পরবর্তী মহামারির খবর আগে কে পাবে—মানুষ, না এআই?
একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে খবর পেলে, তোমার শহরে ডায়রিয়ার প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার আশঙ্কা আছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, তখনো কোনো হাসপাতাল রোগীতে ভরে যায়নি। চিকিৎসকেরাও কোনো সতর্কতা জারি করেননি।
তাহলে খবরটা এল কোথা থেকে? হয়তো শহরের নর্দমাব্যবস্থা থেকে। আর সেই সতর্কবার্তা দিয়েছে একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।
শুনতে বিজ্ঞান কল্পকাহিনির মতো লাগলেও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ইতিমধ্যে এমন প্রযুক্তি নিয়ে কাজ চলছে। বিজ্ঞানীরা বুঝতে শুরু করেছেন, মহামারি শুরুর আগেই আগাম খবর পাওয়া সম্ভব। যদিও কোনো মানুষ অসুস্থ হয়নি। কিন্তু কিছু সংকেত থেকে আগেই জানা যাবে মহামারির খবর।
ধরো, একটি শহরের বর্জ্যপানি বা পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থার সঙ্গে নিয়মিত সেন্সর যুক্ত আছে। প্রতিদিন সেই সেন্সর পানি থেকে রাসায়নিক উপাদান, অণুজীব, ভাইরাসের জিনগত উপাদান এবং অন্যান্য তথ্য সংগ্রহ করছে। এই বিপুল তথ্য বিশ্লেষণ করছে একটি এআই ব্যবস্থা।
হঠাৎ যদি কোনো অঞ্চলের বর্জ্যপানিতে একটি নির্দিষ্ট ভাইরাসের পরিমাণ বাড়তে শুরু করে, এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সেটি শনাক্ত করতে পারে। তখনো হয়তো সেই অঞ্চলের মানুষ অসুস্থ বোধ করছেন না। কিন্তু রোগটি ইতিমধ্যে ছড়াতে শুরু করেছে।
কোভিড-১৯ মহামারির সময় এমন একটি পদ্ধতি ব্যাপক গুরুত্ব পায়। গবেষকেরা দেখেন, আক্রান্ত ব্যক্তিরা অনেক সময় উপসর্গ প্রকাশের আগেই ভাইরাসের জিনগত উপাদান বর্জ্যের মাধ্যমে পরিবেশে ছড়িয়ে দেন। ফলে বর্জ্যপানি বিশ্লেষণ করে অনেক ক্ষেত্রে সংক্রমণের প্রবণতা আগেভাগে বোঝা সম্ভব হয়।
এই পদ্ধতিকে বলা হয় ওয়েস্ট ওয়াটার সার্ভিলেন্স।
তবে শুধু নর্দমা থেকে খবর পাওয়া যায়, এমন নয়। ভবিষ্যতের জনস্বাস্থ্যব্যবস্থায় পানীয় জল, বায়ুর মান, মশার সংখ্যা, আবহাওয়ার পরিবর্তন, হাসপাতালের রোগীর তথ্য, এমনকি ইন্টারনেটে মানুষের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত অনুসন্ধানও একসঙ্গে বিশ্লেষণ করতে পারবে এআই।
ধরো কোনো অঞ্চলে অস্বাভাবিক বৃষ্টি হয়েছে। একই সময়ে তাপমাত্রাও ডেঙ্গু বিস্তারের জন্য উপযোগী। মশার ঘনত্ব বাড়ছে। স্থানীয় ক্লিনিকগুলোতে জ্বরের রোগীও কিছুটা বাড়তে শুরু করেছে। আলাদাভাবে দেখলে তথ্যগুলো হয়তো তেমন গুরুত্বপূর্ণ মনে হবে না। কিন্তু এআই মডেলে এগুলোকে একত্র করে সম্ভাব্য ঝুঁকির একটি চিত্র তৈরি করা যায়।
এখানেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বড় শক্তি। এটি শুধু তথ্য সংগ্রহ করে না। তথ্যের মধ্যে লুকিয়ে থাকা সম্পর্কও খুঁজে বের করার চেষ্টা করে।
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা দরকার। এআই ভবিষ্যৎ দেখতে পারে না। এটি কোনো জাদুকরও নয়। এআই কেবল সম্ভাব্য সংকেত শনাক্ত করতে পারে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হয় বিজ্ঞানী, চিকিৎসক, মহামারিবিদ ও জনস্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞদের।
ভুলের সম্ভাবনাও রয়েছে। কখনো এআই অপ্রয়োজনীয় সতর্কতা দিতে পারে। আবার কখনো গুরুত্বপূর্ণ সংকেত ধরতে ব্যর্থও হতে পারে। তাই প্রযুক্তিকে মানুষের বিকল্প হিসেবে নয়, বরং সহকারী হিসেবে দেখা বেশি বাস্তবসম্মত।
তবু ভবিষ্যতের কথা ভাবলে একটি প্রশ্ন থেকেই যায়। আমরা কি এমন একটি পৃথিবীর দিকে এগোচ্ছি, যেখানে রোগী হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই জনস্বাস্থ্যব্যবস্থা সতর্ক হয়ে যাবে?
যেখানে শহরের নর্দমা, পানির লাইন, পরিবেশের সেন্সর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা একসঙ্গে কাজ করে মহামারির আগাম সংকেত খুঁজে বের করবে?
উত্তরটি এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি।
কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট। আগামী দিনের জনস্বাস্থ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সবচেয়ে বড় ভূমিকা চিকিৎসকের জায়গা নেওয়া নয়, বরং এটি এমন সংকেত খুঁজে বের করার কাজে লাগবে, যা মানুষের চোখে ধরা পড়তে আরও কিছু সময় লাগত।
আর মহামারির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কখনো কখনো কয়েক দিনের আগাম সতর্কতা হাজার হাজার মানুষের জীবন বাঁচিয়ে দিতে পারে।