ল্যাংড়া আমের গন্ধ দূর থেকে পাই, আম্রপালির পাই না কেন
ধরো বাজার থেকে বাসায় ব্যাগভর্তি ফল নিয়ে এসেছে। তুমি ব্যাগ না খুলেই ঘ্রাণ দিয়ে টের পেলে, ব্যাগে আম আছে।
পরের সপ্তাহে হয়তো একইভাবে আম বাসায় আম আনা হলো। কিন্তু এবার নাক কিছু ধরতে পারছে না। ব্যাগ খুলে দেখা গেল আম। কিন্তু ঘ্রাণ নেই। তবে এই আমও পাকা, হলুদ, দেখতে সুন্দর। কিন্তু আগে টের পাওয়া যায়নি। ধরে নিচ্ছি তোমার কোভিড হয়নি। ঠান্ডা লেগে নাকও বন্ধ হয়নি। তবে টের পাও বা না পাও, দুই দফাতেই বাসায় আম এসেছে। দুটোই পাকা আম। তবে একটার গন্ধ আছে। অন্যটার নেই।
আমের ঘ্রাণ আসে কোথা থেকে
গন্ধ বা ঘ্রাণ আসলে অণু। ছোট ছোট রাসায়নিক অণু আম থেকে বেরিয়ে বাতাসে ভাসে, তারপর নাকে এসে ঢোকে। এদের বলে উদ্বায়ী যৌগ। মানে যারা সহজে বাতাসে ভাসতে পারে।
আম পাকার সময় ভেতরে একটা রাসায়নিক কাজ চলে। শর্করা ভাঙে, এনজাইম নড়েচড়ে বসে, তৈরি হয় নানা যৌগ। এর মধ্যে কিছু যৌগ হালকা বাতাসে মিশে যায় সহজে। সেগুলোই নাকে আসে। মস্তিষ্ক সেটা চিনে বলে—আম।
কিন্তু কোন জাতে কোন যৌগ কতটুকু তৈরি হবে, সেটা একেক জাতে একেক রকম হয়। আর এখানেই ল্যাংড়া আর আম্রপালির গল্প আলাদা হয়ে যায়।
ঘ্রাণ যেটা পেয়েছিলে, সেটা ল্যাংড়া আম। আর ঘ্রাণ ছাড়াটা আম্রপালি। এখন দুটোই বাজারে পাওয়া যাচ্ছে।
ল্যাংড়ার ভেতরে কী আছে
ল্যাংড়ায় একটা বিশেষ গোষ্ঠীর যৌগ বেশি থাকে। নাম টার্পিন। বিশেষত মনোটার্পিন থাকে এতে। এই অণুগুলো এত হালকা যে পাকা আম কাছে না আসতেই এরা বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। সঙ্গে কিছু এস্টার যৌগ থাকে। যেগুলো মিষ্টি আর হালকা ফুলেল একটা গন্ধ দেয়। দুটো মিলে ল্যাংড়ার যে গন্ধ তৈরি হয়, সেটা স্তরে স্তরে সাজানো। দূর থেকে এক রকম লাগে, কাছে গেলে আরেক রকম। খোসার কাছে মুখ নিলে আরেকটু আলাদা।
এই তীব্রতার কারণ শুধু যৌগের ধরন নয়, পরিমাণও। ল্যাংড়ায় এই উদ্বায়ী যৌগগুলো এত বেশি থাকে যে এরা ঘাণ না ছড়িয়ে থাকতে পারে না।
আম্রপালিতে ঘ্রাণ নেই কেন
আম্রপালি তৈরি হয়েছে দশেরি আম আর নীলম আম মিলিয়ে। এটা বেশ ভালো জাতের আম। টেকসই, ফলন বেশি, পোকায় কম ধরে। কিন্তু গন্ধের দিক থেকে এর দুটো বাবা-মাই তেমন জোরালো ছিল না। সংকরায়ণে যে জিন তৈরি হলো, তাতে মনোটার্পিন–জাতীয় যৌগের পরিমাণ কম। এতে উদ্বায়ী যৌগ তৈরি হয়, কিন্তু বাতাসে ছড়ানোর মতো যথেষ্ট নয়।
ফলে কাছে গেলে একটু টের পাওয়া যায়। দূরে গেলে কিছু নেই। এটা আম্রপালির দোষ না। এটি যা নিয়ে জন্মেছে, তাই তোমার নাকে আসছে। এটির জিনে গন্ধ ছড়ানোর নির্দেশ লেখা নেই। লেখা আছে বেঁচে থাকার, ফলন দেওয়ার নির্দেশ।
জাত মানে শুধু মিষ্টি-টক না
আম চেনার সময় আমরা সাধারণত ভাবি, কোনটা মিষ্টি, কোনটা আঁশ কম, কোনটা বড়। কিন্তু জাতের পার্থক্য আসলে আরও গভীর ব্যাপার। প্রতিটি জাতের নিজস্ব রাসায়নিক পরিচয় আছে। কোন যৌগ কতটুকু তৈরি হবে, কোন অণু বাতাসে উড়বে আর কোনটা ফলের ভেতরেই থাকবে, পুরো ব্যাপারটা জিনে লেখা আছে।
ল্যাংড়ার জিনে বলা আছে ঘ্রাণটা যেন ছড়িয়ে পড়ে। আম্রপালির জিনে আছে টিকে থাকার নির্দেশ। দুটোর আলাদা কাজ। দুটো আলাদা জাতের জিন।
নাক আসলে কতটা ঘ্রাণ বোঝে
মানুষের নাকে চার শতাধিক রিসেপ্টর আছে। একটা আমের গন্ধে মিশে থাকতে পারে দুই শতাধিক আলাদা যৌগ। এই সব কটা মিলিয়ে মস্তিষ্ক যা বোঝে, সেটাই আমরা বলি ‘ল্যাংড়ার গন্ধ’।
কিন্তু সব নাক একইভাবে বোঝে না। কেউ চোখ বন্ধ করে বলে দিতে পারে কোন জাত। কেউ পারে না। এটা কিছুটা জিনের ব্যাপার, কিছুটা অভ্যাসের। যে মানুষ আমবাগানে বড় হয়েছেন, তাঁর মস্তিষ্ক এই পার্থক্যগুলো বছরের পর বছর ধরে আলাদা করতে শিখেছে। রাজশাহীর আম বিক্রেতা তাই দূর থেকেই বলতে পারেন, এটা ল্যাংড়া। তিনি রসায়ন পড়েননি। কিন্তু তাঁর নাক পারে।
শেষ কথা
পরেরবার যখন আম আসবে বাড়িতে, একটু খেয়াল করো। কোনোটা ঘরে ঢোকার আগেই জানান দিচ্ছে, কোনোটা কাটার পরও চুপ।
যেটা গন্ধ ছড়াচ্ছে, সেটার জিনে কথাটা লেখা আছে। দীর্ঘকাল ধরে তার ভেতরে যে রসায়ন তৈরি হয়েছে, আমটি শুধু সেটাই প্রকাশ করছে।
তুমি নাক দিয়ে যা টের পাচ্ছ, সেটা আসলে কিছু অণুর গল্প। খুব ছোট, খুব হালকা অণু নাকে প্রবেশ করছে বলেই ঘ্রাণ টের পাচ্ছ। সেই হালকা জিনিসটাই ঘরময় ছড়িয়ে পড়ে। আর আমরা আমের নাম ধরে বলি, বাসায় অমুক আম এসেছে।