বউ কথা কও: একটি পাখি, তিনটি দেশ, তিনটি গল্প
দুপুরবেলা। রোদ পড়ে এসেছে একটু। গরম কমেনি। তুমি হয়তো নানাবাড়ির উঠানে বসে আম কাটছ, ঠিক তখনই দূরের কাঁঠালগাছ থেকে ভেসে আসে একটা ডাক। বউ, ক-থা, ক-ও। থেমে থেমে, একটু করুণ সুরে। কেউ কান খাড়া করে বলে ওঠে, ‘ওই যে বউ কথা কও ডাকছে।’ তুমি জিজ্ঞাসা করো, কে ডাকে? কেন ডাকে? আর উত্তরে শোনা যায় একটা গল্প। যেন নানু তাঁর নানুর মুখে শুনেছিলেন।
গল্পটা এ রকম। এক লোকের বিয়ে হয়েছিল, কিন্তু তার বউ কোনো কথা বলত না। মুখ বুজে থাকত সারা দিন। লোকটা অনেক চেষ্টা করেও তাঁর মনের কথা বুঝতে পারত না। শেষে সে ঠাকুরের কাছে প্রার্থনা করল, আমাকে পাখি বানিয়ে দাও, যেন আমি বউয়ের ভাষা বুঝতে পারি। ঠাকুর তার আর্জি শুনলেন। লোকটা পাখি হয়ে গেল, আর সেই থেকে গাছে গাছে উড়ে বেড়িয়ে ডাকে, বউ, কথা কও, কথা কও।
তুমি হয়তো ভাবছ, এইটুকুই তো গল্প। গ্রামে এমন কত গল্প শোনা যায়। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, এই একই পাখি, একই ডাক, পৃথিবীর অন্য প্রান্তে গিয়ে সম্পূর্ণ আলাদা একটা গল্প হয়ে যায়। আর সেটাই এই লেখার আসল কথা।
একটা পাখি, একই সুর
প্রথমে জেনে নাও, পাখিটা আসলে কে। এর ইংরেজি নাম ইন্ডিয়ান কুক্কু, বৈজ্ঞানিক নাম কুকুলাস মাইক্রপ্টেরাস। কোকিল পরিবারের সদস্য এই পাখি বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া হয়ে চীনের উত্তরাঞ্চল আর রাশিয়া পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকে। খুব লাজুক স্বভাবের, একা একা থাকতে ভালোবাসে, আর গাছের উঁচু ডালে বসে এমন জোরে ডাকে যে অনেক দূর থেকেও শোনা যায়। ডাকটা মূলত চার সুরে বাঁধা। কেউ শোনে বো-ক-টা-কো, কেউ শোনে ওয়ান মোর বোটল, কেউবা অরেঞ্জ-পিকো। বাংলায় সেই একই সুর কানে বাজে বউ কথা কও হয়ে।
এখানেই গল্পের আসল মজা শুরু। একটা প্রাণী, একটা নির্দিষ্ট শব্দ, অথচ পৃথিবীর ভিন্ন ভিন্ন কোণে মানুষ সেই একই শব্দ শুনে সম্পূর্ণ ভিন্ন অর্থ বসিয়ে দিয়েছে এর মধ্যে। কেউ শুনেছে ভালোবাসার আকুতি, কেউ শুনেছে সতর্কবার্তা, কেউবা শুনেছে মৃত মানুষের কান্না।
দেখতে অবশ্য পাখিটা মোটেও রহস্যময় কিছু নয়। লম্বায় একটু বেশি, গায়ের রং ধূসর, বুকের দিকটায় হালকা পাটকিলে ছোপ। স্ত্রী আর পুরুষ দেখতে প্রায় একই রকম, পার্থক্য বলতে চোখে পড়ার মতো কিছু নেই বললেই চলে। মাটিতে নামতে এদের একদমই ভালো লাগে না, বেশির ভাগ সময় গাছের ওপর থেকেই পোকামাকড় শিকার করে কাটিয়ে দেয়। আর অদ্ভুত ব্যাপার হলো, নিজের বাসা বাঁধতেও জানে না এই পাখি। কোকিলের মতোই অন্য পাখির বাসায় ডিম পেড়ে চুপচাপ সরে পড়ে, বাচ্চা লালন-পালনের ভার পড়ে পরের ঘাড়ে। যে পাখিকে নিয়ে এত ভালোবাসার গল্প, সে নিজে অবশ্য সংসারী নয় মোটেও।
চীনে যখন এই ডাকই ঘুম ভাঙায়
চীনের গ্রামাঞ্চলে এই একই পাখির ডাক অন্য অর্থ বহন করে। সেখানে এই সুরটাকে ধরা হয় রাত শেষ হয়ে ভোর হওয়ার, ঘুম থেকে জেগে ওঠার সংকেত হিসেবে। ভাবো তো—তুমি রাতভর ঘুমিয়েছ, বাইরে তখনো আবছা অন্ধকার, আর জানালার ওপাশ থেকে ভেসে আসছে সেই একই সুর যেটা বাংলার বাড়িতে শোনা যায় প্রেমের আর্তি হিসেবে। কিন্তু চীনা কৃষকের কানে সেটা যেন এক অদৃশ্য ঘড়ির অ্যালার্ম। মাঠে যাওয়ার সময় হয়েছে, দিন শুরু হয়ে গেছে। পাখিই যেন বলে দিচ্ছে সেই কথা।
কোনো ভূত নেই এই গল্পে, নেই কোনো অভিশপ্ত স্বামী কিংবা মন খারাপ করা বউ। শুধু আছে একটা বাস্তব প্রয়োজন। কৃষিনির্ভর সমাজে সময়ের হিসেব রাখা। পাখির ডাক সেখানে গল্প নয়, ঘড়ি।
কাংড়া উপত্যকায় হারিয়ে যাওয়া রাখাল
এবার চলো যাই ভারতের হিমাচল প্রদেশের কাংড়া উপত্যকায়। পাহাড়ি এই এলাকায় মানুষ একই পাখির ডাকে শোনে সম্পূর্ণ অন্য একটা প্রশ্ন। আমার ভেড়া কোথায়? স্থানীয় ভাষায় ডাকটাকে বলা হয়, হোয়ার ইজ মাই শিপ। আর এর পেছনের গল্পটা বেশ গা ছমছমে।
কথিত আছে, বহু বছর আগে এক রাখাল ছিল যে তার ভেড়ার পাল নিয়ে পাহাড়ে চরাতে যেত। একদিন কোনো এক দুর্ঘটনায় সে মারা যায়, কিন্তু তার আত্মা শান্তি পায় না। কারণ, মৃত্যুর আগে তার শেষ চিন্তা ছিল, তার ভেড়াগুলো কোথায় গেল, তারা কি নিরাপদে বাড়ি ফিরেছে? সেই অতৃপ্ত আত্মাই নাকি এই পাখির রূপ ধরে পাহাড়ে পাহাড়ে ঘুরে বেড়ায়, খুঁজে বেড়ায় তার হারানো পালকে। সেই খোঁজার আকুতিই শোনা যায় তার ডাকে।
একই সুর, অথচ এখানে গল্পটা প্রেমের নয়, দায়িত্ববোধের, অসমাপ্ত কাজের, মৃত্যুর পরও রয়ে যাওয়া চিন্তার। রাখালের পেশা, তার জীবনযাপন, পাহাড়ি সমাজের ভয়-ভাবনা, সবকিছু মিলে তৈরি হয়েছে এই গল্প।
কেন এত আলাদা
তুমি এতক্ষণে নিশ্চয়ই খেয়াল করেছ—তিনটি গল্পই তিন রকম সমাজের ছাপ বহন করে। বাংলার কৃষিভিত্তিক পরিবারতান্ত্রিক সমাজে গল্পটা দাম্পত্য সম্পর্ক আর যোগাযোগহীনতা নিয়ে। চীনের গ্রামীণ কৃষিসমাজে গল্পটা সময় আর শৃঙ্খলা নিয়ে। আর কাংড়ার পাহাড়ি রাখাল-সমাজে গল্পটা দায়িত্ব আর অতৃপ্ত মৃত্যু নিয়ে। প্রতিটি সমাজ তার নিজের ভয়, নিজের দরকার, নিজের সম্পর্কের টানাপোড়েন দিয়ে একই শব্দকে ব্যাখ্যা করেছে।
এটাকে বলা যায় লোককথার এক অদ্ভুত নিয়ম। মানুষ যা বোঝে না, তাকে নিজের মতো করে অর্থ দিয়ে দেয়। পাখি তো জানে না তার ডাকের মানে কী দাঁড়াচ্ছে মানুষের কাছে। সে শুধু ডাকে; কারণ, প্রজননের মৌসুমে ডাকাই তার কাজ, সঙ্গী খোঁজার উপায়। বাকি সবটাই আমাদের মনের তৈরি।
তুমি যদি কখনো বিদেশি বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পাও, জিজ্ঞাসা কোরো তাদের দেশে কোন পাখির ডাক নিয়ে কী গল্প চালু আছে। হয়তো অবাক হয়ে যাবে, কতটা আলাদা হতে পারে মানুষের কল্পনা। অথচ পাখিটা হয়তো একই, ডাকটাও একই।
আজ রাতে যদি জানালার বাইরে কোনো পাখি ডাকে, একটু থেমে শুনো তো। কী মনে হয় তোমার কাছে, শুনতে কেমন? উত্তরটা তোমার নিজের কল্পনার ওপরেই হয়তো নির্ভর করছে।