জেল খাটা আসামি থেকে বিশ্বসেরা

কথায় আছে, বাস্তব নাকি সিনেমার থেকেও বেশি রোমাঞ্চকর। সিনেমার পর্দায় কতকিছুই তো দেখা যায়, নায়ক জেলে বন্দী, দেশের প্রয়োজনে তাঁকে জেল থেকে ছাড়িয়ে আনা, এরপর একাই নায়কের মতো গিয়ে দেশকে বাঁচিয়ে আনা। এসব গল্প সিনেমায় দেখতে দেখতেও যেন পুরোনো হয়ে গিয়েছে। কিন্তু একই গল্প বাস্তবে ঘটিয়েছেন ইতালির স্ট্রাইকার পাওলো রসি। সেটাও আবার বিশ্বকাপের মঞ্চেই।

ঘটনার সূত্রপাত ১৯৮০ সালে। ইতালিয়ান ফুটবলে আঘাত হেনেছিল ম্যাচ ফিক্সিং কেলেঙ্কারি। সে সময় ফুটবল খেলার ওপর বাজি ধরা ছিল ইতালিতে বেশ জনপ্রিয়। তবে ম্যাচ ফিক্সিং করার সুযোগ যেন না থাকে, তাই গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের ব্যাপারে কোনো বাজি ধরা যেত না। তাও ফাঁকফোকর বের করে, বাজিকরদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ইতালির মোট সাতটি দল জড়িয়ে যায় ম্যাচ ফিক্সিংয়ের সঙ্গে।

কিছুদিন যেতে না যেতেই ধরা পড়ে যায় তারা। ম্যাচ পাতানোর দায়ে সাতটি ক্লাবকে দেওয়া হয় বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তি। ২০ জন খেলোয়াড়কে করা হয় নিষিদ্ধ। দুজন ক্লাবমালিককে ফুটবল থেকে আজীবনের জন্য বের করে দেওয়া হয়। তাঁদেরই একজন ছিলেন পাওলো রসি।

আরও পড়ুন
পেরুজিয়ার হয়ে ম্যাচ ফিক্সিংয়ের শাস্তি পেয়েছিলেন পাওলো রসি।
ছবি: এক্স

পাওলো রসি তখন পেরুজিয়ার খেলোয়াড়। সেই মৌসুমে ১৩ গোল করে দলকে নিয়ে গিয়েছেন উয়েফা কাপের (বর্তমান ইউরোপা লিগ) নকআউট পর্বে। কিন্তু ম্যাচ ফিক্সিং কেলেঙ্কোরিতে তিনি ছিলেন সামনের সারির একজন। ফলে শাস্তির খড়্গটা পড়েছিল তাঁর ওপরেই। সঙ্গে সঙ্গে ইতালির ইতিহাসের অন্যতম ঘৃণিত তারকায় পরিণত হন রসি।

১৯৮০ সালে তিন বছরের জন্য নিষিদ্ধ হওয়ায় বিশ্বকাপ খেলার সম্ভাবনা শেষ হয়ে যায় রসির। ফুটবলকে বিদায় বলে অন্য কিছু করার স্বপ্ন ছিল তাঁর মনে। তখনই তাঁর পাশে এসে দাঁড়ান ইতালিয়ান দুই কোচ—জুভেন্টাসের জিওভান্নি ত্রাপাতোনি ও ইতালির এনজো বেয়ারজট। তাঁদের অনুরোধে নিষেধাজ্ঞা এক বছর কমিয়ে আনে ইতালিয়ান ফেডারেশন। বিশ্বকাপের আগে আগে ফিটনেস ফিরে পেতে যোগ দেন জুভেন্টাসে। বিশ্বকাপের আগের দুই বছরে মাত্র তিন ম্যাচ খেলেই দলে জায়গা করে নেন রসি। বলতে গেলে তাঁর ওপর একটা বাজিই ধরেন ইতালিয়ান কোচ।

আরও পড়ুন
ব্রাজিলকে হারিয়ে সেমিফাইনালের টিকিট কেটেছিলেন পাওলো রসি।
ছবি: এক্স

বিশ্বকাপে যাওয়ার আগে চারদিকে সমালোচনা, জেল খাটা, আনফিট খেলোয়াড় নিয়ে বিশ্বকাপে যাওয়ার অর্থ কী? সমালোচকদের আলোচনাতেও নতুন করে ঘি ঢাললেন রসি, প্রথম তিন ম্যাচে হতশ্রী পারফরম্যান্স। প্রথম তিন ম্যাচে তিন ড্র নিয়ে কোনোমতে পরের রাউন্ডের টিকিট কাটে ইতালি। এমনকি সেকেন্ড রাউন্ডের প্রথম ম্যাচেও নিষ্প্রভ রসি। তত দিনে কোচও হতাশ হয়ে পড়েছেন। হয়তো রসিকে দিয়ে আর হবে না।

বিশ্বকাপ ফেবারিট ব্রাজিলের বিপক্ষে জয় ছাড়া যখন গতি নেই, তখনই যেন ফিনিক্স পাখির মতো জেগে উঠলেন রসি। ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিলেন পাঁচ মিনিটের মাথায়। ব্রাজিলের জালে বল জড়িয়ে বিশ্বকাপে খুললেন গোলের খাতা। সেখান থেকেই শুরু বিশ্বকাপে রসির কাব্যগাথা।

সেদিন জিকো-সক্রেটিসের ব্রাজিল মাথা তুলে দাঁড়াতেই পারেনি রসির সামনে। ব্রাজিলের ২ গোলের বিনিময়ে হ্যাটট্রিক করে বদলা নেন রসি। দলকে টেনে নিয়ে যান সেমিফাইনালে। সেমিফাইনালেও একই চিত্র। পোল্যান্ডের ডিফেন্সকে একাই ধসিয়ে দিলেন তিনি। ইতালির দুটি গোলই এসেছিল তাঁর পা থেকে।

ফাইনালে ইতালির প্রতিপক্ষ ছিল পশ্চিম জার্মানি। দুই দলের সামনেই ব্রাজিলের তিন বিশ্বকাপ জয়ের রেকর্ডে ভাগ বসানোর হাতছানি। সেখানেও দুর্দান্ত রসি। এক গোল আর এক অ্যাসিস্ট করে দলকে এনে দেন সেই পরম কাঙ্ক্ষিত শিরোপা। ইতালির লোগোর ওপর যুক্ত হয় তৃতীয় তারকা। বিশ্বকাপের প্রথম চার ম্যাচে নিজের ছায়া হয়ে দৌড়ে বেড়ানো রসি শেষ তিন ম্যাচে করলেন ৬ গোল।

আরও পড়ুন
ফাইনালে জার্মানির বিপক্ষে পাওলো রসি।
ছবি: এক্স

ছয় দিনের ব্যবধানে পাওলো রসি ইতালির ইতিহাসের সবচেয়ে নিকৃষ্ট ব্যক্তি থেকে পরিণত হলেন নায়কে। জেল, জরিমানা, নিষেধাজ্ঞায় নিন্দিত পাওলো রসি নন্দিত হলেন বিশ্বকাপের মঞ্চে এসে। কোচ এনজো বেয়ারজট যে দ্বিতীয় সুযোগ দিয়েছিলেন পাওলো রসিকে, সেটাই কাজে লাগালেন নিজের সর্বোচ্চটা দিয়ে। ফিরে আসার এর থেকে উৎকৃষ্ট গল্প হয়তো আর কিছু হতেই পারে না।

আরও পড়ুন