কিছু মানুষ কেন শিস বাজাতে পারে না
গানের তালে তালে অনেকে বেশ সুন্দর করে শিস বাজাতে পারে। শিস বাজানোর পেছনে মুখ ও ঠোঁটের একটা বিশেষ কৌশল থাকে। শিস দিতে হলে ঠোঁট দুটি খুব বেশি সামনের দিকে না বাড়িয়ে একটু পেছনের দিকে চেপে রাখতে হয়। আর মাঝখানে পেনসিলের মতো ছোট্ট একটা গোল ফাঁকা অংশ তৈরি করতে হয়। অনেকে এ কৌশল দেখে শিস দিতে চেষ্টা করে। তবে সবার হয় না। এখন প্রশ্ন হলো, এ নিয়ম জানার পরও সবাই কেন শিস বাজাতে পারে না? নাকি কারও কারও পক্ষে সত্যিই কখনো শিস দেওয়া সম্ভব নয়?
যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অধ্যাপক ফ্রান্সিসকো রুইজ। তিনি শিসের শব্দ ও কৌশল নিয়ে গবেষণা করেন। তাঁর মতে, মুখের শারীরবৃত্তীয় বা জন্মগত গঠনের কারণে শিস দিতে না পারা মানুষের সংখ্যা খুবই কম। বেশির ভাগ মানুষের জন্যই এটি কেবল চর্চার বিষয়। এটি অনেকটা সাইকেল চালানো শেখার মতো। প্রথমে হয়তো অনেকবার ভুল হবে। পড়ে যেতে হবে। কিন্তু বারবার চেষ্টা করলে একদিন না একদিন ঠিকই আয়ত্তে চলে আসবে।
যে কারণে কিছু মানুষ শিস দিতে পারে না
খুব কম মানুষের ক্ষেত্রে শারীরবৃত্তীয় সমস্যার কারণে শিস দেওয়া অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। অধ্যাপক ফ্রান্সিসকো রুইজ জানান, শিস দিতে হলে ঠোঁটের পাশাপাশি মুখের ভেতরে জিহ্বা আর তালুর অবস্থানও সঠিক হতে হয়। কারও যদি জন্মগতভাবে তালু কাটা থাকে, তবে মুখ দিয়ে বাতাস চলাচলের সরু ফাঁকাটি তৈরি হতে পারে না। এ ধরনের সমস্যা থাকলে শিস দেওয়া সত্যিই অসম্ভব।
তবে জন্মগত সমস্যা না থাকলে সাধারণ মানুষের পক্ষে শিস দেওয়া শেখা মোটেও অসম্ভব নয়। কারও হয়তো একটু বেশি সময় লাগে, এ–ই যা। আমাদের মুখ কিন্তু আমাদের অজান্তেই নানা রকম আকৃতি তৈরি করতে বেশ ভালো।
তবে বয়স বাড়লে শিস দেওয়া শেখা কিছুটা কঠিন হয়ে পড়ে। গবেষক মরিন স্টোন বড় বয়সে শিস শেখাকে একটি নতুন ভাষা শেখার সঙ্গে তুলনা করেছেন। ছোট শিশুরা যেমন যেকোনো দেশের ভাষা খুব সহজে আর নিখুঁতভাবে শিখে ফেলে, বড়দের ক্ষেত্রে তা অতটা সহজ হয় না। আসলে বয়ঃসন্ধির পর ঠোঁট ও জিহ্বার পেশিগুলো আগের মতো নমনীয় থাকে না। ফলে বড় বয়সে এসে শিস দেওয়ার মতো সূক্ষ্ম কৌশলগুলো আয়ত্ত করা একটু কঠিন হয়ে পড়ে।
শিস আসলে কীভাবে কাজ করে
গান গাওয়া বা কথা বলার সময় গলার ভেতর ভোকাল কর্ড কেঁপে উঠে শব্দ তৈরি করে। তবে শিস দেওয়ার সময় কিন্তু তেমনটা ঘটে না। শিস বাজানোর পুরো সময় গলার ভোকাল কর্ড খোলা ও সম্পূর্ণ শান্ত থাকে।
এর পরিবর্তে মুখ ও ঠোঁট মিলে পুরো কাজ করে। বিজ্ঞানীরা এ পথকে বলেন ভোকাল ট্র্যাক্ট। শিস দেওয়ার সময় ঠোঁট সামনে একটি ছোট ফাঁকা জায়গা তৈরি করে। আর জিহ্বার পেছনের অংশ মুখের তালুর দিকে উঠে গিয়ে পেছনে আরও একটি সরু ফাঁকা তৈরি করে।
এ দুই ফাঁকার ভেতর দিয়ে বাতাস যাওয়ার সময় একটি বিশেষ প্রক্রিয়া তৈরি হয়। জিহ্বা বাতাসের মধ্যে ছোট আলোড়ন তৈরি করে। এটা ঠোঁটের দিকে যায় এবং পরে আবার চাপ তরঙ্গ হয়ে পেছনের দিকে ফিরে আসে। প্রতি সেকেন্ডে শত শত বার এ তরঙ্গ মুখের ভেতর সামনে-পেছনে যাতায়াত করতে করতেই শিসের স্পষ্ট ও মিষ্টি সুর তৈরি হয়।
বিষয়টি বোঝার জন্য কাচের বোতলে ফুঁ দেওয়ার উদাহরণ দেওয়া যায়। বোতলের ভেতরে থাকা খালি বাতাসের কম্পন থেকেই শব্দ তৈরি হয়। বোতলে পানি কম থাকলে বাতাস বেশি জায়গা পায়। ফলে নিচু সুর তৈরি হয়। আবার পানি বেশি থাকলে বাতাসের জায়গা কমে যায়। ফলে শিসের সুর উঁচুতে ওঠে। বিজ্ঞানীরা একে বলেন হেলমহোল্টজ রেজোনেটর। আমাদের মুখও শিস দেওয়ার সময় ঠিক এই নীতিতে কাজ করে।
তবে কেবল ঠোঁট ও জিহ্বার সঠিক আকৃতিই যথেষ্ট নয়; ইলিনয় ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির গবেষক প্রশান্ত তামিলসেলভাম জানান, শিস বাজাতে হলে ফুঁ দেওয়ার শক্তিতে সঠিক ভারসাম্য থাকতে হবে। খুব আস্তে ফুঁ দিলে শব্দ হবে না। আবার খুব জোরে ফুঁ দিলেও শিস ফুটবে না।
শিস দেওয়ার প্রাথমিক ধাপ ও নতুন আবিষ্কার
যারা এখনো শিস দেওয়ার কৌশল পুরোপুরি বুঝতে পারেনি, তাদের জন্য অধ্যাপক ফ্রান্সিসকো রুইজ তৈরি করেছেন ‘ফ্লুটিনো’ নামের একটি থ্রিডি-প্রিন্টেড যন্ত্র। এটি পয়সার চেয়েও ছোট এবং দেখতে অনেকটা ফানেলের মতো।
অধ্যাপক ফ্রান্সিসকো রুইজ জানান, ফ্লুটিনো মূলত ঠোঁটের সঠিক আকৃতি তৈরি করতে সাহায্য করে। যন্ত্রটি ঠোঁটের মাঝে চেপে ধরে বাতাস ভেতরে টানলে বা বাইরে ফুঁ দিলে শিসের সুর তৈরি হয়। পরীক্ষার সময় এ যন্ত্র থেকে ১০০ ডেসিবেল পর্যন্ত তীব্র শব্দ তৈরি হয়েছিল, যা সত্যিই চমকে দেওয়ার মতো।
বর্তমানে অধ্যাপক ফ্রান্সিসকো রুইজ তাঁর এই উদ্ভাবনের পেটেন্টের জন্য আবেদন করেছেন। যন্ত্রটি এখনো বাজারে কিনতে পাওয়া যায় না। তবে এটি ব্যবহার করে শিস শেখানো সম্ভব কি না, তা পরীক্ষা করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইউসিএলএ বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘হুইসলিং ক্লাব’ নামের একটি সংগঠন এ যন্ত্র দিয়ে একদম শিস দিতে না পারা মানুষদের ওপর পরীক্ষা চালাচ্ছে।
তবে একই গবেষক দলের অন্যতম সদস্য প্রশান্ত তামিলসেলভাম কোনো যন্ত্র ছাড়াই শিস বাজানো আয়ত্ত করেছেন। আগে তিনি টানা শিস দিতে পারতেন না। কিন্তু গবেষণায় অংশ নিয়ে বারবার অনুশীলনের মাধ্যমে তাঁর উন্নতি হয়েছে। তাঁর মতে, নিয়মিত চর্চা শিস দেওয়ার দক্ষতায় দারুণ পরিবর্তন এনে দেয়।