বাংলাদেশসহ যেসব দেশ এখনো নিজস্ব ক্যালেন্ডার ব্যবহার করে

নাচ–গানসহ নানা আয়োজনে বরণ করা হয় বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩। চট্টগ্রাম, ১৪ এপ্রিলছবি: সৌরভ দাশ

ক্যালেন্ডারের মূল কাজ হলো, প্রতিটি দিনকে একটি নির্দিষ্ট তারিখ দিয়ে আলাদা করা। সরকারি বা অফিসের কাজে যে ক্যালেন্ডার ব্যবহার করা হয়, তাকে বলা যায় নাগরিক পঞ্জিকা। শুধু অফিস নয়, সাধারণ মানুষও তাদের প্রতিদিনের কাজের পরিকল্পনা করার জন্য এ ক্যালেন্ডার ব্যবহার করে।

বর্তমানে পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার বা ইংরেজি ক্যালেন্ডার সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়। এই ক্যালেন্ডারের সূচনার সঙ্গে খ্রিষ্টধর্মের ক্যাথলিক চার্চের সম্পর্ক থাকলেও, আধুনিক সব দেশই এখন এটি মেনে চলে। তবে এখনো এমন কিছু দেশ আছে, যারা তাদের সরকারি কাজে এই ইংরেজি ক্যালেন্ডার পুরোপুরি ব্যবহার করে না। তারা হয় নিজেদের তৈরি আলাদা কোনো ক্যালেন্ডার ব্যবহার করে অথবা ইংরেজি ক্যালেন্ডারের পাশাপাশি নিজেদের পঞ্জিকাটিও চালু রাখে। আবার কোনো কোনো দেশ ইংরেজি ক্যালেন্ডারকেই কিছুটা বদলে নিজেদের মতো করে সাজিয়ে নিয়েছে।

আরও পড়ুন

ভিন্ন নিয়মের চারটি ক্যালেন্ডার

উত্তর কোরিয়া, তাইওয়ান, জাপান ও থাইল্যান্ডে এমন ক্যালেন্ডার ব্যবহার করা হয় যা মূলত আন্তর্জাতিক গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারেরই একটি ভিন্ন রূপ। দেশগুলো উত্তর কোরীয়, মিঙ্গুও, জাপানি ও থাই সূর্য ক্যালেন্ডার ব্যবহার করে। থাইল্যান্ডে আগে চাঁদের হিসাব মেনে ক্যালেন্ডার তৈরি হতো। কিন্তু ১৮৮৮ সাল থেকে তারা সূর্যের হিসাব মেনে ক্যালেন্ডার ব্যবহার শুরু করে। থাই ক্যালেন্ডারে বছর গণনা করা হয় বুদ্ধের সময়কাল থেকে, যা আন্তর্জাতিক ক্যালেন্ডারের চেয়ে ৫৪৩ বছর এগিয়ে।

থাইল্যান্ডের ক্যালেন্ডারে মাসের নামগুলো রাখা হয়েছে রাশিচক্রের জ্যোতিষশাস্ত্রীয় নাম অনুসারে। মাসের নামের শেষে নির্দিষ্ট কিছু শব্দ যোগ করে দিনের সংখ্যা বোঝানো হয়। ৩০ দিনের মাসের নামের শেষে ‘আয়ন’ (-ayon) এবং ৩১ দিনের মাসের নামের শেষে ‘আখোম’ (-akhom) যুক্ত থাকে। আবার ফেব্রুয়ারি মাসের নামের শেষে যুক্ত হয় ‘ফান’ (-phan)। লিপ ইয়ার বা অধিবর্ষের ক্ষেত্রে ফেব্রুয়ারি মাসে একটি অতিরিক্ত দিন যোগ করা হয়।

আরও পড়ুন

ভারত ও বাংলাদেশের নিজস্ব ক্যালেন্ডার

ভারত, বাংলাদেশ ও ইসরায়েলে আন্তর্জাতিক ইংরেজি ক্যালেন্ডারের পাশাপাশি নিজস্ব পঞ্জিকাও ব্যবহার করা হয়। এগুলো হলো ভারতীয় জাতীয় ক্যালেন্ডার, বাংলা ক্যালেন্ডার ও হিব্রু ক্যালেন্ডার।

ভারতে একসময় প্রায় ৩০টি আলাদা পঞ্জিকা চালু ছিল। এ সমস্যা দূর করতে প্রখ্যাত বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহার নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হয়। তারা সব পঞ্জিকা মিলিয়ে একটি জাতীয় ক্যালেন্ডার তৈরি করে, যা ১৯৫৭ সাল থেকে ভারতে সরকারিভাবে ব্যবহৃত হয়। এ পঞ্জিকার মাসগুলোর নাম রাখা হয়েছে রাশিচক্র অনুযায়ী। এর প্রথম মাস চৈত্র, শুরু হয় ২২ মার্চ। তবে লিপ ইয়ার হলে তা শুরু হয় ২১ মার্চ থেকে। এখানে বছর গণনা করা হয় ‘শকাব্দ’ হিসেবে।

বাংলাদেশেও দাপ্তরিক ও ধর্মীয় কাজে নিজস্ব বাংলা বর্ষপঞ্জি ব্যবহার করা হয়। এখন গ্রামীণ বাংলার মানুষের দিন শুরুই হয় পঞ্জিকা দেখে। বাংলাদেশে এখন যে ক্যালেন্ডার প্রচলিত, তার মূলত বেশ কয়েক দফা সংস্কার করা হয়েছে। বৈশাখ থেকে ভাদ্র মাস পর্যন্ত প্রথম ৫টি মাস ৩১ দিনে এবং বাকি ৭টি মাস ৩০ দিনে গণনা করা হয়। লিপ ইয়ার বা অধিবর্ষের সময় ফাল্গুন মাসে ১ দিন যোগ করা হয়। এর ফলে প্রতিবছর ইংরেজি ক্যালেন্ডারের ১৪ এপ্রিলেই পহেলা বৈশাখ অর্থাৎ বাংলা নববর্ষ পড়ে।

আরও পড়ুন
হিজরি সন পুরোপুরি চাঁদের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে
ছবি: হাসান মাহমুদ

নিজস্ব ক্যালেন্ডার ব্যবহারকারী অন্যান্য দেশ

ইরান ও আফগানিস্তান তাদের সরকারি ও ধর্মীয় কাজে সূর্য হিজরি ক্যালেন্ডার ব্যবহার করে। তারা আন্তর্জাতিক গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার একেবারেই ব্যবহার করে না। একই অবস্থা নেপাল ও ইথিওপিয়ার ক্ষেত্রেও। নেপাল শুধু ‘বিক্রম সংবৎ’ এবং ইথিওপিয়া তাদের নিজস্ব ‘ইথিওপিয়ান ক্যালেন্ডার’ ব্যবহার করে। ইথিওপিয়ার ক্যালেন্ডারটি মূলত প্রাচীন মিসরীয় ক্যালেন্ডার থেকে এসেছে।

ইথিওপিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী বছরের প্রথম দিন শুরু হয় ২৯ বা ৩০ আগস্ট। মজার ব্যাপার হলো, আন্তর্জাতিক ক্যালেন্ডারের তুলনায় ইথিওপিয়ার ক্যালেন্ডার প্রায় ৭ থেকে ৮ বছর পিছিয়ে থাকে। তবে সারা বিশ্বের মানুষের বোঝার সুবিধার জন্য, এসব ভিন্ন ক্যালেন্ডারের তারিখগুলোকে আন্তর্জাতিক গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের তারিখের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার একটি পদ্ধতি রয়েছে।

আর হিজরি সন পুরোপুরি চাঁদের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে। তবে হিব্রু বা চীনা ক্যালেন্ডারের মতো এটি সূর্যের বছরের সঙ্গে দিন মিলিয়ে চলার জন্য বাড়তি কোনো মাস বা দিন ব্যবহার করে না। এ কারণে ইসলামি ক্যালেন্ডারের মাসগুলো প্রতিবছর একই ঋতুতে থাকে না। প্রতিবছর মাসগুলো আগের বছরের চেয়ে কিছুটা এগিয়ে আসে। এভাবে ঘুরতে ঘুরতে একটি নির্দিষ্ট মাস বা ঋতু আবার আগের জায়গায় ফিরে আসতে প্রায় সাড়ে ৩২ বছর সময় লাগে।

সূত্র: ওয়ার্ল্ড অ্যাটলাস

আরও পড়ুন