যেদিন থমকে গিয়েছিল ব্রাজিলের ফুটবল

নিস্তব্ধতা ঠিক কতটা গভীর? সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সামর্থ্য খুব কম মানুষেরই আছে। জনসমুদ্র স্তব্ধ হয়ে যাওয়া ঠিক আনন্দের, না বিভীষিকার—সেটা নিজ চোখে না দেখলে বলা সম্ভব না। ১৯৫০ বিশ্বকাপের শেষ দিনের গল্পটা অবশ্য লেখা আছে বিভীষিকা হয়েই। মারাকানা স্টেডিয়ামে সেদিন অবাক হয়ে জুলে রিমে আবিষ্কার করেছিলেন, নিস্তব্ধতার এক অশরীরী অনুভূতি। ‘আমি যখন মাঠে নামলাম, দেখলাম কোনো জাতীয় সংগীত নেই, কোনো উৎসব নেই, শুধু এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা।’ মুহূর্তেই থমকে গিয়েছিল ব্রাজিলের আনাচে-কানাচে, গলিঘুপচিতে বেড়ে ওঠা প্রত্যেক ব্রাজিলিয়ানের স্বপ্ন। এক ‘মারাকানজো’ ট্র্যাজেডিতে।

১৯৫০ বিশ্বকাপ ছিল ফুটবলের আবারও মাথা তুলে দাঁড়ানোর লড়াই। বিশ্বযুদ্ধের কারণে টানা ১২ বছর বন্ধ ছিল বিশ্বকাপ। ১৯৫০ বিশ্বকাপ আয়োজনেও আগ্রহী ছিল মাত্র একটি দেশ, ব্রাজিল। নিজেদের জয়ের মঞ্চ তৈরি করেছিল নিজেরাই, শুধু বাকি ছিল একটা ছোট্ট ফিনিশিং টাচের। স্বপ্নের মতো শুরু করা বিশ্বকাপ শেষ করতে লাগবে মাত্র ১ পয়েন্ট।

বিশ্বকাপের শুরু থেকেই ব্রাজিল ছিল ফর্মের তুঙ্গে। ৩ ম্যাচে ২ জয় ১ ড্র নিয়ে ৫ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপের শীর্ষে ছিল ব্রাজিল। আদেমির, জিজিনহো ও জাইর যেন কবি—মাঠের ভেতরেই রচনা করছেন কাব্য। সত্যিকারের সাম্বা যাকে বলে, ’৫০ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের ফুটবল ছিল সেটাই।

আরও পড়ুন
সেদিনের মারাকানা স্টেডিয়াম।
ছবি: এক্স

সেই বিশ্বকাপে ছিল না কোনো নকআউট পর্ব, ছিল না বাদ পড়ার ভয়। ১৬ দল থেকে তিন দল আগেই নাম সরিয়ে নিয়েছে, ফলে বিশ্বকাপে বেঁচে ছিল ১৩ দল। এর মধ্যে উরুগুয়ের গ্রুপ থেকে বিদায় নিয়েছে দুজন। ব্রাজিল যেখানে তিন ম্যাচ খেলে সুযোগ করে নিয়েছে সেমিতে, উরুগুয়েকে খেলতে হয়েছে মাত্র এক ম্যাচ। বলিভিয়াকে ৮-০ গোলে হারিয়েই জায়গা করে নিয়েছে পরের পর্বে। স্বাগতিক ব্রাজিলের কাছে সুইডেন বিধ্বস্ত হলো ৭-১ গোলে আর স্পেন ধসে গেল ৬-১ গোলে। পুরো বিশ্বকাপে ফর্মের তুঙ্গে থাকা অপরাজিত ব্রাজিলকে আটকে রাখার সাধ্য কার?

দুই ম্যাচে ৪ পয়েন্ট নিয়ে সবার ওপরে তখন ব্রাজিল। শেষ ম্যাচে প্রতিপক্ষ এক উরুগুয়ে, যারা দুই ম্যাচে পেয়েছে ৩ পয়েন্ট। বিশ্বকাপের শেষ ম্যাচটা তাই পরিণত হলো এক অঘোষিত ফাইনালে। বিশ্বকাপ জিততে চাইলে উরুগুয়েকে জিততেই হবে, সেটাও ব্রাজিলের মাঠ থেকে। আর ব্রাজিলকে জিততে হলে? ড্র যথেষ্ট। ম্যাচের আগের দিন রিওর মেয়র জনসমক্ষে ঘোষণা করে দিয়েছিলেন, ‘তোমরা যারা আজ এখানে আছ, সেখানেই থাকো। তোমরাই আগামীকাল বিশ্বজয়ী হবে!’ এমনকি ফিফা প্রেসিডেন্ট জুলে রিমে পর্যন্ত ব্রাজিলের ভাষায় তাঁর অভিনন্দন বার্তা পকেটে নিয়ে বসেছিলেন গ্যালারিতে। বিন্দুমাত্র সময় যাতে নষ্ট না হয়। গুঞ্জন আছে, মাঠে নামার আগেই ২২টি সোনার মেডেল তৈরি করা হয়েছিল, যাতে খোদাই করা ছিল ব্রাজিলিয়ান খেলোয়াড়দের নাম। সবকিছুই প্রস্তুত ব্রাজিলের বিশ্বজয়ের জন্য।

১৬ জুলাই, ১৯৫০। মারাকানার গ্যালারিতে তিল ধারণের জায়গা নেই। এক লাখ সিটের মাঠে দর্শকের সংখ্যা ছাড়িয়েছে দুই লাখ। ভিআইপি ছাড়া কারও বসার জায়গা নেই, সবাই উত্তেজনায় খেলা দেখছে দাঁড়িয়ে। বিশ্বকাপ নিজেদের করে নিতে বাকি আর মাত্র ৯০ মিনিট। উরুগুইয়ান অধিনায়ক ভারেলা দলের খেলোয়াড়দের মোটিভেশন দিচ্ছিলেন, ‘দুই লাখ মানুষের দিকে তাকিও না, মাঠে শুধু আমরা ১১ জন আর ওরা ১১ জন।’ নিজেও জানতেন এ ফাঁকা বুলি। কিন্তু ভাগ্য তাকিয়ে ছিল অন্যদিকে।

আরও পড়ুন
ফ্রিয়াঙ্কার গোল।
ছবি: এক্স

দুই লাখ মানুষকে আনন্দে ভাসিয়ে দেন ব্রাজিলিয়ান স্ট্রাইকার ফ্রিয়াঙ্কা। ৪৭ মিনিটে তাঁর গোলে এগিয়ে যায় ব্রাজিল। ব্রাজিলের ঘরে ঘরে তখন আনন্দের উদ্‌যাপন শুরু হয়ে গিয়েছে। কিন্তু এরপরেই দুঃস্বপ্নের মতো বয়ে আসে ব্রাজিলিয়ানদের জীবনের সবচেয়ে বড় ঝড়। ১৫ মিনিটের সেই ঝড়ে তোলপাড় হয়ে গেল ব্রাজিলিয়ান ডিফেন্স। ৬৬ মিনিটে উরুগুয়েকে সমতায় ফেরান আলবার্তো শিয়াফিনো। ব্রাজিলের কাছে তখনো সুযোগ বাকি আছে। কিন্তু সবাইকে স্তব্ধ করে দিলেন আলসিদেস ঘিঘিয়া। ঝড়ের বেগে বল নিয়ে ডি–বক্সে ঢুকলেন, ব্রাজিলিয়ান কিপার মোয়াসির বারবোসা ভেবেছিলেন ঘিঘিয়া হয়তো ভেতরে ক্রস দেবেন, তাই গোলবার ছেড়ে একটু এগিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু শট নিলেন সরাসরি, কাছের পোস্টে আলতো করে বাড়ালেন বল। বারবোসার হাতের নিচ দিয়ে বল জড়িয়ে গেল জালে। রেফারির লম্বা গোলের বাঁশি। স্কোরলাইন ২-১!

দুই লাখ মানুষ মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলেন সেদিন। স্টেডিয়ামজুড়ে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল ঘিঘিয়ার চিৎকার আর উদ্‌যাপন। ঘিঘিয়া নিজেও অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখেছিলেন, পুরো স্টেডিয়াম বুঝি এভাবেই স্তব্ধ হয়ে যেতে পারে। সেদিন থেকে ব্রাজিলিয়ানদের জীবন বিভক্ত হয়ে গিয়েছে দুই ভাগে, ঘিঘিয়ার গোলের আগে ও পরে। ঘিঘিয়া গর্ব করে আজও বলেন, ‘ইতিহাসে মাত্র তিনজন মানুষ মারাকানাকে এক নিমিষে স্তব্ধ করে দিতে পেরেছে—পোপ, ফ্রাঙ্ক সিনাত্রা এবং আমি।’

আরও পড়ুন
আলবার্তো শিয়াফিনোর প্রথম গোল।
ছবি: এক্স

ম্যাচের শেষ বাঁশি গুঁড়িয়ে দিয়েছিল প্রত্যেক ব্রাজিলিয়ানের জীবন। পরাজয়ের হতাশায় ব্রাজিলের বিখ্যাত রেডিও জকি আরি বেরেসো আর কোনো দিনও মাইক হাতে তুলে নেননি। চারজন খেলোয়াড় মাঠ থেকেই ঘোষণা দেন অবসরের। জুলে রিমে যখন ট্রফি নিয়ে মাঠে নামলেন, দেখলেন নেই কোনো জাতীয় সংগীত, নেই কোনো উদ্‌যাপন। উরুগুয়ের অধিনায়ক ভারেলা একা দাঁড়িয়ে আছেন শিরোপা নিতে। উরুগুয়ের ভক্তরাও সেদিন ভাবেনি, বিশ্বকাপ তাদের কাছে যেতে পারে, উদ্‌যাপনের প্রস্তুতি ছিল একেবারের নগণ্য। সেই উদ্‌যাপনেই পর্দা উঠল ১৯৫০ বিশ্বকাপের।

১৯৫০ বিশ্বকাপ বদলে দিয়েছিলে ব্রাজিলিয়ানদের জীবন। বিশেষ করে গোলরক্ষক মোয়াসির বারবোসার। মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত আক্ষেপ কুরে কুরে খেয়েছে তাঁকে। ব্রাজিলের অনুশীলনে পর্যন্ত তাঁকে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি ১৯৯৩ সালে। সেদিন আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘ব্রাজিলে সর্বোচ্চ শাস্তি ৩০ বছরের কারাদণ্ড। কিন্তু আমি সেই ১৯৫০ সাল থেকে ৫০ বছর ধরে এমন এক অপরাধের সাজা ভোগ করছি, যা আমি একা করিনি।’

এই ম্যাচের পর বদলে গিয়েছিল ব্রাজিলের ইতিহাস। নিজেদের সাদা জার্সিকে অপয়া ভেবে ছুড়ে ফেলে তারা। বেছে নেয় হলুদ জার্সি। ৭৬ বছর পর এসেও ব্রাজিল একবারের জন্যও সাদা জার্সিতে খেলেনি। সেদিনের স্কোয়াডে থাকা মাত্র দুজন খেলোয়াড় পরবর্তী সময়ে জিতেছিলেন বিশ্বকাপ। বেঞ্চে বসে থাকা ডিফেন্ডার নিলটন সান্তোস আর ব্যাকআপ গোলরক্ষক কার্লোস কাস্তিলহো। আর সেদিন থেকেই ব্রাজিল জেগে ওঠে, হয়ে ওঠে আজকের পরাক্রমশালী, পাঁচবারের বিশ্বজয়ী ব্রাজিল। যার জন্ম হয়েছিল মারাকানা স্টেডিয়ামের দুই লাখ মানুষের সামনে স্তব্ধ হয়ে।

আরও পড়ুন