বৃষ্টি এলে ঘুম ঘুম পায় কেন
কখনো কি খেয়াল করেছ, বৃষ্টি শুরু হতে না হতেই কেন হুট করে ক্লান্ত লাগে? কিংবা বৃষ্টির দিনে সকালে বিছানা ছেড়ে ওঠা কেন এত কঠিন মনে হয়? আসলে এর জন্য তুমি একা দায়ী নও। তুমি অলসও নও। বৃষ্টির দিনে আমাদের বেশি ঘুম পাওয়ার পেছনে একটি বিশেষ কারণ রয়েছে।
বৃষ্টির সময় শরীর ম্যাজম্যাজ করা বা ঘুম ঘুম ভাব হওয়ার পেছনে বেশ কিছু কারণ কাজ করে। তবে এর বেশির ভাগ কারণই আমাদের শরীরের ভেতরের বিভিন্ন কার্যকলাপের সঙ্গে যুক্ত। বাইরের আবহাওয়া আমাদের শরীরের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে বলেই এমনটা ঘটে থাকে।
আবহাওয়া কীভাবে আমাদের ঘুমের ওপর প্রভাব ফেলে? সূর্যের আলোতে থাকা ইউভিএ ও ইউভিবি রশ্মি আমাদের শরীরে সেরোটোনিন হরমোন তৈরিতে সাহায্য করে। একই সঙ্গে এটি মস্তিষ্কের পিনিয়াল গ্রন্থি থেকে মেলাটোনিন হরমোনের উৎপাদন কমিয়ে দেয়। সেরোটোনিনকে বলা হয় সুখের হরমোন। এটি আমাদের শরীরকে সজাগ রাখে ও মেজাজ ফুরফুরে করে। অন্যদিকে মেলাটোনিন হরমোন আমাদের ঘুম ও জেগে থাকার চক্র নিয়ন্ত্রণ করে। ঘুমানোর সময় শরীরে মেলাটোনিনের পরিমাণ বেড়ে যায় ও জেগে থাকার সময় তা কমে যায়।
তবে বৃষ্টির দিনে আকাশে ঘন কালো মেঘ থাকে। এর ফলে আমরা পর্যাপ্ত সূর্যালোক পাই না। সূর্যালোকের এই অভাব আমাদের শরীরে রাতের মতো পরিবেশ তৈরি করে। ফলে শরীরে সেরোটোনিন হরমোনের উৎপাদন কমে যায় এবং মেলাটোনিন হরমোনের পরিমাণ বেড়ে যায়। এই কারণেই বৃষ্টির দিনে আমাদের বেশি ঘুম পায়।
শিকাগোর অ্যাডভোকেট ক্রাইস্ট মেডিক্যাল সেন্টারের ঘুম বিশেষজ্ঞ ডক্টর ড্যারিয়াস লোগমানি বিষয়টি নিয়ে কাজ করছেন। তিনি জানান, মানুষের ঘুমিয়ে পড়া বা জেগে ওঠার ক্ষমতা চারপাশের পরিবেশের ওপর অনেকখানি নির্ভর করে। আমরা যদি সম্পূর্ণ অন্ধকারে ঘুমাতে অভ্যস্ত হই, তবে ঘরে আলো থাকলে ঘুমানো কঠিন হয়ে পড়ে। একইভাবে আমরা যদি দিনের আলোয় ঘুম থেকে উঠতে অভ্যস্ত হই, তবে মেঘলা আবহাওয়ার কারণে চারপাশে অন্ধকার থাকলে সহজে ঘুম ভাঙতে চায় না। ঋতু বা আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে এমনটা ঘটে থাকে।
এ ছাড়া বর্ষাকালে বাতাসে আর্দ্রতা বা জলীয়বাষ্পের পরিমাণ অনেক বেড়ে যায়। এই সময়ে হোমিওস্ট্যাসিস প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শরীরের ভেতরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক রাখতে শরীরকে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি পরিশ্রম করতে হয়। এই অতিরিক্ত পরিশ্রমের কারণে আমাদের শরীর দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়ে। এতে ঘুম চলে আসে।
বাতাসে আর্দ্রতা বাড়ার পাশাপাশি ঝোড়ো আবহাওয়ার কারণে বায়ুমণ্ডলের চাপও কমে যায়। ঝড়ের সময় সাধারণত নিম্নচাপের সৃষ্টি হয়। এই নিম্নচাপের কারণে বাতাসে অক্সিজেনের মাত্রা কিছুটা কমে যায়। অক্সিজেনের এই সামান্য ঘাটতির কারণে আমাদের শরীরে ক্লান্তি ও তন্দ্রাচ্ছন্নতা তৈরি হতে পারে।
বৃষ্টির শব্দও আমাদের ঘুম আসার একটি বড় কারণ। বৃষ্টির শব্দ আসলে একধরনের পিঙ্ক নয়েজ, যা অনেকটা হোয়াইট নয়েজের মতোই কাজ করে। এই দুই ধরনের শব্দই মানুষের ভালো ঘুমে সাহায্য করে। কারণ, এগুলো ব্যাকগ্রাউন্ডে একটানা একটি শান্ত পরিবেশ তৈরি করে, যা চারপাশের অন্য যেকোনো বিরক্তিকর শব্দকে ঢেকে দেয়। তবে হোয়াইট নয়েজের চেয়ে পিঙ্ক নয়েজের তীক্ষ্ণতা অনেক কম এবং এটি মানুষের মনকে বেশি শান্ত করে। গাছের পাতার মর্মর শব্দ, মৃদু বাতাস, এমনকি মানুষের নিজের হৃৎস্পন্দনের শব্দও এই পিঙ্ক নয়েজের মধ্যে পড়ে।
ঋতু ও আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে মানুষের মনে একধরনের বিষণ্ণতা তৈরি হতে পারে। চিকিৎসার ভাষায় একে সিজনাল অ্যাফেক্টিভ ডিসঅর্ডার বা সংক্ষেপে স্যাড বলা হয়। মূলত শীতকাল বা বর্ষাকালে আকাশে সূর্যের আলো কমে যাওয়ার কারণে অনেকেই এই সমস্যায় ভোগেন। তবে বছরের যেকোনো সময়েই এই বিষণ্ণতা দেখা দিতে পারে।
এই ঋতুগত বিষণ্ণতা দূর করার একটি চিকিৎসা হলো লাইট থেরাপি। এটি বর্ষার দিনের মন খারাপ ভাব কাটাতেও দারুণ সাহায্য করে। এই চিকিৎসায় সাধারণত একটি বিশেষ লাইট থেরাপি বক্স ব্যবহার করা হয়। এই বক্স থেকে প্রায় ১০ হাজার লাক্স তীব্রতার আলো বের হয়, যা মানুষের মেজাজ ফুরফুরে করতে সাহায্য করে।
বৃষ্টির দিনে শরীর ম্যাজম্যাজ করলে অলসতা ভেঙে কিছুটা ব্যায়াম বা শারীরিক পরিশ্রম করা উচিত। এটি শরীরের ক্লান্তি দূর করার একটি দারুণ উপায়। এর পাশাপাশি কফি বা চা ছাড়াও পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করে শরীরকে সতেজ রাখা জরুরি।