শহরের খালে আটকে পড়া হাঙর দেখতে ছুটল ছয় লাখ মানুষ
শহরের ব্যস্ত জীবনের মাঝখানে হঠাৎ যদি একটা বিশাল হাঙর এসে হাজির হয়, কেমন হবে বলো তো? দক্ষিণ কোরিয়ার বুসান শহরে ঠিক এমনই ঘটেছে। প্রায় সাড়ে তিন মিটার লম্বা একটি হাঙর আটকে পড়েছে শহরের সরু একটি খালে। আর এটিকে দেখতে গত ১০ দিনে সেখানে ভিড় করেছেন প্রায় ছয় লাখ মানুষ!
হাঙরটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘বুকাং-ই’। বুসানের নর্থ পোর্ট বা উত্তর বন্দরের নাম থেকেই এই ডাকনাম। ১৮ সেপ্টেম্বর শহরের একটি জলাধারের পাশে হাঙরটিকে প্রথম দেখা যায়। ধারণা করা হচ্ছে, সমুদ্র থেকে শিকারের পেছনে ছুটতে ছুটতে এটি খালের ভেতরে ঢুকে পড়েছিল। পরে আর সমুদ্রে ফিরে যাওয়ার পথ খুঁজে পায়নি।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এটি ব্রোঞ্জ হুইলার প্রজাতির হাঙর। সাধারণত সমুদ্রে ঘুরে বেড়ানো এই হাঙর কীভাবে শহরের খালে ঢুকে পড়ল, সেটাই এখন কৌতূহলের বিষয়।
হাঙরটিকে সমুদ্রে ফেরানোর চেষ্টা অবশ্য প্রথম দিন থেকেই শুরু হয়েছিল। উপকূলরক্ষী বাহিনীর সদস্যরা ১৮ সেপ্টেম্বর হাঙরটিকে খাল থেকে বের করে দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু প্রায় ছয় ঘণ্টা পর সেই চেষ্টা বন্ধ করে দিতে হয়। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছিলেন, জোর করে হাঙরটিকে বের করার চেষ্টা করলে সেটি আহত হতে পারে। আবার ভয় পেয়ে আক্রমণাত্মকও হয়ে উঠতে পারে।
এরপর হাঙরটি বেশ কয়েক দিন ধরেই খালের পানিতে ঘুরে বেড়াতে থাকে। এদিকে খবর ছড়িয়ে পড়তেই বুসানে শুরু হয় অন্য রকম কাণ্ড। মানুষ হাঙরটিকে দেখতে ভিড় করতে শুরু করে। যে পার্কে সাধারণ ছুটির দিনে প্রায় দুই হাজার মানুষ ঘুরতে আসেন, সেখানে ১৯ থেকে ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দর্শনার্থীর সংখ্যা দাঁড়ায় ছয় লাখ সাত হাজার! কেউ হাঙরটির ছবি তুলেছেন, কেউ ভিডিও করেছেন, কেউ আবার দূর থেকে দাঁড়িয়ে শুধু এর পানিতে সাঁতার কাটা দেখেছেন।
হাঙরটির প্রতি মানুষের মায়াও জন্মে গেছে। ৬২ বছর বয়সী কিম জুং-সুক নামের এক নারী মঙ্গলবার হাঙরটিকে বিদায় জানাতে সেখানে গিয়েছিলেন। কয়েক দিন ধরে হাঙরটিকে দেখতে দেখতে তাঁর মায়া পড়ে গেছে। তিনি বলেন, ‘কয়েক দিন ধরে এখানে দেখতে দেখতে ওর প্রতি মায়া হয়ে গেছে। তাই একটু মন খারাপ লাগছে।’
বুসানের মেয়র চুন জে-সু-ও হাঙরটির ভক্ত হয়ে গেছেন। তাঁর ভাষায়, হাঙরটির তারকা হওয়ার মতো গুণ আছে। প্রতি পাঁচ থেকে ১০ মিনিট পরপর এটি পানির ওপরে উঠে আসে। ‘ওকে দেখতে খুব সুন্দর লাগে,’ বলেন মেয়র।
হাঙরটিকে নিয়ে শহর কর্তৃপক্ষও মজার একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একে দেওয়া হয়েছে ‘সম্মানসূচক প্রচারদূত’-এর মর্যাদা। এমনকি এর নতুন একটি উপাধিও হয়েছে, ‘শাফ্লুয়েন্সার’। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামে শহরের পক্ষ থেকে করা এক জরিপে ৯১ শতাংশ মানুষ এই প্রস্তাবের পক্ষে মত দেওয়ার পরই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বুসানের মাসকট বুগি হাঙরটির হয়ে এই সম্মাননা গ্রহণ করবে।
তবে এত মানুষের আগ্রহের মধ্যে আসল বিষয় হলো হাঙরটির নিরাপদে সমুদ্রে ফিরে যাওয়া। মৎস্যবিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, হাঙরটি আপাতত স্থিতিশীল আছে। কিন্তু খালের সরু জায়গায় এর চলাফেরা ও খাবার খোঁজার সুযোগ কমে গেছে। সেখানে বেশি দিন আটকে থাকলে ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
তাই মঙ্গলবার আবারও হাঙরটিকে সমুদ্রের দিকে ফেরানোর চেষ্টা শুরু হয়। উপকূলরক্ষী বাহিনীর নৌকা থেকে পানির জোরালো ধারা ছিটিয়ে হাঙরটিকে খালের মুখের দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়। ২০০৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটসে অগভীর পানিতে আটকে পড়া একটি গ্রেট হোয়াইট হাঙরকে উদ্ধারের সময় একই ধরনের পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছিল।
তবে প্রথম চেষ্টায় কাজ হয়নি। নৌকাগুলো হাঙরটির পেছনে পানি ছিটিয়ে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলেও সেটি নৌকাগুলোকে পাশ কাটিয়ে আবার খালের ভেতরে ফিরে যায়।
দক্ষিণ কোরিয়ার সমুদ্রে হাঙর দেখা নতুন কিছু নয়। তবে এ বছর দেশটির পূর্ব উপকূলে বড় আকারের হাঙরের দেখা পাওয়ার ঘটনা বেড়েছে। জাতীয় মৎস্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, এ বছরের প্রথম ছয় মাসে পূর্ব উপকূলে ৪৬টি বড় হাঙর রেকর্ড করা হয়েছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এই সংখ্যা প্রায় চার গুণ। বিজ্ঞানীদের মতে, সমুদ্রের পানির তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া এবং হাঙরের শিকার মাছের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে এর সম্পর্ক থাকতে পারে।
এদিকে বুসানের মানুষ অবশ্য বুকাং-ইকে বিদায় দিতে প্রস্তুত। আট বছরের লি দো-ইউন বাবার সঙ্গে হাঙরটিকে শেষবারের মতো দেখতে এসেছিল। এত দিন শহরের খালে থাকা হাঙরটি এবার হয়তো সত্যিই সমুদ্রে ফিরে যাবে, এই ভাবনায় তার অবশ্য মন খারাপ হয়নি।