হিজল-করচ বন যেভাবে মাছের নার্সারি হিসেবে কাজ করে

প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠা হিজল-করচ-বরুণগাছের পাশাপাশি বেত, ইকরা, খাগড়া, মুর্তা ও শণজাতীয় গাছ রাতারগুলকে জলাবন হিসেবে অনন্য করেছে।

আষাঢ়ের শেষ দিকে সিলেটের হাওরে পানি ঢুকতে শুরু করে। রাতারগুলের দিকে গেলে তখন একটা অদ্ভুত জিনিস চোখে পড়ে। ডাঙার গাছ পানির নিচে ডুবে আছে, অথচ পাতা সবুজ, ডালপালা অক্ষত। নৌকা থেকে পানির দিকে তাকালে বোঝা যায়, গাছের ডাল যেখানে ডুবে গেছে, ঠিক সেখানেই ছোট ছোট মাছ ঝাঁক বেঁধে ঘুরছে। এই গাছ দুটো হিজল আর করচ। মাছেদের কাছে এই ডোবা জঙ্গলটাই আসলে সবচেয়ে নিরাপদ ঠিকানা।

হিজলের বৈজ্ঞানিক নাম ব্যারিংটোনিয়া অ্যাকুট্যাঙ্গুলা। গাছটা পানির সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে অসাধারণভাবে। বছরের বেশির ভাগ সময় শুকনা মাটিতে দাঁড়িয়ে থাকে, বর্ষা এলে গোড়া থেকে অনেকখানি অংশ ডুবে যায়, তাতে গাছের কিছুই হয় না। করচের নাম পোঙ্গামিয়া পিন্নাটা, এটাও জলাভূমিতে টিকে থাকতে অভ্যস্ত। দুই গাছ একসঙ্গে জন্মালে শিকড়ের একটা জাল তৈরি হয়ে যায় পানির নিচে। সেই জাল দেখতে অনেকটা এলোমেলো সুতার বল, কিন্তু মাছের জন্য এটাই দুর্গ।

পোনা মাছ যখন ডিম ফুটে বের হয়, তখন এতটাই ছোট থাকে যে খোলা পানিতে এক মিনিটও টিকে থাকা কঠিন। শোল, বোয়াল কিংবা পানকৌড়ির মতো শিকারিরা তখন ওত পেতে থাকে চারপাশে। হিজল-করচের ডালপালার ফাঁকে ঢুকে গেলে বড় মাছ আর সহজে পৌঁছাতে পারে না, শরীরের গড়নই তাদের বাধা দেয়। পানির নিচের জঙ্গলটা তখন একটা দেয়ালের কাজ করে, নরম অথচ ভেদ করা কঠিন।

আরও পড়ুন

খাবারের দিক থেকেও জায়গাটা সমৃদ্ধ। গাছের ডালে জমে থাকা শেওলা, পচা পাতা থেকে জন্ম নেওয়া অতি ক্ষুদ্র জীব, পোকামাকড়ের ডিম, এসব মিলিয়ে একটা টেবিলভর্তি খাবার তৈরি হয়ে যায় পোনার জন্য। কোনো একটা নির্দিষ্ট খাবার নয়, বরং পচনের গন্ধ থেকে শুরু হওয়া পুরো একটা শৃঙ্খল। জেলেরা বলেন, এই পানির রং একটু ঘোলাটে সবুজ হয়ে যায় বর্ষার মাঝামাঝি সময়ে, আর সেই রংই নাকি বলে দেয় নিচে পোনা আছে কি নেই।

পানিতে ডোবা হিজল, করচের গাছ
ছবি: এম এ হান্নান

বাংলাদেশের অনেক নদী আর হাওরের মাছ এই বনের ওপর নির্ভরশীল। পুঁটি, টেংরা, খলশে—এরা সবাই বর্ষার শুরুতে ডিম ছাড়ে এমন জায়গায়, যেখানে গাছ ডুবে থাকে পানির নিচে। মা মাছ ঠিক কীভাবে জায়গাটা চিনে নেয়, তা এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি। তবে পানির স্রোত কম আর ছায়াঘেরা পরিবেশ, এই দুটো জিনিস যে মাছকে টানে, সেটা গবেষকেরা বহুবার দেখেছেন। খোলা পানিতে স্রোতের টানে ডিম ভেসে যায়, গাছের জঙ্গলে পানি প্রায় স্থির থাকে।

সিলেটের রাতারগুল আর সুনামগঞ্জের কিছু বিলে এই বাস্তুতন্ত্র এখনো টিকে আছে, যদিও জায়গাগুলো কমছে বছর বছর। হাওরে বাঁধ উঠছে, রাস্তা হচ্ছে, আর অনেক জায়গায় হিজল-করচগাছ কাটা হয়েছে জ্বালানির জন্য। স্থানীয় এক মাঝি একবার বলেছিলেন, তাঁর ছোটবেলায় যে গাছের সারি ছিল নদীর ধারে, তার অর্ধেকই আর নেই। গাছ কমলে পোনার আশ্রয়ও কমে যায়, আশ্রয় কমলে মৃত্যুহার বাড়ে, আর তার প্রভাব গিয়ে পড়ে বাজারের মাছের দামে, জেলের হাতে জমা টাকায়।

আরও পড়ুন

এই পুরো ব্যবস্থাটা দাঁড়িয়ে আছে একটুকরা ডোবা গাছের ওপর। একটা ডাল, তার গায়ে জমে থাকা শেওলা, সেই শেওলা খেয়ে বড় হওয়া একঝাঁক পোনা—কোথাও একটা সুতা ছিঁড়ে গেলে পুরো নদীর মাছের সংখ্যায় তার আঁচ লাগে। বিজ্ঞানীরা এ ধরনের জায়গাকে বলেন ফিশ নার্সারি, মাছের শৈশব কাটানোর জায়গা। জেলেরা অবশ্য এই শব্দ কখনো ব্যবহার করেননি, তাঁরা শুধু জানেন গাছের কাছে জাল ফেললে মাছ বেশি ওঠে। কথাটা তাঁরা জানতেন প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে, গবেষণা তো এল অনেক পরে।

কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, হিজল-করচ বনের আশপাশে মাছ ধরা পড়ার হার খোলা পানির তুলনায় লক্ষণীয়ভাবে বেশি। মাছের ঘনত্ব বেশি থাকে সেখানে, স্বাভাবিকভাবেই ধরাও পড়ে বেশি। এই বাস্তুতন্ত্র বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা কিছু জায়গায় শুরু হয়েছে। কেউ কেউ নদীর ধারে নতুন করে হিজল-করচ লাগাচ্ছেন, কেউ বর্ষার মৌসুমে গাছের কাছাকাছি মাছ ধরা কিছুদিনের জন্য বন্ধ রাখছেন। খুব বড় আন্দোলন নয়, তবু গ্রামের মানুষ নিজেরাই বুঝে গেছেন, গাছ কমে গেলে মাছও কমে যাবে একদিন।

পরেরবার হাওর বা বিল এলাকায় গেলে যদি দেখো পানির মধ্যে অর্ধেক ডোবা কিছু গাছ দাঁড়িয়ে, একটু থেমে তাকিয়ে দেখো ডালের ফাঁকগুলোর দিকে। ওখানে হয়তো এখনই কোনো পোনা লুকিয়ে আছে, চোখে দেখা যাচ্ছে না, তবু বেড়ে উঠছে নিজের মতো করে।

সূত্র: সায়েন্স ডিরেক্ট
আরও পড়ুন