স্কুলের শিক্ষক খুঁজে পেলেন বিরল টি–রেক্সের পায়ের ছাপ
যুক্তরাষ্ট্রের ডাইনোসরের জীবাশ্মে ভরা বিশেষ শিলাস্তরে ঘেরা এলাকা হেল ক্রিক ফরমেশন। মন্টানা, ওয়াইমিং, নর্থ ডাকোটা ও সাউথ ডাকোটার কিছু অঞ্চলজুড়ে বিস্তৃত এই বিশাল এলাকাটি। তবে সেখানে ডাইনোসরের পায়ের ছাপ খুঁজে পাওয়া বেশ কঠিন এক কাজ। কারণ, স্থায়ী কোনো ছাপ তৈরি হওয়ার আগেই ওখানকার পলিমাটি বা শিলাস্তর ক্ষয়ে যেত। তা সত্ত্বেও কলোরাডোর একটি হাইস্কুলের বিজ্ঞানের শিক্ষক কেন্ট হুপস এমন এক রহস্যময় চিহ্নের খোঁজ পান সেখানে।
পরে সেটা ‘টি–রেক্স’ ডাইনোসরের রেখে যাওয়া পায়ের ছাপ হিসেবে প্রমাণিত হয়। এ ধরনের ধারাবাহিকভাবে হেঁটে যাওয়ার ছাপ বা ‘ট্র্যাকওয়ে’ টি–রেক্সের ক্ষেত্রে এই প্রথম শনাক্ত করা সম্ভব হলো।
ডেনভার মিউজিয়াম অব নেচার অ্যান্ড সায়েন্সের স্বেচ্ছাসেবক হুপস বলেন, ‘প্রথমেই আমার মনে হয়েছিল, এমনটা কি সত্যিই সম্ভব। এটি যে সত্যি কোনো প্রাণীর পায়ের ছাপ, তা পুরোপুরি নিশ্চিত হতে আমি বেশ কিছুক্ষণ ওটার দিকে কেবল তাকিয়েই ছিলাম।’
হুপস প্রথম যে দুটি প্রকাণ্ড পায়ের ছাপ দেখতে পেয়েছিলেন, সেগুলোয় তিনটি করে আঙুলের স্পষ্ট চিহ্ন ছিল। আর এই চিহ্নগুলো অন্য জীবাশ্মের সঙ্গে বেশ মিলে যায়। তৎকালীন যুগের ঠিক কোন প্রাণীটি এই ছাপ রেখে গেছে, তা নিশ্চিত করতে তিনি সেই ছাপের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত মেপে দেখেন।
হুপস জানান, পায়ের ছাপের দৈর্ঘ্য যখন চওড়ার চেয়ে বেশি হয়, তখন বোঝা যায় প্রাণীটি মাংসাশী ছিল। প্রতিটি পায়ের ছাপ ছিল প্রায় ৩ ফুট লম্বা এবং ২ থেকে আড়াই ফুট চওড়া। এতেই তিনি বুঝে যান, এটি কোনো সাধারণ শিকারি নয়; বরং কোনো এক বিশাল মাংসাশী ডাইনোসরের রেখে যাওয়া চিহ্ন। এই প্রকাণ্ড টি–রেক্স ডাইনোসরটি একসময় ওই ঘন বন আর জলাভূমিতে ঘুরে বেড়াত।
অসাধারণ এই পায়ের ছাপগুলোর বিস্তারিত তথ্য ৮ সেপ্টেম্বর জার্নাল অব ভার্টিব্রেট প্যালিওন্টোলজি সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। গবেষকদের মতে, হাড়গোড়ের জীবাশ্মের চেয়ে পায়ের ছাপের এই চিহ্নগুলো অনেক বেশি নিখুঁত। কারণ, এগুলো প্রায় ৬ কোটি ৬৫ লাখ বছর আগের প্রাগৈতিহাসিক সেরা শিকারি প্রাণীটির বাস্তব চলাচলের স্মৃতি ধরে রেখেছে। এতে ওর হাঁটার ঢং ও স্বভাব সম্পর্কে বেশ দরকারি তথ্য জানা যাচ্ছে।
টি–রেক্সের হেঁটে যাওয়ার প্রথম চিহ্ন
কেন্ট হুপস প্রথম খোলামেলা স্থানে দুটি জীবাশ্মীভূত পায়ের ছাপ দেখতে পান। এর মধ্যে একটি ছাপ একটু বেশি ক্ষয়ে গিয়েছিল। গবেষণার অন্য সহলেখক ও ডেনভার মিউজিয়াম অব নেচার অ্যান্ড সায়েন্সের জ্যেষ্ঠ গবেষক টাইলার লাইসন। তিনি পুরোপুরি নিশ্চিত হতে চেয়েছিলেন, এটি সত্যি কোনো ডাইনোসরের হেঁটে যাওয়ার পথ বা ‘ট্র্যাকওয়ে’ কি না। তাই তিনি আরও জোরালো প্রমাণের খোঁজে নামেন।
প্রকৃতিতে পাথর তো নানা আকারেরই হতে পারে। কোনোটা দেখতে টেক্সাস বা ফ্লোরিডার মানচিত্রের মতো হতে পারে, আবার কোনোটা দেখতে ভুল করে টি–রেক্সের পায়ের ছাপের মতোও মনে হতে পারে।
হুপস মাটিতে সম্ভাব্য স্থান বুঝে একটি এক্স চিহ্ন এঁকে দিলেন। যেখানে আরও ছাপ থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছিল। এরপর মাটি খুঁড়তেই গবেষকেরা কেবল তৃতীয়টিই নয়, ৪ নম্বর পায়ের ছাপটিরও দেখা পেয়ে গেলেন। প্রতিটি ছাপেই ছিল তিনটি করে সরু আঙুলের চিহ্ন এবং মাঝখানের আঙুলটি ছিল অন্যগুলোর চেয়ে বেশ লম্বা, যা টি–রেক্সের পায়ের গড়নের সঙ্গে পুরোপুরি মিলে যায়।
পায়ের ছাপের বিশাল আকারও এক বড় প্রমাণ। ‘হেল ক্রিক ফরমেশন’ বিশ্বজুড়ে অন্যতম পরিচিত এক গবেষণার জায়গা, তাই এখানকার ডাইনোসরদের নিয়ে বিজ্ঞানীদের ভালো ধারণা আছে। এই এলাকায় এত বড় পায়ের ছাপ ফেলার মতো বিশাল ডাইনোসর মাত্র দুটিই ছিল—একটি টি–রেক্স এবং অন্যটি হাঁসের মতো ঠোঁটওয়ালা ডাইনোসর এডমন্টোসরাস। তবে এই দুটির পায়ের গঠন সম্পূর্ণ ভিন্ন।
গবেষণাপত্রে আনুষ্ঠানিকভাবে চারটি পায়ের ছাপের কথা লেখা হলেও এই গ্রীষ্মেই দলটি ৫ নম্বর ছাপটিরও সন্ধান পেয়েছে। এই অনন্য আবিষ্কার সম্ভব হয়েছে কারণ, ডাইনোসরটি সঠিক সময়ে সঠিক জায়গায় পা ফেলেছিল। ৬৬৫ লাখ বছর আগে আজকের এই নর্থ ডাকোটা অঞ্চলটি গাছে ঢাকা সবুজ এক এলাকা ছিল। সেখানকার নরম ও কাদামাটি এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করেছিল, যার ফলে পায়ের ছাপগুলো দ্রুত মাটির নিচে চাপা পড়ে সংরক্ষিত হয়ে যায়। পরবর্তী সময় বাতাস ও বৃষ্টির ক্ষয়ের ফলে কোটি কোটি বছর পর সেগুলো আবার বাইরে উন্মুক্ত হয়ে পড়েছে।
এর আগে বিজ্ঞানীরা টাইরানোসরাসের কেবল দুটি বিচ্ছিন্ন পায়ের ছাপ খুঁজে পেয়েছিলেন। প্রথমটি নিউ মেক্সিকোয় ১৯৯৪ সালে এক ভূতাত্ত্বিক আবিষ্কার করেন। আর দ্বিতীয়টির কথা জানা যায় ২০০৮ সালে মন্টানায়। বিজ্ঞানীদের মতে, পুরো পৃথিবীতে ডাইনোসরের একাধিক পায়ের ছাপ দেখা গেলেও উত্তর আমেরিকার এই নির্দিষ্ট যুগে এমন পুরো হাঁটার পথ বা ট্র্যাকওয়ে খুঁজে পাওয়া অত্যন্ত বিরল ঘটনা।