বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড় রদ্রিকে ঘিরে বার্সা-রিয়ালের ‘এল ক্লাসিকো’
বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড় বলে কথা, তাঁকে দলে নেওয়ার জন্য ক্লাবগুলোর মধ্যে কাড়াকাড়ি তো হবেই। আর সেটা যদি হয় সেরা খেলোয়াড়ের ঘরে ফেরা, তবে তো কথাই নেই। ২০২৬ বিশ্বকাপের গোল্ডেন বলজয়ী রদ্রি আবারও ফিরছেন স্পেনে, গুঞ্জনটা সে রকমই। তবে সেটা কাদের জার্সিতে, সে নিয়েই চলছে আলোচনা। কারণ, দৌড়ে আছে বার্সেলোনা-রিয়াল মাদ্রিদ—দুই দলই।
রদ্রি কেন অপরিহার্য
একটা সময় রদ্রিকে বলা হতো ‘মাঠে কিছু না করা খেলোয়াড়’। কারণ, মাঠে তাঁর উপস্থিতি সেভাবে ঠিক বোঝা যায় না। ড্রিবল করে দু–তিনজনকে ফেলে এগিয়ে যাচ্ছেন না, বল পায়ে কারিকুরিও করছেন না। বরং চুপিসারে ম্যাচটাকে নিজের করে নিচ্ছেন। কারণ, প্রতিপক্ষ যখনই প্রেস করছে মাঝমাঠে, তখন তিনি বলটা নিয়ে পুরো প্রেসিং সামলে নিচ্ছেন এক মুহূর্তে। রদ্রি তাই চুপিসারে হয়ে উঠেছিলেন পেপ গার্দিওলার সেরা অস্ত্র। আতলেতিকো মাদ্রিদ থেকে এনে তাঁকে ম্যানচেস্টার সিটির ত্রাতা বানিয়েছিলেন গার্দিওলা।
গার্দিওলার জন্য রদ্রি কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন, তার প্রমাণ মিলবে একটা পরিসংখ্যান থেকেই। ২০২০-২১ মৌসুমে চেলসির বিপক্ষে চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে রদ্রিকে ছাড়া দল সাজিয়েছিলেন তিনি। পুরো মৌসুমে সেটাই একমাত্র ম্যাচ ছিল, যেখানে ৯০ মিনিটে একবারের জন্যও মাঠে নামেননি রদ্রি। আর সেটা হেরেই শিরোপা হাতছাড়া হয়েছিল সিটির। এর পর থেকে তাঁকে সরানোর মতো ভুল আর কখনো করেননি গার্দিওলা।
রদ্রি তাঁর প্রতিদান দিয়েছেন চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতিয়ে। ২০২৩ সালের চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালে তাঁর একমাত্র গোলে প্রথমবারের মতো চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতে ম্যানচেস্টার সিটি। আর সেই চ্যাম্পিয়নস লিগ রদ্রিকে এনে দেয় স্বপ্নের ব্যালন ডি’অর। যদিও তাঁর ব্যালন ডি’অর জেতা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা আছে বৈকি। কিন্তু বছরজুড়ে তাঁর পারফরম্যান্সের দিকে আঙুল তুলতে পারবে না কেউ।
গার্দিওলার নকশায় অনস্বীকার্য রদ্রি স্পেনেও হয়ে উঠেছিলেন সমান গুরুত্বপূর্ণ। লুইস দে লা ফুয়েন্তের ইউরো-নেশনস লিগ জয়ের অন্যতম তুরুপের তাস ছিলেন রদ্রি। আর বিশ্বকাপে যা করলেন তা তো ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। পুরো টুর্নামেন্টে রদ্রি ছিলেন অপ্রতিরোধ্য। অধিনায়কের আর্মব্যান্ড হাতে মাঝমাঠকে এমনভাবে সামলেছেন যে প্রতিপক্ষ গোল করতে পেরেছে মাত্র একটি। পুরো টুর্নামেন্টে দুর্দান্ত খেলা ফ্রান্স, আর্জেন্টিনাকে একেবারে নিষ্ক্রিয় করে দিয়েছেন মাঝমাঠেই। আক্রমণে যাওয়ার সুযোগই পায়নি তারা।
রিয়াল কেন রদ্রিকে চাইছে
রদ্রির জন্য প্রথমে উঠেপড়ে লেগেছিল রিয়াল মাদ্রিদ। টনি ক্রুসের বিদায়ের পর থেকেই রিয়ালের মাঝমাঠের অবস্থা ছন্নছাড়া। ক্রুস যেভাবে পুরো মাঝমাঠ দখলে রাখতেন, সামনে-পেছনে সব দিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখতেন, সেই নজরদারি একেবারেই হারিয়ে গেছে রিয়ালের মাঝমাঠ থেকে। রিয়ালের মাঝমাঠে খুব করে প্রয়োজন একজন কন্ট্রোলার। যিনি নিচে থেকে পুরো দলকে সামলে রাখবেন। যে কারণেই রদ্রির দিকে হাত বাড়িয়েছিল রিয়াল।
অথচ বছর দুই আগে, ব্যালন ডি’অর জয়ের সময় রিয়ালের সঙ্গেই মনোমালিন্য হয়েছিল তাঁর। রদ্রি ব্যালন ডি’অর জেতায় সেখানে কাউকে পাঠায়নি রিয়াল, রদ্রিও একহাত নিয়েছিলেন রিয়াল মাদ্রিদকে। সেই সম্পর্ক বদলে গিয়েছে দুই বছরের মাথায়। বেশ কয়েক জায়গায় রিয়াল মাদ্রিদ নিয়ে ভালো ভালো কথাও বলেছেন রদ্রি। ম্যানচেস্টার সিটির সঙ্গে এক বছরের চুক্তি বাকি আছে তাঁর।
দৃশ্যপটে বার্সেলোনা
৩০ বছর বয়সী তারকাকে ভেড়াতে খুব একটা বেগ পাওয়ার কথা ছিল না রিয়ালের। জন্ম যে মাদ্রিদে, সেখানে ফেরার জন্য মুখিয়ে ছিলেন রদ্রি। কিন্তু ভিনিসিয়ুসের চুক্তি বাড়ানো নিয়ে রিয়াল এতটাই ব্যস্ত ছিল যে রদ্রির দিকে ভালোভাবে নজর দেওয়ার সময়ই হয়নি। বাকি খেলোয়াড়দের কেনার পর মূল দলে আর কোনো জায়গাই ফাঁকা নেই। তাই রিয়ালের ইচ্ছা ছিল এদুয়ার্দো কামাভিঙ্গাকে বিক্রি করে রদ্রিকে ভেড়াবে তারা। দলবদলে এত অনাগ্রহ থেকেই বোধ হয় রদ্রির নজর চলে গেছে স্পেনের আরেক প্রান্তে, বার্সেলোনার শিবিরে।
বার্সেলোনার সঙ্গে রদ্রির সম্পর্ক তেমন গাঢ় না হলেও তাঁর সতীর্থরা সবাই আছেন কাতালুনিয়ায়। যাঁদের সঙ্গে মিলে স্পেনের মাঝমাঠ সামাল দিয়েছেন ইউরো-নেশনস লিগ-বিশ্বকাপে, তাঁরাই সতীর্থ হবেন লাল-নীল জার্সিতে। বার্সেলোনায় রদ্রির মতো খেলোয়াড় আছেন বৈকি। কিন্তু বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়কে সূত্র অনুযায়ী প্রথম দুই দফায় তাদের দেওয়া প্রস্তাব ফিরিয়েও দিয়েছে সিটি। রদ্রির জন্য ম্যানচেস্টারের ক্লাবটির চাওয়া অন্তত ৮০ মিলিয়ন ইউরো।
সিটি অবশ্য নিজেদের আখের গুছিয়ে রেখেছে। নটিংহাম ফরেস্ট থেকে ১৩৫ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে এলিয়ট অ্যান্ডারসনকে ভিড়িয়েছে তারা। শুধু তা–ই নয়, মরক্কোর তরুণ তারকা আইয়ুব বুয়াদ্দিকেও ভেড়াতে চাইছে সিটি। ফলে রদ্রিকে ধরে রাখার তেমন ইচ্ছা নেই তাদের। যত বেশি দামে বিক্রি করা সম্ভব, তাতেই তাদের লাভ। দলবদলের মাঝামাঝি এসে এখন দেখার বিষয়, কে বেশি দাম দিয়ে রদ্রিকে নিজেদের জার্সিতে পেতে পারে?