২০১২ সালের এপ্রিল মাসে কিশোরদের জন্য নববর্ষ সংখ্যা প্রকাশ করেছিল প্রথম আলো। কিশোর আলোর পূর্বসূরী বলা চলে এই সংখ্যাটাকে। এটি ব্যাপক জনপ্রিয় হওয়ার পর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, বের হবে কিশোর আলো। সেই সংখ্যায় লিখেছিলেন প্রখ্যাত সব লেখকেরা। আসছে ১ অক্টোবর কিশোর আলোর ১৩তম জন্মদিন। জন্মদিনের আনন্দ পাঠকের সঙ্গে ভাগাভাগি করতে নববর্ষ সংখ্যা থেকে ধারাবাহিকভাবে লেখা প্রকাশিত হবে শুধু কিশোর আলো অনলাইনে। কিআ পাঠকের জন্য থাকল মুশফিকুর রহিমের শৈশবের গল্প।
আমাদের বাসাটা তখন ছিল এক তলা। আমরা, বড় চাচারা সবাই একসঙ্গে থাকতাম। যৌথ পরিবার মানেই অনেক মজা। অনেক হইচই। বাচ্চাদের তো সারা বছরই ঈদ লেগে থাকে! আমি তখন বগুড়া জিলা স্কুলে ক্লাস ফাইভে পড়ি। বাসায় আইন ছিল ছোটদের জন্য, স্কুল থেকে ফেরার পর আসরের আজানের আগ পর্যন্ত আমাদের ঘর থেকে বের হওয়া নিষেধ। এই সময়ে ঘুমাতে হবে বা পড়তে হবে। খেলা যাবে না। বাসার ভেতর একটা লম্বা করিডর ছিল। আমার বড় চাচা আসার আগ পর্যন্ত ওখানে আমরা ইচ্ছেমতো ক্রিকেট খেলতাম। তবে উনি গেট দিয়ে ঢোকার আগে মোটরসাইকেলের শব্দ শুনেই বুঝতে পারতাম চাচা এসে গেছেন। শব্দ শুনে দৌড়ে ঘরে ঢুকে বিছানায় শুয়ে পড়তাম সবাই। চোখ বন্ধ করে ঘুমের ভান করে পড়ে থাকতাম।
বড় চাচাও বোধহয় বুঝতেন ওটা আসল ঘুম নয়,ঘুমের ভান। ঘরে ঢুকে সবাইকে সুড়সুড়ি দিয়ে দেখতেন আসলেই আমরা ঘুমোচ্ছি কি না। ভাইয়াদের কারও সুড়সুড়ি ছিল না। চাচা যতই চেষ্টা করতেন, তাঁরা ঠিকই ঘুমের ভান করে পড়ে থাকতেন। কিন্তু আমার তো অনেক সুড়সুড়ি। আমি বাঁচতে পারতাম না। চাচা সুড়সুড়ি দিলেই লাফ দিয়ে উঠে পড়তাম। ধরা খেয়ে যেতাম। খেলতাম সবাই, অথচ বকাটা খেতাম আমি!
শুধু বড় চাচা নন, একবার দাদাভাইও আমাকে বিপদে ফেলে দিয়েছিলেন। ছোটবেলায় আমি আর আমার বড় ভাই দাদার সঙ্গে নদীতে গোসল করতে যেতাম। বাসার কাছেই করতোয়া নদী। নদীতে নামলে তো বোঝই, সহজে উঠতে ইচ্ছে করে না। মনে হতো সারা দিন নদীতেই পড়ে থাকি। নদীর পাড়ের ধারেই দুই ভাই গোসল করতামাই দাপাদাপি করি। তবে আমরা সাঁতার পারতাম না। বললেন, 'এবার বাড়ি চল। আর থাকার দরকার নেই। সর্দি-জ্বর হয়ে যাবে। কাল আবার আসব।' কিন্তু সেদিন আমাদের নদী থেকে একদমই উঠতে ইচ্ছে করছিল না। দাদাভাই গামছা দিয়ে গা-টা মুছে বাসায় ফেরার জন্য তৈরি। অথচ আমরা তখনো গোসল করছি। এই দেখে দাদাভাই আবার পানিতে নামলেন। আমরা তো খুশি, যাক দাদাভাই আবার নামছেন। আমাদের নিয়ে নিশ্চয়ই আরও কিছু সময় থাকবেন।
একদমই তৈরি ছিলাম না। হঠাৎই আমার এক পা কিন্তু তিনি পানিতে নেমে যা করলেন, তার জন্য আর এক হাত ধরে চ্যাংদোলা করে নদীর মাঝখানের দিকে ছুড়ে ফেললেন!
আমি তখন মাত্র ফোর-ফাইভে পড়ি। সাঁতার-টাতার পারি না। ভাইয়াও পারেন না। আমার এই দশা দেখে ভীষণ ভয় পেয়ে গেলেন ভাইয়া। আমি তো পেলামই। ভাবলাম, আজ বোধহয় ডুবেই যাব। ভাগ্য ভালো নদীর ওই দিকটায় পানি কম ছিল, ডুবিনি। তবে পানি খেতে খেতে আমার অবস্থা খারাপ। এরপর যখন উঠলাম, দাদা বললেন, 'কী, আর গোসল করবি? না শখ মিটে গেছে?' আমি তাড়াতাড়ি বললাম, 'না না না... আর করব না। তাড়াতাড়ি বাসায় চলেন।'