোট ৯টি হলুদ কার্ড দেখিয়েছেন রেফারি। এর মধ্যে দুই দলের তিনজনকে দুইবার হলুদ কার্ড দেখানোর পর দেখিয়েছেন লাল কার্ড। সেখানে একজনের গণনা ভুল হয়ে যাওয়া তো দোষের কিছু নয়।
এই এক ভুলের মাশুল দিতে হয়েছিল পোলের ক্যারিয়ার দিয়ে। প্রিমিয়ার লিগ ও আন্তর্জাতিকে প্রায় ১৫০০ ম্যাচ রেফারিং করা ব্রিটিশ রেফারি এই ঘটনার পর স্বেচ্ছায় নাম সরিয়ে নেন বিশ্বকাপ থেকে। আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকেও নিজেকে সরিয়ে নেন তিনি। তার এক বছর পর ইতি টানেন ২৯ বছরের রেফারিং ক্যারিয়ারের। গ্রাহাম পোল তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছিলেন, সেই মুহূর্তটি ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল। পুরো স্টেডিয়াম আর কোটি কোটি দর্শক যা দেখেছিলেন, খোদ রেফারি হয়েও তিনি তা দেখতে পাননি।