বিশ্বকাপের উদ্ধারকর্তা কুকুর
বিশ্বকাপের বাকি মাত্র কয়েক মাস। নিরেট স্বর্ণের শিরোপা নিয়ে সবার আগ্রহের শেষ নেই। প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের আসর বসেছে ফুটবলের জন্মদাতা ইংল্যান্ডে। যাদের ফুটবল নিয়ে এত গর্ব, সেই ইংল্যান্ডের মাটি থেকেই কিনা চুরি হয়ে গেল বিশ্বকাপ? বিশাল বিশ্বযুদ্ধ যে শিরোপার গায়ে আঁচ ফেলতে পারেনি, সেই বিশ্বকাপ কিনা চুরি হয়ে গেল ফুটবলের দেশে এসে?
তখনো বিশ্বকাপের নতুন শিরোপা আসেনি, বরং ব্যবহার করা হতো জুলে রিমে শিরোপা। নিয়ম অনুযায়ী স্বাগতিক দেশে বিশ্বকাপের ছয় মাস আগেই পাঠিয়ে দেওয়া হয় বিশ্বকাপের শিরোপা। যাতে তারা চাইলে দেশব্যাপী প্রদর্শনী করতে পারে। লন্ডনের ওয়েস্টমিনস্টার হলে সাধারণ মানুষের দেখার জন্য রাখা হয়েছিল ‘জুলে রিমে ট্রফি’। ২৪ ঘণ্টা পুলিশি পাহারায় থাকা সেই ট্রফি সবার চোখের সামনে দিয়ে হাওয়া হয়ে গেল। ২০ মার্চ দুপুরের দিকে হুট করেই সবাই আবিষ্কার করেন, শিরোপাটি নেই। পাহারাদারদের চোখ ফাঁকি দিয়ে কাচের শোকেস ভেঙে ট্রফি নিয়ে চম্পট দিয়েছিল চোর।
চারদিকে রীতিমতো হইচই পড়ে যায়, ব্রিটিশ পুলিশ নেমে পড়ে বিশ্বকাপ উদ্ধারের কাজে। পরদিন মুক্তিপণ হিসেবে চাওয়া হয় ১৫ হাজার পাউন্ড। সেটাও দিতে হবে ১ আর ৫ টাকার নোটে। শেষ পর্যন্ত অনেক কষ্টে ধরা পড়ল চোর। কিন্তু চোর ধরা পড়লেও শিরোপার কোনো খোঁজ নেই। অন্যদিকে নিজেদের সম্মান বাঁচাতে গোপনে রেপ্লিকা তৈরি করতে শুরু করে ফিফা। যেভাবেই হোক, বিশ্বকাপ তো নামাতে হবে।
অবশেষে সাত দিন পর খুঁজে পাওয়া গেল সেই ট্রফি। ডেভিড করবেট ও তার পোষা কুকুর ‘পিকলস’ হাঁটতে বেরিয়েছিল বিকেলে। দক্ষিণ লন্ডনের একটি নির্জন রাস্তার পাশে থাকা ঝোপের পাশে গিয়ে ঘেউ ঘেউ করতে লাগল পিকলস। করবেট প্রথমে বুঝতেই পারেননি, কী করবেন। পুলিশকে ডাকবেন নাকি নিজেই কিছু করবেন? অবশেষে সাহস করে পুরোনো খবরের কাগজ আর সুতা দিয়ে শক্ত করে মোড়ানো সেই প্যাকেট একটু করে ছিঁড়লেন।
তার ভেতরেই দেখা মিলল সোনালি সেই শিরোপার। ট্রফির গায়ে খোদাই করা নামগুলো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল—ব্রাজিল, পশ্চিম জার্মানি, উরুগুয়ে। পুরো পৃথিবী যাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে, সেই পিকলস অবশেষে খুঁজে পেল ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ, জুলে রিমে ট্রফি!
রাতারাতি আন্তর্জাতিক সুপারস্টার বনে গেল পিকলস। তাকে উপহার দেওয়া হলো পুরস্কার, ১৫ হাজার পাউন্ড আর সারা জীবনের জন্য যা খেতে চায়, তা–ই। বিভিন্ন টিভি শোতে তাকে আমন্ত্রণ জানানো হলো, এমনকি ‘দ্য স্পাই উইথ আ কোল্ড নোজ’ নামের একটি সিনেমায় অভিনয় করারও সুযোগ পেল সে। বিশ্বকাপ শেষে বিজয়ী ইংল্যান্ড দলের ভোজসভায় ‘গেস্ট অব অনার’ হিসেবে আমন্ত্রিত ছিল পিকলস।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে পিকলস হয়ে আছে স্মরণীয় এক নাম। যদিও নিজের জনপ্রিয়তা বেশি দিন দেখার সৌভাগ্য হয়নি তার। ১৯৬৭ সালে গলায় শিকল পেঁচিয়ে মৃত্যুবরণ করে পিকলস। মালিক ডেভিড করবেট তাকে বাড়ির পেছনের বাগানেই সমাহিত করেন। পরবর্তীকালে লন্ডনের পার্কে তার স্মরণে একটি ফলক স্থাপন করা হয়। পিকলস চলে গেছে, কিন্তু ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ে সে আজও বেঁচে আছে ‘বিশ্বকাপের ত্রাণকর্তা’ হিসেবে।