৬ বছর ধরে আমেরিকা যেভাবে ফুটবল বিশ্বকাপের মাঠ তৈরি করেছে

চলছে ফুটবল বিশ্বকাপ। সবার মনোযোগ এখন মাঠের খেলায়। তবে জন ট্রে রজার্সের পুরো মনোযোগ মাঠের ঘাসে। মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটির ‘টার্ফগ্রাস’ বা ঘাস গবেষণা বিষয়ের অধ্যাপক তিনি। উত্তর আমেরিকার তিন দেশ যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডার ১৬টি স্টেডিয়ামের মাঠের মান ও স্থায়িত্ব নিশ্চিত করার মূল দায়িত্ব তাঁর। নিজের কাজের প্রতি ভালোবাসা থেকে তিনি রসিকতা করে বলেন, ‘আমি ফুটবলের চেয়ে মাঠের ঘাসের ব্যাপারেই বেশি আগ্রহী।’

১১ জুন শুরু হওয়া বিশ্বকাপে ৪৮টি দল ছয় সপ্তাহ ধরে যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডায় মোট ১০৪টি ম্যাচ খেলবে। এই বিশাল অঞ্চলের আবহাওয়াও একেক জায়গায় একেক রকম। কোথাও প্রচণ্ড গরম ও ভ্যাপসা আর্দ্রতা। আবার কোথাও মৃদু বা নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়া।

সাধারণ ফুটবলপ্রেমীদের কাছে মাঠের ঘাস ততটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে না হলেও, বিশ্বকাপের মতো হাই ভোল্টেজ টুর্নামেন্টের জন্য এটি জরুরি। কারণ, মাঠের ঘাস কেমন এর ওপর নির্ভর করে বলের গতি, খেলোয়াড়দের ছুটে চলা ও তাঁদের বড় ধরনের চোট কিংবা আঘাত পাওয়ার ঝুঁকি।

বিশ্বকাপের ১৬টি স্টেডিয়ামের ৮টিতে ছিল কৃত্রিম ঘাস। প্রাকৃতিক ঘাস বাকি ৮টি মাঠে। তবে ফিফার নিয়ম অনুযায়ী সব কটি মাঠেই প্রাকৃতিক ঘাস থাকতে হবে। বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়দের বল নিয়ন্ত্রণ ও স্বাচ্ছন্দ্যের জন্যই এই নিয়ম।

আরও পড়ুন

এই নিয়ম মানতে স্টেডিয়ামগুলোর সব ঘাস উপড়ে ফেলা হয়েছে। সেখানে বসানো হয়েছে আন্তর্জাতিক মানের বিশেষ প্রাকৃতিক ঘাস। তবে এর মধ্যে ৫টি স্টেডিয়াম ছাদঢাকা। ফলে সেখানে পর্যাপ্ত সূর্যের আলো পৌঁছায় না। এই বিষয়টি কাজটিকে আরও কঠিন করে তুলেছে। যেহেতু সব মাঠের মান সমান রাখতে হবে, তাই ২০২০ সাল থেকে ছয় বছর ধরে মাঠের ঘাস নিয়ে গবেষণা ও প্রস্তুতি চলেছে। এই দায়িত্ব পালন করেছেন ঘাসবিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ট্রে রজার্স ও তাঁর ছাত্র অধ্যাপক জন সোরোচান।

আমেরিকার স্টেডিয়ামগুলো সাধারণত আমেরিকান ফুটবলের জন্য তৈরি। সেহেতু আন্তর্জাতিক ফুটবলের সাধারণ পিচের চেয়ে আকারে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ ছোট। বিশ্বের অন্যান্য দেশে স্টেডিয়ামগুলো ফুটবল খেলার উপযোগী করে বানানো হলেও আমেরিকা এর ব্যতিক্রম। মাঠের আকার আন্তর্জাতিক মাপে বড় করতে মিজৌরির কানসাস সিটি স্টেডিয়ামের গ্যালারির ১০ সারির আসন সরিয়ে ফেলতে হয়েছে।

ভ্যাঙ্কুভার, ব্রিটিশ কলাম্বিয়া ও লস অ্যাঞ্জেলেসের মতো স্টেডিয়ামগুলোতে সাধারণত কৃত্রিম ঘাস বা টার্ফ থাকে। বিশ্বকাপের জন্য এই মাঠগুলোর কৃত্রিম ঘাস পুরোপুরি তুলে ফেলে নতুন করে প্রাকৃতিক ঘাস বসানোর ব্যবস্থা করতে হয়েছে। এই পুরো প্রক্রিয়ার জন্য বিজ্ঞানীরা মূলত তিন প্রজাতির ঘাস বেছে নিয়েছেন। প্রতিটি স্টেডিয়ামের আবহাওয়া অনুযায়ী কোন ঘাসটি সবচেয়ে ভালো হবে, তা নির্ধারণ করতে গবেষকেরা বিশেষ কিছু যন্ত্রপাতি ব্যবহার করেন। এই যন্ত্রগুলো দিয়ে পরীক্ষা করে দেখা হয়, খেলোয়াড়দের বুটের ঘর্ষণে ঘাস কতটা টিকে থাকতে পারে। মাঠে ড্রপ খাওয়ার পর বল কতটা উঁচুতে ওঠে।

আরও পড়ুন

টরন্টো, ফিলাডেলফিয়া ও মেক্সিকো সিটির মতো ঠান্ডা আবহাওয়ার অঞ্চলের জন্য কেন্টাকি ব্লুগ্রাস ও পেরেনিয়াল রাইগ্রাস নামের দুই ধরনের ঘাস ব্যবহার করা হয়েছে। আবার মায়ামি ও মেক্সিকোর গুয়াদালাহারা ও মন্টেরের মতো গরম আবহাওয়ার স্টেডিয়ামগুলোর জন্য বিজ্ঞানীরা বেছে নিয়েছেন বারমুডা ঘাস।

তবে ছাদঢাকা স্টেডিয়ামগুলো এই ঘাস বাছাইয়ের হিসাবটিকে আরও জটিল করেছে। হিউস্টন, ডালাস ও আটলান্টার আবহাওয়া প্রচণ্ড গরম হওয়ায় সেখানে বারমুডা ঘাস উপযুক্ত ছিল। কিন্তু যেহেতু এই স্টেডিয়ামগুলোর ওপর ছাদ রয়েছে, তাই মাঠের ঘাসগুলোকে সব সময় ঘরের ভেতরে কম আলো ও এসির ঠান্ডার মধ্যে থাকতে হবে। আর এই বিশেষ কারণে গরম আবহাওয়ার স্টেডিয়াম হওয়া সত্ত্বেও সেখানে ঠান্ডা আবহাওয়ার উপযোগী ঘাস ব্যবহার করতে হয়েছে।

অধ্যাপক জন ট্রে রজার্স

ছাদঢাকা ইনডোর স্টেডিয়ামগুলোর ঘাস সজীব রাখতে বিশেষ সেচব্যবস্থা ও চাকাওয়ালা কৃত্রিম গ্রো লাইট ব্যবহার করা হয়। ঘাস তাজা রাখতে প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট নিয়মে এই আলো ব্যবহার করা হয়েছে। এর আগে পৃথিবীর কোথাও একাধিক ইনডোর স্টেডিয়ামে এত দিন ধরে বিশ্বকাপের খেলা আয়োজন করা হয়নি।

বিশ্বকাপের স্টেডিয়ামগুলোর ভেতরের তাপমাত্রা কৃত্রিমভাবে ২১ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ধরে রাখা হবে। তাই কলোরাডোর ঠান্ডা আবহাওয়ায় এই বিশেষ ঘাস চাষ করেছেন জো উইলকিন্স, যা স্টেডিয়ামগুলোর আশপাশে প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো অসম্ভব।

সহজে পরিবহনের জন্য প্লাস্টিক, নুড়ি ও বালুর স্তরের ওপর কার্পেটের মতো করে ঘাসগুলো বড় করা হয়। ব্যাকআপসহ প্রায় ৯ একর জমিতে ঘাস চাষের পর গত ২৫ মে কলোরাডো থেকে ২৪টি হিমায়িত ট্রাকে করে ১ হাজার মাইল দূরে হিউস্টন স্টেডিয়ামে ঘাস পাঠানো হয়। মাঠ আরও শক্তিশালী করতে ঘাসের সঙ্গে প্লাস্টিকের কৃত্রিম ফাইবার সেলাই করে দেওয়া হয়েছে।

মাঠের মান নিয়ে যেন কোনো অভিযোগ না ওঠে, সে বিষয়ে আত্মবিশ্বাসী ৩৪ বছর ধরে কাজ করা অভিজ্ঞ অধ্যাপক ট্রে রজার্স। ১৯৯৪ সালের যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপে তিনি প্রথম ইনডোর স্টেডিয়ামে প্রাকৃতিক ঘাসের পিচ তৈরির মডিউলার পদ্ধতি আবিষ্কার করেছিলেন, যা এবারও ব্যবহৃত হচ্ছে।

সূত্র: সিএনএন
আরও পড়ুন