গরমে পথ হারানো নারীকে সাহায্য করে স্বীকৃতি পেয়েছে ১৪ বছরের কিশোর
যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনার গিলবার্ট শহর। জুন মাসে এখনকার আবহাওয়া ছিল বেশ গরম। এই গরমে এক নারী রাস্তার পাশে অসুস্থ হয়ে পড়েন। এই নারীকে অসহায় অবস্থায় দেখে সাইকেল থামিয়েছিল ১৪ বছরের কিশোর রয়্যাল কুথরান। পরে জানা যায়, ওই নারীর ডিমেনশিয়া ছিল। পথ হারিয়ে তিনি বুঝতে পারছিলেন না, কীভাবে বাড়ি ফিরবেন।
দিনটি ছিল ৭ জুন। রয়্যাল তখন বাড়ির কাছাকাছি এলাকায় সাইকেল চালাচ্ছিল। হঠাৎ সে দেখতে পায় এই নারীকে। ঠিকমতো হাঁটতে পারছিলেন না তিনি। বাইরে তখন তাপমাত্রা ১০০ ডিগ্রি ফারেনহাইটের (প্রায় ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস) ওপরে। প্রচণ্ড গরমে নারীর মুখ লাল হয়ে গিয়েছিল।
রয়্যাল সঙ্গে সঙ্গে সাইকেল থামায়। পরে সে বলেছে, ‘বুঝতে পারছিলাম, ব্যাপারটা গুরুতর’।
এই নারীর হাতে ছিল বড় একটি বাজারের ব্যাগ। রয়্যাল তাঁকে জিজ্ঞাসা করল, কোথায় যাচ্ছেন? তিনি বললেন, নিজের অ্যাপার্টমেন্টে ফিরতে চান। কিন্তু তাঁর বাড়ি কোথায়, সেটাই মনে করতে পারছিলেন না।
রয়্যাল ফোন বের করে আশপাশে খোঁজ করল। কাছাকাছি যে অ্যাপার্টমেন্টটি পাওয়া গেল, সেটি প্রায় তিন মাইল দূরে।
এরপর রয়্যাল তাঁকে রাস্তার পাশের ছায়ায় নিয়ে গেল। কিন্তু কিছুক্ষণ কথা বলার পর সে বুঝতে পারল, পরিস্থিতি আরও গুরুতর।
রয়্যাল বলেছে ‘আমি যত বেশি তাঁর সঙ্গে কথা বলছিলাম, তাঁর কথাগুলো তত বেশি এলোমেলো হয়ে যাচ্ছিল’। ‘তিনি বারবার বলছিলেন, “অনেক গরম”, “আমাকে সাহায্য করো।” কখনো বিড়বিড় করছিলেন, আবার পড়ে যাচ্ছিলেন।’
এই নারী বেশ ভয় পেয়েছেন বলে মনে করেছিল রয়্যাল। নারীর ফোন ছিল ব্যাগের ভেতর। কিন্তু ব্যাগের জিপ আটকে যাওয়ায় ফোন বের করতে পারছিলেন না।
রয়্যাল নিজেই জিপ খোলার চেষ্টা করল। কিন্তু সেটি কিছুতেই খুলছিল না।
‘আমি আমার পুরো শক্তি দিয়ে জিপটা খোলার চেষ্টা করেছি, কিন্তু পারিনি। বুঝতে পারছিলাম, তিনি একটু আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। আমি বুঝতে পারছিলাম না, তিনি অজ্ঞান হয়ে যাবেন কি না, কিংবা এরপর কী ঘটবে’।
রয়্যাল বুঝতে পারল, প্রচণ্ড গরমে নারীর শরীরের তাপমাত্রা অতিরিক্ত বেড়ে যাচ্ছে।
ঠিক তখনই নারীটি বললেন, তাঁর ছেলের ফোন নম্বর তাঁর মনে আছে।
রয়্যাল নম্বরটি নিয়ে ফোন করল। ফোন ধরলেন নারীটির ছেলে জেফ মরগ্যান। তিনি তখনই ঘটনাস্থলের দিকে রওনা হলেন।
তবে তাঁর আসতে কিছুটা সময় লাগল। এর মধ্যে নারীটি আবার পড়ে গিয়ে হাতে আঁচড় পান। রয়্যাল তাঁকে উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করতে চেয়েছিল। কিন্তু তিনি উঠতে রাজি হননি।
‘তিনি উঠতেই চাইছিলেন না। শুধু বলছিলেন, পাথরগুলো ঠান্ডা এবং শুয়ে থাকলে তাঁর মাথা ঘুরছে না’।
কিছুক্ষণ পর ঘটনাস্থলে পৌঁছান মরগ্যান। তিনি জরুরি সেবায় ফোন করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই দমকল ও চিকিৎসাকর্মীরা সেখানে পৌঁছে যান।
রয়্যাল কিন্তু তখনো চলে যায়নি। প্রথমবার নারীটিকে দেখার প্রায় দেড় ঘণ্টা পর তাঁকে তাঁর ছেলের গাড়িতে তুলে দেওয়া পর্যন্ত সেখানেই অপেক্ষা করেছিল সে।
পরে মরগ্যান জানান, কিশোরটির আচরণ তাঁকে সত্যিই অবাক করেছে। তিনি বলেছেন ‘সে যদি ওই নারীকে দেখে সাইকেল চালিয়ে চলে যেত, তাহলে পরিস্থিতি অন্য রকম হতে পারত। ভাগ্য ভালো, এমন একজন নিঃস্বার্থ ও যত্নশীল মানুষের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়েছিল। আশ্চর্যের বিষয়, রয়্যাল পুরো সময়টুকু তাঁর পাশে ছিল। যেন তিনি নিজের পরিবারের একজন।’
পরে জানা যায়, ওই নারী ছিলেন মরগ্যানের মা থেরেসা। জুলাই মাসে তাঁর বয়স ৭৬ বছর হয়েছে। গত বছর তাঁর ডিমেনশিয়া ধরা পড়ে।
ঘটনার দিন তিনি কাছের একটি মুদি দোকানে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে বাড়ি ফেরার সময় পথ হারিয়ে ফেলেন।
মরগ্যান জানিয়েছেন, এর আগে তাঁর সঙ্গে কখনো এমন ঘটনা ঘটেনি। এখন তিনি একা বাইরে বের হন না এবং তাঁর ছোট ছেলের সঙ্গে থাকেন। আমরা তাঁকে খুব ভালোবাসি। ভবিষ্যতে যেন এমন কিছু আর না ঘটে, আমরা সেটি নিশ্চিত করছি।
গিলবার্ট শহরের ফায়ার চিফ রব ডাগান বলেছেন, সেদিন ঘটনাটি আরও ভয়াবহ হতে পারত। তিনি তখন পর্যন্ত অনেকক্ষণ বাইরে ছিলেন। আর একটু বেশি সময় পার হলে তাঁর হাঁটার ক্ষমতা চলে যেতে পারত। প্রচণ্ড গরমে বিভ্রান্তি আরও বেড়ে যেত।
ডাগানকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছে ১৪ বছরের রয়্যালের আচরণ। তাঁর মতে ‘সে খুব দ্রুত বুঝতে পেরেছিল যে ওই নারী বিপদে আছেন। তাঁর বয়সের কথা বিবেচনা করলে, পরিস্থিতির গুরুত্ব এত দ্রুত বুঝতে পারা সত্যিই অসাধারণ’।
রয়্যালের এই কাজের স্বীকৃতিও মিলেছে। ১১ আগস্ট গিলবার্ট সিটি কাউন্সিলের এক সভায় তাকে সম্মাননা দেওয়া হয়। শহরের পক্ষ থেকে তাকে দেওয়া হয় শহরের চাবি, একটি জীবনরক্ষাকারী পুরস্কার এবং দমকল বিভাগের একটি বিশেষ টুপি।
ফায়ার চিফ রব ডাগান ও ভাইস মেয়র চাক বোনজিওভান্নি তার হাতে পুরস্কার তুলে দেন।
ভাইস মেয়র বলেন, ‘সে সত্যিই অসাধারণ একটি ছেলে। তাকে সম্মান জানাতে পেরে আমরা গর্বিত।’
ডাগান বলেন, ‘কিশোরদের নিয়ে অনেক সময় নেতিবাচক খবর সামনে আসে। কিন্তু রয়্যালের মতো ঘটনাগুলো দেখিয়ে দেয়, অসংখ্য কিশোর-কিশোরী অন্যের জন্য ভালো কিছু করছে। আমাদের চারপাশে অনেক ভালো কিশোর আছে, যারা নিঃস্বার্থভাবে মানুষের উপকার করছে। তাদেরও স্বীকৃতি দেওয়া দরকার’।
মরগ্যান বলেছেন, ‘রয়্যাল আমাদের সবার জন্য একটি উদাহরণ। সে আমাদের নায়ক’।
তবে এত সম্মান পাওয়ার কথা রয়্যাল নিজেও ভাবেনি। তার কাছে ঘটনাটি ছিল খুবই সাধারণ। সে বলেছে, ‘সত্যি বলতে, আমি শুধু দেখেছিলাম একজন মানুষের সাহায্য দরকার। তাই আমি তাকে সাহায্য করেছি’।