প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ ভেঙে ফেলে ইউরোপ–আমেরিকার গণ্ডি। ২০০২ বিশ্বকাপের মঞ্চ হিসেবে ঠিক হয় এশিয়ার দুই দেশ—দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান। এটাই ছিল ইতিহাসের প্রথম যৌথ আয়োজনের বিশ্বকাপ। এশিয়ার মাটিতে বিশ্বকাপ আয়োজন নিয়ে উত্তেজনার কমতি ছিল না। সেই বিশ্বকাপ চমকও দেখিয়েছে নানাভাবে।
চমকের শুরু বিশ্বকাপের বাছাইপর্ব থেকে। ব্রাজিলের মতো দল বিশ্বকাপে সুযোগ পাবে কি না, সে নিয়েই ছিল দোটানা। লাতিন আমেরিকার শেষ দল হিসেবে নিজেদের একদম শেষ ম্যাচ জিতে কোনোমতে এশিয়ার টিকিট কাটে তারা। ফেবারিটদের এমন বেহাল দেখে শঙ্কায় পড়ে গিয়েছিলেন খোদ ব্রাজিলিয়ানরাও। সাধারণত বিশ্বকাপের আগে ব্রাজিলকে নিয়ে আশা থাকে অনেক। কিন্তু বিশ্বকাপের আগে এমন পারফরম্যান্স খোদ ব্রাজিলিয়ানরাই আশাবাদী ছিলেন না।
২০০২ বিশ্বকাপের পোস্টার। ছবি: এক্স
অন্যদিকে অন্য টপ ফেবারিটদের দুর্দশা শুরু হয় বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে। বিশ্বজয়ী ফ্রান্স, ফেবারিট আর্জেন্টিনা—সবাই গ্রুপ পর্ব থেকেই বাড়ির টিকিট কাটে। তাদের পাশ কাটিয়ে বিশ্বকাপের ডার্ক হর্স হয়ে ওঠে তুরস্ক, দক্ষিণ কোরিয়া। এশিয়ার কন্ডিশনে বাকি দলগুলো যেখানে হিমশিম খাচ্ছিল, সেখানে এশিয়ার দলগুলো ছড়ি ঘোরাচ্ছিল নিজেদের মতো। একদিকে দক্ষিণ কোরিয়ার জয়রথের সামনে চাপা পড়ে ইতালি–স্পেনের মতো দল, অন্যদিকে জাপান ও সেনেগালকে হারিয়ে সেমির টিকিট কাটে তুরস্ক। যদিও দুই দেশের জয় নিয়েই বেশ আলোচনা-সমালোচনা ছিল। বিশেষ করে দক্ষিণ কোরিয়া-ইতালি ম্যাচকে ধরা হয় বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম বাজে রেফারিংয়ের ম্যাচ হিসেবে। সেদিন রেফারির পক্ষপাত চোখের সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। ইতালিকে হটিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার ২-১ গোলের জয় বিশ্বকাপের অন্যতম বিতর্কিত ম্যাচের একটি।
তবে দুই দলের স্বপ্নযাত্রায় ছেদ পড়ে সেমিতে এসে। জার্মানি আর ব্রাজিলের কাছে হেরে বাড়ি ফেরে দুই দলই। এর আগেই বিশ্বকাপে নতুন এক ইতিহাস লেখা শেষ হয়ে গিয়েছিল তাদের। বাকি ছিল শুধু ফাইনাল। আর সেখানেই গল্পের আসল চমক। বিশ্বকাপ ইতিহাসের সেরা দলগুলোর কথা যদি পর্যালোচনা করো, তাহলে একটা জিনিস বারবারই ঘুরেফিরে আসবে—তাদের গল্পের সমাপ্তি হয়েছে বিরহে। ৫৪-এর হাঙ্গেরি, ৭৮-এর নেদারল্যান্ডস, ৮৬-এর ব্রাজিল; ইতিহাসের সেরা দলগুলো কখনো ছুঁয়ে দেখতে পারেনি বিশ্বকাপ। ২০০২–এর ব্রাজিলও ছিল তেমনই একটা দল, বিশ্বকাপের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একই সুর-তাল-লয়ে খেলে যাওয়া ব্রাজিল দলকে হারানোর সাধ্য ছিল না কারোর। অন্যদিকে জার্মানি আজীবনই পরিচিত তাদের ‘জায়ান্ট-হান্টার’ ট্যাগ নিয়ে। বিশ্বকাপের সেরা দলদের শিরোপা বঞ্চিত করতে তাদের জুড়ি মেলা ভার।
সেই সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল রোনালদোর চোট। ১৯৯৮ বিশ্বকাপের মতো এই বিশ্বকাপেও চোট নিয়ে বেশ আলোচনা ছিল। সব আলোচনা যেন রোনালদোর মাথায় আটকে গিয়েছিল। আবারও না ১৯৯৮ বিশ্বকাপের পুনরাবৃত্তি হয়। সেই চিন্তা থেকেই রোনালদো নিলেন এক অদ্ভুত সিদ্ধান্ত। সেমিফাইনালের আগের দিন অদ্ভুত এক হেয়ারকাট দিয়ে সবার নজর নিয়ে গেলেন নিজের খেলার দিকে।
প্রমাণ মিলল হাতেনাতে। বিশ্বকাপে আর কারও কোনো কথাই নেই। সবার মুখে মুখে শুধু রোনালদোর চুলের ছাঁট। চোট, জার্মানির ভয়, এগুলো নিয়ে কেউ প্রশ্ন তোলার অবকাশই পেল না। রোনালদোও দেখালেন নিজের খেল। পুরো টুর্নামেন্টে ১ গোল হজম করা অলিভার কানকে রীতিমতো নাকানি–চুবানি খাইয়ে ২ গোল করলেন রোনালদো। ২০০২ ফাইনাল যেন ছিল রোনালদোর একক শো। আর তার ওপরে ভর করেই পঞ্চমবারের মতো বিশ্বকাপ ভিড়ল ব্রাজিলের ডেরায়। যে রেকর্ড এখনো ছুঁতে পারেনি কেউ।