ঘুম কোন বয়সে কত ঘণ্টা, কেমন আর কত দূর গেলে বিপদ হবে
ঘুম আমাদের জীবনের সবচেয়ে স্বাভাবিক অভ্যাস। তবু এই স্বাভাবিক বিষয়টি নিয়েই আমাদের সবচেয়ে বেশি ভুল ধারণা। কেউ ভাবে, বেশি ঘুমালেই ভালো। কেউ আবার মনে করে, কম ঘুমিয়েই সফল হওয়া যায়। কিন্তু বিজ্ঞান বলছে, ঘুমের প্রশ্নে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বয়স অনুযায়ী পরিমাণমতো ঘুমানো বা তার চেয়ে বেশি ঘুমানো। ঘুমের গুণগত মানই আসল কথা।
চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে, বয়সের সঙ্গে ঘুমের প্রয়োজন বদলায়। নবজাতক শিশুদের প্রতিদিন প্রায় ১৪ থেকে ১৭ ঘণ্টা ঘুম দরকার। এক থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের জন্য আদর্শ ঘুমের সময় প্রতিদিন ১০ থেকে ১৪ ঘণ্টা। স্কুলপড়ুয়া শিশুদের প্রয়োজন ৯ থেকে ১২ ঘণ্টা ঘুম। কিশোর বয়সে শরীর ও মস্তিষ্ক দ্রুত পরিবর্তনের মধ্যে থাকে। তাই ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা ঘুম খুব জরুরি। প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য সাধারণভাবে ৭-৯ ঘণ্টা ঘুমকে স্বাস্থ্যকর ধরা হয়। বয়স বাড়লে ঘুমের সময় কিছুটা কমে আসে, কিন্তু নিয়মিত ও নিরবচ্ছিন্ন হলে ৭-৮ ঘণ্টাই যথেষ্ট।
তবে ঘুমের প্রশ্নে শুধু ‘কত ঘণ্টা’ হিসাব করলে হবে না। ‘কেমন ঘুম’ হচ্ছে, সেটাই আসল প্রশ্ন। আট ঘণ্টা বিছানায় শুয়ে থাকলেও যদি বারবার ঘুম ভেঙে যায়, সকালে ক্লান্ত লাগে, তাহলে সেটিকে কোয়ালিটি ঘুম বলা যায় না। ভালো ঘুম মানে এমন ঘুম, যেখানে শরীর ডিপ স্লিপ ও রেম স্লিপ—এই দুই গুরুত্বপূর্ণ ধাপ ঠিকভাবে সম্পন্ন করতে পারে। এ সময়েই মস্তিষ্ক স্মৃতি গুছিয়ে নেয়, আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে। এ সময়ে শরীর নিজেকে মেরামত করে।
এই কোয়ালিটি ঘুম নষ্ট হয় নানা কারণে। অনিয়মিত ঘুমের সময়, ঘুমানোর আগে মুঠোফোন বা স্ক্রিন ব্যবহার, দেরিতে ভারী খাবার, অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা বা ক্যাফেইন গ্রহণ। অথচ কিছু সহজ অভ্যাসে করতে পারলেই ঘুমের মান অনেক ভালো করা যায়। প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়া এবং ঘুম থেকে ওঠা, শোবার ঘর অন্ধকার ও শান্ত রাখা, ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে স্ক্রিন এড়িয়ে চলা, এই ছোট নিয়মগুলোই বড় পার্থক্য গড়ে দেয়।
ঘুম নিয়ে মানুষের কৌতূহল অনেক। মানুষ জানতে চায় ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ঘুমিয়েছে কে? বাস্তবে ‘সবচেয়ে বেশি স্বাভাবিক ঘুম’-এর কোনো স্বীকৃত বিশ্বরেকর্ড নেই। কারণ, অস্বাভাবিক দীর্ঘ ঘুম সাধারণত অসুস্থতা বা ওষুধের প্রভাবে হয়। তাই গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস এমন রেকর্ড গ্রহণ করে না।
তবে বিপরীত দিকের একটি ঐতিহাসিক রেকর্ড আছে। ১৯৬৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের স্কুলছাত্র র্যান্ডি গার্ডনার টানা প্রায় ১১ দিন না ঘুমিয়ে জেগে ছিল—প্রায় ২৬৪ ঘণ্টা। এ সময় তাঁর বিভ্রান্তি, স্মৃতিভ্রংশ ও মনোযোগের গুরুতর সমস্যা দেখা দেয়। এ ঘটনা প্রমাণ করে, মানুষ কত দূর পর্যন্ত যেতে পারে। কেন এই সীমা অতিক্রম করা বিপজ্জনক, তা–ও এই রেকর্ড থেকে জানা যায়।
ইতিহাসে আবার এমন মানুষও আছেন, যাঁরা কম ঘুমিয়েও কাজ করেছেন। ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়ন বোনাপার্ট সাধারণত রাতে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা ঘুমাতেন। তবে দিনের বেলায় ছোট ছোট ন্যাপ নিয়ে নিজের ক্লান্তি সামলাতেন। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে, এ ধরনের উদাহরণ ব্যতিক্রম। আদর্শ উদাহরণ নয়।
বিষয়টা খুব সহজ। ঘুমকে তুমি বিলাসিতা হিসেবে মনে করতে পারবে না। আবার রেকর্ড ভাঙার বিষয়ও ভাবতে পারবে না। বয়স অনুযায়ী যথেষ্ট সময় নিয়ে, নিয়মিত ও গভীর ঘুমই শরীর সুস্থ রাখবে।