যেভাবে ২২ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটাল আর্সেনাল

২০ মে, ভোর ছয়টা। লন্ডনের এমিরেটস স্টেডিয়ামের সামনে আস্তে আস্তে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। আর্সেনাল সমর্থকেরা ঘরে ফিরে গেছেন, অন্যরাও প্রস্তুতি নিচ্ছেন ঘরে ফেরার। এমন সময় হুট করেই জটলা তৈরি হলো গেটের কাছে। রাস্তায় সমর্থকদের সঙ্গে মিশে গিয়ে উদ্‌যাপন করছেন টুপি পরা কয়েকজন। টুপি খুলতেই তার নিচ থেকে বেরিয়ে এল পরিচিত কয়েকটা মুখ। ডেকলান রাইস, বুকায়ো সাকা, এবেরাচি এজে—প্রত্যেকের মুখে সারা রাতের ক্লান্তি। কে বলবে তাঁরা পেশাদার খেলোয়াড়! দেখে বোঝার উপায় নেই, প্রত্যেকেই মিশে গেছেন সমর্থকদের মধ্যে। ডেকলান রাইস ভাঙা গলায় সবাইকে ডাকছেন, ‘এসো এসো। এখন তো সময় উদ্‌যাপনের।’ আসলেই সময়টা এখন উদ্‌যাপনের। ২২ বছরের অপেক্ষার পূর্ণতা, আর্সেনাল পেল ছাব্বিশে এসে।

আর্সেনালের অপেক্ষার গল্পটা ঠিক কোন জায়গা থেকে শুরু করা উচিত, এটা ভাবতেও বেশ সময় লেগে যায়। আর্সেনালের গল্প যতটা না অপেক্ষার, তার চেয়ে বেশি নিজেদের প্রমাণ করার। দীর্ঘ সময় ধরে আর্সেনালের ডাগআউটে দেখা গেছে আর্সেন ওয়েঙ্গার নামের এক পরিচিত মুখ। আধুনিক ফুটবলের যুগান্তকারী সব আইডিয়ার রূপকারও তিনি। ২০০৪ সালে শেষবারের মতো তাঁর হাত ধরেই প্রিমিয়ার লিগ শিরোপা জিতেছিল আর্সেনাল। সেটাও ছিল এক অপরাজিত শিরোপা। লিগের ৩৮ ম্যাচের ৩৮টি না হেরে ‘গোল্ডেন প্রিমিয়ার লিগ’-এর একমাত্র মালিক হয়েছিল গানার্সরা। সেখানেই শেষ, আর্সেনাল এর পর থেকে আর নিজেদের লিগের শীর্ষে খুঁজে পায়নি। ঘুরপাক খেয়েছে হারের বৃত্তে।

আর্সেন ওয়েঙ্গার আর্সেনালকে হাইবারি স্টেডিয়াম থেকে নিয়ে এসেছিলেন এমিরেটসে। এমিরেটস স্টেডিয়াম ছিল আর্সেনালের নতুন এক পরিচয়। নিজেদের টাকায় বানানো স্টেডিয়ামই একসময় হয়ে ওঠে বিষফোড়া। কারণ, বড় খেলোয়াড় কেনার জন্য হাতে ছিল না অঢেল টাকা, ওয়েঙ্গারকে তাই দল চালাতে হয়েছে এমন খেলোয়াড়দের নিয়েই, যাঁরা ভালোবেসে এসেছিলেন আর্সেনালে। সেখান থেকেই যেন বদলে গিয়েছিল আর্সেনালের দর্শন। ওয়েঙ্গার কোচ হিসেবে আর কখনোই প্রিমিয়ার লিগের ছোঁয়া পাননি। তাঁর সামনে দিয়ে নবীন কোচরা উদ্‌যাপন করেছেন, ওয়েঙ্গার পারেননি। তাঁর পরিকল্পনায় মাথা তুলে দাঁড়ানো এমিরেটস স্টেডিয়ামে বিশাল ব্যানার নেমেছে তাঁরই পদত্যাগের দাবিতে। বছরের পর বছর ‘#ওয়েঙ্গারআউট’ হ্যাশট্যাগে মুখরিত ছিল আর্সেনালের ফ্যানবেজ। কিন্তু একবার ওয়েঙ্গার দায়িত্ব ছাড়তেই যেন সবটা ফিরে এল আর্সেনালের কাঁধে। বছরের পর বছরে ধরে হারের বৃত্তে ঘুরপাক খাওয়া আর্সেনাল স্বপ্ন দেখতে চেয়েছিল অন্য কোচে ভর করে। ট্রফি খুঁজতে গিয়ে রীতিমতো হতাশ হওয়ার দশা। চ্যাম্পিয়নস লিগ দূরে থাক, ইউরোপা থেকেও বেরিয়ে গিয়েছিল তারা। শিরোপার খোঁজে অবশেষে শরণাপন্ন হলো নিজেদেরই একসময়ের ভরসা, মিকেল আর্তেতার কাছে।

আরও পড়ুন
২২ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটাল আর্সেনাল
ছবি: এক্স

আর্তেতা পেপ গার্দিওলার সান্নিধ্য পেয়েছেন দীর্ঘদিন, প্রিমিয়ার লিগে কাজ করার অভিজ্ঞতাও দারুণ। আর্সেনাল–ভক্তদের স্বপ্ন আস্তে আস্তে বুনতে শুরু হয়েছিল তাঁর হাত ধরেই। কিন্তু স্বপ্ন বুনতে তো সময় লাগে, আর্তেতা দলকে সেভাবেই বুঝিয়েছেন। যেভাবেই হোক না কেন, ভরসা রাখতে হবে। শিরোপা এক দিনে আসে না। আর যে শিরোপা এক দিনে আসে, সেই জয় বেশি দিন টিকে থাকেও না। মিকেল আর্তেতার কথায় ভরসা খুঁজে পেয়েছে গানার্সরা, স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিল নতুন করে।

আর্তেতার শুরুটাও যে খুব একটা আশাব্যঞ্জক ছিল, তা নয়। আর্সেনালের অনেক ভক্ত আর্তেতার সঙ্গে স্বপ্নে তাল মেলাতে ভয় পাচ্ছিলেন। প্রতিটি কোচ এসেই স্বপ্ন দেখান—এই মৌসুমেই সব জিতে দেখিয়ে দেব। আর্তেতা বলতেন অপেক্ষা করতে, স্বপ্ন দেখার আগেই অপেক্ষার গল্প শুনতে কার ভালো লাগবে? কিন্তু আর্তেতা কথা রেখেছিলেন। প্রথম মৌসুমেই জিতেছিলেন এফএ কাপ। এরপর শুরু হোঁচট খাওয়া। ঠিক হোঁচট খেয়ে পড়ে যাওয়া নয়, বরং তিন পা এগোলে পিছিয়ে যাচ্ছিলেন এক পা। এত বড় পাহাড় বইতে হলে এসব একটু–আধটু হোঁচট তো খেতে হবেই। তাতে দমে যায়নি আর্সেনাল।

যার প্রতিদানও পেয়েছেন ভক্তরা। একবার নয়, দুইবার নয়, টানা তিনবার লিগ জেতার দ্বারপ্রান্তে গিয়েও জিততে পারেনি গানার্সরা। কখনো ৫ পয়েন্টের ব্যবধান, কখনো ২ পয়েন্টের। কখনো আবার ১০ পয়েন্ট। কিন্তু মৌসুমের পর মৌসুম, শিরোপাপ্রত্যাশী হিসেবে তাদেরকেই রাখা হতো শীর্ষে। উন্নতির গ্রাফ স্পষ্ট চোখে পড়ছিল সবার। বাকি ছিল শুধু স্নায়ু ধরে রাখা। এই মৌসুমে এসে আর্সেনাল সেটাই করেছে একেবারে প্রথম দিন থেকে।

আর্তেতা নিজের ধাঁচে একটা দুর্দান্ত কৌশল বানিয়ে নিয়েছিলেন। কেউ কেউ এটাকে অবশ্য অ্যান্টিফুটবলও বলে। আর্সেনালের খেলা দেখে খুব একটা আনন্দ পাওয়ার কিছু নেই। বেশির ভাগ সময়ই তারা খেলে জয়ের জন্য। প্রতি মুহূর্তে আক্রমণ করার কোনো প্রয়োজন নেই আর্তেতার কৌশলে। বরং যে সুযোগটা পেয়েছে দল, ঠিক সেটাকেই কাজে লাগাতে হবে। আর দল সেই বাণী মেনে চলেছে অক্ষরে অক্ষরে। আর্সেনালের বেশির ভাগ গোলই এসেছে ‘ডেড বল’ থেকে। অর্থাৎ কর্নার, থ্রো ইন অথবা ফ্রি–কিক থেকে। এ ধরনের আক্রমণের সুবিধা হলো দলের সবাই মিলে প্রতিপক্ষকে ভড়কে দেওয়া যায়। আর সঙ্গে তো কিছু বুদ্ধির খেলা আছেই।

আরও পড়ুন
কোচ মিকেল আর্তেতা
ছবি: এক্স

কর্নারের সময় ডি-বক্সে প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডারদের চাপ দেওয়া, গোলরক্ষককে ভড়কে দেওয়া, জটলার মধ্য থেকে গোল বের করে আনা ছিল আর্সেনালের কৌশলের অংশ। আর এটাই অনেকের কাছে ছিল অপছন্দের। কারণ, খেলা হবে সমান–সমান, মুখোমুখি। সেখানে যদি প্রতিপক্ষকে হেনস্তা করে শিরোপা জিততে হয়, তাহলে তো ভালো দেখায় না। কিন্তু দিন শেষে ভালো দেখানো কিংবা ব্যবহার দিয়ে কেউ শিরোপা উদ্‌যাপন করে না। শিরোপা উদ্‌যাপন করে মাঠে খেলে, জয় নিয়ে। সেটা কর্নার থেকে ১-০ গোলেই হোক আর সুন্দর ফুটবল খেলে বিশাল ব্যবধানে। দিন শেষে মাঠে সবাই জয়ের জন্যই নামে, সুন্দর খেলে হারার জন্য নয়।

আর্তেতার ট্যাকটিকস সেখানেই বদলে দিয়েছিল চিত্র। আর্সেনালকে ঠেকাতে হলে তাই নামতে হবে তাদের পর্যায়ে। তাদের মতো ‘ডার্টি ফুটবল’ খেলতে হবে দলগুলোকে। কিন্তু তাদের মতো ডার্টি ফুটবল খেলার স্কিল নেই আর কারও। সেখানেই বাজিমাত করেছে আর্সেনাল। লিগের মাঝামাঝি পর্যায়ে যেতেই অন্যদের থেকে যোজন যোজন এগিয়ে গিয়েছিল গানার্সরা। তবু শান্তি মিলছিল না। কারণ, গত তিন মৌসুম ধরে শেষ মুহূর্তে পা হড়াকানোর গল্প মাথায় জেঁকে বসেছিল সবার।

ম্যানচেস্টার সিটির বিপক্ষে হারের পর তো সবাই ধরেই নিয়েছিলেন, এবারও বুঝি আর্তেতাকে পা হড়কাতে হবে। টানা কয়েক ম্যাচে পয়েন্ট হারিয়ে ব্যবধানটাকে নামিয়ে এনেছিলেন নগণ্যতে। আর একবার হড়কালেই হয়তো…কিন্তু সেদিন সিটির মাঠে চিৎকার করে করে ডেকলান রাইস বলেছিলেন, যেভাবেই হোক হাল ছাড়া যাবে না। অধিনায়ক মার্টিন ওডেগার্ড দলের সবার মাথায় হাত বুলিয়ে নিয়ে এসেছিলেন। কারণ, পা হড়কানোর কোনো সুযোগ নেই।

আরও পড়ুন
ডেকলান রাইস
ছবি: এক্স

হড়কাননি আর্সেনালের সমর্থকেরা। বরং শেষ মৌসুমে এসে পেপ গার্দিওলাই আর নার্ভ ধরে রাখতে পারেননি। জিততেই হবে, এমন ম্যাচে করেছেন ড্র। আর সেটাই আর্সেনালকে এনে দিয়েছে শিরোপা। শেষ দিন পর্যন্ত, অন্যের ফলাফলের অপেক্ষায় সকাল কাটাতে হয়নি আর্সেনালকে। বরং এক ম্যাচ আগেই, নিজেদের ট্রেনিং গ্রাউন্ডের জিমে সবাই মিলে মেতে উঠেছেন আনন্দে। এরপর বেরিয়ে পড়েছেন রাস্তায়। সারা রাত দর্শকদের সঙ্গে কাটিয়ে, লন্ডনের ব্যস্ত রাস্তায় ‘কাম অন ইউ গানার্স’ চিৎকারে মুখরিত হয়েছে সারা রাত।

আর মৌসুমের শেষ ম্যাচে ক্রিস্টাল প্যালেসের মাঠে ২-১ গোলের জয় লিডটাকে নিয়ে গেল ৭ পয়েন্টে। ইতিহাসের পাতা ঘেঁটে কেউ বলতে পারবে না, খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে শেষ মুহূর্তের জয়ে শিরোপা হাতে পেয়েছে আর্সেনাল। তিন বছর ধরে শিরোপার কাছ থেকে ফিরে আসার গল্প, অধ্যবসায় পূরণ হয়েছে ২০২৬ সালে এসে।

লন্ডনের রাস্তায় এখনই শিরোপা নিয়ে নামা হচ্ছে না আর্সেনালের। নেই একটুও বিরতি। ছুটতে হবে হাঙ্গেরি। চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনাল খেলতে। পিএসজির বিপক্ষে সেই ফাইনালও বহু অধ্যবসায়ের ফল। প্রিমিয়ার লিগের শিরোপা তো আগেও পাওয়া হয়েছে, চ্যাম্পিয়নস লিগ তো অমাবস্যার চাঁদ। সেটাও আবার বর্তমান সময়ের সেরা ট্যাকটিশিয়ান লুইস এনরিকের পিএসজির বিপক্ষে। তাই লন্ডনে প্যারেডের ডাক পড়েছে ৩১ মে। সেদিন শুধু প্রিমিয়ার লিগ নয়, একেবারে চ্যাম্পিয়নস লিগের শিরোপা নিয়ে হাজির হতে চান মিকেল আর্তেতা। রাজার বেশে দুই হাতে দুই শিরোপা নিয়ে লন্ডনের রাস্তায়—লাখো মানুষের সামনে এমন উৎসবের গল্প লেখা তো স্বপ্নের চেয়েও বেশি কিছু। সেটাই সত্যি হওয়ার অপেক্ষায় গানার্সরা।

আরও পড়ুন