একাধিক ভাষা শিখলে কি বেশি বুদ্ধিমান হওয়া যায়
একটি ছোট্ট শিশু ধীরে ধীরে বর্ণমালা শিখছে। তার কাছে নতুন ভাষা শেখা যেন খেলার মতো সহজ। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই কাজই কেন এত কঠিন হয়ে ওঠে?
যখন কেউ একাধিক ভাষায় কথা বলতে পারে, তখন কি তার মস্তিষ্ক সত্যিই বদলে যায়?
নতুন ভাষা কেউ কাজের প্রয়োজনে শেখে। কেউ কোনো দেশের মানুষ আর সংস্কৃতিকে জানার আগ্রহ থেকে নতুন ভাষা শেখে। গবেষণা বলছে, নতুন ভাষা শেখা শুধু যোগাযোগের দক্ষতা বাড়ায় না, এটি আমাদের মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের ওপরও গভীর প্রভাব ফেলে।
নতুন ভাষা শেখা অনেকটা শরীরচর্চার মতো। যেমন নিয়মিত ব্যায়াম করলে পেশি শক্তিশালী হবে। তেমনই ভাষা শেখার সময় মস্তিষ্কের ভেতরের স্নায়ুর পথগুলো নতুনভাবে গড়ে ওঠে, নতুন করে বদলে যায়। তাই যাঁরা একাধিক ভাষায় কথা বলেন, তাঁরা তথ্য প্রক্রিয়াজাত করেন একটু ভিন্নভাবে। বিষয়টি কীভাবে ঘটে?
ভাষা ব্যবহারের জন্য আমাদের মস্তিষ্কের অনেকগুলো অংশ একসঙ্গে কাজ করে। এর মধ্যে দুটি গুরুত্বপূর্ণ পথ রয়েছে। একটি শব্দ শোনা ও তৈরি করার জন্য, আরেকটি ঠিক করার জন্য যে কোন ভাষার শব্দ ব্যবহার করা হবে। ভাষা শেখার সঙ্গে সঙ্গে এই পথগুলো নতুনভাবে গড়ে ওঠে এবং বদলে যায়। সহজ করে বললে, আমরা শব্দগুলোকে নতুনভাবে মানচিত্রের মতো সাজাই এবং ঠিক করি কোন ভাষায় কথা বলব।
আমরা যখন কথা বলি, তখন শুধু চিন্তা করলেই হয় না। শব্দ শুনতে আমাদের শ্রবণ অংশ কাজ করে, আর মুখের ভেতরের পেশি, যেমন জিব, ঠোঁট, স্বরযন্ত্র—সবকিছু একসঙ্গে নড়ে ওঠে। তাই ভাষা শেখা মানে শুধু শব্দ শেখা নয়, পুরো একটি শারীরিক প্রক্রিয়া এর সঙ্গে যুক্ত।
মস্তিষ্কের সামনের অংশে থাকা একটি বিশেষ জায়গা বাক্যের গঠন ঠিক করতে সাহায্য করে। আমরা কীভাবে শব্দ সাজাব, কীভাবে ব্যাকরণ ঠিক রাখব—এসবই নিয়ন্ত্রণ করে এই অংশ। আরেকটি অংশ শব্দের অর্থ বোঝা এবং মনে রাখার কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই দুই অংশ মিলে আমাদের ভাষা বোঝা ও বলার ক্ষমতা তৈরি করে।
সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা গেছে, নতুন ভাষা শেখার সঙ্গে সঙ্গে মস্তিষ্কের গঠন বদলে যায়। এই পরিবর্তনকে বলা হয় মস্তিষ্কের অভিযোজনক্ষমতা। মানে নতুন কিছু শেখার জন্য মস্তিষ্ক নিজেই নিজেকে নতুনভাবে সাজিয়ে নেয়। এতে নতুন শব্দ মনে রাখা, নতুন শব্দ চেনা এবং সঠিকভাবে উচ্চারণ করা সহজ হয়ে যায়।
শুধু মস্তিষ্কের গঠন নয়, কাজের ধরনও বদলে যায়। মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশের মধ্যে যোগাযোগ আরও দ্রুত ও কার্যকর হয়। ফলে মনোযোগ, স্মৃতি ও চিন্তা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাও উন্নত হয়।
তবে একটি মজার বিষয় হলো, আমরা আমাদের মাতৃভাষা একটু ভিন্নভাবে ব্যবহার করি। গবেষণায় দেখা গেছে, মাতৃভাষা শুনলে মস্তিষ্কের কাজ কিছুটা কমে যায়। কারণ, এই ভাষা আমরা খুব সহজেই বুঝতে পারি। এতে বেশি চেষ্টা করতে হয় না।
এ জায়গাতেই শিশুদের বিশেষ সুবিধা রয়েছে। ছোটবেলায় মস্তিষ্ক যখন পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি, তখন নতুন কিছু শেখার জন্য মস্তিষ্ক অনেক নমনীয় থাকে। বড়দের মতো ছোটদের আগে শেখা ভাষার সঙ্গে তুলনা করে শিখতে হয় না। ফলে তারা খুব সহজেই নতুন শব্দ, ব্যাকরণ আর উচ্চারণ আয়ত্ত করতে পারে।
কিন্তু একটি প্রশ্ন থেকেই যায়। একাধিক ভাষা জানলে কি মানুষ বেশি বুদ্ধিমান হয়?
কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, একাধিক ভাষা জানা মানুষের স্মৃতি আর সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা ভালো হতে পারে। তবে এর মানে এই নয় যে তাঁরা অবশ্যই বেশি বুদ্ধিমান। কারণ, একজন মানুষের বুদ্ধিমত্তা নির্ভর করে অনেক কিছুর ওপর। শিক্ষা, পরিবেশ, অভিজ্ঞতা—সবকিছু মিলিয়ে বুদ্ধি তৈরি হয়।
যাঁরা একাধিক ভাষায় কথা বলেন, তাঁদের শব্দভান্ডার অবশ্যই বড় হয়। তারা বেশি শব্দ জানেন, বেশি ধারণা প্রকাশ করতে পারেন। কিন্তু এটিই বুদ্ধিমত্তার একমাত্র মানদণ্ড নয়।
তাই বিজ্ঞানীরা এখনো নিশ্চিতভাবে বলতে পারেননি, একাধিক ভাষা জানা মানেই বেশি বুদ্ধিমান হওয়া।