অ্যানিমের শুরু যেভাবে হলো
তুমি যদি জাপানি পপ কালচারের ফ্যান হয়ে থাকো, তবে অ্যানিমে শব্দটা তোমার কাছে অপরিচিত হওয়ার কথা নয়। শব্দটা শুনেই হয়তো তোমার প্রিয় কোনো অ্যানিমে সিরিজের কথা মনে পড়ে গেছে। এখনকার কিশোর-তরুণদের আগ্রহ ও আকর্ষণের একটি বড় জায়গা হলো এই জাপানি অ্যানিমেশন। যা সবার কাছে পরিচিত ‘অ্যানিমে’ হিসেবে।
ধরো, তুমি তোমার প্রিয় কোনো অ্যানিমে সিরিজে বুঁদ হয়ে আছ। এক বসাতেই শেষ করছ পর্বের পর পর্ব। তখন কি প্রশ্নটা একবারও তোমার মনে উঁকি দিয়েছে—বিনোদনের এত চমৎকার এই জাপানি মাধ্যমের শুরুটা কীভাবে হলো? যদি তোমার জিজ্ঞাসু মনে এই প্রশ্নটা এসে থাকে, তবে তোমার জন্যই আজকের লেখা।
শুরুর দিকে আজকের মতো ঝাঁ-চকচকে, রঙিন অ্যানিমেশন আর বৈচিত্র্যময় স্টোরিলাইনের মনোমুগ্ধকর অ্যানিমে সিরিজ ছিল না। অ্যানিমে যাত্রা শুরু করেছিল স্বল্পদৈর্ঘ্যের অ্যানিমেটেড ফিল্ম হিসেবে। মূলত পশ্চিমা অ্যানিমেটেড ফিল্ম দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে গত শতাব্দীর শুরুর দিকে জাপানিরা অ্যানিমেশন তৈরির কাজে হাত দেয়। জাপানে প্রদর্শিত প্রথম অ্যানিমেটেড ফিল্মটি ছিল ফ্রেঞ্চ অ্যানিমেটর এমিল কোল-এর তৈরি একটি ফিল্ম। নাম ‘লা এক্সপ্লোয়া দ্য ফিউ ফোলে’। জাপানে এই ফিল্মটি প্রদর্শিত হয়েছিল ১৯১২ সালে।
তোমার নিশ্চয়ই এখন জানতে ইচ্ছে করছে, প্রথম জাপানি অ্যানিমেটেড ফিল্ম কোনটা ছিল? আসলে এটা নিশ্চিতভাবে এখনো জানা সম্ভব হয়নি। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যুদ্ধ এবং সংরক্ষণের যথাযথ উদ্যোগের অভাবে আগেকার অনেক জাপানি ফিল্ম নষ্ট হয়ে গেছে কিংবা হারিয়ে গেছে। এগুলোর ভেতর অ্যানিমেটেড ফিল্মও ছিল। এখন পর্যন্ত পাওয়া জাপানি অ্যানিমেশনের সবচেয়ে পুরোনো কাজটির নাম ‘কাৎসুদো শাশিন’। ৩ সেকেন্ডের ছোট্ট এই অ্যানিমেশন স্ট্রিপটি পাওয়া যায় ২০০৫ সালে, জাপানের কিয়োতো শহরের একটি পুরোনো ফিল্ম ও প্রোজেক্টরের সংগ্রহ থেকে।
এই অ্যানিমেশন স্ট্রিপটি আসলে কে তৈরি করেছিল আর ঠিক কবেই–বা এটি তৈরি হয়েছিল, তা এখনো অজানাই রয়ে গেছে। তবে ধারণা করা হয়, এটি তৈরি হয়েছিল ১৯০৭ সালে। এটি অবশ্য বাণিজ্যিকভাবে মুক্তিপ্রাপ্ত কোনো অ্যানিমেটেড ফিল্ম নয়। একটি সেলুলয়েড স্ট্রিপে ৫০টি ছবির একটি সিরিজ স্টেন্সিল করার মাধ্যমে অ্যানিমেশনটি তৈরি করা হয়েছিল। অ্যানিমেশনটিতে দেখা যায় নাবিকের পোশাক পরা কিশোর বয়সী এক ছেলে জাপানি ভাষায় লিখছে ‘কাৎসুদো শাশিন’ যার অর্থ ‘গতিশীল ছবি’।
ধারণা করা হয়, প্রথম বাণিজ্যিকভাবে মুক্তি পাওয়া জাপানি অ্যানিমেটেড ফিল্মটির নাম ছিল ‘দেকোবো শিঙ্গাচো মেইয়ান নো শিপ্পাই’। এটি মুক্তি পায় ১৯১৭ সালের শুরুর দিকে। এই ফিল্মটির আগেও কয়েকটি জাপানি অ্যানিমেটেড ফিল্মের মুক্তির কিছু অসমর্থিত তথ্য পাওয়া যায়। তবে এসব ফিল্মের কোনোটির কোনো কপি এখন আর অবশিষ্ট নেই।
অ্যানিমের উৎপত্তি ও বিকাশ নিয়ে কিছু বলতে গেলে তিনজন মানুষের নাম অবশ্যই আসবে। তাঁরা হলেন ওতেন শিমোকাওয়া, জুনিচি কোউচি এবং সেইতারো কিতায়ামা। এই তিনজন প্রসিদ্ধ অ্যানিমেটর একসঙ্গে জাপানি অ্যানিমেশনের জনক হিসেবে পরিচিত। তিনজনই ১৯১৬ সালের দিকে পৃথকভাবে অ্যানিমেশন তৈরির কাজ শুরু করেন। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি তাঁদের প্রায় সব কাজই সময়ের সঙ্গে হারিয়ে গেছে।
তবে ২০০৮ সালে জাপানের ওসাকা শহরের একটি অ্যান্টিক শপে জুনিচি কোউচির তৈরি একটি অ্যানিমেটেড ফিল্মের কপি খুঁজে পাওয়া যায়। এই ফিল্মটির নাম ‘নামাকুরা গাতানা’। এটি ১৯১৭ সালে তৈরি একমাত্র জাপানি অ্যানিমেটেড ফিল্ম, যা কালের পরিক্রমায় হারিয়ে যায়নি। তুমি যদি আগ্রহী হও, তবে ৪ মিনিট দৈর্ঘ্যের ফিল্মটি ইউটিউবে দেখে নিতে পারো।
এভাবেই অ্যানিমের যাত্রা শুরু হয়েছিল। পরে কালের বিবর্তনে অ্যানিমে বিকশিত হয়ে বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জনের পাশাপাশি পরিণত হয় মাল্টিবিলিয়ন ডলারের ইন্ডাস্ট্রিতে।