ম্যারাডোনা যেদিন হয়ে উঠেছিলেন অতিমানব

মেক্সিকো সিটির অ্যাজটেকা স্টেডিয়াম, নামের যেমন গরম, পোড়া দুপুরের রোদে আবহাওয়াটাও ছিল গরম। আজ থেকে ৫০ বছর আগের এক দিনের কথা, ২২ জুন, ১৯৮৬। বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল, যেখানে লড়াইটা শুধু ফুটবলের নয়, অনেক বেশি আবেগেরও। কারণ, সেই লড়াইয়ে ছোঁয়া আছে বারুদ আর রক্তের।

‘খেলার সঙ্গে রাজনীতি মেশাবেন না’, বিশ্বে কোনো একটা ঘটনা ঘটলেই যেন এই কথা কানে বাজে। পৃথিবীর কোথাও যুদ্ধের দামামা বাজুক অথবা আক্রমণে ধসিয়ে দেওয়া হোক পুরো দেশের মানচিত্র—ফুটবল মাঠে এলেই যেন সব ভুলে যেতে হবে। কেন? সেই প্রশ্নই সেদিন দুপুরে ছুড়েছিলেন ডিয়েগো ম্যারাডোনা। যার মনে তখনো বয়ে বেড়াচ্ছে ফকল্যান্ডের ক্ষত।

ফকল্যান্ড বিশ্বরাজনীতিতে খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয়, আটলান্টিক মহাসাগরের মধ্যখানে ১২ হাজার বর্গকিলোমিটারের এক দ্বীপপুঞ্জ। কিন্তু আর্জেন্টিনার কাছে এই দ্বীপপুঞ্জের মূল্য অনেক। অনেক দিন ধরেই মধ্য সাগরের এই জমির দাবিদার ছিল আর্জেন্টিনা। ব্রিটিশরা নিজেদের সাম্রাজ্য গুটিয়ে চলে গেলেও এই দ্বীপপুঞ্জ ধরে রেখেছিল। দীর্ঘদিনের কথাবার্তা চালাচালি করেও যখন সমাধান এল না, উল্টো ইংল্যান্ড ঘোষণা দিল, নিজেদের সৈন্য নিয়ে এগোনোর। আর্জেন্টিনা তখনই আগবাড়িয়ে দখলে নিয়ে নিল পুরো দ্বীপ। ব্রিটিশরাও কম যায় না, নিজেদের নৌবাহিনী পাঠিয়ে দিল রাজ্য ফিরিয়ে আনতে। ফলাফল?

আরও পড়ুন

দীর্ঘ ১০ সপ্তাহ ধরে চলল এক রক্ষক্ষয়ী যুদ্ধ। দুই পক্ষের বিশাল ক্ষয়ক্ষতির পর অবশেষে আত্মসমর্পণ করল আর্জেন্টাইন বাহিনী। ৬৪৯ জন সৈন্যের মৃতদেহ নিয়ে দেশে ফিরল আর্জেন্টিনা। ব্রিটিশরা ফিরল ২৫৫ জন সৈনিকের মৃতদেহ নিয়ে। সেই যুদ্ধে তিনজন নিরীহ মানুষও প্রাণ হারিয়েছিলেন। যুদ্ধের পর শুধু দেশে নয়, পুরো বিশ্বমঞ্চে হাসির পাত্র হয়ে উঠেছিল আর্জেন্টিনা।

এই জার্সি পরে এক ম্যাচই খেলেছে আর্জেন্টিনা।
ছবি: এক্স

সেই ফকল্যান্ড যুদ্ধের কথা পৃথিবী আস্তে আস্তে ভুলে গেলেও ভোলেননি একজন। আর্জেন্টিনার অধিনায়ক, ডিয়েগো আর্মান্ডো ম্যারাডোনা। তাঁর কাছে ফকল্যান্ড ছিল এক লজ্জার নাম, এক অপমানের গল্প। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে লড়াইটা শুধু মাঠের নয়, ছিল আঁতে ঘা লাগার মতো। সেমিফাইনালের টিকিটের জন্য ম্যারাডোনা সেদিন লড়েননি, ম্যারাডোনা লড়েছিলেন নিজেদের সম্মান বাঁচাতে। আর দেশের জন্য সম্মান বাঁচাতে সবকিছুই ‘জায়েজ’।

ম্যাচের আগে ঘটল আরেক ঘটনা। কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ড খেলবে সাদা জার্সি পরে। তাই আর্জেন্টিনা চাইলেও আকাশি-সাদা জার্সি পরতে পারবে না। সেটা তেমন বড় সমস্যা নয়। নীল অ্যাওয়ে জার্সি তো আছেই। কিন্তু সেই জার্সি পরেই উরুগুয়ের বিপক্ষে নেমেছিল আর্জেন্টিনা। ১-০ গোলের জয় আনলেও মেক্সিকোর তপ্ত গরমে হাঁসফাঁস করছিলেন খেলোয়াড়েরা। একে তো তুলার তৈরি জার্সি, অন্যদিকে গাঢ় নীল রং। সব মিলিয়ে মেক্সিকোতে হিমশিম খেতে হচ্ছিল আর্জেন্টিনাকে।

তাই কোচ কার্লোস বিলার্দো দায়িত্ব দিলেন রুবেন মোসেলার ওপর, যেভাবেই হোক হালকা নীল রঙের জার্সি খুঁজে আনতে। ম্যাচের তিন দিন আগে, পুরো মেক্সিকো শহর ঘুরে দুটি জার্সি নিয়ে হাজির হলেন তিনি। ম্যারাডোনা একটা জার্সি গায়ে চড়িয়েই বললেন, ‘এটা পরেই আমরা প্রতিশোধ নেব।’ ব্যস, কাজে বসে পড়লেন তিনি। প্রতিটি জার্সিতে আর্জেন্টিনার লোগো বসানো হয় হাতে সেলাই করে। আরেক পাশে স্পনসরের লোগো। অন্য জার্সি থেকে কেটে লাগানো হলো খেলোয়াড়দের নাম। অতঃপর অ্যাজটেকা স্টেডিয়ামে মাঠে নামল আর্জেন্টিনা।

আরও পড়ুন
‘হ্যান্ড অব গড’
ছবি: এক্স

ইংল্যান্ড আর্জেন্টিনা লড়াইয়ের প্রথমার্ধ ছিল গোলশূন্য। দ্বিতীয়ার্ধেও যে খুব একটা কিছু ঘটেছে তা নয়। যা ঘটেছে, তা হয়েছে মাত্র চার মিনিটে। ডিয়েগো আরমান্ডো ম্যারাডোনা নিজেকে ইতিহাসের পাতায় জায়গা করে নিয়েছেন সেই চার মিনিটের ক্যামিওতে। যার সূচনা হয়েছিল ৫১ মিনিটে এসে। মাঝমাঠে একপ্রকার ফাঁকাতেই বল পেয়ে যান ম্যারাডোনা। এরপর রীতিমতো স্বভাবসুলভ ম্যারাডোনা ফ্যাশনে এক দুই করে পাঁচজনকে কাটিয়ে পাস বাড়িয়ে দেন সামনে। কিন্তু সেই পাস সতীর্থের কাছে না পৌঁছে চলে যায় স্টিভ হজের পায়ে। ক্লিয়ার করতে গিয়ে উলটো গোলরক্ষক পিটার শিলটনের দিকে তুলে দেন বল। একদিকে ৬ ফুট ১ ইঞ্চির শিলটন, অন্যদিকে ৫ ফুট ৫ ইঞ্চির ম্যারাডোনা। ম্যারাডোনা জানতেন, এই বল কখনো তাঁর পক্ষে মাথা দিয়ে ছোঁয়া সম্ভব নয়। তাই তো তিনি লাফিয়ে উঠলেন, বলটাকে আলতো করে ছুঁয়ে দিলেন হাত দিয়ে। শিলটনের মাথার পর দিয়ে বল পৌঁছে গেল জালে।

ঘটনার আকস্মিকতায় হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলেন ম্যারাডোনাও। একমুহূর্ত দাঁড়িয়ে দেখেছেন। যখন দেখলেন রেফারি গোলের বাঁশি বাজিয়ে দিয়েছেন, তখনই শূন্যে হাত ছুড়ে দৌড়ে গেলেন উদ্‌যাপন করতে। সতীর্থরাও যোগ দিলেন সঙ্গে। অন্যদিকে পুরো ইংল্যান্ড দল দাবি জানাচ্ছে গোল বাতিল করার, ম্যারাডোনার তো ‘সামর্থ্য’ও নেই অত উঁচুতে বল ধরার। শিলটনের দাবি গোনাতেই ধরলেন না তিউনিসিয়ান রেফারি আলি বিন নাসের। বাজিয়ে দিলেন গোলের বাঁশি। ম্যাচের লিড চলে এল আর্জেন্টিনার কাছে, সেটাও অধিনায়কের গোলে।

আরও পড়ুন
একে একে পাঁচজনকে কাটিয়ে ডি-বক্সে ম্যারাডোনা।
ছবি: এক্স

প্রথম গোলের রেশ কাটতে না কাটতেই ম্যারাডোনা হাজির হলেন তাঁর দ্বিতীয় চমক নিয়ে। এমনিতেই প্রথম গোল নিয়ে ইংল্যান্ডের মনে তখনো সন্দেহ, হয়েছেটা কী? কিন্তু এবার সেই সন্দেহকে রীতিমতো উড়িয়ে দিলেন ম্যারাডোনা। যা করলেন, তা ভাষায় ব্যাখ্যা করা অসম্ভব। ম্যারাডোনা বল পেয়েছিলেন নিজেদের অর্ধে। সেখান থেকে শুরু করলেন দৌড়। একজন, দুইজন, তিনজন, চারজন, পাঁচজন খেলোয়াড়কে কাটিয়ে প্রবেশ করলেন ডি-বক্সে। এরপর পিটার শিলটনকে আবারও বোকা বানিয়ে দুই ডিফেন্ডারের মাঝ দিয়ে নিলেন শট। অতঃপর গোল। ধারাভাষ্যকার ভিক্টর হুগো মোরালেস চিৎকার করে বলছিলেন, ‘তুমি কোন গ্রহ থেকে এসেছ?’

আরও পড়ুন
শিলটনকে ‘বোকা’ বানিয়ে ম্যারাডোনার শট।
ছবি: এক্স

সত্যিই ম্যারাডোনা সেদিন কোন গ্রহ থেকে এসেছিলেন তা ব্যাখ্যা করার শক্তি বা সাধ্য কারও নেই। ম্যারাডোনা সেটা ব্যাখ্যা করেছিলেন নিজের মতো করে। ‘স্বয়ং ঈশ্বর সেদিন নেমে এসে সাহায্য করেছিলেন আমাকে প্রতিশোধ নিতে। হাত দিয়ে গোল করার সময় সেটা আমার হাত ছিল না, ছিল স্বয়ং ঈশ্বরের হাত। আর পরের গোলটাও এসেছে ঈশ্বরের পা থেকে’। ম্যারাডোনার এমন বক্তব্যের পর আর কিছুই বলার থাকে না কারও। কারণ, সেদিন অ্যাজটেকা স্টেডিয়ামে যা ঘটেছিল, চার মিনিটের কারসাজিতে পুরো ইংল্যান্ডকে বিশ্বকাপ থেকে ছুড়ে ফেলার গল্প, সেটাকে ম্যারাডোনার নিজের মুখের বাণী ছাড়া অন্যভাবে ব্যখা করা সম্ভব। তাই তো ম্যারাডোনার কথাকেই বিনাবাক্যব্যয়ে মেনে নিয়েছেন সবাই।

২০০১ সালে গত শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ গোল নিয়ে করা হয়েছিল এক ভোটের আয়োজন। সেখানে সবাইকে ছাড়িয়ে শতাব্দীর সেরা গোল হয়েছিল ম্যারাডোনার করা দ্বিতীয় গোলটি। আর প্রথম গোলটি এখনো হয়ে আছে অবিস্মরণীয় শুধু হাত দিয়ে করা বলে। সেদিনের রেফারির ভুল ম্যারাডোনাকে এনে দিয়েছে অদ্ভুত এক সম্মান। পিটার শিলটন এখনো ক্ষমা করতে পারেননি ম্যারাডোনাকে। ইংল্যান্ড ভক্তরাও না। কিন্তু তাতে তাঁর কিছু যায় আসে না। কারণ, ম্যারাডোনা যা চেয়েছিলেন, তাই পেয়েছিলেন। ইংল্যান্ডকে হারিয়ে ফকল্যান্ডের প্রতিশোধ আর আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ জিতিয়ে আক্ষেপ পূরণ। একজীবনে এর থেকে বেশি আর কী-ই বা লাগে?

আরও পড়ুন