বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড়েরা কে কী করছেন
৩৯ দিন, ১০৪টা ম্যাচ, ১৬টি শহর, ৪৮ দেশ, আর ৩০৮টি গোল! এভাবেই পর্দা নামল ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের। এবারের বিশ্বকাপটা কিন্তু বেশ জমেছিল। আগের কয়েকটা আসরের চেয়ে বড় তারকারা এবার নিজেদের সেরা খেলাটা দেখিয়েছেন, করেছেন একের পর এক গোল।
তুমি যদি ফুটবলে নতুন হয়ে থাকো, আর বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পর এই তারকাদের খেলা আরও দেখতে চাও, তাহলে কী করবে? কারণ, এখন তো তাঁরা সবাই ফিরে যাবেন যাঁর যাঁর ক্লাবে। এটাই ফুটবলারদের আসল চাকরি। এই তারকাদের আগামী দিনে কোথায় দেখা যাবে, সে খোঁজ পাবে এই লেখায়।
লিওনেল মেসি
বয়স: ৩৯
জাতীয় দল: আর্জেন্টিনা
ক্লাব: ইন্টার মায়ামি
বিশ্বকাপে কী করলেন
টানা দ্বিতীয়বারের মতো আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে তুললেন মেসি। একাই করেছেন ৮ গোল! কিন্তু টুর্নামেন্টজুড়ে তাঁর জাদুকরি পারফরম্যান্স থাকলেও ফাইনালে ছিলেন ম্লান। যার ফলে টুর্নামেন্টের সেরা দল স্পেনের কাছে ফাইনালে হার মানতে হয়েছে আর্জেন্টিনাকে।
সামনে কী করবেন
ছুটি কাটিয়ে মেসি আবার ফিরে যাবেন যুক্তরাষ্ট্রে। ইন্টার মায়ামির জার্সিতে তাঁর ২০২৬ মৌসুমের খেলা শুরু হয়েছে ২২ জুলাই। সে ম্যাচে শিকাগো ফায়ারের বিপক্ষে ৩-২ গোলে জিতেছে মেসির দল। যদিও তিনি দলে ছিলেন না, তবে ফিরতে পারেন ২৬ জুলাইয়ের ম্যাচে। ২০২৩ সালে মায়ামিতে যোগ দেওয়ার পর থেকেই তিনি সেখানে সুপারহিট। গত বছর দলকে জিতিয়েছেন এমএলএস কাপ। এবারও লক্ষ্য সেই শিরোপা ধরে রাখা।
ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো
বয়স: ৪১
জাতীয় দল: পর্তুগাল
ক্লাব: আল নাসর
বিশ্বকাপে কী করলেন
নিজের ষষ্ঠ বিশ্বকাপে মাঠে নেমেই গড়েছেন রেকর্ড। উজবেকিস্তানের বিপক্ষে জোড়া গোল করে প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে ছয়টি বিশ্বকাপে গোল করার কীর্তি গড়েন তিনি। পর্তুগাল অবশ্য শেষ ষোলোতে স্পেনের কাছে হেরে বিদায় নেয়।
সামনে কী করবেন
আমাদের তালিকার সবচেয়ে বয়সী এই তারকা সৌদি আরবের ফুটবল–বিপ্লবের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তাঁর ক্লাব আল নাসর গত মৌসুমে লিগ জিতেছে। ২০২৩ সালে সেখানে যাওয়ার পর এটাই রোনালদোর প্রথম বড় শিরোপা।
মাইকেল ওলিসে
বয়স: ২৪
জাতীয় দল: ফ্রান্স
ক্লাব: বায়ার্ন মিউনিখ
বিশ্বকাপে কী করলেন
ওলিসের টুর্নামেন্টটা কেটেছে দুর্দান্ত। এক আসরে সবচেয়ে বেশি অ্যাসিস্ট করার রেকর্ড গড়েছেন তিনি। সতীর্থদের দিয়ে ৭টি গোল করিয়েছেন, যা ভেঙে দিয়েছে ১৯৭০ সালে কিংবদন্তি পেলের গড়া ৬ অ্যাসিস্টের রেকর্ড!
সামনে কী করবেন
বায়ার্ন মিউনিখে হ্যারি কেইনদের সঙ্গে নিয়ে ইউরোপের অন্যতম ভয়ংকর আক্রমণভাগ সামলাবেন তিনি। গত মৌসুমে লিগ জিতলেও চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতা হয়নি, এবার সেটাই হবে মূল টার্গেট। তবে ওলিসের রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দেওয়ার কানাঘুষাও শোনা যাচ্ছে। দেখা যাক, শেষ পর্যন্ত ওলিসে বায়ার্নে থাকেন, নাকি এমবাপ্পে-ভিনির রিয়ালে আসেন!
উনাই সিমন
বয়স: ২৯
জাতীয় দল: স্পেন
ক্লাব: অ্যাথলেটিক বিলবাও
বিশ্বকাপে কী করলেন
স্পেনের বিশ্বকাপ জয়ের পেছনে গোলপোস্টের নিচে যেন এক দুর্ভেদ্য দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন সিমন। টুর্নামেন্টজুড়েই অসাধারণ সব সেভ করে দলের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছেন বহুগুণ। পুরো টুর্নামেন্টে গোল হজম করেছেন মাত্র ১টি।
সামনে কী করবেন
স্প্যানিশ ক্লাব অ্যাথলেটিক বিলবাওয়ের হয়েই মাঠ মাতাবেন তিনি। ক্লাবটির দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত মুখ সিমন চাইবেন বিশ্বকাপের এই দুর্দান্ত ফর্ম লা লিগাতেও ধরে রাখতে।
রদ্রি
বয়স: ৩০
জাতীয় দল: স্পেন
ক্লাব: ম্যানচেস্টার সিটি
বিশ্বকাপে কী করলেন
স্পেনের মাঝমাঠের আসল বস ছিলেন তিনিই। ইউরো জেতানোর পর এবার বিশ্বকাপ জয়েও রাখলেন বিশাল ভূমিকা। খেলাটা কখন ধীর করতে হবে আর কখন আক্রমণ শানাতে হবে, রদ্রির চেয়ে ভালো বোধ হয় এই মুহূর্তে আর কেউ বোঝেন না। তাই তো নিখুঁত বুদ্ধির জোরে কোনো গোল বা অ্যাসিস্ট না করেও ২০২৬ বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড় হলে তিনি। শুধু গোল করেই যে সেরা খেলোয়াড় হওয়া যায় না, এর প্রমাণ রদ্রি স্বয়ং!
সামনে কী করবেন
ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ মাতাবেন। কয়েক বছর ধরে বিশ্বের অন্যতম সেরা মিডফিল্ডার হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেছেন। নতুন কোচ মারেসকার দলেও রদ্রিই হবেন মাঝমাঠের প্রধান ভরসা।
মার্ক কুকুরেয়া
বয়স: ২৮
জাতীয় দল: স্পেন
ক্লাব: রিয়াল মাদ্রিদ
বিশ্বকাপে কী করলেন
স্পেনের লেফটব্যাক পজিশনে প্রতিপক্ষের আক্রমণভাগের খেলোয়াড়দের রীতিমতো নাচিয়ে ছেড়েছেন! ইউরোতে আলো ছড়ানোর পর বিশ্বকাপেও তাঁর ঝাঁকড়া চুলের দৌরাত্ম্য দেখেছে পুরো বিশ্ব।
সামনে কী করবেন
চেলসির অধ্যায় চুকিয়ে সদ্যই যোগ দিয়েছেন রিয়াল মাদ্রিদে। স্পেনের এই তারকা এবার নিজের দেশের সবচেয়ে বড় ক্লাবের হয়ে খেলবেন। নতুন ক্লাবে মানিয়ে নিয়ে লা লিগায় রিয়ালের হয়ে দাপট দেখানোই হবে তাঁর মূল মিশন।
পাউ কুবারসি
বয়স: ১৯
জাতীয় দল: স্পেন
ক্লাব: বার্সেলোনা
বিশ্বকাপে কী করলেন
স্পেনের ডিফেন্সে তরুণ এই তারকার উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। ইয়ামালের মতো তিনিও প্রমাণ করেছেন, স্পেনের নতুন প্রজন্ম কতটা তৈরি। নিখুঁত ট্যাকল ও পাসিংয়ে প্রতিপক্ষকে বেশ ভুগিয়েছেন। জিতেছেন সেরা তরুণ খেলোয়াড়ের পুরস্কার।
সামনে কী করবেন
বার্সেলোনার রক্ষণভাগের ভবিষ্যৎ মনে করা হয় তাঁকে। লা লিগা ও চ্যাম্পিয়নস লিগে ইয়ামালদের সঙ্গে মিলে বার্সাকে আবার ইউরোপের চূড়ায় নিয়ে যাওয়ার লড়াইয়ে নামবেন এই ১৯ বছর বয়সী তরুণ।
ভোজিনহা
বয়স: ৪০
জাতীয় দল: কেপ ভার্দে
ক্লাব: কোলো-কোলো
বিশ্বকাপে কী করলেন
এবারের বিশ্বকাপের অন্যতম বড় সারপ্রাইজ ছিল কেপ ভার্দে এবং তাদের ৪০ বছর বয়সী গোলরক্ষক ভোজিনহা। স্পেন ও আর্জেন্টিনার মতো বাঘা বাঘা দলের বিপক্ষে তাঁর অবিশ্বাস্য কিছু সেভ ও বীরত্বপূর্ণ পারফরম্যান্স ফুটবলভক্তদের মন জয় করে নিয়েছে। এমনকি চ্যাম্পিয়ন স্পেনের বিপক্ষে তিনি কোনো গোলই হজম করেননি!
সামনে কী করবেন
কেপ ভার্দে থেকে অ্যাঙ্গোলা, পর্তুগাল, স্লোভাকিয়া হয়ে এই অভিজ্ঞ গোলরক্ষক এখন খেলছেন চিলির বিখ্যাত ক্লাব কোলো-কোলোতে। ৪০ বছর বয়সেও বিশ্বকাপের এমন মঞ্চ কাঁপিয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন, বয়স আসলে একটা সংখ্যামাত্র! ক্লাব ফুটবলেও তিনি এই ঝলক ধরে রাখতে চাইবেন।
কিলিয়ান এমবাপ্পে
বয়স: ২৭
জাতীয় দল: ফ্রান্স
ক্লাব: রিয়াল মাদ্রিদ
বিশ্বকাপে কী করলেন
গোল করার দিক থেকে এমবাপ্পে রীতিমতো আগুন ঝরিয়েছেন এবার! ১০ গোল করে ছুঁয়ে ফেলেছেন ১৯৭০ সালে পশ্চিম জার্মানির গার্ড মুলারের রেকর্ড। ফ্রান্স সেমিফাইনাল থেকে বিদায় নিলেও এমবাপ্পে টুর্নামেন্টের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়ে নিজের নামটা কিংবদন্তিদের কাতারে পাকাপোক্ত করে নিয়েছেন।
সামনে কী করবেন
বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদে নিজের রাজত্বটা আরও শক্ত করতে চাইবেন এমবাপ্পে। গত মৌসুমে মাদ্রিদের সময়টা খুব একটা ভালো কাটেনি; কিন্তু এমবাপ্পে ঠিকই ৪৪ ম্যাচে ৪২ গোল করেছেন। মেসির যুগ তো শেষের পথে, এবার বর্তমান ফুটবলের গোট (GOAT) হওয়ার মুকুটটা নিজের মাথায় তুলে নিতে তিনি একদম প্রস্তুত।
আর্লিং হলান্ড
বয়স: ২৫
জাতীয় দল: নরওয়ে
ক্লাব: ম্যানচেস্টার সিটি
বিশ্বকাপে কী করলেন
নরওয়ের ফুটবল ইতিহাসের সেরা বিশ্বকাপটা কেটেছে এবার। ব্রাজিলকে হারিয়ে তারা পৌঁছে গিয়েছিল কোয়ার্টার ফাইনালে! আর এই পুরো যাত্রার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন হলান্ড। বাছাইপর্বে ১৬ গোল ও মূল পর্বে ৫ ম্যাচে ৭ গোল করে টুর্নামেন্টের তৃতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা তিনি।
সামনে কী করবেন
ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ক্লাব ম্যানচেস্টার সিটিতে খেলেন হলান্ড। সেখানে এবার নতুন যুগের শুরু। পেপ গার্দিওলার ১০ বছরের রাজত্ব শেষে নতুন কোচ এনজো মারেসকার অধীন খেলবেন হলান্ড। সিটিতে এটা তাঁর পঞ্চম মৌসুম। এরই মধ্যে সব মিলিয়ে ১৬২টি গোল করে ফেলেছেন এই গোলমেশিন!
লামিন ইয়ামাল
বয়স: ১৯
জাতীয় দল: স্পেন
ক্লাব: বার্সেলোনা
বিশ্বকাপে কী করলেন
ট্রফিটাই জিতে নিলেন! ব্যক্তিগতভাবে হয়তো খুব বেশি গোল বা অ্যাসিস্ট করতে পারেননি (মাত্র ১টি করে), কিন্তু টুর্নামেন্ট যত গড়িয়েছে, তত ধারালো হয়েছেন ইয়ামাল। স্পেনের দলগত পারফরম্যান্সের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিলেন তিনি।
সামনে কী করবেন
একজন কিশোর হিসেবে ইয়ামাল এরই মধ্যে যা অর্জন করেছেন, তা ফুটবল ইতিহাসে রীতিমতো বিরল। তিনটি লা লিগা, ইউরো ২০২৪ এবং ২০২৬ বিশ্বকাপ! তিনি এখন বার্সেলোনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়। তাঁর একমাত্র অপূর্ণতা চ্যাম্পিয়নস লিগ। ২০২৬-২৭ মৌসুমে ইয়ামাল ও বার্সার প্রধান লক্ষ্য থাকবে এটাই।
জুড বেলিংহাম
বয়স: ২৩
জাতীয় দল: ইংল্যান্ড
ক্লাব: রিয়াল মাদ্রিদ
বিশ্বকাপে কী করলেন
আন্তর্জাতিক ফুটবলে এটা ছিল বেলিংহামের সেরা টুর্নামেন্ট। ৭ গোল করে ইংল্যান্ডকে সেমিফাইনালে তুলতে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে ফ্রান্সের বিপক্ষে তাঁর একক চেষ্টায় করা গোলটা তো মনে রাখার মতো।
সামনে কী করবেন
গত কয়েক মৌসুমে ট্রফিহীন থাকা রিয়াল মাদ্রিদকে আবার তাদের হারানো গৌরব ফিরিয়ে দেওয়ার গুরুদায়িত্ব থাকবে এই ইংলিশ তারকার কাঁধে।
হ্যারি কেইন
বয়স: ৩২
জাতীয় দল: ইংল্যান্ড
ক্লাব: বায়ার্ন মিউনিখ
বিশ্বকাপে কী করলেন
৭ ম্যাচে ৬ গোল করেছেন কেইন। তাঁর ওপর ভর করেই ইংল্যান্ড ১৯৬৬ সালের পর নিজেদের সেরা সাফল্য হিসেবে বিশ্বকাপে তৃতীয় স্থান অধিকার করেছে।
সামনে কী করবেন
বায়ার্ন মিউনিখের ইতিহাসের অন্যতম সফল স্ট্রাইকার হয়ে উঠেছেন কেইন। গত মৌসুমে ইউরোপের সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে জিতেছিলেন গোল্ডেন শু। এবার নতুন কোচের অধীন বায়ার্নের মূল লক্ষ্য হবে চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতা, আর কেইন থাকবেন সেই অভিযানের মূল অস্ত্র।
উসমান দেম্বেলে
বয়স: ২৯
জাতীয় দল: ফ্রান্স
ক্লাব: প্যারিস সেন্ট জার্মেই (পিএসজি)
বিশ্বকাপে কী করলেন
এমবাপ্পেকে নিয়ে চারপাশের তুমুল আলোচনার মধ্যে নিজের কাজটা ঠিকই করে গেছেন উসমান দেম্বেলে। দারুণ খেলেছেন পুরো বিশ্বকাপে। করেছেন হ্যাটট্রিকসহ ৬টি গোল।
সামনে কী করবেন
গত বছরের ব্যালন ডি’অরজয়ী এই ফরাসি তারকা খেলেন ইউরোপের গত দুবারের সেরা দল পিএসজিতে। ফ্রেঞ্চ লিগ জেতা তো তাদের জন্য ডালভাত। কোচ লুইস এনরিকের অধীন এবার পিএসজির মূল লক্ষ্য টানা তৃতীয় চ্যাম্পিয়নস লিগ ঘরে তোলা।