বিশ্বের সবচেয়ে শিক্ষিত মানুষ কি জেমি বিটন
২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের ফল সেমিস্টারের শুরুতে অধ্যাপক লিসা বেলকিন খেয়াল করেন, তাঁর এক ছাত্র এখনো ক্লাসে আসেনি। বেলকিন কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্নালিজম স্কুলের একজন সহযোগী অধ্যাপক।
সাধারণত তিনি শিক্ষার্থীদের বিষয়ে ইন্টারনেটে আগে থেকে কোনো খোঁজ খবর নেন না। তাই জেমি বিটন নামের এই ছাত্র সম্পর্কে তিনি কিছুই জানতেন না। জেমি বিটনের অনুপস্থিতির কারণ জানতে তিনি ডিনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এরপর ডিন জেমি বিটনকে একটি ই–মেইল পাঠান।
উত্তরে জেমি দুঃখ প্রকাশ করে জানান, তিনি নিজের কাজের সময়সূচি গুলিয়ে ফেলেছিলেন। তিনি তখন নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি কোর্স পড়াচ্ছিলেন। তবে পরবর্তী সপ্তাহেই নিউইয়র্কে ফিরে আসবেন বলে জানান।
তখনই লিসা বেলকিন গুগলে জেমি বিটন সম্পর্কে খোঁজ নেওয়ার কথা ভাবেন। তিনি জানতে চান, কে এই তরুণ?
অনুসন্ধান করে লিসা বেলকিন জানতে পারেন, মাত্র ২৮ বছর বয়সের মধ্যেই জেমি বিটনের রয়েছে অভাবনীয় সব ডিগ্রি। ২০১৬ সালে তিনি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে স্নাতক শেষ করেন। পাশাপাশি অ্যাপ্লায়েড ম্যাথমেটিকসে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেন। এরপর তিনি স্ট্যানফোর্ড থেকে এমবিএ ও ইয়েল থেকে আইন বিষয়ে ডিগ্রি অর্জন করেন। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রোডস স্কলার হিসেবে পাবলিক পলিসিতে পিএইচডিও সম্পন্ন করেন তিনি।
এখানেই শেষ নয়। অনলাইনে ও সরাসরি ক্লাসে অংশ নিয়ে তিনি ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়া, স্ট্যানফোর্ড, প্রিন্সটন, ডার্টমাউথ, কিংস কলেজ এবং লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিভিন্ন বিষয়ে আরও একাধিক স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেন।
এর বাইরেও জেমির আরেকটি পরিচয় আছে। নিউজিল্যান্ডে জন্ম ও বেড়ে ওঠা জেমি বিটন হলেন ‘ক্রিমসন এডুকেশন’-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী। এটি একটি কলেজ ভর্তিবিষয়ক পরামর্শদাতা প্রতিষ্ঠান, যার বর্তমান বাজারমূল্য ৬০ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি।
ই–মেইল পাঠানোর এক সপ্তাহ পর জেমি অবশেষে বেলকিনের ক্লাসে এসে যোগ দেন। পুরো সেমিস্টারে তিনি কোনো অ্যাসাইনমেন্ট জমা দিতে ভুল করেননি। বেলকিন বলেন, শিক্ষার্থী হিসেবে ওকে পাওয়াটা আনন্দের ছিল। তবে শিক্ষক হিসেবে কোনো ছাত্রের সঙ্গে এটিই আমার সবচেয়ে অদ্ভুত অভিজ্ঞতা।
কৌতূহল ও ডিগ্রির রেকর্ড
৫ ফুট ৬ ইঞ্চি উচ্চতার জেমি বিটনের লিংকডইন প্রোফাইল দেখলে যে কেউ অবাক হবে। একের পর এক ডিগ্রি অর্জন করছেন তিনি। ৩১ বছর বয়সেই তিনি নিজেকে আজীবন শিক্ষার্থী বানিয়ে ফেলেছেন। তিনি যেভাবে ছুটছেন, তাতে খুব দ্রুতই নতুন রেকর্ড গড়বেন। ৫০ বছর বয়সে ১৬টি ডিগ্রি নেওয়া বেঞ্জামিন বোলগার কিংবা ৩০টির বেশি ডিগ্রি থাকা মাইকেল নিকলসনকেও হয়তো তিনি হারিয়ে দেবেন।
পড়াশোনার পাশাপাশি জেমি বিটন একজন সফল উদ্যোক্তা। তাঁর প্রতিষ্ঠান ‘ক্রিমসন এডুকেশন’ শিক্ষার্থীদের বিশ্বের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পরামর্শ দেয়। যার ফি ৩০ হাজার থেকে ২ লাখ মার্কিন ডলার পর্যন্ত। ব্যবসার এত প্রচারের মধ্যেও কেবল অদম্য কৌতূহল ও শেখার আগ্রহ থেকেই তিনি একের পর এক ডিগ্রি নিচ্ছেন।
স্ত্রী প্রিসিলাকে নিয়ে ম্যানহাটানে থাকেন জেমি। সারা দিন কাজ আর পড়ার চাপে ব্যস্ত থাকতেই তিনি ভালোবাসেন। তাঁর পছন্দের তালিকায় রয়েছে শিক্ষার্থীদের সাহায্য করা, বড় বই পড়া থেকে শুরু করে দ্রুততম রোলার কোস্টারে চড়ার মতো অদ্ভুত সব অভিজ্ঞতা।
ব্যবসায়িক সফরে ভারতে বসেও জেমি ব্রাউন ইউনিভার্সিটির প্রজেক্ট জমা দেন। রাতে ছয় ঘণ্টা ঘুমান তিনি। নিউজিল্যান্ডের সাবেক প্রধানমন্ত্রী জন কি বিজ্ঞানী আর্নেস্ট রাদারফোর্ডের পর জেমি বিটনকেই নিউজিল্যান্ডের সেরা মেধাবী মনে করেন।
‘আমি কাজ করতে চাই’
জেমি বিটনের বেড়ে ওঠা নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ডে। তিনি মা পলা বিটনের একমাত্র সন্তান। জেমির জন্মের আগেই মা-বাবার বিচ্ছেদ হয়। পরিবারে জেমির সঙ্গে তাঁর নানা-নানিও থাকতেন। পুরো পরিবারে পড়াশোনাকে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হতো।
মা পলা বিটন নতুন গাড়ি বা বিলাসিতা বাদ দিয়ে ছেলের পড়াশোনায় টাকা খরচ করতেন। তিনি ছেলেকে ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলা, সাঁতার, দাবা ও প্রাইভেট কোচিংয়ের সুযোগ করে দেন।
কৈশোরে জেমির স্বপ্ন ছিল যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া। হাইস্কুলে দ্বিগুণ কোর্স করে তিনি হার্ভার্ড, ইয়েল ও প্রিন্সটনসহ ২৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পান। যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার আগেই তিনি আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের সহায়তার জন্য ‘ক্রিমসন এডুকেশন’ নামের প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন।
হার্ভার্ডে পড়ার সময় জেমি ১৫টি ছাত্র সংগঠনে যোগ দেন। দ্বিতীয় বর্ষে পড়ার সময় তিনি ওয়াল স্ট্রিটের হেজ ফান্ড ‘টাইগার ম্যানেজমেন্টে’ কাজ শুরু করেন। পড়াশোনা ও ব্যবসার কাজ তিনি একই সঙ্গে চালাতেন।
হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলে পড়াশোনার পাশাপাশি জেমি নিউইয়র্কে কাজ করতেন। পরে কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় সহপাঠী প্রিসিলা পুটজারের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয় এবং পরে তাঁরা বিয়ে করেন।
জেমি বর্তমানে ব্রাউন ইউনিভার্সিটিতে ডেটা সায়েন্সে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের জন্য পড়াশোনা করছেন।
সূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস