প্রকৃতিতে কে কাকে খায়, জানার চেষ্টা করছেন গবেষকেরা
স্কুলে আমরা প্রথম খাদ্যশৃঙ্খল বা ফুড চেইনের কথা জানতে পারি। তবে তা প্রকৃতির আসল খাদ্যশৃঙ্খলের কেবল প্রাথমিক ধারণাটুকু দেয়। যেমন ইঁদুর মাঠের ফসল খায়, সাপ ইঁদুরকে ধরে আর ইগল আবার সেই সাপকে শিকার করে নিয়ে যায়। কিন্তু এই সহজ হিসাবটার ভেতরে অনেক জটিল বিষয়ই বাদ পড়ে যায়। যেমন এঁটুলি বা পেটের কৃমির মতো পরজীবীরা সরাসরি ইগল আর ইঁদুরের শরীর থেকেই পুষ্টি নেয়। আবার এসব শিকারি প্রাণী মারা গেলে এদের মৃতদেহ খেয়ে সাফ করে দেয় পিঁপড়া ও অন্যান্য মৃতভোজী প্রাণী।
প্রকৃতিতে বিভিন্ন প্রাণীর এই জটিল সম্পর্কের হিসাব বের করা বেশ কঠিন ও সময়সাপেক্ষ। এত দিন গবেষকদের দিনের পর দিন মাঠে ঘাটে ঘুরতে হতো। ছানাদের মা-বাবা পাখি কী খাওয়াচ্ছে, তা জানতে পাখির বাসায় নজর রাখতে হতো। এমনকি শিকার হওয়া প্রাণীর হাড়গোড় খুঁজে পেতে গবেষকদের প্রাণীর মলের মতো দুর্গন্ধযুক্ত জিনিস নিয়েও গবেষণা করতে হতো।
তবে গবেষকদের হাতে এখন এসেছে দারুণ এক শক্তিশালী ও আধুনিক মাধ্যম। এর নাম ‘হু ইটস হুম’ (Who Eats Whom)। এটি সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে পরিচালিত একটি প্রজেক্ট। এই কাজ সহজ করতে তারা ‘আই-ন্যাচারালিস্ট’ নামের একটি সামাজিক নেটওয়ার্ক ব্যবহার করছেন। সেখানে সাধারণ মানুষ নানা প্রাণীর ছবি তুলে নিজেদের ভৌগোলিক অবস্থান বা জিওট্যাগসহ আপলোড করে দেন।
‘হু ইটস হুম’ কেবল প্রাণীদের শিকারের ছবি দেখার জায়গা নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছে। নর্থ ক্যারোলাইনা স্টেট ইউনিভার্সিটির গবেষক ব্র্যাডলি আলফ এই প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেন। এখন পর্যন্ত ১০০টির বেশি দেশের ৫ হাজার ৭০০টি প্রজাতির প্রায় ১৭ হাজারটি খাদ্যাভ্যাসের তথ্য এতে জমা হয়েছে। একজন গবেষক একা যে তথ্য বহু বছরেও পেতেন না, সাধারণ মানুষ ছবি শেয়ার করে তার চেয়ে অনেক বেশি তথ্য জমা করে দিচ্ছেন।
গবেষক অদিতি মল্লাভারাপু জানান, মাত্র পাঁচ বছরেই প্রাণীদের খাদ্যাভ্যাসে বড় পরিবর্তন এসেছে। তাই বিশ্বজুড়ে বাস্তুসংস্থান কীভাবে পাল্টাচ্ছে, তা বুঝতে এই বিশাল তথ্য বেশ কাজে দিচ্ছে।
ওয়েবসাইটের ‘ইন্টারঅ্যাকটিভ ফুড ওয়েব’-এ গেলে যেকোনো প্রাণীর খাদ্যজাল দেখা যায়। লাল-লেজযুক্ত বাজপাখি ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণী ও আমেরিকান রবিন পাখি শিকার করে। এই রবিন পাখি আবার বিভিন্ন উদ্ভিদের ফল বা পাতা খায়। আবার ‘ওয়েস্টার্ন হানি বি’ ফুল থেকে পরাগায়ন ঘটায়। আবার নিজেই ভুতুড়ে সাদা রঙের ‘গোল্ডেনরড ক্র্যাব স্পাইডার’-এর শিকারে পরিণত হয়।
এখানে বহু অবাক করা দৃশ্যও ধরা পড়ে। সান লুইস ওবিস্পো কাউন্টির এক সৈকতে নিউ ওয়ার্ল্ড শকুনকে মরা শিশু সাদা হাঙরের শরীর ঠুকরে খেতে দেখা গেছে। প্রকৃতিতে প্রাণীদের খাদ্যশৃঙ্খলের এই জটিল হিসাবগুলোকেই এখন নিখুঁতভাবে সংরক্ষণ করছে এই প্ল্যাটফর্ম।
বর্তমানে প্রচুর মানুষের হাতে স্মার্টফোন রয়েছে। আর তারা সৈকত, বন কিংবা মরুভূমিতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। ফলে বাস্তুসংস্থানবিদরা প্রকৃতি পর্যবেক্ষণে সাধারণ মানুষের এক বিশাল দল বা মিত্র পেয়ে গেছেন। এই প্রকল্পে যুক্ত না থাকা ক্যালিফোর্নিয়া একাডেমি অব সায়েন্সেসের গবেষক পিটার রূপনারাইন বলেন, ‘প্রকৃতিতে অজস্র প্রজাতি আর এদের মধ্যে সম্পর্কের সীমাহীন জটিলতা রয়েছে। তাই এই সব তথ্য নির্ভুলভাবে সংগ্রহ করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক ঘটনা চোখের পলকে ঘটে যায় হয়তো কোনো প্রাণীর জীবনে মাত্র একবারই এমন ঘটে, তা ছাড়া এগুলো পৃথিবীর সব জায়গায় ছড়িয়ে রয়েছে।’
কে কাকে শিকার করে বা খায়, তা সঠিকভাবে বুঝতে পারলে গবেষক ও পরিবেশবিদরা বিপন্ন প্রজাতিদের রক্ষা করার ভালো উপায় খুঁজে পাবেন। পৃথিবী দ্রুত উত্তপ্ত হওয়ার কারণে অনেক প্রাণী তুলনামূলক শীতল মেরু অঞ্চলের দিকে সরে যাচ্ছে। এতে বাস্তুসংস্থান বদলে যাচ্ছে ও প্রাণীদের পারস্পরিক সম্পর্কের ধরনও পাল্টাচ্ছে। ‘হু ইটস হুম’-এর মতো প্ল্যাটফর্ম থাকায় সাধারণ মানুষ নিজের স্মার্টফোন ক্যামেরা দিয়েই এলাকায় আসা নতুন প্রাণীর উপস্থিতি রেকর্ড করে রাখতে পারছেন।
ক্যালিফোর্নিয়া একাডেমি অব সায়েন্সেসের পরিচালক রেবেকা জনসন বলেন, অংশগ্রহণকারীদের জন্য এটি দারুণ এক রোমাঞ্চকর কাজ। এটি চারপাশে প্রকৃতিকে নতুন চোখে দেখতে এবং সেই তথ্য সবার সঙ্গে শেয়ার করতে শেখায়।
একই সঙ্গে, ক্ষতিকর বা আক্রমণাত্মক প্রজাতিগুলো বিশ্বজুড়ে নানা অঞ্চলের বাস্তুসংস্থান ধ্বংস করছে। এই ক্ষুধার্ত বহিরাগত প্রাণীগুলো লাগামহীনভাবে ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় প্রজাতিগুলো বিলুপ্তির মুখে পড়ে। যারা এমনিতেই তীব্র দাবদাহ ও খরার কারণে সংকটে রয়েছে। গবেষকেরা বলেন, ‘আমাদের জানা জরুরি এই আক্রমণাত্মক প্রাণীরা কাদের শিকার করছে। আর এদের খাদ্যতালিকায় এমন কোনো দুর্লভ প্রজাতি আছে কি না, যা নিয়ে আমাদের চিন্তিত হওয়া দরকার।’
ওলটপালট হতে থাকা এই পৃথিবীতে প্রজাতিদের বাঁচিয়ে রাখতে হলে কেবল কিছু বন বা সমুদ্র আলাদা করে সংরক্ষণ করলেই চলবে না। সংরক্ষণবাদীদের নিশ্চিত করতে হবে যে মাংসাশী ও সর্বভুক প্রাণীরা যেন এদের স্বাভাবিক শিকার পায় এবং তৃণভোজী প্রাণীরা যেন এদের বেঁচে থাকার প্রয়োজনীয় গাছপালা খুঁজে পায়। বাস্তুসংস্থানবিদ বলেছেন, প্রাণীদের কেবল কিছুটা জায়গার দরকার নেই, এদের বাঁচতে হলে প্রকৃতির সেই পারস্পরিক খাদ্য-সম্পর্কগুলো টিকিয়ে রাখা প্রয়োজন।
সূত্র: পপুলার সায়েন্স