আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্ব ১

আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্ব

১৯০৫ সালের কথা। আলবার্ট আইনস্টাইন তখন ২৬ বছরের এক টগবগে যুবক। সদ্য বিয়ে করেছেন। কাজ করতেন সুইজারল্যান্ডের এক পেটেন্ট অফিসে। এই অফিসে নতুন নতুন আবিষ্কারের অনুমোদন দেওয়া হতো। তিনি যখন জুরিখের পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ছাত্র ছিলেন, তখনকার রেজাল্ট কিন্তু মোটেও আহামরি ছিল না! বেশি নম্বর পাওয়ার জন্য বইয়ের পাতা মুখস্থ করতে তিনি মোটেই পছন্দ করতেন না। তার চেয়ে বরং তিনি নিজের মতো করে বই পড়তে, ভাবতে এবং স্বপ্ন দেখতেই বেশি ভালোবাসতেন। তিনি কিছুদিন পদার্থবিজ্ঞান পড়ানোর চেষ্টাও করেছিলেন। কিন্তু শিক্ষক হিসেবে তিনি খুব একটা সুবিধার ছিলেন না। তাই কয়েকবার পড়ানোর চাকরিটাও খুইয়েছিলেন!

তবে এই গল্পের আরেকটা দিকও আছে। একদম ছোটবেলা থেকেই আইনস্টাইন প্রকৃতির নিয়মকানুন নিয়ে গভীরভাবে ভাবতেন। পরে তিনি নিজেই বলেছিলেন, ছোটবেলায় দুটো জিনিস তাঁকে সবচেয়ে বেশি অবাক করেছিল। প্রথমটি হলো একটা কম্পাস, যেটা তাঁর বাবা তাঁকে দেখিয়েছিলেন চার-পাঁচ বছর বয়সে। দ্বিতীয়টি ইউক্লিডিয়ান জ্যামিতির একটা বই, যেটা তিনি পড়েছিলেন ১২ বছর বয়সে। এই দুটি বিস্ময় আইনস্টাইনের পুরো জীবনের কাজের দারুণ দুটি প্রতীক।

কম্পাসটি হলো আমাদের চারপাশের এই বিশাল ভৌত জগতের প্রতীক, যে জগৎ সম্পর্কে আমরা কখনোই শতভাগ নিশ্চিত হতে পারি না। অন্যদিকে জ্যামিতির বইটি হলো বিশুদ্ধ গণিতের প্রতীক, যার সবকিছু একদম নিখুঁত এবং নিশ্চিত; কিন্তু এর সঙ্গে আমাদের চারপাশের বাস্তব পৃথিবীর সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই। তুমি শুনলে অবাক হবে, মাত্র ১৬ বছর বয়সের আগেই আইনস্টাইন নিজের চেষ্টায় ক্যালকুলাস ও অ্যানালিটিক্যাল জ্যামিতির মতো কঠিন সব গণিত খুব ভালোভাবে শিখে ফেলেছিলেন!

সুইস পেটেন্ট অফিসে কাজ করার ফাঁকে আইনস্টাইন আলো ও গতি নিয়ে নানা রকম জটিল সমস্যা নিয়ে ভাবতেন। তাঁর বিখ্যাত স্পেশাল থিওরি অব রিলেটিভিটি ছিল বিজ্ঞানীদের সমাধান করতে না পারা অনেকগুলো পরীক্ষার দারুণ একটা উত্তর। এর মধ্যে মাইকেলসন-মোর্লির পরীক্ষাটি ছিল সবচেয়ে চমকপ্রদ ও আলোচিত। তবে এটা মনে রাখা খুব জরুরি যে বিদ্যুৎ ও চুম্বক নিয়ে আরও অনেক পরীক্ষাই বিজ্ঞানীদের তখন রীতিমতো ঘোল খাইয়ে ছাড়ছিল। মাইকেলসন-মোর্লির পরীক্ষাটি যদি কখনো না–ও হতো, তবু আইনস্টাইন তাঁর এই বিশেষ তত্ত্বটি ঠিকই আবিষ্কার করতেন।

আরও পড়ুন

আইনস্টাইন নিজেই পরে বলেছিলেন, তাঁর চিন্তাভাবনার জগতে মাইকেলসন-মোর্লির পরীক্ষার ভূমিকা খুব সামান্যই ছিল। হ্যাঁ, এটা ঠিক যে মাইকেলসন ও মোর্লি যদি সত্যি সত্যিই ইথার বায়ুর খোঁজ পেতেন, তাহলে আইনস্টাইনের এই তত্ত্ব শুরুতেই বাতিল হয়ে যেত। কিন্তু ইথার বায়ু না পাওয়ার সেই ফলাফল ছিল অনেকগুলো সূত্রের মধ্যে মাত্র একটি সূত্র, যা আইনস্টাইনকে তাঁর তত্ত্বে পৌঁছাতে সাহায্য করেছিল।

লরেন্টজ ও ফিটজেরাল্ড ইথার বায়ুর তত্ত্বকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলেন। তাঁরা ধরে নিয়েছিলেন, চলন্ত অবস্থায় ইথার বায়ুর চাপের কারণে বস্তুর আকার সত্যিই ছোট হয়ে যায়। কিন্তু আইনস্টাইন আগের যুগের বিজ্ঞানী আর্নস্ট মাখের পথ ধরে আরও বড় একটা সাহসী পদক্ষেপ নিলেন। তিনি বললেন, মাইকেলসন ও মোর্লির ইথার বায়ুর খোঁজ না পাওয়ার কারণটা খুব সহজ। ইথার বায়ু বলে আসলে কিছুই নেই! তিনি কিন্তু এমনটা বলেননি যে ইথার নেই; তিনি শুধু বলেছিলেন, ইথার যদি থেকেও থাকে, তবু কোনো বস্তুর সুষম বা স্থির গতি মাপার ক্ষেত্রে এর কোনো দরকার নেই।

ক্ল্যাসিক্যাল পদার্থবিজ্ঞান, অর্থাৎ বিজ্ঞানী আইজ্যাক নিউটনের পদার্থবিজ্ঞানের নিয়মগুলো থেকে একটা ব্যাপার খুব পরিষ্কার। ধরো, তুমি এমন একটা ট্রেনের বগির ভেতর আছ, যার চারপাশ পুরোপুরি বন্ধ। বাইরের কোনো দৃশ্যই তুমি দেখতে পাচ্ছ না। ট্রেনটি যদি একদম সমান গতিতে মসৃণভাবে ছুটতে থাকে—অর্থাৎ কোনো ঝাঁকুনি নেই, ডানে-বাঁয়ে না দোলে—তাহলে ভেতরে বসে কোনো যান্ত্রিক পরীক্ষা করেই তুমি প্রমাণ করতে পারবে না যে ট্রেনটি চলছে।

তুমি যদি ট্রেনের ভেতর একটি বল সোজা ওপরের দিকে ছুড়ে দাও, সেটি ঠিক সোজা তোমার হাতেই ফিরে আসবে। ট্রেনটি এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকলেও ঠিক এমনটাই ঘটত। তবে ট্রেনের বাইরে মাটিতে দাঁড়িয়ে থাকা কোনো মানুষ যদি ট্রেনের দেয়াল ভেদ করে দেখতে পেত, তবে তার কাছে মনে হতো বলটি একটা বাঁকা পথে গিয়ে পড়ছে। কিন্তু ট্রেনের ভেতরে থাকা তোমার কাছে মনে হবে বলটি সোজাই উঠছে এবং নামছে। আমাদের ভাগ্য ভালো যে জিনিসপত্র এমন আচরণই করে। তা না হলে আমরা কখনোই ক্রিকেট, বেসবল বা টেনিস খেলতে পারতাম না। ভাবো তো, তুমি বলটা ওপরে ছুড়লে আর ততক্ষণে পৃথিবীর মাটি তোমার পায়ের নিচ থেকে সরে গেল! কেমন বিপদ হতো বলো!

আরও পড়ুন

আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্ব নিউটনের এই পুরোনো আপেক্ষিকতার ধারণাকেই আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেছে। এই তত্ত্ব বলছে, ট্রেনের ভেতরের কোনো যান্ত্রিক পরীক্ষা দিয়ে যেমন এর গতি মাপা যায় না, তেমনি কোনো আলোক পরীক্ষা বা আরও সঠিকভাবে বললে তড়িৎচৌম্বকীয় তরঙ্গের পরীক্ষা দিয়েও এর গতি মাপা অসম্ভব। বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্বকে খুব সহজে এক কথায় এভাবে বলা যায়—কোনো বস্তুর সুষম গতি একেবারে নিখুঁত বা পরমভাবে মাপার কোনো উপায়ই নেই।

আমরা যদি মসৃণভাবে এবং সুষম গতিতে চলতে থাকা কোনো ট্রেনের ভেতরে থাকি, তবে ট্রেনটি চলছে কি না, তা বোঝার জন্য আমাদের জানালার পর্দা একটুখানি সরিয়ে বাইরের কোনো কিছুর দিকে তাকাতেই হবে। আপাতত ধরো, রাস্তার পাশের বিদ্যুতের খুঁটি দেখলে। কিন্তু তখনো আমরা নিশ্চিত করে বলতে পারব না, ট্রেনটি খুঁটির পাশ দিয়ে ছুটছে, নাকি খুঁটিটি ট্রেনের পাশ দিয়ে ছুটছে! আমরা বড়জোর এটুকু বলতে পারি, ট্রেন এবং মাটি একে অপরের সাপেক্ষে সুষম গতিতে চলছে।

তুমি কি খেয়াল করেছ, ওপরের প্যারায় আমি বারবার ‘সুষম’ শব্দটা ব্যবহার করেছি? সুষম গতি মানে কী জানো? একদম সোজা পথে, একই বেগে ছুটে চলা। আর অসম গতি বা ত্বরণ মানে হলো, যখন কোনো বস্তুর গতি সময়ের সঙ্গে বাড়ে বা কমে। গতি কমলে তাকে ঋণাত্মক ত্বরণ বা মন্দন বলে। অথবা বস্তুটি সোজা পথে না গিয়ে বাঁকা পথে গেলেও তা সুষম গতি হবে না।

একটা সহজ উদাহরণ দিই। বাসে চড়েছ নিশ্চয়ই। বাস কি সব সময় একই গতিতে চলতে পারে? না, পারে না। কারণ, বাসকে হঠাৎ করে ব্রেক চাপতে হয়। তা ছাড়া বাসের রস্তাও একদম সোজা নয়। তাই এটা সুষম গতি হবে না।

সুষম গতির আপেক্ষিকতার বিষয়টা শুনতে বেশ নিরীহ মনে হচ্ছে, তাই না? কিন্তু সত্যি বলতে কী, এই ধারণা আমাদের এমন এক অদ্ভুত জগতে নিয়ে ফেলে, যার সঙ্গে শুধু লুইস ক্যারলের অ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড বইয়ের সেই আয়নার পেছনের আজব দুনিয়ারই তুলনা চলে! কারণ, ইথারের মতো কোনো স্থির বা পরম কাঠামোর সাপেক্ষে যদি সুষম গতি মাপার কোনো উপায়ই না থাকে, তবে আলোর আচরণ এমন অদ্ভুত হয়ে যায় যা আমাদের সাধারণ বুদ্ধি বা দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার একেবারেই উল্টো!

ধরো, একজন নভোচারী তাঁর মহাকাশযানে চড়ে আলোর একটি রশ্মির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুটছেন। মহাকাশযানটির গতি আলোর গতির ঠিক অর্ধেক। এখন সেই নভোচারী যদি আলোর বেগ মাপেন, তবে কী দেখবেন জানো? তিনি দেখবেন, আলোর রশ্মিটি আগের মতোই সেকেন্ডে ২ লাখ ৯৯ হাজার ৮০০ কিলোমিটার বেগে তাঁকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে! একটু ভেবে দেখো। ইথার বায়ু বলে যদি কিছু না থাকে, তবে এমনটাই তো ঘটার কথা! নভোচারীর গতির কারণে যদি আলোর গতি কমে যেত, তবে তো তিনি সেই ইথার বায়ুরই খোঁজ পেয়ে যেতেন, যা মাইকেলসন ও মোর্লি শত চেষ্টা করেও পাননি। একইভাবে, মহাকাশযানটি যদি আলোর গতির অর্ধেক বেগে সোজা আলোর উৎসের দিকে ছুটে যায়, তবে কি আলোর বেগ দ্বিগুণ মনে হবে? মোটেই না! তখনো নভোচারী দেখবেন, আলো সেই সেকেন্ডে ২ লাখ ৯৯ হাজার ৮০০ কিলোমিটার বেগেই তাঁর দিকে ধেয়ে আসছে। নভোচারী আলোর সাপেক্ষে যেভাবেই ছুটুন না কেন, আলোর বেগ মাপলে সব সময় একই ফলাফল পাবেন।

আরও পড়ুন

অনেকেই বলেন, আপেক্ষিকতা তত্ত্ব নাকি পদার্থবিজ্ঞানের সবকিছুকেই আপেক্ষিক করে দিয়েছে, পৃথিবীতে পরম বলতে আর কিছুই রাখেনি। এটা কিন্তু একেবারেই ঠিক নয়। এই তত্ত্ব এমন কিছু বিষয়কে আপেক্ষিক প্রমাণ করেছে, যেগুলো আগে পরম বলে ভাবা হতো। কিন্তু একইসঙ্গে এটি নতুন কিছু পরম বিষয়েরও জন্ম দিয়েছে। পুরোনো পদার্থবিজ্ঞানে আলোর বেগ ছিল আপেক্ষিক। অর্থাৎ যে দেখছে তার গতির ওপর ভিত্তি করে আলোর বেগ বদলানোর কথা ছিল। কিন্তু আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্বে আলোর বেগ হয়ে দাঁড়াল নতুন এক পরম বিষয়। আলোর উৎস কীভাবে ছুটছে বা পর্যবেক্ষক কীভাবে ছুটছেন, তাতে কিছুই যায় আসে না। যে মাপছে, তার সাপেক্ষে আলোর বেগ কখনোই বদলায় না।

এবার চলো মহাকাশে দুটো মহাকাশযানের কথা কল্পনা করি। ধরো, এদের নাম যথাক্রমে ‘ক’ এবং ‘খ’। আপাতত ধরে নিই, পুরো মহাবিশ্বে এই দুটো যান ছাড়া আর কিচ্ছু নেই! যান দুটো একই বেগে একে অপরের দিকে এগিয়ে আসছে। এখন যেকোনো যানের নভোচারীর পক্ষে কি বলা সম্ভব যে নিচের তিনটি কথার মধ্যে কোনটি সত্যি বা কোনটি পরম?

১. ‘ক’ যানটি স্থির দাঁড়িয়ে আছে, আর ‘খ’ যানটি চলছে।

২. ‘খ’ যানটি স্থির দাঁড়িয়ে আছে, এবং ‘ক’ যানটি চলছে।

৩. দুটো যানই চলছে।

আইনস্টাইনের উত্তর হলো—না, এটা নিশ্চিতভাবে বলার কোনো উপায়ই নেই! যেকোনো যানের নভোচারী চাইলে ধরে নিতে পারেন যে, ‘ক’ যানটি স্থির। আলো বা বিদ্যুৎ-চুম্বকের কোনো পরীক্ষা দিয়েই এটা প্রমাণ করা যাবে না যে তাঁর ধারণাটি ভুল। আবার তিনি যদি ধরে নেন যে ‘খ’ যানটি স্থির, তাহলেও একই কথা খাটবে। আবার তিনি যদি মনে করেন দুটো যানই চলছে, তবে তাঁকে এই যান দুটোর বাইরে এমন কোনো একটা বিন্দুকে প্রসঙ্গ কাঠামো হিসেবে ধরে নিতে হবে, যার সাপেক্ষে যান দুটো গতিশীল। এখানে আসলে কোনো একটা পছন্দ সঠিক এবং অন্যগুলো ভুল; এমনটা বলার সুযোগ নেই। যেকোনো একটি যানের পরম গতি আছে বলাটা একদম অর্থহীন। এখানে একটাই সত্যি আছে, একটি আপেক্ষিক গতি দুটি যানকে সুষম বেগে একে অপরের কাছাকাছি নিয়ে আসছে।

এখানের বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্বের খুব কঠিন ও গাণিতিক বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করা সম্ভব নয়। আমরা বরং এমন কিছু চমকপ্রদ ফলাফলের কথা জানার চেষ্টা করি, যা আইনস্টাইনের তত্ত্বের দুটি মূল ভিত্তি বা স্বীকার্য থেকে যুক্তির মাধ্যমে বেরিয়ে আসে। আপেক্ষিকতা নিয়ে লেখা তাঁর প্রথম গবেষণাপত্রে তিনি এই দুটি মূল ভিত্তির কথা বলেছিলেন।

১. কোনো বস্তু স্থির আছে, নাকি একটি স্থির ইথারের সাপেক্ষে সুষম গতিতে চলছে, তা বোঝার কোনো উপায় নেই।

২. আলোর উৎস যেভাবেই ছুটুক না কেন, শূন্যস্থানে আলো সব সময় একই স্থির বেগে ছুটে চলে।

আরও পড়ুন