পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘ ১০ বিমানযাত্রা

প্লেনে ওঠার পর থেকেই অনেকের উসখুস শুরু হয়ে যায়। কখন মাটিতে পা পড়বে? কিন্তু বিমান পরিবহন শিল্প এখন এমন এক যুগে প্রবেশ করছে, যেখানে ফ্লাইটের হিসাব ঘণ্টা নয়; বরং দিনে মাপা হতে পারে। মাত্র ১০ বছর আগেও এমন মাত্র একটি যাত্রীবাহী ফ্লাইট ছিল, যা ১৭ ঘণ্টার বেশি সময় আকাশে উড়ত। আর এখন? যাত্রীরা কোনো বিরতি ছাড়াই পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পাড়ি দিচ্ছেন।

এই তো কিছুদিন আগেই অস্ট্রেলিয়ার এয়ারলাইন কান্টাস যাত্রীবাহী বিমানের সবচেয়ে দীর্ঘ ফ্লাইটের রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। তাদের ২৪ ঘণ্টা ২৪ মিনিটের এই মহাকাব্যিক যাত্রা শুরু হয়েছিল ২৩ জুলাই অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে। শেষ হয় ২৪ জুলাই ফ্রান্সের তুলুজে। সেখানেই বিমান নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এয়ারবাসের সদর দপ্তর। এটি ছিল এয়ারবাসের নতুন মডেল A350-1000ULR-এর একটি পরীক্ষামূলক ফ্লাইট। আগামী বছর থেকেই কান্টাসের প্রজেক্ট সানরাইজের অধীনে সিডনি থেকে লন্ডন এবং নিউইয়র্কের সরাসরি ফ্লাইট চালুর জন্য বিমানটি বিশেষভাবে তৈরি করা হচ্ছে। এর আগে এই রেকর্ডের মালিক ছিল হংকং থেকে লন্ডনের একটি বিশেষ ফ্লাইট, যা বোয়িং 777-200LR ওয়ার্ল্ডলাইনারে করে ২২ ঘণ্টা ৪২ মিনিট সময় নিয়েছিল।

গত এক দশকে উন্নত টুইন-ইঞ্জিন বিমান ও জ্বালানি ধারণক্ষমতা বাড়ার কারণে এমন লম্বা ফ্লাইটের সংখ্যা অনেক বেড়েছে। ২০ ঘণ্টার কাছাকাছি বেশ কয়েকটি ফ্লাইট তো আছেই, ১৫ থেকে ১৭ ঘণ্টার ফ্লাইটের তালিকাটাও বেশ লম্বা। শুধু এ বছরেই আটলান্টা থেকে রিয়াদ, সিডনি থেকে লাস ভেগাস, জর্ডান থেকে ডালাস এবং মিসর থেকে শিকাগো ও লস অ্যাঞ্জেলেসের মধ্যে নতুন লং-হোল রুট যোগ করা হয়েছে। তবে বর্তমানের সবচেয়ে দীর্ঘ ফ্লাইটগুলোর কাছে এগুলোকে ছোটখাটো হাঁটাচলার মতোই মনে হবে। ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে অস্ট্রেলিয়া ও সিঙ্গাপুর থেকে এমন ফ্লাইট সবচেয়ে বেশি পরিচালিত হয়।

পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘ এমন কয়েকটি ফ্লাইটের তালিকা নিচে দেওয়া হলো:

আরও পড়ুন

প্রজেক্ট সানরাইজ: ২৪ ঘণ্টা ২৪ মিনিট

জুলাইয়ের ওই রেকর্ড গড়া ফ্লাইটে মূলত পাইলট ও টেস্ট ইঞ্জিনিয়াররাই ছিলেন। তবে আগামী বছরের এ সময়ের মধ্যে কান্টাস আশা করছে, ২৩৮ যাত্রী নিয়ে তারা আকাশে উড়বে। এর মধ্যে ফার্স্ট ক্লাসে ৬টি, বিজনেস ক্লাসে ৫২টি, প্রিমিয়াম ইকোনমিতে ৪০টি এবং সাধারণ কোচ ক্লাসে ১৪০টি আসন থাকবে। যাত্রীদের জন্য থাকবে একটি ওয়েলবিয়িং জোন, যেখানে তুমি চাইলে হাঁটাচলা করতে পারবে, সেলফ সার্ভিস স্টেশন থেকে খাবার নিতে পারবে এবং একটু হাত-পা ছড়িয়ে জিরিয়ে নিতে পারবে। এত লম্বা যাত্রায় শরীরের কথা তো ভাবতেই হবে!

এই যাত্রায় তুমি কয়েকবার সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখতে পাবে। বিমানের পেছনে থাকা ৫ হাজার ৩০০ গ্যালনের একটি বিশাল ফুয়েল ট্যাংক এই অসম্ভবকে সম্ভব করেছে। জ্বালানি ফুরিয়ে যাওয়ার মতো দুঃস্বপ্ন যেন সত্যি না হয়, সে জন্য এতে বসানো হয়েছে অত্যাধুনিক সেন্সর।

দক্ষিণ কোরিয়ার ইনচন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দাঁড়িয়ে আছে এমিরেটস এয়ারলাইনসের একটি এয়ারবাস এ৩৮০
ছবি: রয়টার্স

সিঙ্গাপুর থেকে নিউইয়র্ক: ১৮ ঘণ্টা ১০ মিনিট

নিউইয়র্ক থেকে সিঙ্গাপুরের ৯ হাজার ৫৪২ মাইলের এই পথ পাড়ি দিতে প্রায় ১৯ ঘণ্টা সময় লাগে। জানালার পাশ থেকে তুমি আটলান্টিক মহাসাগর, ইউরোপের কিছু অংশ এবং ভারত দেখতে পাবে। তবে বিমানটি পূর্ব নাকি পশ্চিম দিক দিয়ে যাবে, তা ওড়ার ঠিক আগমুহূর্তে ঠিক করা হয়। ২০২১ সালে সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনসের বিশাল এয়ারবাস A350-900 দিয়ে শুরু হওয়া এই রুট এখন প্রতিদিনই চলছে।

সিঙ্গাপুর থেকে নিউ জার্সি: ১৮ ঘণ্টা ৩০ মিনিট

আগের গন্তব্য থেকে মাত্র এক ঘণ্টার ড্রাইভের দূরত্বে রয়েছে নেওয়ার্ক। সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনসের এয়ারবাস A350-900 করে এই রুটে সময় লাগে ১৭ ঘণ্টা ৫০ মিনিট থেকে ১৮ ঘণ্টা ৩০ মিনিট। বাতাসের গতি ও চূড়ান্ত গন্তব্যের ওপর ভিত্তি করে এই সময় ওঠানামা করে।

আরও পড়ুন

অকল্যান্ড থেকে নিউইয়র্ক: ১৭ ঘণ্টা ৩০ মিনিট

ফ্যান্টাসি মুভি আর সিলিকন ভ্যালির ধনকুবেরদের আনাগোনার কারণে সম্প্রতি নিউজিল্যান্ডে মার্কিন পর্যটকদের ঢল নেমেছে। ২০২২ সালে এয়ার নিউজিল্যান্ড সরাসরি ফ্লাইট চালু করে এই যাতায়াত আরও সহজ করে দেয়। ৮ হাজার ৮৪২ মাইলের এই যাত্রায় নিউজিল্যান্ড যেতে সময় লাগে প্রায় ১৭ ঘণ্টা ৩০ মিনিট, আর যুক্তরাষ্ট্রে ফিরতে লাগে ১৬ ঘণ্টার একটু বেশি। লম্বা হলেও রুটটি দারুণ জনপ্রিয়। ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব ট্রান্সপোর্টেশনের রিপোর্ট বলছে, ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের নভেম্বরের মধ্যে এই রুটে ৫৩ হাজার ৫৭৩ যাত্রী যাতায়াত করেছেন।

পার্থ থেকে লন্ডন: ১৭ ঘণ্টা ১৫ মিনিট

৯ হাজার ১০ মাইলের এই রুটের একটা দারুণ নাম আছে—ক্যাঙ্গারু রুট। একসময় এই পথ পাড়ি দিতে কয়েক দিন লেগে যেত, জ্বালানি নেওয়ার জন্য থামতে হতো বারবার। ২০১৮ সালে কান্টাস পার্থ থেকে লন্ডনের হিথরো পর্যন্ত সরাসরি ফ্লাইট চালু করে। ২৩৬ যাত্রী নিয়ে বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনারের মাধ্যমে লন্ডনে যেতে সময় লাগে ১৭ ঘণ্টার একটু বেশি। অস্ট্রেলিয়ায় ফিরতে লাগে ১৭ ঘণ্টার কিছুটা কম।

ছবি: পেক্সেলস

প্যারিস থেকে পার্থ: ১৭ ঘণ্টা ২০ মিনিট

২০২৪ সালে ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিক গেমসের ঠিক আগমুহূর্তে কান্টাস এই ৮ হাজার ৮৭৮ মাইলের রুটটি চালু করে। বোয়িং ৭৮৭-৯-এ করে প্যারিস পৌঁছাতে লাগে ১৭ ঘণ্টা ২০ মিনিট। পার্থে নামতে সময় লাগে তার চেয়ে সামান্য কম।

দোহা থেকে অকল্যান্ড: ১৭ ঘণ্টা ১৫ মিনিট

২০১৮ সালে কাতার এয়ারওয়েজ যখন রুটটি চালু করে, তখন এটিই ছিল বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘ ফ্লাইট। এখন এটি শীর্ষ পাঁচেও নেই! শুরুতে বোয়িং ৭৭৭ ব্যবহার করা হলেও এখন তারা এয়ারবাস A350-1000 ব্যবহার করে। কোভিডের সময় ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার কারণে রুটটি বন্ধ হয়ে গেলেও ২০২৪ সালে কাতার এয়ারওয়েজ এটি আবার চালু করে।

আরও পড়ুন

দুবাই থেকে অকল্যান্ড: ১৭ ঘণ্টা ১০ মিনিট

উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে এমিরেটসই প্রথম এমন আলট্রা-লং-হোল ফ্লাইটের কথা ভেবেছিল। ২০১৬ সালে যখন এই রুট চালু হয়, তখন এটিই ছিল বিশ্বের দীর্ঘতম ফ্লাইট। ৮ হাজার ৮৩৪ মাইলের এই যাত্রায় ডাবল ডেকার এয়ারবাস A380-800 ব্যবহার করা হয়। শুরুতে ব্যবহৃত হতো বোয়িং 777-200LR। আরব সাগর, ভারতের দক্ষিণ প্রান্ত এবং ভারত মহাসাগর পেরিয়ে অস্ট্রেলিয়া পার হয়ে তারপর এটি নিউজিল্যান্ডে অবতরণ করে।

টেক্সাস থেকে সিডনি: ১৭ ঘণ্টা

২০১১ সালের আগে টেক্সাস থেকে অস্ট্রেলিয়ায় যাওয়ার সরাসরি কোনো উপায় ছিল না। কান্টাস এয়ারবাস A380 দিয়ে ৮ হাজার ৫৭৮ মাইলের এই রুট চালু করে। সিডনি যেতে প্রায় ১৭ ঘণ্টা লাগলেও ফেরার পথটা একটু ছোট, ১৫ ঘণ্টা ১৫ মিনিটেই ফেরা যায়।

শেনজেন থেকে মেক্সিকো সিটি: ১৬ ঘণ্টা

তালিকার শেষ ফ্লাইটটি একটু অন্য রকম। এটিই একমাত্র রুট, যা চীন ও লাতিন আমেরিকার কোনো দেশকে যুক্ত করেছে। ২০২৪ সালে চীনের রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থা চায়না সাউদার্ন এই ৮ হাজার ৭৮৯ মাইলের রুটটি চালু করে। ১৬ ঘণ্টার ফ্লাইটটি কেবল চীন থেকে মেক্সিকো যাওয়ার সময়ই বিরতিহীন থাকে। ফেরার সময় জ্বালানি নেওয়ার জন্য এটি মেক্সিকোর টিজুয়ানা শহরে থামে, তবে যাত্রীদের বিমান থেকে নামতে হয় না। লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করতেই চীন রুটটি চালু করেছে।

সূত্র: পপুলার সায়েন্স
আরও পড়ুন