জাপানে ১৮০০ মানুষ মিলে টেনে সরাল ৩৬০ টনের হিরোসাকি দুর্গ

জাপানের উত্তরাঞ্চলে প্রায় ১ হাজার ৮০০ মানুষ মিলে দড়ি টেনে সরিয়েছেন ৩৬০ টন ওজনের একটি দুর্গের টাওয়ার। ‘সো-রে, সো-রে’ স্লোগান দিতে দিতে তাঁরা ঐতিহাসিক হিরোসাকি দুর্গের টাওয়ারটি এর পুরোনো জায়গার দিকে দুই মিটারের বেশি সরিয়ে নেন।

জাপানের আওমোরি প্রিফেকচারে অবস্থিত হিরোসাকি দুর্গের সংস্কারকাজের অংশ হিসেবে দুর্গটি সরানো হয়েছে। ভূমিকম্পে দুর্গের একটি দেয়াল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর সেটি মেরামতের জন্য মূল কাঠামোটিকে সাময়িকভাবে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল।

সরানোর জন্য টাওয়ারটি বসানো হয়েছে বিশেষ রেলের ওপর। এরপর ৩০ মিটার লম্বা দড়ি ধরে ৮০ জনের একেকটি দল পালা করে টেনেছেন। ২২ আগস্ট (শনিবার) তাঁরা দুর্গটিকে ১ দশমিক ১৩ মিটার সরান। পরদিন আরও ১ দশমিক ০৯ মিটার এগিয়ে নেওয়া হয়।

আরও পড়ুন

এই কাজে জাপানের প্রাচীন এক কৌশল ব্যবহার করা হচ্ছে। যার নাম হিকিয়া। এ পদ্ধতিতে কোনো ভবন ভেঙে না ফেলে সেটিকে রোলারের ওপর বসিয়ে ধীরে ধীরে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সরিয়ে নেওয়া হয়।

এবারের আয়োজন অবশ্য শুধু প্রকৌশলের কৌশল দেখানোর জন্য নয়। এতে সাধারণ মানুষকেও সরাসরি অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। ২০১৫ সালে হিরোসাকি শহর কর্তৃপক্ষ প্রথমবারের মতো সাধারণ মানুষকে এই কাজে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিল। সেটিই ছিল নাগরিকদের অংশগ্রহণে প্রথম ‘হিকিয়া’ আয়োজন। প্রায় এক শতাব্দীর মধ্যে কোনো দুর্গ সরানোর কাজে এই পদ্ধতি ব্যবহারের ঘটনায় সেটিই ছিল প্রথম।

হিরোসাকি শহরের পার্ক ও সবুজায়ন বিভাগের প্রধান কেনসুকে হায়াসাকা দ্য গার্ডিয়ানকে বলেন, এবার ১ হাজার ৮০০ জনের জায়গায় অংশ নিতে আবেদন করেছিলেন প্রায় ৮ হাজার মানুষ। মানে সুযোগ পাওয়ার জন্য আবেদনকারীর সংখ্যা ছিল নির্ধারিত সংখ্যার প্রায় চার গুণ। শুধু জাপানের বিভিন্ন প্রান্ত থেকেই নয়, বিদেশ থেকেও অনেকে আবেদন করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার মানুষও ছিলেন।

দুর্গটির দেয়াল সংস্কারের কাজ শুরু হয়েছিল বেশ কয়েক বছর আগে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে দেয়ালটির কাজ শেষ হয়। এ সময় দেয়াল থেকে খুলে নেওয়া ২ হাজার ১৮৫টি পাথর আবার একে একে আগের জায়গায় বসানো হয়েছে।

দেয়ালের কাজ শেষ হওয়ার পর এবার দুর্গের টাওয়ারটিকে আবার এর পুরোনো অবস্থানে ফিরিয়ে নেওয়ার পালা। আর সেই কাজেই আবার সাধারণ মানুষের সাহায্য চেয়েছে কর্তৃপক্ষ।

আরও পড়ুন

৬১ বছর বয়সী মোতোহারু নাকাতা অংশ নিতে এসেছেন জাপানের একেবারে অন্য প্রান্ত হিরোশিমা থেকে। ১১ বছর আগেও তিনি এই দুর্গ সরানোর কাজে অংশ নিয়েছিলেন।

নাকাতা বলেন, আবারও এই কাজে অংশ নিতে পেরে তাঁর ভীষণ ভালো লাগছে। একটি দুর্গ টেনে সরানোর সুযোগ জীবনে আর কোথায় পাওয়া যাবে? এই অভিজ্ঞতা তাঁর কাছে অসাধারণ।

মানুষের হাতে দুর্গ সরানোর এই কাজ চলবে আগস্টের শেষ পর্যন্ত। সব মিলিয়ে প্রায় ৪ হাজার ১০০ মানুষ এতে অংশ নেবেন। তাঁদের হাত দিয়ে দুর্গটি মোট ৫ মিটার সরানোর পরিকল্পনা রয়েছে, এরপর বাকি প্রায় ৭৩ মিটার সরানোর কাজ যন্ত্রের সাহায্যে করা হবে। সেটি বছরের শেষ নাগাদ শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

হিরোসাকি দুর্গের এই টাওয়ার জাপানে টিকে থাকা মাত্র ১২টি ঐতিহাসিক দুর্গ-টাওয়ারের একটি। উত্তর-পূর্ব জাপানের তোহোকু অঞ্চলে টিকে থাকা এমন কাঠামোর মধ্যে এটিই একমাত্র।

হিরোসাকি দুর্গ ছিল সুকারু গোত্রের কেন্দ্র। দুর্গটির নির্মাণ শেষ হয় ১৬১১ সালে। তবে সেই সময়ের মূল টাওয়ারটি বেশি দিন টেকেনি। ১৬২৭ সালে বজ্রপাতের কারণে দুর্গের বারুদঘরে আগুন ধরে যায়। আগুনে পুড়ে যায় মূল টাওয়ারটি।

বর্তমান টাওয়ারটি নির্মাণ করা হয় ১৮১০ সালে। এত বছর পরও এটি টিকে আছে। এখন দুর্গটি ঘিরে তৈরি হয়েছে একটি বড় পার্ক। প্রতিবছর শুধু চেরি ফুল ফোটার মৌসুমেই এখানে প্রায় ২০ লাখ মানুষ ঘুরতে আসেন।

তবে সংস্কারকাজের কারণে পর্যটকদের জন্য দুর্গের টাওয়ারটি আরও কয়েক বছর বন্ধ থাকবে। কাজ শেষ করে সেটিকে আবার আগের ভিত্তির ওপর বসানো হবে। এরপর সংরক্ষণের কাজ চলার সময় পুরো কাঠামোটি ঢেকে রাখা হবে।

কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনা অনুযায়ী, সব কাজ শেষ হলে ২০৩৩ সালে আবার দর্শনার্থীদের জন্য খুলে দেওয়া হতে পারে হিরোসাকি দুর্গের এই ঐতিহাসিক টাওয়ার।

আরও পড়ুন