অসুস্থ হলে অদ্ভুত সব স্বপ্ন দেখি কেন

স্বপ্ন এমনিতেই বেশ অদ্ভুত হতে পারে। তবে শরীর খারাপ থাকলে বা জ্বর হলে সেই স্বপ্নগুলো আরও অদ্ভুত ও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। গবেষণায় দেখা গেছে, জ্বরের সময় মানুষ যেসব স্বপ্ন দেখে, সেগুলো সাধারণ স্বপ্নের চেয়ে অনেক বেশি পরিষ্কার মনে থাকে। আর তাতে ভয় বা অনুভূতির পরিমাণও বেশি থাকে। কিন্তু অসুস্থ হলে আমাদের স্বপ্নে কেন এমন বিচিত্র ঘটনা ঘটে?

জ্বরের ঘোরে স্বপ্নের অদ্ভুত দুনিয়া

জ্বরের সময় মাথার মধ্যে বিভ্রম বা উল্টাপাল্টা চিন্তা কেন আসে, তা নিয়ে বিজ্ঞানীরা বহু বছর ধরে গবেষণা করছেন। ১৮৯২ সালে চিকিৎসাবিজ্ঞানী জোসেফ কোটস এক জার্নালে নিজের টাইফাস জ্বরের অভিজ্ঞতা লিখেছিলেন। জ্বরের তীব্রতায় শরীরের তাপমাত্রা অনেক বেড়ে যাওয়ায় তিনি প্রলাপ বকা শুরু করেন। তিনি চোখের সামনে নিজের বোনের মৃত্যুর দৃশ্য দেখতে পান, যা এতটাই আসল মনে হয়েছিল যে পরের দিনও তিনি বিশ্বাস করতেন বোন সত্যি মারা গেছেন। অথচ তখন তিনি জেগেই ছিলেন।

ঘুম নিয়ে গবেষণা করেন জার্মানির বিজ্ঞানী মাইকেল শ্রেডল। তিনি জানান, জ্বরের সময় আমাদের মস্তিষ্ক ঠিকভাবে কাজ করতে পারে না। ফলে ঘুমের মধ্যে যেসব স্বপ্ন তৈরি হয়, সেগুলো খুব অদ্ভুত হয়ে ওঠে। গবেষণায় দেখা গেছে, সাধারণ স্বপ্নের চেয়ে জ্বরের সময়ের স্বপ্নগুলো প্রায় ৫৮ শতাংশ বেশি অদ্ভুত হয়। এসব স্বপ্নে প্রায়ই আশপাশের জিনিসের আকার বদলে যেতে দেখা যায়। ঘরের দেয়াল নড়াচড়া করছে, বিশাল আকৃতির পোকা ঘুরে বেড়াচ্ছে কিংবা প্রকাণ্ড হাত-পাওয়ালা কোনো প্রাণী সামনে দাঁড়িয়ে আছে।

বিজ্ঞানীদের মতে, জ্বর হলে যেহেতু মানুষ জেগে থাকা অবস্থাতেই ঠিকমতো চিন্তাভাবনা করতে পারে না, তাই শরীরের উচ্চ তাপমাত্রায় মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কাজ ব্যাহত হয়। এই কারণেই স্বপ্নের ভেতর এমন সব অদ্ভুত ও বিচিত্র জিনিস দেখা যায়।

আরও পড়ুন
ঘরে ঘরে এখন জ্বরের প্রকোপ। ছবিটি প্রতীকী
ছবি: সৌরভ দাশ

শরীরের তাপমাত্রা বাড়লে মস্তিষ্কে কী ঘটে

বেশ কয়েকটি গবেষণায় দেখা গেছে, শরীরের তাপমাত্রা অনেক বেড়ে গেলে মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কাজের ছন্দ বিঘ্নিত হয়। ফলে আমাদের সাধারণ চিন্তাভাবনা করার ক্ষমতা কমে যায়।

শরীরের তাপমাত্রা সাধারণ ১০১.৮ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত উঠলে মানুষের স্মৃতিশক্তিতে প্রভাব পড়তে পারে। এ ছাড়া অনেকক্ষণ অতিরিক্ত গরমের মধ্যে থাকলে মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশের মধ্যে যে সংকেত আদান-প্রদান চলে, তাতে সমস্যা দেখা দেয়। ফলে মানুষের মনোযোগ দেওয়া, কোনো কিছু মনে রাখা বা দ্রুত কিছু বোঝার ক্ষমতা কমে যায়।

তবে জ্বর থাকা অবস্থায় মানুষ যখন স্বপ্ন দেখে, তখন মস্তিষ্কের ভেতর ঠিক কী ঘটে, তা এখনো কোনো গবেষক সরাসরি পরীক্ষা করে দেখতে পারেননি। তাই জ্বরের ঘোরে মস্তিষ্ক কীভাবে এমন অদ্ভুত সব দৃশ্য তৈরি করে, তা পুরোপুরি নিশ্চিত হয়ে বলা কঠিন। এমন গবেষণা চালানো বেশ কঠিন। বিজ্ঞানী মাইকেল শ্রেডল জানান, যদি অসুস্থ ও ঘুমন্ত মানুষকে এমআরআই মেশিনের ভেতর রেখে পরীক্ষা করা যেত, তবে হয়তো এ রহস্য জানা সম্ভব হতো।

আরও পড়ুন
মডেল: প্রমি, ছবি: অধুনা

শরীরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও জ্বরের স্বপ্ন

শরীরের তাপমাত্রা খুব বেশি বেড়ে যাওয়া শরীরের জন্য ক্ষতিকর। তবু জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়াই করতে শরীর কেন গরম হয়, তা ভাবলে বেশ অবাক লাগে।

আসলে জ্বর হওয়ার আসল কারণ নিয়ে বিজ্ঞানীরা এখনো পুরো নিশ্চিত নন। তবে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ধারণাটি হলো, শরীরের তাপমাত্রা বাড়লে ক্ষতিকর জীবাণুরা সহজে বংশবৃদ্ধি করতে পারে না। এ ছাড়া কিছুটা বেশি তাপমাত্রায় শরীরের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা আরও ভালোভাবে কাজ করতে পারে।

সংক্রমণ হলে শরীর গরম হয়ে যাওয়ার এই প্রক্রিয়াটি কিন্তু নতুন নয়। প্রায় ৬০ কোটি বছর আগে এর সূচনা হয়েছিল। এত দীর্ঘ সময় ধরে এটি টিকে আছে বলে ধারণা করা হয়, শরীরের জন্য জ্বরের ক্ষতিকর দিকের চেয়ে উপকারী দিকই বেশি।

মজার বিষয় হলো, জ্বরের ঘোরে দেখা স্বপ্নে প্রায়ই গরম বা তাপের বিষয় চলে আসে। বিজ্ঞানী মাইকেল শ্রেডলের গবেষণায় দেখা গেছে, সাধারণ স্বপ্নের চেয়ে জ্বরের ঘোরে দেখা স্বপ্নে তাপ-সংক্রান্ত বিষয় প্রায় পাঁচ গুণ বেশি থাকে।

অসুস্থ থাকলে মানুষের মন ভালো থাকে না, তাই জ্বরের সময়ের স্বপ্নগুলোও সাধারণত ভীতিজনক বা নেতিবাচক হয়। গবেষণায় অংশ নেওয়া একজন ব্যক্তি তাঁর একটি স্বপ্নের কথা জানান। তিনি স্বপ্নে দেখেন, চারপাশের বাতাস তীব্র গরম হয়ে গেছে এবং বিশাল এক জ্বলন্ত লাভার পিণ্ড তাঁকে তাড়া করছে!

এ থেকে মনে হতে পারে, শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার কারণেই হয়তো স্বপ্নে এসব গরম বা আগুনের দৃশ্য আসে। তবে বিজ্ঞানীরা জানান, শরীরের তাপ সরাসরি স্বপ্নে প্রভাব ফেলে, নাকি মানুষ কেবল জ্বর হওয়ার কারণে গরমের স্বপ্ন দেখে, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

সূত্র: আইএফএল সায়েন্স
আরও পড়ুন