তারারা মিটমিট জ্বলে, গ্রহরা জ্বলে না কেন

ছবি: মিডজার্নির সাহায্যে তৈরি

রাতের পরিষ্কার আকাশের দিকে তাকালে দেখবে, কালো ক্যানভাসে ছড়ানো হাজার হাজার মায়াবী আলোর বিন্দু। একটু ভালো করে খেয়াল করলে দেখবে, কিছু তারা খুব সুন্দর করে মিটমিট করে জ্বলছে। আবার কিছু তারা কিন্তু মোটেও মিটমিট করছে না; বরং একদম স্থির হয়ে আলো দিচ্ছে। আকাশের এই স্থির আলোর বিন্দুগুলো আসলে কোনো তারা নয়, এগুলো হলো আমাদের সৌরজগতেরই একেকটি গ্রহ! যেমন শুক্র, মঙ্গল বা বৃহস্পতি।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, গ্রহ ও তারা উভয়ই তো দূর আকাশেই থাকে, তাহলে তারারা মিটমিট করে জ্বললেও গ্রহরা কেন জ্বলে না?

এই রহস্যের মূল কারণটা লুকিয়ে আছে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের ভেতর। পৃথিবীর চারপাশে গ্যাসের যে বিশাল আবরণ আছে, তা কিন্তু স্থির কোনো চাদর নয়। এটি প্রতিনিয়ত নড়াচড়া করছে। বাতাসের এই বিভিন্ন স্তরের তাপমাত্রা ও ঘনত্ব আবার আলাদা হয়। কোথাও বাতাস গরম ও হালকা, আবার কোথাও বেশ ঠান্ডা ও ভারী।

আরও পড়ুন

মহাকাশ থেকে যখন কোনো তারার আলো আমাদের চোখে এসে পৌঁছায়, তখন তাকে পৃথিবীর এই অশান্ত বায়ুমণ্ডল ভেদ করে আসতে হয়। বাতাসের এই ঘন ও হালকা স্তরগুলোর ভেতর দিয়ে আসার সময় আলোর পথ সামান্য একটু বেঁকে যায়। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় আলোর প্রতিসরণ। গ্রীষ্মকালে পিচঢালা গরম রাস্তার দিকে তাকালে যেমন মনে হয় পেছনের দৃশ্যগুলো কাঁপছে, ঠিক তেমন একটা ব্যাপার ঘটে মহাকাশ থেকে আসা আলোর ক্ষেত্রেও।

তারারা আমাদের পৃথিবী থেকে এত বেশি দূরে অবস্থিত যে বিশাল আকৃতির হওয়া সত্ত্বেও পৃথিবী থেকে তাদের কেবল একটি ছোট্ট আলোর বিন্দু বলে মনে হয়। সবচেয়ে কাছের তারাটিও আমাদের থেকে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন কিলোমিটার দূরে!

যখন এই বিন্দুর মতো তারা থেকে আসা আলোর একটি মাত্র সরু রশ্মি পৃথিবীর অস্থির বায়ুমণ্ডলের ভেতর দিয়ে আসে, তখন প্রতিসরণের কারণে সেটি বারবার তার দিক পরিবর্তন করে। আলোটি কখনো সরাসরি আমাদের চোখে পড়ে, আবার কখনো সামান্য অন্যদিকে বেঁকে যায়। ফলে তারার অবস্থান ও উজ্জ্বলতা প্রতিমুহূর্তে একটু একটু করে বদলাতে থাকে। এই আলো একবার চোখে সরাসরি পড়া আর একবার সামান্য সরে যাওয়ার কারণেই আমাদের মনে হয় তারাটি কাঁপছে বা মিটমিট করে জ্বলছে! জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভাষায় এই ঘটনাকে বলা হয় অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সিন্টিলেশন।

অন্যদিকে, গ্রহগুলো কিন্তু তারাদের মতো এত দূরে নেই। এরা আমাদের সৌরজগতের ভেতরেই, অর্থাৎ পৃথিবীর অনেক কাছাকাছি অবস্থিত। তাই পৃথিবী থেকে গ্রহগুলোকে একটি ছোট্ট বিন্দুর বদলে একটি ছোট্ট চাকতি বা থালার মতো দেখায়। যদিও খালি চোখে আকাশ দেখার সময় আমরা এই চাকতির আকার বুঝতে পারি না, কিন্তু গ্রহ থেকে আসা আলোর পরিমাণ একটি তারার আলোর বিন্দুর চেয়ে বেশ প্রশস্ত হয়।

আরও পড়ুন

তবে আলোর আসল ম্যাজিকটা কিন্তু এখানেই! যেহেতু গ্রহগুলো আমাদের কাছে একেকটি ছোট্ট চাকতির মতো, তাই এদের পৃষ্ঠ থেকে একসঙ্গে অনেক আলোর রশ্মি পৃথিবীতে আসে। গ্রহের এক পাশ থেকে আসা আলো যখন বায়ুমণ্ডলের কারণে বেঁকে অন্যদিকে চলে যায়, ঠিক সেই মুহূর্তেই গ্রহের অন্য পাশ থেকে আসা আলো বেঁকে আমাদের চোখে এসে পড়ে।

সোজা কথায়, গ্রহের চাকতির বিভিন্ন অংশ থেকে আসা আলোর রশ্মিগুলো আলাদাভাবে বায়ুমণ্ডলে কাঁপতে থাকলেও, তারা একে অপরের এই কাঁপুনি বা মিটমিট করাকে বাতিল করে দেয়। একটি আলোর রশ্মি কমে গেলে অন্যটি সেই অভাব পূরণ করে দেয়। ফলে সামগ্রিকভাবে আমরা গ্রহের আলোটাকে একটা স্থির ও উজ্জ্বল আলো হিসেবেই দেখতে পাই।

তবে এর মানে এই নয় যে গ্রহরা কখনোই মিটমিট করে না! দিগন্তের খুব কাছাকাছি যখন কোনো গ্রহ থাকে, তখন তার আলোকে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের সবচেয়ে পুরু বা ঘন স্তর ভেদ করে আমাদের চোখ পর্যন্ত আসতে হয়। তখন গ্রহের আলোও সামান্য কাঁপতে পারে বা মিটমিট করতে পারে। তবে তারাদের মতো এত স্পষ্ট করে গ্রহরা কখনোই কাঁপে না।

সূত্র: বিবিসি সায়েন্স ফোকাস ও স্পেস ডটকম
আরও পড়ুন