জার্মানি ৭ ব্রাজিল ১

ফুটবল ইতিহাসে এমন কিছু রাত আসে, যা পুরো বিশ্বকে মুহূর্তের জন্য থমকে দেয়। ২০১৪ সালের ৮ জুলাই শুধু ব্রাজিল নয়, থমকে গিয়েছিল পুরো বিশ্ব। অভিশপ্ত এক রাত পার করেছিল বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে থাকা ব্রাজিল ভক্তরা। বেলো হরিজন্তের মিনেইরাও স্টেডিয়ামে সেদিন ইতিহাস গড়েছিল জার্মানি, ৭-১ গোলের পরাজয় স্তব্ধ করে দিয়েছিল পুরো ব্রাজিলকে।

ফুটবল ব্রাজিলের কাছে কেবল একটি খেলা নয়, ফুটবল মিশে আছে ব্রাজিলিয়ানদের রক্তে। সেই ব্রাজিলে যখন ২০১৪ বিশ্বকাপের আসর বসল, তখন সবাই উন্মুখ হয়ে ছিলেন বিশ্বকাপটা নিজেদের কাছে রেখে দেওয়ার জন্য। ব্রাজিলের মাটিতে শেষ বিশ্বকাপ হয়েছিল ৬৪ বছর আগে, সেবার উরুগুয়ের কাছে হারার ক্ষত জ্বলজ্বল করেছে ব্রাজিলিয়ানদের বুকে। ২০১৪ সালে যখন বিশ্বকাপ আবারও ব্রাজিলে ফিরল, পুরো জাতির আশা ছিল, পুরোনো ক্ষত ধুয়ে নিজেদের মাটিতে ‘হেক্সা’ জয়ের। কিন্তু সেই বিশ্বাস ধুয়েমুছে গেল বেলো হরিজন্তের মিনেইরাও স্টেডিয়ামে। ফুটবল বিশ্ব দেখল ব্রাজিলের দ্বিতীয় ট্র্যাজেডি—‘মিনেইরাজো’।

আরও পড়ুন

ঘরের মাটিতে দুর্দান্ত এক বিশ্বকাপ শুরু করেছিল ব্রাজিল। গ্রুপ পর্বে ৭ পয়েন্ট নিয়ে নক আউট পর্বে পদার্পণ। চিলিকে টাইব্রেকারে হারিয়ে কোয়ার্টারে। আর সেখানে কলম্বিয়াকে ২-১ গোলে হারিয়ে ৮ বছর পর সেমিফাইনালে। কিন্তু কোয়ার্টার ফাইনালটাই হয়ে উঠেছিল ব্রাজিলের জন্য এক দুঃস্বপ্ন। ব্রাজিল ২-১ গোলে জিতে সেমিফাইনাল নিশ্চিত করলেও হারিয়েছিল নিজেদের দুই প্রাণভোমরাকে। ম্যাচের ৮৮ মিনিটে কলম্বিয়ার ডিফেন্ডার হুয়ান জুনিগার হাঁটুর এক আঘাতে মেরুদণ্ডের কশেরুকা ভেঙে যায় নেইমারের। আঘাত এতটাই গুরুতর ছিল যে তাঁকে সরাসরি নিয়ে যাওয়া হয় হাসপাতালে। সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বকাপ শেষ হয়ে যায় নেইমারের। চোট এতটাই গুরুতর ছিল যে একটু এদিক সেদিক হয়ে মেরুদণ্ডের হাড় পর্যন্ত ভেঙে যেতে পারত নেইমারের।

নেইমারের চোট বদলে দিয়েছিল ব্রাজিলের চিত্র
ছবি: এক্স

শুধু নেইমার নন, দলের অধিনায়ক থিয়াগো সিলভাও সেদিন পেয়েছিলেন হলুদ কার্ড। ফলে তিনিও ছিটকে যান সেমি থেকে। সব মিলিয়ে ব্রাজিল সেমিফাইনালে মুখোমুখি হলো জার্মানির। যেখানে না আছেন তাদের মূল তারকা নেইমার, না আছেন অধিনায়ক থিয়াগো সিলভা।

আরও পড়ুন

সেমির মাত্র চার দিন আগে দলের দুই গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়কে হারিয়ে রীতিমতো বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল ব্রাজিল। বিশ্বকাপজয়ী কোচ লুইস ফিলিপে স্কলারির কাছে তখন ট্যাক্টিকসের চেয়ে বড় হয়ে উঠল আবেগ। আবেগ দিয়েই যেন বিশ্বকাপের সেমির বাধা পার হতে চায় ব্রাজিল। বেলো হরিজন্তের মিনেইরাও স্টেডিয়াম তাই সেমিফাইনালের দিন পরিণত হয়েছিল শোককে শক্তিতে পরিণত করতে।

নেইমারের জার্সি নিয়ে সেমি শুরু করেছিল ব্রাজিল
ছবি: এক্স

পুরো স্টেডিয়াম তখন ‘প্লে ফর নেইমার’ স্লোগানে উত্তাল। স্টেডিয়ামে যখন জাতীয় সংগীত বাজছিল, ডেভিড লুইজ আর জুলিও সিজার মিলে উঁচিয়ে ধরেছিলেন নেইমারের ১০ নম্বর জার্সি। আবেগের বসে ব্রাজিল ভুলেই গিয়েছিল, এই জার্মানি মাপে মাপে খেলা এক রোবোটিক দল। যেখানে ভুলের মাশুল দিতে হবে হাজার গুণ। সেদিন থিয়াগো সিলভার বদলে মাঠে নেমেছিলেন দান্তে, আর নেইমারের জায়গায় বার্নার্ড।

বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়ার পর মিরোস্লাভ ক্লোসার উদ্‌যাপন
ছবি: এক্স

সেমির প্রথম দশ মিনিট বেশ আক্রমণাত্মকই ছিল ব্রাজিল। কিন্তু ১০ মিনিটের মাথায় টনি ক্রুসের কর্নার থেকে টমাস মুলারের গোল রীতিমতো ধসিয়ে দিল ব্রাজিলের ট্যাক্টিকস। ব্রাজিলের রক্ষণভাগ ভেঙে পড়ল তাসের ঘরের মতো। ২৩ থেকে ২৯ মিনিট—মাত্র ৬ মিনিটে ব্রাজিলের জালে জড়াল আরও ৪টি গোল! মিরোস্লাভ ক্লোসা, টনি ক্রুস (২টি) আর সামি খেদিরা ব্রাজিলিয়ান ডিফেন্স নিয়ে ছিনিমিনি খেলছিলেন। ব্রাজিলিয়ান কেন, খোদ বিশ্বের ফুটবল ভক্ত কেউ বিশ্বাসই করতে পারেননি, ব্রাজিল ৩০ মিনিটের মাথায় ৫ গোল হজম করেছে।

আরও পড়ুন

শুধু কি তাই, ২৩ মিনিটের মাথায় মিরোস্লাভ ক্লোসার গোল বদলে দিয়েছিল বিশ্বকাপের ইতিহাস আরেক দফা। ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি রোনালদো নাজারিওকে টপকে বিশ্বকাপের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ডটিও দখল করে নেন তিনি। স্বয়ং রোনালদো তখন কমেন্ট্রি বক্সে বসে সেই ঘটনার কমেন্ট্রি করছিলেন।

৫ গোল হজমের পর হতাশ ব্রাজিল
ছবি: এক্স

২৯ মিনিটেই ৫-০ গোলে পিছিয়ে পড়া ব্রাজিল শেষ হয়ে গিয়েছিল সেখানেই। মাঠের ভেতরে সবাই দিশাহারা, গ্যালারিতে কান্নার রোল। হাজার হাজার হলুদ জার্সি পরা সমর্থক—কেউ অঝোরে কাঁদছেন, কেউ তো হতাশায় ম্যাচ দেখতে না পেরে মাঠ ছেড়েই চলে গিয়েছিলেন। কিন্তু একবারের জন্য জার্মান ডিফেন্সে ভয়ের সঞ্চার করতে পারেনি ব্রাজিল। আর যে দুই একটা আক্রমণ হয়েছিল, সেটাও ম্যানুয়াল নয়্যারের কাছে নস্যি। প্রথমার্ধ শেষে জার্মান কোচ ড্রেসিংরুমে সবাইকে নিয়ে বলেছিলেনও ব্রাজিলকে যেন আর গোল না দেওয়া হয়। তাদের লক্ষ্য ফাইনাল খেলা, কাউকে অপমান করা নয়। শুধু নিজেদের খেলাটা স্বাভাবিকভাবে খেলে যেতে বলেছিলেন কোচ।

স্বাভাবিক খেলাটা খেলেই আরও ২ গোল ছিনিয়ে নেয় জার্মানি। দ্বিতীয়ার্ধে আন্দ্রে শুরলে বদলি হিসেবে নেমে করেন আরও দুটি গোল, স্কোরলাইন দাঁড়ায় ৭-০। ম্যাচের শেষ মুহূর্তে অস্কারের গোল শুধু লজ্জাটাকেই কমিয়েছে। পৃথিবীর ইতিহাসে এত শান্ত উদ্‌যাপন কখনো হয়েছে কিনা, সেটাও একটা বড় প্রশ্ন।

ব্রাজিল ভক্ত ক্লোভিস ফার্নান্দেসের দেখা বিশ্বকাপের শেষ ম্যাচ ছিল এটি
ছবি: এক্স

৭-১ গোলের হার ব্রাজিলের ইতিহাসে হয়ে রয়েছে এক লজ্জার ইতিহাস হয়ে, বিশ্বকাপের ইতিহাসে মিনেইরাজো হয়ে। পুরো ব্রাজিল সেদিন স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল, যেন কোনো জাতীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছে। ম্যাচ শেষে গোলরক্ষক জুলিও সিজার বলেছিলেন, ‘প্রথমার্ধের ওই ছয় মিনিট ব্যাখ্যা করার মতো কোনো শব্দ আমার কাছে নেই।’ বিশ্বের একসময়ের অন্যতম সেরা গোলরক্ষক সেদিন হয়ে ছিলেন দর্শক।

জার্মানি জানত নেইমারহীন ব্রাজিল ভাসবে আবেগে। তারা চাইবে প্রতিশোধ নিয়ে বিশ্বকে দেখিয়ে দিতে। রক্ষণে যে জায়গাটা থিয়াগো সিলভা ধরে রাখতেন, সেটাই হয়ে যাবে আলগা। আর সেখানেই টনি ক্রুস আর মেসুত ওজিলরা আঘাত হেনেছিলেন। অন্যদিকে ব্রাজিল মানসিকভাবে এতটাই ভেঙে পড়েছিল যে মাঠের ভেতরে নিজেদের স্বাভাবিক খেলাটাই ভুলে গিয়েছিল। সাম্বা ফুটবলের ছন্দ থমকে গিয়েছিল জার্মানির কৌশলী ফুটবলের তোড়ে।

আরও পড়ুন